খতমে কুরআনের বিনিময় গ্রহণ করার বিধান
সাধারণভাবে ইবাদত বন্দেগী ৩ প্রকার। যথাঃ
১. মাকাসিদ তথা খালিস ও মূল ইবাদত। যেমনঃ নামায, রোযা, হজ্ব ও সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার ও দু‘আ-দুরুদ ইত্যাদি।
এই প্রকার তথা মাকাসিদ জাতীয় ইবাদত করে তার বিনিময় নেয়া দেয়া সর্ব সম্মতভাবে হারাম। (ফাতাওয়ায়ে শামী, ৬:৫৫-৫৮; আল-মুগনী, ৫:২৩; আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা, ৩:৪৩১; ফাতাওয়ায়ে রশীদিয়া, ৪১৭ পৃ.)
২. ওয়াসাইল তথা সহায়ক পর্যায়ের ইবাদত। যেমনঃ ইমামতি, আযান, ইকামত, দ্বীনি শিক্ষা দান, ওয়াজ-নসীহত ইত্যাদি।
দ্বিতীয় প্রকার ইবাদত আবার দুই ভাগে বিভক্ত
(ক) যে সকল ইবাদত ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুআক্কাদাহ এবং শিয়ারে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত দ্বীনের স্থায়িত্ব তার ওপরে নির্ভরশীল বিধায় তার বিনিময় গ্রহণ ও প্রদান অন্যান্য মাযহাবে জায়িয থাকলেও হানাফী মাযহাবের আলেমগণ জরুরতের কারণে শরী‘আতের বিশেষ উসূলের ভিত্তিতে বিশেষ কতক সহায়ক পর্যায়ের ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ প্রদানকে বৈধ বলেছেন। ফিকাহবিদগণ সে সকল ইবাদতকে চিহ্নিত করেছেন। সেগুলো হলঃ ফরয ও ওয়াজিব নামাযের ইমামতি, আযান, ইকামত, দ্বীনি শিক্ষাদান ইত্যাদি।
(খ) যে সকল ইবাদত ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাতে মুআক্কাদাহ এবং শিয়ারে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত দ্বীনের স্থায়িত্ব তার ওপরে নির্ভরশীল নয় যথাঃ খতমে তারাবীতে কুরআন শুনানো, মৃত ব্যক্তিকে সাওয়াব পৌঁছানোর জন্য খতম পড়া ইত্যাদি।
এ প্রকার ইবাদতের বিনিময়ের লেনদেনে হারাম হওয়ার বিষয়টা শরী‘আতের সকল প্রকার দলীল অর্থাৎ কুরআন, হাদীস, ইজমা এবং কিয়াস দ্বারা সুপ্রমাণিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। এজন্য কোন কালে কোন মাযহাবের কোন নির্ভরযোগ্য আলেম-ফকীহ এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেননি। (ফাতাওয়া রশিদিয়া, ৩২৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১:৪৮৪; ইমদাদুল মুফতীন, ৩১৫; ইমদাদুল আহকাম, ৩:৫১৭; আহসানুল ফাতাওয়া, ৩:৫১৪; মাহমুদিয়া, ৮:২৪৭)
আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহ. বলেন, এ ব্যাপারে (সওয়াব রেসানীর উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে বিনিময় লেনদেন নাজায়িয হওয়ার ব্যাপারে) কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াস সব দলীলই বিদ্যমান আছে। (ফাতাওয়ায়ে শামী, ৬:৫৫-৫৮; আল-মুগনী, ৫:২৩; আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা ৩:৪৩১; ফাতাওয়া রশীদিয়া, ৪১৭ পৃ.)
৩. রুকইয়াত
তথা বালা-মুসীবত থেকে পরিত্রাণ, রোগ মুক্তি, ব্যবসায় উন্নতি ইত্যাদি দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে দু’আ, খতম, ঝাড়-ফুঁক, তাবীয-কবয ইত্যাদি।
এই তৃতীয় প্রকার ইবাদতের বিনিময় গ্রহণ করা সর্বসম্মতভাবে জায়িয।(রদ্দুল মুহতার, ৬:৫৫-৫৮, আল মুদাওয়ানাতুল কুবরা, ৩:৪৩১, ফাতাওয়া রশিদিয়া, ৪১৭)
কুরআন
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, তুচ্ছ মূল্যে তোমরা আমার আয়াতসমূহকে বিক্রি কর না। (সূরা বাকারা:৪১) তবে এর অর্থ নয় যে, বেশি মূল্যে বিক্রি করা যাবে। কারণ গোটা পৃথিবীর মূল্য একেবারেই সামান্য, এমনকি আল্লাহর নজরে এর মূল্য মশা-মাছির একটি পাখর সমতুল্যও নয়।
হাদীস
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা কুরআন পড়, তবে তার দ্বারা বিনিময় গ্রহণ কর না। (মুসনাদে আহমাদ ৩:৩৫৭; হাদীস নং ১৫৫৩৫)
২. সাহাবী হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রা. সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি একবার এক বক্তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, যে কিনা কুরআন পড়ে মানুষের নিকট সাওয়াল করেছিল। তিনি এই অবস্থা দেখে ইন্নালিল্লাহ...পড়লেন এবং বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইরশাদ করতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে কুরআন পড়ে সে যেন আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে। শীঘ্রই কিছু লোকের আবির্ভাব হবে যারা কুরআন পড়ে মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইবে। (তিরমিযী শরীফ, হাদীস নং ২৯১৭)
৩. হযরত বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের কাছ থেকে খাবার গ্রহণের উদ্দেশ্যে কুরআন পড়বে, কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় আসবে যে, তার চেহারায় কোন গোশত থাকবে না, শুধুমাত্র হাড় থাকবে। (বাইহাকী, হাদীস নং ২৬২৫)
অর্থাৎ যারা দুনিয়া অর্জনের জন্য কুরআন পড়বে পরকালে তাদের কোন অংশ নেই। চেহারায় গোশত না থাকার অর্থ হল, যে ব্যক্তি সর্বশ্রেষ্ঠ জিনিষকে নিকৃষ্ট বিষয় অর্জন করার জন্য ব্যয় করল আল্লাহ তা‘আলা তার সর্বশ্রেষ্ঠ অঙ্গ চেহারাকে বিকৃত করে দেবেন।
ইজমা
সকল উম্মত এ ব্যাপারে একমত যে, নিয়ত ছাড়া আমল দ্বারা সওয়াব লাভ করা যায় না। আর আলোচ্য বিষয়ে সাওয়াবের নিয়ত অনুপস্থিত কেননা এক্ষেত্রে পড়নে ওয়ালার নিয়ত হল বিনিময় গ্রহণ করা। তাই তো টাকা ছাড়া তিলাওয়াত করতে বলা হলে উক্ত তিলাওয়াতকারী রাজী হবে না। ফলে তার দ্বারা সওয়াব লাভ হবে না। সুতরাং এর ইজারাই সহীহ হবে না।
কিয়াস
কিরাআত ইবাদতে মাহযা তথা শারীরিক ইবাদত হওয়ার দিক দিয়ে নামায, রোযার মত। সুতরাং নামায রোযার বিনিময় যেমন জায়িয নেই। তদ্রুপ কিরাআতের বিনিময় জায়িয হবে না। (রাসায়েলে ইবনে আবিদীন, ১:১৮২)
কুরআন হাদীস, ইজমা এবং কিয়াস দ্বারা সুপ্রমাণিত এ বিষয়ে কোন কালে কোন আলেম-ফকীহ দ্বিমত পোষণ করেননি।