সমাজে রন্দ্রে রন্দ্রে সুদের সয়লাব ও সুদের ভয়াবহতা

(২৮-২২-২০২৫ঈ. তারিখে খিলগাঁও জামে মসজিদে প্রদত্ত জুমু‘আর বয়ানের অনুলিখন)

হামদ ও সালাতের পর...

বুযুর্গানে মুহতারাম, আজকের মূল আলোচনার পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনাদের খেদমতে পেশ করছি। জাতির ঈমান রক্ষার্থে বর্তমানে এ বিষয়ে সতর্ক করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

বাউল একটি কুফুরী মতবাদ

আজকাল একটা বিষয় নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে। তা হলো বাউল গোষ্ঠি ও তাদের কুফুরী মতবাদ। এ বিষয়ে সারকথা হলো, বাউল গোষ্ঠি সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন ধর্ম। ভন্ড ধর্ম। হিন্দু যেমন একটি ধর্ম, কাদিয়ানী একটি ধর্ম, তেমনি বাউলও একটি ধর্ম। ইসলামে তাদের কোন অংশ নেই। তাদের মূল থিওরী হলো, যে মুরশিদ সেই খোদা। আলাদা কোন খোদা নেই (নাউযুবিল্লাহ)। তাদের একটা মারাত্মক বিষয় হলো, তারা পঞ্চরস খায়। পঞ্চরস হলো, পেশাব, পায়খানা, হায়েয, নেফাস ও বীর্য। এই পাঁচটা মিক্সার করে তারা খায়। এই পাঁচটার মধ্যে একটা হলো পেশাব যার আরবী বাউল (بول)। বাউল খায় বলে তাদের নাম রেখেছে বাউল। জনসাধারণ তো আরবী জানে না। তাই তারা মনে করে বাউলরা মনে হয় অনেক বড় আল্লাহর ওলী। সত্যিকার অর্থে তারা কোন ওলী না। বরং তারা কাফের। তারা তো পেশাব খেয়ে পেশাব হয়ে গেছে। তারা তো সম্পূর্ণ কাফের। তাদের বড় মুরশিদ ও গুরু- লালন শাহ থেকে শুরু করে যত শাহ রয়েছে তারা সবাই কাফের। দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এদেরকে সমর্থন করছে। ফরহাদ মাজহার নামের এক ভন্ড সুন্নতী লেবাস গায়ে দিয়ে এই কাফেরদের পক্ষ নিয়েছে। এদের কারো ঈমান নেই। এদেরকে যে বা যারা সমর্থন করবে তারাও কাফের হয়ে যাবে। কেননা যে কাফেরকে সমর্থন করে সে নিজেও কাফের হয়ে যায়। আমাদের সকলের ঈমান রক্ষা করার জন্য একথাগুলো বলা আমার দায়িত্ব ছিল। এ কথাগুলো জানা না থাকলে, না জানি কে কোন পথে চলে যাবে??!! এক কথাতেই কাফের হয়ে যাবে। কাফের হয়ে গেলে পিছনের জীবনের সমস্ত আমল বাতিল বলে গণ্য হবে। স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। কাজেই কারো খপ্পরে পড়ে বাউলের পক্ষে কথা বলবেন না। এদের গান শুনবেন না। এদের কোন মজলিসে যাবেন না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে হেফাযত করুন। আমীন।

হালাল রিযিক নেক আমলের জন্য সহায়ক

আজকের আলোচ্য বিষয় হলো, ইসলামের যে মৌলিক বিষয়গুলোর ইলম অর্জন করা ফরয তা হলো পাঁচটি:

এক. আকাইদ তথা আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলগণ, ফেরেশতাগণ, আসমানী কিতাবসমূহ ইত্যাদি বিষয়ের উপর ঈমান রাখা।

দুই. ইবাদাত তথা নামায রোযা হজ্জ যাকাত ও অন্যান্য আমলসমূহ পালন করা।

তিন. মু‘আমালা তথা হালাল রিযিক উপার্জন করা ও হালাল পন্থায় লেনদেন করা।

চার. মু‘আশারা তথা সকল বান্দার হক আদায় করা ও তাদেরকে কষ্ট না দেওয়া।

পাঁচ. তাযকিয়া তথা অন্তরকে সাফ করা ও আত্মশুদ্ধি অর্জন করা।

কিন্তু সাধারণ মুসলমান প্রথম দু’টি অর্থাৎ কালেমা পড়া এবং নামায রোযা হজ্জ যাকাতকেই ইসলাম মনে করে। তারা ভাবে এতটুকুই ইসলাম। এই দুইটির বাইরে যে আরো কিছু রয়েছে যেমন, হালাল রিযিক, বান্দার হক ও আত্মশুদ্ধি এগুলোকে তারা ইসলাম মনে করে না। গুরুত্বও দেয় না।

এগুলোর মধ্যে তিন নম্বর মৌলিক বিষয় হলো, হালাল রিযিক। আল্লাহ তা‘আলা নবী রাসূলগণকেও হালাল রিযিক আহারের আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا

অর্থ: হে রাসূলগণ, তোমরা উৎকৃষ্ঠ বস্তু হতে খাও এবং নেক আমল করো। (সূরা মুমিনুন-৫১)

যারা আল্লাহ তা‘আলার সবচেয়ে প্রিয় নিকটতম বান্দা তাদেরকেই আল্লাহ তা‘আলা এই আদেশ করেছেন। সুতরাং আমাদের জন্যও অবশ্যই একই আদেশ। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,

عن أبي هريرة، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: " أيها الناس، إن الله طيب لا يقبل إلا طيبا، وإن الله أمر المؤمنين بما أمر به المرسلين، فقال: يا أيها الرسل كلوا من الطيبات واعملوا صالحا، إني بما تعملون عليم وقال: يا أيها الذين آمنوا كلوا من طيبات ما رزقناكم

অর্থ: হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা উত্তম এবং উত্তম জিনিস ছাড়া কবুল করেন না। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলগণকে যে আদেশ করেছেন মুমিনদেরকেও সেই আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে রাসূলগণ! তোমরা উৎকৃষ্ঠ বস্তু হতে খাও এবং নেক আমল করো। তোমরা যা আমল করো নিশ্চয় আমি সে সম্পর্কে অবগত। আরো বলেন, হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে জীবিকারূপে যে উৎকৃষ্ঠ বস্তুসমূহ দিয়েছি তা থেকে (যা ইচ্ছা) খাও। (সহীহ মুসলিম; হাদীস ১০১৫)

মুফাসসিরীনে কেরাম উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন, এখানে হালাল রিযিকের পর নেক আমলের নির্দেশ দেওয়ার হেকমত এই যে, হালাল রিযিক নেক আমলের জন্য সহায়ক হয়। (তাফসীরে রুহুল মাআনী ৯/২৪১)

অর্থাৎ হালাল রিযিক আহার করলে নেক আমলের প্রতি আগ্রহ তৈরী হয়। নেক আমলের দিকে যেতে না চাইলেও টেনে নিয়ে যায়। আর হারাম রিযিক মানুষকে গুনাহের দিকে নিয়ে যায়। তখন নেক আমল করতে ভালো লাগে না। শুধু গুনাহের কাজ ভালো লাগে। গুনাহের মধ্যেই মজা পায়। তাই হালাল রিযিক উপার্জন করতে হবে। হালাল রিযিক আহার করতে হবে। তাহলে নেক আমলের জন্য সহায়ক হবে।

মাসআলা না জানার কারণে সমাজে সুদের সয়লাব

সবাই তো রিযিক হাসিল করছে। কেউ ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে। আবার কেউ চাকুরির মাধ্যমে। কিন্তু হালাল পন্থায় রিযিল হাসিল করছে এমন ক’জন আছে? আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক রাযি. লাঠি নিয়ে বাজারে ঘুরতেন। একেক দোকানদারকে একেক মাসআলা জিজ্ঞেস করতেন। কেউ বলতে না পারলে তাকে বেত্রাঘাত করতেন। কারণ, বেচাকেনার মাসআলা না জেনে কেন ব্যবসা শুরু করলো? আগে মাসআলা জানতে হবে তারপর ব্যবসা শুরু করতে হবে।

মাসআলা জানা না থাকলে হালাল জিনিস, হালাল টাকা দিয়ে ক্রয় করার পরেও কোন ভুলের কারণে বেচাকেনা হারাম হতে পারে। আমরা অনেকে দেখেছি, মক্কা-মদিনায় লোকেরা হালাল পন্থায় বেচাকেনা করছে। তারা মাসআলা জানে। আপনি যদি তাদের কোন দোকানে একটা অলঙ্কার ফেরত দিয়ে আরেকটা কিনতে চান। তারা কিন্তু উভয়টার দামের মধ্যে কাটাকাটি করে না। বরং আপনি যে অলঙ্কার দিয়েছেন প্রথমে তার দাম আপনাকে ফেরত দিবে। তারপর আপনি যা কিনবেন তার দাম ঠিক করার পর আপনার পকেট থেকে দাম পরিশোধ করতে হবে। তাহলে এখানে দুইটা বেচাকেনা হলো। আপনারটা তারা কিনে নিল আর আপনি তাদেরটা কিনলেন। এমন করে না যে, দুইটার দাম ঠিক করার পর যতটুকু বেশি হবে সেটা ফেরত দিবে। কেননা স্বর্ণ-রূপার মধ্যে সমান সমান কেনাবেচা করা আবশ্যক। কম-বেশি হলে সুদ হবে। আমাদের দেশে তো এগুলোর কোন বালাই নেই। মাসআলা সম্পর্কেও অজ্ঞ। জানার চেষ্টাও করে না। সব মূর্খ লোকেরা কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে। যার ফলে হালাল বেচাকেনাও হারাম হয়ে যাচ্ছে। সমাজে সুদ-ঘুষের সয়লাব হচ্ছে। ব্যবসায়ী হোক বা চাকুরিজীবী হোক সবাই সুদী কারবারে লিপ্ত। আমি আপনাদের খেদমতে সুদী কারবারের কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছি:

এক. বর্তমান প্রচলিত অর্থ ব্যবস্থা সুদী কারবার

বর্তমান দুনিয়াতে যে অর্থ ব্যবস্থা চালু রয়েছে তা সুদ ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা। এখন যদিও কিছু নামধারী ইসলামী ব্যাংক দেখা যায় তাদের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। উদ্যোগটা জরুরী ছিল। কিন্তু বাস্তবে তারাও ইসলামী ব্যাংক চালু করতে পারেনি। কারণ তারা যখন কর্মী নিয়োগের ইন্টারভিউ নেয় তখন তারাই নিয়োগ পায় যারা পূর্বে সুদী ব্যাংকে চাকরী করেছে। আপনি তাদের সাথে ইসলামী কারবার করতে গেলে তারা টেবিলের নিচে হিসাব কষবে। তারপর যত সুদ আসবে তা একটু কম-বেশি করে বলবে আপনার মুনাফা এত টাকা। এটা ইসলামী ব্যাংক হলো কীভাবে? এটা ইসলামী ব্যাংকের কারবার হতে পারে না। ইসলামী ব্যাংক চালাতে হলে প্রত্যেক শাখায় হক্কানী মুফতী লাগবে। সুদ খুব সুক্ষ্ম বিষয়। সবাই বুঝতে পারে না। ব্যাংক বীমা ও ইনসুরেন্সে যারা চাকুরি করে তাদের বেতন হালাল নয়। তাদের ভিন্ন কোন ইনকাম সোর্স না থাকলে তাদের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়া যাবে না। তাদের সাথে মিলে কুরবানী করা যাবে না। তার কারণে বাকী ছয়জনের কুরবানী নষ্ট হয়ে যাবে। এজন্য তাকে বলতে হবে তুমি একটা ছাগল কিনে আলাদা কুরবানী করো। অন্য কারো সাথে মিশো না। তখন তার কুরবানী কবুল হবে কিনা সেটা আল্লাহ তা‘আলাই ভালো জানেন। বাকী ছয়জন তো বাঁচতে পারবে।

দুই. ঋণের বদলে জমি বন্ধক রেখে ভোগ করা সুদী কারবার

সমাজে ঋণের বদলে জমি বন্ধক রাখার প্রচলন রয়েছে। জমির মালিক যতদিন ঋণ পরিশোধ করতে না পারবে ঋণদাতা ততদিন মালিকের জমি ভক্ষণ করতে থাকবে। এটা সুদী কারবার। তাই যতদিন জমি ভক্ষণ করবে ততদিন সুদ খেতে থাকবে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এটা যে সুদী কারবার কেউ এটা মনেই করে না। ঋণদাতা যে সুদ খাচ্ছে সে মনেই করে না আমি সুদ খাচ্ছি। অথচ এই সুদখোরকে গ্রামের সবাই হাজী সাহেব হিসেবে চিনে। কিন্তু কেমন হাজী সাহেব? সুদ খেয়ে হাজী সাহেব। এমন হাজী সাহেব হয়ে কোন লাভ নেই। তাই বলছিলাম, সুদ খুব সুক্ষ্ম। এটা সাধারণ মানুষ বুঝবে না।

তিন. ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য ব্যাংক থেকে লোন গ্রহণ সুদী কারবার

কিছু ভাইকে পাবেন তার ব্যবসা ছোট আকারে ভালো চলছে। কিন্তু সে বড় করতে চায়। এখন বড় করতে হলে তো কোটি কোটি টাকা লাগবে। এত টাকা তাকে কে দিবে? তখন সে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ব্যাংক থেকে সুদভিত্তিক লোন নেয়। কারণ ব্যাংক ছাড়া তো কারো মালিকানায় এত টাকা নেই। যার মালিকানায় আছে সেও ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছে। এভাবে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া শরী‘আতে জায়িয নেই। হ্যাঁ, যার কাছে খাওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। সতর ঢাকার মত কোন কাপড় নেই। প্রাণ বাঁচানোর জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। এই তিন ক্ষেত্রে যদি সুদবিহীন লোন কারো কাছে না পাওয়া যায় তাহলে উক্ত ব্যক্তির জন্য সুদ ভিত্তিক লোন নেয়ার অবকাশ রয়েছে। তবে লোন নেওয়ার পর সব সময় ফিকির এবং চেষ্টা থাকতে হবে আল্লাহ তা‘আলা তাওফীক দেওয়ার সাথে সাথে ঋণ পরিশোধ করে দিব।

কিন্তু বর্তমানে যারা ব্যবসা করে তাদের নব্বই-পঁচানব্বই ভাগ ব্যবসায়ী ব্যবসা বড় করার উদ্দেশ্যে লোন নিচ্ছে আর খুব আনন্দ-ফুর্তী করছে। ব্যবসায়ীরা যখন দেখে ব্যবসায় লস হচ্ছে। কর্মচারীদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। তখন হঠাৎ করে আরেকটা নতুন ব্যবসা চালু করে। আর ব্যাংক থেকে বড় অংকের টাকা লোন নেয়। যেখানে লাগবে পঞ্চাশ কোটি সেখানে একশত কোটির আবেদন করে। অতঃপর পঞ্চাশ কোটি ব্যবসায় ইনভেস্ট করে। আর বাকী পঞ্চাশ কোটি হাতে আসে। সেটা দিয়ে বেতন দেয় এবং অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করে। এভাবে আবার যখন দেওলিয়া হয়ে যায় তখন আরেকটা ব্যবসা চালু করে। ব্যাংক থেকে লোন নেয়। নিজের প্রয়োজন মেটায়। এই সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্যবসা বৃদ্ধি করতে থাকে। আর ব্যাংকের কাছে ঋণী হতে থাকে। ঋণ যে ফেরত দিতে হবে, ঋণ থেকে বের হতে হবে, এ নিয়তই করে না। আল্লাহ তা‘আলা সবাইকে হেদায়াত দান করুন।

চার. ব্যাংকে ফিক্স ডিপোজিট রাখা সুদী কারবার

যারা সরকারি চাকুরি থেকে রিটায়ার্ড করে তারা একসাথে বড় অংকের টাকা পায়। এই টাকাটা অনেকেই ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখে। যেহেতু এটা করলে লাভ বেশি আসে। তখন পুরো টাকাটা ব্যাংকে জমা থাকে। আর মাসে মাসে অন্ততঃ পঞ্চাশ হাজার টাকা সুদ আসে। এই সুদের টাকা দিয়ে সংসারের খরচ বহন করে। দেখা যায় তারা খুব ভালোভাবে চলছে। কিন্তু হালাল টাকায় নয় বরং সুদের টাকায়। যত লোক রিটায়ার্ড করেছে তাদের তো এখন চাকুরি নেই, তারা চলছে কীভাবে? খোঁজ নিলে দেখা যাবে ব্যাংকের সুদের টাকা দিয়ে চলছে।

আবার অনেক সুদখোরকে দেখবেন মসজিদে দাঁড়িয়ে বয়ান দিচ্ছে যে, সবকিছু আল্লাহ থেকে হয়। একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা রিযিক দাতা। আপনারা এই বিশ্বাস রাখুন। তাদেরকে বলতে চাই, আল্লাহ তা‘আলা রিযিকদাতা তো ঠিক, তুমি সুদ খাও কেন? তুমি একটা হালাল পন্থা বের করে চলতে পারছো না কেন? উদাহরণ স্বরূপ, একটা ফ্ল্যাট ক্রয় করতে বা একটা দোকান ক্রয় করতে। তার ভাড়া দিয়ে চলতে। ফিকির করলে অনেক সূরত বের হবে। আলেমদের সাথে পরামর্শ করলেও তো কত সূরত বের হবে। কিন্তু কারো কাছে জিজ্ঞেস না করে নিজের বুঝ মত ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট রেখে ব্যাংকের সুদ দিয়ে সংসার চালাচ্ছে। এভাবে সুদ খেতে খেতে মারা যাচ্ছে। যে ব্যক্তি সুদ খেতে খেতে মারা যাবে তার কি কালেমা নসীব হবে? ঈমান নসীব হবে? সে তো আল্লাহ তা‘আলার সাথে যুদ্ধ করতে করতে মারা গেছে। তার ঈমান থাকবে কীভাবে? নব্বই থেকে পঁচানব্বই ভাগ সরকারি চাকুরিজীবী এই সমস্যার মধ্যে আছে। অনেকে হয়তো এটা কোন সমস্যাই মনে করে না। কিন্তু এটা মারাত্মক সমস্যা। ঈমান নিয়ে মরতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। এটা তো ভয়ানক বিষয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।

পাঁচ. আমদানি ডকুমেন্ট বিক্রি করা সুদী কারবার

আরেকটা সুদভিত্তিক লেনদেন হলো, বড় বড় ব্যবসায়ীরা অনলাইনে চুক্তি করে বিদেশ থেকে মাল আমদানি করে। প্রথমে বিভিন্ন দেশের পণ্য যাঁচাই করে দেখে কোন দেশে কী পণ্য রয়েছে। কোন দেশ থেকে আমদানী করলে লাভ বেশি হবে। অতঃপর বেশি লাভ করার জন্য যে দেশে সস্তা পায় সেখান থেকে মাল আমদানি করে। আমদানি করার সময় যখন বিদেশ থেকে মাল জাহাজে বুকিং দেয়ার পর রপ্তানিকারকের ব্যাংক চালান-রশিদসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র আমদানিকারকের ব্যাংকে পাঠিয়ে দেয়। তখন পন্য বন্দরে পৌঁছা পর্যন্ত আমদানিকারকের অপেক্ষা করা উচিত ছিল। কিন্তু আমদানিকারক অপেক্ষা না করে, যে ডকুমেন্ট হাতে পায় সেটাই একটু বেশী দামে আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেয়। ষাট লাখ টাকায় আমদানি করেছিল সত্তর লাখ টাকায় ডকুমেন্ট বিক্রি করে দেয়। অতঃপর সেই ক্রেতা আবার ডকুমেন্টটি আশি লাখ টাকায় বিক্রি করে। এভাবে পন্য বা ক্রয়কৃত দ্রব্য বন্দরে পৌঁছা পর্যন্ত কয়েক হাতে বিক্রি হতে হতে তার দাম পৌঁছে যায় কোটি টাকায়। সর্বশেষ ডকুমেন্টটি যার হাতে থাকে সে বন্দর থেকে পন্য খালাস করে। অতঃপর ষাট লাখ টাকার পন্য কোটি টাকায় মার্কেটে বিক্রি করে। এতে পন্যের বর্তমান দাম আসল দামের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে যায়। তখন সাধারণ ক্রেতাদের চড়া দামে কিনতে হয়। এই যে পন্যটি হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত যতজন বেচাকেনা করেছে এটা সুদী কারবার হয়েছে। হারাম হয়েছে। কারণ, শরি‘আত মতে এই ডকুমেন্ট বিক্রি করা জায়িয নেই। কেননা শরী‘আতে বেচাকেনা বলে, এক পক্ষ থেকে পন্য অপর পক্ষ থেকে মূল্য বিনিময় করাকে। রপ্তানিকারকের পক্ষ থেকে বেচাকেনার যে ডকুমেন্ট এসেছে এটা কোন পন্য নয়। এটা একটা কাগজ। এই কাগজের দাম মাত্র এক টাকা। কিন্তু বিক্রি করছে সত্তর লাখ। এটা সুদী কারবার। এরকম কত কারবার সমাজে চলছে যা আমারা কল্পনাও করতে পারবো না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে হেফাযত করুন।

ডকুমেন্ট বিক্রি বন্ধ করলে মালের দাম অনেক সস্তা থাকবে

পক্ষান্তরে যদি আমদানিকারক পন্যটি বন্দরে পৌঁছা পর্যন্ত অপেক্ষা করত। অতঃপর নিজে বন্দর থেকে খালাস করে মার্কেটে বিক্রি করত। তাহলে বেচাকেনা হালাল হতো। আর এখন আমরা যে দামে ক্রয় করছি তার অর্ধেক দামে ক্রয় করতে পারতাম। কোন মানুষ বাস্তহারা হয়ে শহরে এসে বস্তিতে বা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো লাগতো না। এ সমস্যা কেন হচ্ছে? বস্তিতে কারা আসছে? কেন আসছে? এগুলো একমাত্র উলামায়ে কেরাম বুঝবে। উলামায়ে কেরাম ছাড়া কোন জেনারেল শিক্ষিত লোক বুঝবে না যে এর গোড়া কোথায়? এর গোড়া হলো অবৈধ বেচাকেনা। আমদানিকারক পন্য হাতে পাওয়ার পূর্বে ডকুমেন্ট বিক্রি করা বন্ধ করুন। বন্দর থেকে আপনি নিজে পন্য খালাস করুন। নিজ হাতে মার্কেটে বিক্রি করুন। তাহলে দেশের সব জিনিসের দাম স্বাভাবিক থাকবে। পন্যের আসল দামের চেয়ে অনেকগুণ বাড়বে না। বরং অনেক সস্তা দামে পাওয়া যাবে। কিন্তু এটা কি সরকার জানে? সরকারের অর্থমন্ত্রী জানে? কেউ জানে না। তারা তো আল্লাহ তা‘আলার অর্থনীতি পড়েনি। তারা ইহুদীদের অর্থনীতি পড়েছে। এই একটা কারণে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যায়। সরকার যদি বুদ্ধিমান হয় আর এই একটা আইন পাস করে যে, কেউ ডকুমেন্ট বিক্রি করতে পারবে না। যিনি আমদানি করেছেন তিনি পন্য খালাস করে পাইকারী দামে বিক্রি করবেন। এই একটা আইন সরকার পাস করুক। তাহলে ইনশাআল্লাহ আজকে আইন পাস করবে কালকে সব জিনিসের দাম অর্ধেক হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন।

ছয়. চেক কম-বেশি করে বিক্রি করা সুদী কারবার

অনেকে চেকের মাধ্যমে বেচাকেনা করে। যেমন, কোন কোম্পানির কাছে মাল বিক্রি করার পর তারা চেকের মাধ্যমে পেমেন্ট করে। কিন্তু চেক তো নগদ টাকা নয়। অনেক সময় মালিকের তাৎক্ষনিক নগদ টাকা দরকার হয়। তখন ঐ চেকটি বিক্রি করে দেয়। যদি আনুমানিক বিশ লাখ টাকার চেক হয়। তাহলে সে ঊনিশ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেয়। এটা সুদী কারবার। কেননা চেকটিও টাকার মত। সুতরাং চেক টাকার বিনিময়ে বিক্রি করতে চাইলে সমান সমান বিক্রি করতে হবে। কম-বেশি করে বিক্রি করা জায়িয নেই। মালিকের উচিত ছিল একটু সবর করা। কিন্তু সবর করতে পারেনি তাই চেকটিই বিক্রি করেছে। আবার যা লেখা আছে তার চেয়ে কম মূল্যে বিক্রি করেছে। এটা সুদী কারবার হয়েছে। এর থেকে পরহেয করতে হবে।

সুদের ভয়াবহতা

এখানে সকল সুদী কারবার উল্লেখ করা সম্ভব নয়। আমি আপনাদের বোঝার জন্য কয়েকটা উদাহরণ পেশ করলাম। যেন আপনারা বুঝতে পারেন কীভাবে আমাদের সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে সুদ ঢুকে আছে। যেখানে দেখবেন সুদ পাবেন। কিন্তু এগুলো আমরা খেয়াল করছি না, গুরুত্বও দিচ্ছি না। অথচ সুদের ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে কঠিন কঠিন ধমকি এসেছে। সুদের ভয়াবহতা অনুধাবন করার জন্য কিছু উল্লেখ করছি:

এক. সুদখোরের সাথে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের যুদ্ধের ঘোষণা

কুরআনে কারীমে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ، فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ

অর্থ: হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমরা যদি প্রকৃত মুমিন হয়ে থাকো তবে সুদের যে অংশই (কারো কাছে) অবশিষ্ট রয়ে গেছে, তা ছেড়ে দাও। তবু যদি তোমরা (তা) না করো তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও। (সূরা বাকারা-২৭৮,২৭৯)

অন্য কোন গুনাহের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা এত কঠিন কথা বলেননি যে, আমার সাথে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নাও। আল্লাহ তা‘আলার সাথে যুদ্ধ করে তো কেউ পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা একটা ভূমিকম্প দিলে দুনিয়ার সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। কিয়ামতের দিন ভূমিকম্প হবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ، يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ

অর্থ: হে মানুষ! নিজ প্রতিপালকের (ক্রোধকে) ভয় করো। জেনে রেখ, কিয়ামতের প্রকম্পন এক সাংঘাতিক জিনিস। যেদিন তোমরা তা দেখতে পাবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী সেই শিশুকে (পর্যন্ত) ভুলে যাবে যাকে সে দুধ পান করিয়েছে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত ঘটিয়ে ফেলবে আর মানুষকে তুমি দেখবে যেন তারা নেশাগ্রস্ত, অথচ তারা নেশাগ্রস্ত নয়; বরং (সে দিন) আল্লাহর শাস্তি হবে অতি কঠোর। (সূরা হজ্জ-১,২)

অন্যান্য আয়াতে এসেছে, সেদিন সমস্ত প্রাণী শেষ হয়ে যাবে। পাহাড়-পর্বত তুলার মত উড়বে। আসমান ভেঙ্গে পড়বে। সমুদ্র কূলে আগুন লাগবে। কোন মানুষ বাঁচবে না। সাধারণ একটা ভূমিকম্প মোকাবেলা করার শক্তি কোন বিজ্ঞানীদের সামর্থে নেই। তাহলে একজন সাধারণ মানুষ কীভাবে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার সাহস করে। সুদের সাথে জড়িত হওয়া মানেই আল্লাহ তা‘আলার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা করা। যে আল্লাহ তা‘আলার সাথে যুদ্ধের ঘোষণা করবে তার পুরো বংশই ধ্বংস হয়ে যাবে। ফকীর হয়ে যাবে। না খেয়ে মরবে। হতে পারে সে এখন কয়েকটা বিন্ডিংয়ের মালিক। তার পরিবারের প্রত্যেকেই একেকটা গাড়ির মালিক। কিন্তু এ সবকিছু নিজের টাকায় নয় বরং ব্যাংকের সুদের টাকায় করেছে। ব্যাংক যদি বলে টাকা ফেরত দাও তাহলে রিক্তহস্ত হয়ে যাবে। অন্যের যাকাত খেতে হবে। যত বড় লোক দেখেন, ব্যাংক যদি বলে টাকা ফেরত দাও তাহলে ফকীর হয়ে যাবে। সে ধনী মানে গরীবের টাকা নিয়ে ধনী। গরীবের টাকা একত্র করে ধনী হয়েছে। এর বাইরে একজন প্রকৃত ধনী খুঁজে বের করাও মুশকিল হয়ে যাবে। সুতরাং যারা টাকার গর্ব করছে আর গরীবকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে তারা গরীবের টাকা আত্মসাৎ করে বিরাট শিল্পপতি হয়েছে। তারা আসলে শিল্পপতি নয় বরং ফকিরপতি।

দুই. সুদখোর জান্নাতে যাবে না

সুদ খেয়ে যে রক্ত-গোশত তৈরী হবে এই রক্ত আর গোশত জান্নাতে যাবে না। হাদীস শরীফে এসেছে,

عَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ جَسَدٌ غُذِّيَ بِحَرَامٍ

অর্থ: যে শরীর হারাম রিযিক দ্বারা প্রতিপালিত হবে তা জান্নাতে প্রবেশ না। (মুসনাদে বাযযার; হাদীস ৪৩, মুসনাদে আবী ইয়ালা; হাদীস ৮৩)

তিন. সুদখোরের ইবাদত কবুল হবে না

এই হারাম খেয়ে আপনি যত ইবাদত করবেন সব বাতিল হয়ে যাবে। কেননা ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য আসল শর্ত হলো আপনার খাওয়া, আপনার লেবাস হালাল হতে হবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে,

ثم ذكر الرجل يطيل السفر أشعث أغبر، يمد يديه إلى السماء، يا رب، يا رب، ومطعمه حرام، ومشربه حرام، وملبسه حرام، وغذي بالحرام، فأنى يستجاب لذلك؟

অর্থ: (হালাল-হারামের আলোচনার পর) নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মুসাফিরের কথা বললেন, দীর্ঘ সফর করে যার চুল এলোমেলো ধূলায় ধূসরিত হয়েছে। আসমানের দিকে হাত উঠিয়ে (চিৎকার করতে থাকে) হে আমার রব! হে আমার রব! অথচ তার পানাহার হারাম। তার পোশাক হারাম। হারাম রিযিক দ্বারা গড়ে উঠেছে। তাহলে কীভাবে তার দু‘আ কবুল হবে?! (সহীহ মুসলিম; হাদীস ১০১৫)

শেষ নিবেদন

আমি আপনাদের খেদমতে সুদের কয়েকটা উদাহরণ পেশ করলাম। বাকীগুলো শরী‘আতের সাথে মিলিয়ে দেখবেন আমাদের রিযিক হালাল হচ্ছে কিনা। কেননা হালাল টাকা দিয়ে কিনছি কিন্তু এর ভিতরে অনেক মাসআলা রয়েছে সেগুলো না জানার কারণে আমার রিযিক হারাম হয়ে যাচ্ছে। অথচ কেউ সন্দেহই করে না যে তার রিযিক হারাম হচ্ছে। মনে করে হালাল টাকা দিয়ে কিনেছি। কাজেই প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসাইল জানার চেষ্টা করুন। উলামায়ে কেরামের কাছে এসে আপনার সারা দুনিয়ার মাসআলা জানার দরকার নেই। আপনি যে কাজে আছেন, চাই জমি চাষাবাদ করেন বা চাকুরি করেন বা ব্যবসা করেন, আপনি যে পেশায়ই নিয়োজিত থাকেন না কেন, সেটার মাসআলা জেনে নিন। আমার লেখা ‘আমালুস সুন্নাহ’ কিতাবে বেচাকেনার কিছু মাসআলা উল্লেখ করা হয়েছে সেখান থেকেও দেখতে পারেন। জানার পর সেভাবে আমল করার চেষ্টা করুন। যেন আপনার ইনকামের মধ্যে কোন হারাম মিশানো না থাকে। সব জায়গায় ইনসাফ করুন। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে ইনসাফ করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফ, দয়া এবং আত্মীয়-স্বজনকে (তাদের হক) প্রদানের হুকুম দেন আর অশ্লীলতা, মন্দ কাজ ও জুলুম করতে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (সূরা নাহল-৯০)

প্রত্যেক জুমআর দ্বীতীয় খুতবায় এটা পড়া হয়। আপনার বিবেককে জিজ্ঞেস করুন আপনি যে কাজ করছেন এটা কি ইনসাফ হচ্ছে? যদি আপনার সাথে কেউ জুলুম করে বা ইনসাফ না করে আর আপনি তা জানতে পারেন তাহলে আপনি কি মেনে নিবেন? তাহলে আরেকজনের সাথে কেন এমন করছেন? আল্লাহ তা‘আলা তো বিবেক দিয়েছেন ইনসাফ আর জুলুমের মাঝে পার্থক্য করার জন্য। আপনি বিবেক দিয়ে পার্থক্য করুন। ইনসাফের সাথে লাভ করুন। হারাম কারবার ছেড়ে দিন। যদি সত্যিই হারাম ছাড়তে পারেন তাহলে দুটি লাভ হবে:

এক. ইবাদত করা সহজ মনে হবে

এখন তো চাপ দিয়ে আমল করাতে হয়। তখন আপনার মনই আপনাকে নামায পড়তে তৈরী করে দিবে। কুরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর যিকির করা, উলামাদের মজলিসে যাওয়া ইত্যাদি কাজে আপনার বিবেকই আপনাকে প্রস্তুত করে দিবে তা করার জন্য। কোন জবরদস্তি করা লাগবে না। কোন গুনাহ করতে চাইলে তখন গুনাহ করার আগ্রহ আসবে না। নাপাক দেখলে যেমন ঘৃণা লাগে, গুনাহের প্রতি এমন ঘৃণা সৃষ্টি হবে। আপনি ঐ গুনাহ করতে পারবেন না। যে ব্যক্তি আমল করলো আর গুনাহ ছাড়ল। এ দুটাই তো ইবাদত। আল্লাহর আদেশ মানা আর নিষেধ বর্জন করা। তাহলে সে পূর্ণ ইবাদত করল। সে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জন করল। সে দুনিয়াতে সফল। আখেরাতেও তার সফলতা অপেক্ষা করছে।

দুই. রিযিকে বরকত লাভ হবে

বরকতের মালিক আল্লাহ তা‘আলা। তিনি বরকত দিয়ে আপনার রিযিক বাড়িয়ে দিবেন। ইয়াকীন রাখুন তিনি বাড়িয়ে দিবেন। আমাদের ব্যবসায়ীরা মনে করে ধোকাবাজি করে যা অর্জন করলাম এটাই তো লাভ। এটা তো কাফেরদের চিন্তাধারা। লাভ আল্লাহ তা‘আলা দিবেন এবং সেটা স্থায়ী হবে। আপনি যেভাবে লাভ করছেন এটা তো জুলুম করছেন। এটা স্থায়ী হবে না। শেষ জীবনে আপনি ফকীর হয়ে যাবেন। অথবা আপনার সন্তানাদি ফকির হয়ে যাবে। তারা ভিক্ষাও পাবে না। এটা আপনার জুলুমের কারণে হবে। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন,

يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ

অর্থ: আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-সদকাকে বর্ধিত করেন। (সূরা বাকারা ২৭৬)

এটা আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা যে, তিনি রিযিক বাড়িয়ে দিবেন। এটা বিশ্বাস করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সুদের ভয়াবহতা বুঝে সুদ থেকে পরহেয করার তাওফীক দান করুন। হালাল রিযিক উপার্জন করার এবং নেক আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।