তুহফাতুল হাদীস
ভারতবর্ষ মাযহাবপন্থী মুসলমানদের আবাসভূমি। এ অঞ্চলের মুসলমানগণ মাযহাব মেনে ইসলাম পালনে অভ্যস্ত এবং প্রায় ৯০ শতাংশই হানাফী মাযহাব অনুসরণ করে। ১২৪৬ হিজরী পর্যন্ত চার মাযহাবের কোনো একটি মাযহাব মানে না এমন মুসলমানের অস্তিত্ব এদেশে পাওয়া যায় না। ১২৪৬ হিজরীতে মৌলভী আব্দুল হক বেনারসী ইংরেজদের পরোক্ষ মদদে মুসলমানদের ঐক্যের মাঝে ভাঙ্গন সৃষ্টির জন্য আহলে হাদীস বা লা-মাযহাবী ফিরকা আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে হুসাইন আহমাদ বাটালবী এই ফেতনাকে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ মদদে আরো চাঙ্গা করেন।
বর্তমানে আমাদের দেশে লা-মাযহাবিয়্যাতের ফেতনা চরম আকার ধারণ করেছে। যুগে যুগে উলামায়ে কেরামই নব-উদ্ভাবিত সমস্ত ফেতনার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। একজন নায়েবে নবী হিসাবে চলমান এই ফেতনা সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানদেরকে সতর্ক করা আমি আমার দায়িত্ব মনে করি। আর সেই দায়িত্ব পালনের জন্য তারা যেসব মাসআলা নিয়ে ফেতনা করে থাকে, সেসব মাসআলা পারচা আকারে তৈরি করে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছি। বক্ষ্যমান গ্রন্থটি সেই পারচাসমূহেরই সংকলন। গ্রন্থে প্রথমত হানাফী মাযহাবের দলীল উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয়ত লা-মাযহাবীদের দলীল উল্লেখ করা হয়েছে, তৃতীয়ত তাদের দলীল খণ্ডন করে তাদের ভ্রষ্টতা প্রমাণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, লা-মাযহাবীদের অনেক দলীল চার মাযহাবের কোনো-না-কোনো মাযহাবে হুবহু পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কি ঐসব মাযহাবের অনুসারীরাও ভ্রষ্টতার মধ্যে রয়েছে? এর উত্তর হলো, যারা কোনো মুজতাহিদের মাযহাব অনুযায়ী কুরআন-হাদীসের উপর আমল করবে তারা ভ্রষ্ট বিবেচিত হবে না। কারণ সাধারণদের দায়িত্ব হল মুজতাহিদের কাছে জিজ্ঞেস করে সে অনুযায়ী আমল করা (সূরা নাহল:১৬)। আর মুজতাহিদ ইজতিহাদ করতে গিয়ে কোনো ভুল করলে তার কোনো পাপ হয় না (আল ওরাকাত ফিল উসূল পৃ.৬৫)। বরং ভুল করলেও একটি সাওয়াব হয়, আর ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলে দুইটি সাওয়াব হয়। (বুখারী হা.২৩১) সুতরাং মাযহাবী মুসলমানরা মাযহাব মানতে গিয়ে ভ্রষ্টতার শিকার হবে না। আর লা-মাযহাবীরা যেহেতু কোনো মুজতাহিদকে মানে না, আর নিজেরাও তারা মুজতাহিদ নয়, তাই অনধিকার চর্চার অপরাধে তারা ভ্রষ্ট বিবেচিত হবে। তাদের উদাহরণ, হাতুড়ে চিকিৎসকের ন্যায়। যার ভুল চিকিৎসায় রোগী মারা গেলে এর দায়ভার তাকেই বহন করতে হয়।
আলহামদুলিল্লাহ, কিতাবটি প্রকাশের এই শুভক্ষণে আমি আমার ঐসব শাগরিদদের বিশেষভাবে স্মরণ করছি যারা কিতাবের ‘মাওয়াদ’ সংগ্রহে আমাকে সহযোগিতা করেছে। আল্লাহ তা‘আলা উভয় জাহানে তাদেরকে কামিয়াব করুন।
মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। তাই নির্ভুল করার চেষ্টা সত্ত্বেও কিছু ভুল থেকে যাওয়া স্বাভাবিক। বিজ্ঞ কোনো পাঠক যদি কোনো ভুলের ব্যাপারে অবহিত করেন, তাহলে তা সাদরে গ্রহণ করা হবে।
আল্লাহ তা‘আলা এই কিতাবের মাধ্যমে আম-খাস সবাইকে সমান উপকৃত করুন এবং এই মেহনতের উসীলায় লা-মাযহাবীদের ফেতনার দ্বার বন্ধ করে দিন। আমীন।
পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণের ভূমিকা
বেশ কিছুদিন যাবত ‘তুহফাতুল হাদীস’ কিতাবখানি বাজারে নেই। চারদিক থেকে তাকাদা করা হচ্ছিলো দ্রুত প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু বিভিন্ন যৌক্তিক কারণে দেরি হয়ে গেলো। আলহামদুলিল্লাহ, কিতাবখানি আহলে হাদীস ফিরকার ফিতনাসমূহ ও প্রকৃত অবস্থা মুস্লিম জনগণকে অবহিতকরণে ভূমিকা রাখতে পেরেছে। প্রথম প্রকাশে বেশকিছু ভুল-ত্রুটি ও কমতি ছিলো। এবার চেষ্টা করা হয়েছে ভুলগুলো সংশোধন ও কিছু বিষয় সংযোজন করে কিতাবটির মান বৃদ্ধির মাধ্যমে সকলের জানার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটু পানি সিঞ্চনের জন্য। নিঃসন্দেহে লা-মাযহাবী ফিতনা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রকৃত অবস্থা প্রত্যেকেরই জানা প্রয়োজন।
পুরানো কথারই পুনরাবৃত্তি করে বলছি, মানুষ ভুলের উর্ধে নয়। তাই নির্ভুল করার চেষ্টা সত্ত্বেও কিছু ভুল থেকেই যায়। বিজ্ঞ কোনো পাঠক ভুল চিহ্নিত করে আমাকে জানালে পরবর্তী সংস্করণে সংশোধন করা হবে, ইনশা-আল্লাহ।
আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাবের উসীলায় তথাকথিত আহলে হাদীস ফিরকার ফিতনাসমূহ চীরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিন। আমীন।
বিনীত
মুফতী মনসূরুল হক