তালাক দেয়ার শরঈ বিধান
ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের চুক্তি অন্যান্য চুক্তির মত নয় বরং এতে একদিকে যেমন চুক্তি রয়েছে অপর দিকে এটি একটি ইবাদতও বটে। এ কারণেই হাদীসে পাকে বিবাহ শাদীর ব্যাপারে যেভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে অন্যান্য মুআমালা তথা বেচা কেনা ইত্যাদির ব্যাপারে তেমন উৎসাহিত করা হয় নাই। কাজেই শরীআতে বিবাহের চুক্তি একটি অত্যন্ত মূল্যবান চুক্তি যা সারা জীবনের জন্য সম্পাদন করা হয়। এ চুক্তি যেন ভঙ্গ করার মত কোর অবস্থা সৃষ্টি না হয়। সে দিকে ইসলাম বিশেষ ভাবে লক্ষ রেখেছে। কেননা এই সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিণাম শুধু স্বামী-স্ত্রী পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এতে উভয় পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সন্তানাদি থাকলে তাদের জীবনও বরবাদ হয়ে যায়। এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেই এর ফলে ক্ষতি গ্রস্ত হয় । এই জন্য শরীআতে বিবাহের চুক্তি ভঙ্গ করা তথা তালাকের বিষয়টিও অন্যান্য মুআমালার চেয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র । কুরআন ও হাদীসে তার জন্য অনেক আহকাম ও পরামর্শ বয়ান করা হয়েছে যাতে করে পরত পক্ষে বিবাহ বিচ্ছেদ সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয় । অতএব যদি কখনো স্বামী-স্ত্রীর মাঝে অমিল দেখা দেয়, বনি-বনা না হয় এবং একজন অপরজনের হক আদায় করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় তখন শরিআত তালাক দেয়ার পূর্বে সমস্যা সমাধানের জন্য দুটি ব্যবস্থা নিয়েছে । কোন অবস্থায় উক্ত ব্যবস্থা অবলম্বনের পূর্বে তালাক দেয়ার অনুমতি দেয়া হয় নাই। আল্লাহ না করুন যদি উক্ত দুটি ব্যবস্থা দ্বারাও সমস্যা সমাধান না হয় তখন কয়েকটি বিষয় খেয়াল রেখে স্বামীকে তালাক দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
প্রথম ব্যবস্থাটি কার্যকরী হলে উদ্ভূত সমস্যা স্বামী স্ত্রী দুজনের মধ্যেই মিট মাট হয়ে যায় তৃতীয় কোন লোকের প্রয়োজন হয় না। এতে স্বামীকে লক্ষ করে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে বলা হয়েছে।কুরআনে কারীমে স্বামীকে লক্ষ করে ইরশাদ হচ্ছে “তুমি যদি স্ত্রীর অবাধ্যতা কিংবা আনুগত্যের কিছু অভাব অনুভব কর, তবে,
(ক) সর্বপ্রথম সবর কর এবং তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে মানসিক ভাবে তাকে সংশোধন কর। এতে যদি কাজ হয়ে যায় তাহলে বিষয়টি এখানেই মিটে গেল।
(খ) আর যদি এতে কাজ না হয় তাহলে তাকে সতর্ক করার জন্য এবং নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে একই ঘরে পৃথক বিছানায় শয়ন করবে।
(গ) আর যদি এটাতেও কাজ না হয় তাহলে তৃতীয় পর্যায়ে হালকা শাসন তথা শরীরের যে সব স্থানে মারলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা নাই এবং চেহারা বাদ দিয়ে অন্যত্র হালকা প্রহারের অনুমতি আছে। কিন্তু এই পর্যায়েও স্ত্রীকে প্রহার করা রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহী ওয়াসাল্লাম পছন্দ করেননি। বরং তিনি বলেছেন আমার উম্মতের মধ্যে শরীফ ত্ববকা অর্থাৎ ভদ্র লোকেরা এমনটি করবে না। (বুখারী শরীফ - ৫২০৪)
মোট কথা শরিআত এই ব্যবস্থাটি এই জন্যেই দিয়েছে যে, যাতে ঘরের বিষয় ঘরেই মীমাংসা হয়ে যায়।
কিন্তু অনেক সময় মনোমালিন্য বা বিবাদ দীর্ঘায়িত হয়ে যায় যা স্ত্রীর কোন বদ স্বভাবের কারণে স্বামীর পক্ষ থেকে অহেতুক কড়াকড়ি ইত্যাদির কারণে হয়ে থাকে। যে কোন কারণেই হোক এমতাবস্থায় ঘরের ব্যাপার আর ঘরে সীমিত থাকে না। তখন বাইরে নিয়ে যাওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। কেননা সাধারণত এসব ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রী উভয় পক্ষের লোকেরা একে অপরকে মন্দ বলে বেড়ায় এবং তাদের মাঝে ফেৎনা ফাসাদ সৃষ্টি হয়। এই ফেৎনা ফাসাদের পথ বন্ধ করার জন্য শরিআত সালিশী ব্যবস্থা নিয়েছে যে, একজন সালিস স্বামীর পরিবারের পক্ষ থেকে আর একজন সালিস স্ত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে মনোনীত করা হবে। তাঁরা উভয়ে ইসলাহের নিয়তে স্বামী স্ত্রীর মাঝে বনি বনা করানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করবে । উক্ত সালিসগণ যদি ব্যর্থ হন তখন কয়েকটি শর্তের সাথে الطلاقابغضالمباحات তথা সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ তালাক দেওয়া) এই ভিত্তিতে স্বামীর জন্য এক তালাক দেওয়া জায়িয হবে। শর্তগুলি হচ্ছে (ক) স্ত্রী হায়েয থেকে পাক অবস্থায় হবে। (খ) উক্ত তুহুরে তার সাথে মিলন না হতে হবে। (গ) ঠাণ্ডা মস্তিস্কে অর্থাৎ রাগান্বিত অবস্থায় নয় (ঘ) এক সাথে একাধিক তালাক না দেয়া জরুরী । কারণ এক সাথে একাধিক তালাক বা তিন তালাকের কোন প্রয়োজন শরীআতে রাখে নাই। এক সাথে তিন তালাক জায়িযও করে নাই। জরুরতের ক্ষেত্রে এক তালাকই যথেষ্ট। মোট কথা উপরের বর্ণিত স্তর অতিক্রম না করে হঠাৎ করে তালাক দেয়া জায়িয নয় আর এর পূর্বে মাসআলা জানার জন্য ফাতওয়া নিতে হবে। সংশোধনের সকল রাস্তা অবলম্বন করতে হবে। তারপর তালাক দেয়ার মুহূর্তে উল্লেখিত কথাগুলি খেয়াল রাখতে হবে। এতে করে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ চাহে তো তালাক দেয়ার প্রয়োজন না ও থাকতে পারে। (তাকমীলায়ে ফাতহুল মুলহিম .১:১৩৩ # همارىعائليمسائلج1 ص 118 # ফাতাওয়ায়ে শামী.৩:৪৪১)