18

মওদুদী সাহেবের চিন্তাধারা নিয়মিতই ভ্রান্ত

মওদুদী সাহেবের ব্যাপারে কতিপয় প্রশ্নের সমাধান

প্রশ্ন: একঃ মওদুদী সাহেবের চিন্তাধারাকে উলামায়ে কেরাম নিয়মিতই ভ্রান্ত ও গোমরাহ বলে থাকেন, এর আসল কারণ কি? সঠিক ইসলামী চিন্তাধারার সাথে মওদুদী চিন্তাধারার মৌলিক সংঘাতগুলো কি কি? নির্ভরযোগ্য প্রমাণসহ জানানোর আবেদন রইল।

১নং প্রশ্নের জবাব

মাসিক তরজুমানুল কুরআন ১৩৫৫ হিজরী রবিউল আউয়াল সংখ্যায় জনাব মওদুদী সাহেব নিজের সম্পর্কে লিখেনঃ

مجہے گروہ علماء میں شامل ہونے کا شرف حاصل نہیں ہے، میں ایک بیچ کی راس کا آدمی ہوں جس نے جدید اور قدیم دونوں طریقہ ہائے ذعلیم سے کچہ کچہ حصہ پایاہے، اور دونو کوچوں کو چل پہر کر دیکہا ہے۔

অর্থঃ উলামা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আমি মধ্য বিন্দুর লোক, যে নতুন-পুরাতন উভয় শিক্ষাব্যবস্থার কিছু কিছু অংশ পেয়েছে এবং উভয় গলিতেই হেঁটে চলে দেখেছে।

অপরদিকে “মাওলানা মওদুদী” নামক বইতে জনাব আব্বাস আলী খান লিখেনঃ উনিশ শ’ চৌদ্দ খৃঃ এ বালক মওদুদী মৌলভী (তথা তার বর্ণনা মতে) মেট্রিক পরীক্ষা দেন ১৯১৬ খৃষ্টাব্দে (তার পিতা) আওরঙ্গবাদ থেকে হায়দ্রাবাদ গমন করেন এবং সেখানে দারুল উলূমে (তথা ডিগ্রী কলেজে) পুত্র মওদুদীকে ভর্তি করে দেন কিন্তু ছ’মাস অতীত না হতেই ভূপাল থেকে দুঃসংবাদ এলো যে, পিতা মৃত্যু শয্যায় শায়িত। এ সময় থেকেই বালক মওদুদীকে জীবিকা অন্বেষণের উপায় অবলম্বন করতে হয়। (মাওলানা মওদুদী পৃঃ ৩৬)

মাসিক তরজুমানুল কুরআন রবিউল আউয়াল সংখ্যায় উদ্ধৃত নিজ ভাষ্য ও “মাওলানা মওদুদী” নামক বইতে উদ্ধৃত জামা‘আতের সাবেক ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খানের উক্ত বর্ণনা অনুযায়ী বুঝা গেল যে জনাব মওদুদী সাহেব দ্বীনী ও দুনিয়াবী শিক্ষার কোনটিতেই পরিপূর্ণ শিক্ষিত নন।

একদিকে যেমন নিয়মিত কোন শিক্ষা গ্রহণ করে আলেম হওয়ার সুযোগ তিনি পাননি অপর দিকে কোন কামেল ও দক্ষ আলিমের দিক নির্দেশনার অধীনে থেকে দ্বীনী কাজ করার প্রয়োজনীয়তাও তিনি স্বীকার করেননি। বরং নিজ মেধার উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ও চরম মুক্ত স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। উম্মতের রাহবার আইম্মায়ে মাযহাব থেকে শুরু করে আইম্মায়ে হাদীস ও যামানার মুজাদ্দিদগণ সহ অতীতের প্রায় সকল দক্ষ উলামায়ে কেরাম তাঁর নিকটে ছিল অতি তুচ্ছ। যা তার বিভিন্ন লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।

এই ধরনের লোক ইসলামকে নিয়ে গবেষণা করলে পরিণতি যা হওয়ার তাই ঘটেছে। বিষয়টি মওদুদী সাহেব পর্যন্ত সীমিত থাকলে উলামায়ে কেরামের তেমন বিচলিত হওয়ার কিছু ছিল না, কিন্তু যখন তিনি নিজ গবেষণার ফসলগুলো জামায়াতে ইসলামী নামে একটি দল গঠনের মাধ্যমে উম্মতের মাঝে ছড়ানোর প্রয়াস পেলেন তখন শর‘ঈ মূলনীতির আলোকে তার চিন্তাধারাকে যাঁচাই বাছাই করে উম্মতের সামনে পেশ করার জরুরী দায়িত্ব, দক্ষ ও পরিপক্ক, মুত্তাকী ও সচেতন উলামাদের যিম্মায় বর্তায়।

উপমহাদেশের খ্যাতনামা উলামাদের প্রায় সকলেই মওদুদী সাহেবের চিন্তা ধারায় যে সব মারাত্মক ভুল ভ্রান্তি স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে প্রথমে তা মওদুদী সাহেব ও তার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী নেতৃবর্গকে বিভিন্ন ভাবে অবহিত করে সেগুলো প্রকাশ্যে প্রত্যাহার করতে বলেছেন। কিন্তু যখন দেখা গেল মওদুদী সাহেব বা জামায়াতের নেতৃবর্গ তা প্রত্যাহার করার পরিবর্তে বাড়তি কিছু বিভ্রান্তি যোগ করে ক্রমাগত তা প্রতিষ্ঠিত করতেই চেষ্টা করেছেন। তখন মুসলিম জন সাধারণকে গোমরাহী থেকে বাঁচানোর স্বার্থে উলামায়ে কেরাম মওদুদী সাহেবের মৌলিক ভুলগুলো সুদৃঢ় প্রমাণসহ মুসলিম উম্মাহর সামনে তুলে ধরতে বাধ্য হয়েছেন, এমনকি মওদুদী সাহেবের প্রাথমিক পর্যায়ের তুলনামূলক ভ্রান্তিমুক্ত রচনা-প্রবন্ধ ইত্যাদি দেখে যেসব বিদগ্ধ উলামায়েকেরাম ও ইসলামী বুদ্ধিজীবীগণ জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠালগ্নে জনাব মওদুদী সাহেবের সঙ্গে এমনকি জামায়াতের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ সমূহে অধিষ্ঠিত হয়ে মওদুদী সাহেবকে খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। অতঃপর মওদুদী সাহেবকে ক্রমশঃ ভুলপথে চলতে দেখে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরাও একে একে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে জামায়াত হতে পৃথক হয়ে গেছেন। উদাহরণতঃ জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা নায়েবে আমীর মাওলানা মনজুর নো’মানী, সেক্রেটারী জনাব কামরুদ্দীন (এম,এ) বেনারসী। মজলিসে শূরার অন্যতম সদস্য হাকীম আঃ রহীম আশরাফ ও মাওলানা আমীন আহসান এসলাহী, বিশ্ব বরেণ্য দাঈয়ে ইসলাম মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী। জামায়াতের অন্যতম রুকন ও মওদুদী সাহেবের জন্য নিবেদিত প্রাণ ডক্টর এসরার আহমাদ সাহেব প্রমূখ সহ প্রথম সারীর প্রায় আরো সত্তর জন নেতৃবর্গ।

দ্রঃ মাওলানা মনযুর নো’মানী লিখিত “মওদুদী সাহেবের সাথে আমার সাহচর্যের ইতিবৃত্ত।”

যুগসেরা মুহাক্কিক উলামায়েকেরাম সঠিক বরাতের ভিত্তিতে মওদুদী সাহেবের গোমরাহ চিন্তাধারাগুলোর তাত্ত্বিক পর্যালোচনা করে অনেক বই-পুস্তক ও প্রবন্ধ লিখেছেন। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটির নাম যথাক্রমে-

১। মাওলানা মনজুর নো’মানীর “মাওলানা মওদুদী ছে মেরী রেফাক্বতকী ছার গুযাশ্‌ত” অনুবাদ “মাওলানা মওদুদীর সাথে আমার সাহচর্যের ইতিবৃত্ত”।

২। শাইখুল হাদীস যাকারিয়া রহ.-এর “ফিতনায়ে মওদুদীয়্যাত”।

৩। বিশ্ববরেণ্য আলেম ও ইসলামী দার্শনিক জাস্টিস মুফতী, মাওলানা মুহাম্মাদ তক্বী উসমানি সাহেব দামাত বারাকাতুহুম- এর “হযরত মুআ‘বিয়া আওর তারিখী হাক্কায়েক” বাংলা অনুবাদ “ইতিহাসের কাঠগড়ায় হযরত মুআ‘বিয়া”

৪। মুজাহিদে আযম আল্লামা শামছুল হক ফরীদপুরী রহ.-এর “ভুল সংশোধন” ও

৫। হযরত মাওলানা ইউসুফ বিন্নূরী রহ-এর

الاسذاذ المودودي وشيئ من حياذه وافكاره

ইত্যাদি।

বিস্তারিত দেখার প্রয়োজন বোধ করলে উপরোক্ত বইগুলো দেখুন।