18

অবতরণিকা

বিসমিহী তা‘আলা

হিন্দুস্তানে ইসলামের পুনর্জাগরণ এবং সাধারণ মানুষের মাঝে দ্বীনী সচেতনতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ইসলামী মাদরাসাগুলো যে ভূমিকা পালন করছে তা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট। এমনকি বর্তমানে ইসলামী মাদরাসাগুলোর অস্তিত্বই ইসলামের বড় বড় শত্রুদের মাথা ব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একদিকে তারা ঐ মাদরাসাগুলোর দিকে শকুনের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আর অন্য দিকে স্বয়ং মুসলমানদের মধ্যকার এমন একটি গোষ্ঠিকে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করছে যারা জনসাধারণকে ঐসমস্ত মাদরাসা থেকে বিচ্ছিন্ন করা, আলেম-উলামাদের প্রতি তাদের লালিত আস্থা বিনষ্ট করা এবং তাদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অপচেষ্টায় কোন ত্রুটি করছে না।

অপর দিকে এ তিক্ত বাস্তবতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, স্বয়ং মাদরাসা কর্তৃপক্ষের অন্তর থেকে তাদের একটি মহামূল্যবান সম্পদের যথাযথ মূল্যায়ন ও কদরও উঠে যাচ্ছে। মাদরাসাগুলোর প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই হল, আল্লাহর দ্বীনকে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুউচ্চ করা। জনসাধারণের সংশোধন ও সফলতার দিকে লক্ষ্য করে আকাবিরে উম্মত এগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যেগুলো বর্তমানে এর মূল উদ্দেশ্য ও উপকারিতা হারাতে বসেছে। এগুলোর আসল পূঁজি ছিল ইখলাস ও তাওয়াক্কুল আলাল্লাহ। কিন্তু বর্তমানে তা দ্রুত গতিতে বস্তুনির্ভরতার প্রবাহের তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। পরিচালকবৃন্দের মধ্যে ইখলাসেছর পরিবর্তে পদের লোভ, ক্ষমতার লাগাম টানাটানি এবং জাতীয় সম্পদ ও ওয়াক্ফ সম্পত্তির প্রতি অসতর্কতা এবং মূল মাকসাদ থেকে উদাসীনতা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। আসাতিযায়ে কেরাম এবং ছাত্রদের পরস্পরের সম্পর্ক দুর্বল থেকে দুর্বলতর হচ্ছে। কলেজ-ইউনিভার্সিটিগুলোর মত একে অন্যের মধ্যে সম্পর্কহীনতা ও দূরত্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আসাতিযায়ে কেরাম শুধুমাত্র নিয়মমাফিক ঘন্টার সময়ে ঘন্টা করাকে নিজ যিম্মদারী মনে করছেন। ব্যস এতটুকুই। না তারা ছাত্রদের নেগরানী করছেন, না তাদের দ্বীনী, আখলাকী এবং আমলী তরবিয়তের দিকে যথেষ্ঠ পরিমাণ দৃষ্টি দিচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে বর্তমানে মাদরাসায় বসবাসরত ছাত্রদের থেকে অবরোধ ও পোষ্টারিং হচ্ছে। আর ফারেগ হওয়ার পরে তাদের মাধ্যমে ইলমে দ্বীনের খিদমতের পরিবর্তে মুসলিম সমাজে ফিতনা-ফাসাদ ও অনিষ্টতা ছড়াচ্ছে।

আমার মুহ্তারাম পিতা হযরত শাইখুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া সাহেব রহ.-এর দৃষ্টিতে এর মূল কারণ হচ্ছে, মাদরাসাগুলোর যিকিরের মজলিস বা খানকা থেকে খালি হওয়া। কেননা আল্লাহ তা‘আলার পবিত্র নাম তো গোটা বিশ্বজগতকে সামলে রেখেছে। তো মাদরাসাগুলো যেখানে শুধুমাত্র قال الله এবং قال الرسول -এর তা‘লীম ও তাবলীগের জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেখানে এগুলোকে কি আল্লাহ এ পবিত্র নাম হেফাযত করবে না? আপবীতী (২/৭৪৮)-এর মধ্যে অত্যন্ত আক্ষেপ ও ব্যথার সাথে তিনি লিখেন,

ছাত্রদের আদব ও শিষ্টাচারের প্রতি আমাদের আকাবিরদের বিশেষ দৃষ্টি থাকতো। ঐ যুগে ছাত্রদের অন্তরে আকাবির ও উস্তাদদের প্রতি আদব ও ইহতিরামের বিষয়টি এমনভাবে বদ্ধমূল ছিল যে, তা মনে হলে আর বর্তমান অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে খুবই দুঃখ ও আফসোস হয়। হযরত হাকীমুল উম্মতও এই বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন। ইফাযাতে ইয়াওমিয়্যা-র ৬ষ্ঠ খন্ডের এক জায়গায় তিনি বলেন,

‘অমুক মাদরাসায় এক সময় এমন একটি জামা‘আত ছিল যাদের কারণে মাদরাসায় সকল প্রকার খায়ের ও বরকতের ধারা অব্যাহত ছিল। প্রত্যক্ষভাবেও এবং পরোক্ষভাবেও। তৎকালে ভবন এতবড় ছিল না ঠিকই কিন্তু একটি এমন গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ ছিল যার কারণে মাদরাসাকে ‘খানকা’ মনে হতো। চতুর্দিকে শুধু বুযুর্গ আর বুযুর্গই নজরে আসতো। আর বর্তমানে সবকিছুই আছে, বরং আগের চেয়েও বেশী আছে, কিন্তু ঐ জিনিষ নেই যা তখন ছিল। যেন দেহ আছে আত্মা নেই। আমি মুহতামিম সাহেরকে (হযরত মাওলানা ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়্যব সাহেব রহ.) বলেছিলাম, এ অবস্থায় যদি মাদরাসাগুলো বাহ্যিক উন্নতিও করে তবে তা মৃত লাশ ফুলে যাওয়ার মতো হবে; যা গঠনের দিক থেকে বড় কিন্তু ফুলে যাওয়ার পরে যখন তা ফেটে যাবে তখন তার দুর্গন্ধ মানুষকে কাছে আসতে দিবে না।’

এ অবস্থার কারণে আমার পিতা হযরত শাইখুল হাদীস রহ. সবসময় চিন্তিত থাকতেন। তাঁর মতে মাদরাসাগুলোর ফিতনা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকরী বিষয় ছিল, মাদরাসার শিক্ষাব্যবস্থা পোক্ত করার সাথে সাথে যিকরূল্লাহর ব্যবস্থাও করা। ফলে তিনি মাদরাসাগুলোর কর্তৃপক্ষকে বার বার চিঠি লিখতেন, মৌখিক উৎসাহ দিতেন এবং নিজে সফর করে করে মাদরাসাগুলোতে খানকা প্রতিষ্ঠা করতেন। জীবনের শেষ দিকে হযরত শাইখুল হাদীস রহ. এ জন্যে খুবই ব্যস্ত ও পেরেশান ছিলেন।

এ কারণেই দারুল উলুম দেওবন্দসহ কয়েকটা বড় বড় ও গুরুত্বপূর্ণ মাদরাসার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি তিনি এদিকে আকৃষ্ট করেছেন। শত ওজর, অসুস্থতা এবং অতি দুর্বলতা সত্বেও নিজ দেশের বিভিন্ন এলাকা বাদেও এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকার বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। এবং প্রত্যেক জায়গায় নিজ মুতাআল্লেকীন বা যে কোন আহলুল্লাহ অথবা আহলে নিসবত তাঁর নজরে পড়েছে তাকেই তিনি আধ্যাত্মিক সংশোধনের কাজে নিযুক্ত করেছেন এবং যিকরুল্লাহর মজলিস কায়েম করেছেন আর দৃঢ়তার সাথে নিজ কাজে লেগে থাকার জন্য তাদেরকে উৎসাহ দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ তার ভাল ফল পাওয়া গেছে। বর্তমানে এমন অনেক মাদরাসা আছে যেখানে তা‘লীম ও তা‘আল্লুমের সাথে মাজালিসে যিকিরও বিদ্যমান রয়েছে, যেগুলোর বরকতে সেগুলোর তা‘লীমের উপকারিতা প্রকাশ্যভাবে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে।

এ ব্যাপারে হযরত শাইখুল হাদীস রহ.-র ব্যথা ও চিন্তা-ফিকিরের একটি বড় প্রমাণ হচ্ছে, তাঁর ঐ সমস্ত চিঠির আদান-প্রদান যা স্বয়ং তাঁর, মুফতী শফী রহ. এবং মাওলানা মুহাম্মদ ইউফুফ বিন্নুরী রহ.-র মাঝে হয়েছিল। হযরত শাইখুল হাদীস রহ. মাদরাসাগুলোতে মাজালিসে যিকির প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এ সমস্ত হযরতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এ সমস্ত হযরত তাঁর মতের সাথে শুধু একাত্মতা প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তা বাস্তবায়িত করেছেন এবং নিজ নিজ মাদরাসায় রীতিমত মাজালিসে যিকির কায়েম করেছেন।

মাদরাসাগুলোর বর্তমান অবস্থার আবেদন হলো, হযরত শাইখুল হাদীস রহ.-র উপরোল্লিখিত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়িত করা। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তাঁদের মধ্যে আদান-প্রদানকৃত ঐ চিঠিগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে। হযরত উলামায়ে কেরাম এবং মাদরাসাগুলোর কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন রইলো, আল্লাহর ওয়াস্তে এই লেখাগুলো মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করবেন এবং তা বাস্তবায়নে স্বত:স্ফূর্ত উদ্যোগী হবেন।

তাঁদের মধ্যে আদান-প্রদানকৃত ঐ চিঠিগুলোর মধ্যে ঐ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তরও পাওয়া যাবে, যা সাধারণত উলামায়ে কেরামের মনে উঁকি দিয়ে থাকে যে, মাদরাসাগুলোতে তো বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআনের তা‘লীম দেওয়া হয়, পবিত্র হাদীস সমূহ পড়ানো হয় এবং সেগুলোর পরিবেশ দিন-রাত আল্লাহ তা‘আলার পবিত্র নামের দ্বারাই মুখরিত থাকে। তাহলে আবার ভিন্নভাবে খানকা তৈরী করে মাজালিসে যিকির কায়েম করার প্রয়োজন কি? বরং কোন কোন উলামায়ে কেরামের মতে এ ব্যাপারটা ‘মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের পরিপন্থী’ বলে প্রতীয়মান হয়।

এটা আমাদের অন্তরের একটা দাবী, যা এ আশায় বলা হচ্ছে যে, হতে পারে আপনাদের অন্তর আমাদের এ কথা গ্রহণ করে নিবে।

আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের এ আওয়াজ যেন দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমির প্রতিধ্বনিতে পরিণত না হয়। মিল্লাতে ইসলামিয়ার এ মহা মূল্যবান সম্পদকে হেফাযতের জন্য আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে কোন না কোন স্তরে কবূল করে নেন। এটা হবে আমাদের প্রতি তাঁর বিরাট দয়া ও অনুগ্রহ।

বান্দা মুহাম্মদ তলহা কান্ধলবী

৭ই শাওয়াল, ১৪২৮ হিজরী