মুনাব্বিহাত
শায়েখ আবুল ফজল শিহাবুদ্দীন আহমাদ বিন আলী বিন মুহাম্মাদ বিন হাজার আসক্বালানী মিশরী রহ. যিনি “ইবনে হাজার আসক্বালানী” নামে খ্যাত। তিনি ৭৭৪ হিজরীর ১২ই শাবান প্রাচীন মিশর নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী শৈশবেই এতীম হন। বাল্যকাল হতেই তাহার মধ্যে অসাধারণ ধীশক্তির পরিচয় পাওয়া যায় এবং মাত্র নয় বছর বয়সেই তিনি আল্লামা সদর সাক্কী রহ.-এর নিকট পূর্ণ কুরআন শরীফ হেফজ সম্পন্ন করেন। অতঃপর কিশোর বয়সেই তিনি সেই যুগের খ্যাতনামা ফকীহ হযরত আবনাসী রহ.-এর নিকট ইলমে ফিকাহ অধ্যয়ন করেন।
মিশর নগরী হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর যুবা বয়সেই তিনি আলেকজান্দ্রিয়া গমনপূর্বক তথাকার প্রসিদ্ধ আলেম ও বুজুর্গদের সংস্পর্শে থেকে ইলমে দ্বীন হাসিলে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু জ্ঞানের সন্ধান পাওয়ার পর এই প্রতিভাবান যুবকের জ্ঞান-পিপাসা উত্তরোত্তর আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ার শিক্ষা সমাপ্ত করার পর পারস্য, সিরিয়া, হেজাজ, ইরাক ও ইয়ামান সফর করে অত্যন্ত সাফল্যজনকভাবে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। বিশেষতঃ তিনি সেই যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়েখ জয়নুদ্দীন রহ.-এর নিকট ইলমে হাদীস এবং আল্লামা বালকিনী রহ.-এর নিকট ফিকাহশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন।
আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ.-এর সকল উস্তাদগণই তাঁহার অসাধারণ প্রতিভা ও ইলমের প্রতি অদম্য অনুরাগ দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁহার শিক্ষা ও দীক্ষার প্রতি বিশেষ যত্নের সাথে মনোযোগ দান করেন। ফলে উস্তাদগণের মহাব্বত ও তত্ত্বাবধান এবং নিজস্ব প্রতিভার যৌথ আনুকুল্যে জ্ঞানরাজ্যে তিনি অসাধারণ পাণ্ডিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হন।
আল্লামা আসক্বালানী রহ. শুধু নিজে ইলম হাসিল করেই ক্ষান্ত হন নাই; বরং আগামী দিনের কওম ও মিল্লাতের জন্য নিজের ইলমের কিয়দাংশ গ্রন্থাকারে সংরক্ষিত করে যান। তাঁহার পাণ্ডিত্বপূর্ণ রচনাসম্ভার বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে কতটা সমৃদ্ধ করেছে অল্প কথায় তাহা প্রকাশ করার মত নহে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিস হযরত শাহ আব্দুল আজীজ রহ. "বুসতানুল মুহাদ্দিসীন” গ্রন্থে লিখেন, আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. প্রায় একশত পঞ্চাশটি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। হযরত জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহ. রচিত গ্রন্থের সংখ্যা আরো বেশী হলেও গ্রন্থের কলেবর এবং মূল প্রতিপাদ্যের বিবেচনায় নিঃসন্দেহে আল্লামা আসক্বালানীর রচনা সম্ভারই শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত হবে। বোখারী শরীফের সুবিখ্যাত শরাহ “ফাতহুল বারী” তাঁহার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। সুদীর্ঘ ত্রিশ বছর নিরবচ্ছিন্ন সাধনার পর দ্বাদশ খণ্ডে তিনি ইহা সমাপ্ত করেন। ইহাকেই বোখারী শরীফের সবচাইতে নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ বলে মনে করা হয়।
আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. ফতহুল বারীর সুদীর্ঘ ভূমিকা সম্বলিত অপর একটি পৃথক গ্রন্থও রচনা করেছেন। অভিজ্ঞ মুহাদ্দিসীনের মতে আল্লামা আসক্বালানী রহ. একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এই ভূমিকায় হাদীস শাস্ত্রের উপর, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে এই বিষয়ে বহু সূক্ষ্ম তত্ত্ব বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে তিনি বোখারী শরীফের ব্যাখ্যা না লিখে শুধু এই ভূমিকা লিখলেই যথেষ্ট হতো। বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম মনীষী আল্লামা শাওকানী রহ.-কে বোখারী শরীফের ব্যাখ্যা লিখতে অনুরোধ করা হলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন-
لا هجرة بعد فتح مكة
“মক্কা বিজয়ের পর হিজরতের কোন প্রয়োজন নাই”।
অর্থাৎ-“ফতহুল বারী” লিখার পর বোখারী শরীফের আর কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নাই।
আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. “ফতহুল বারী” লিখতে পারায় আল্লাহর দরবারে শোকরানা আদায়ের নিদর্শন স্বরূপ সেই যুগে পাঁচশত দীনার খরচ করে মিশর ও সিরিয়ার আলেমগণকে জিয়াফত খাওয়াইয়াছিলেন।
বিশ্ববরেণ্য মুসলিম মনীষী আল্লামা ইবনে হাজার আসক্বালানী রহ. কায়রোতে ৮৫২ হিজরীর ২৮শে জিলহজ্ব ৮৭ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চির বিদায় গ্রহণ করেন।