প্রচলিত তাবলীগ করা কি ফরজ?

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)February 10, 2025দাওয়াত ও তাবলীগ

Question

দাওয়াতে তাবলীগ এর কাজ করা কি ফরজ? দাওয়াতের কাজের তারতীব কি? হুযুর ﷺ কোন তারতীবে দাওয়াতের কাজ করেছেন? প্রচলিত তাবলীগী জামা‘আত যে তারতীবে কজ করছে তার বাস্তবতা কতটুকু?

Answer

উম্মতে মুহাম্মদীর উপর নামায রোজা হজ্ব যাকাত ইত্যাদি যেমন ভাবে ফরজ করা হয়েছে, ঠিক তেমনভাবে নিজের পরিবার আত্মীয় স্বজনদেরকে দ্বীনের দিকে দাওয়াত দেয়া, সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজের নিষেধ করার দায়িত্ব পালন করা এবং সারা দুনিয়ার মুসলিমদের নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জামা‘আত ময়দানে থাকা ফরজে কিফায়া করা হয়েছে। অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মদী শুধু নিজে দ্বীনের উপর আমল করলেই তার দায়িত্ব শেষ হবে না। বরং অন্যকেও ঐ সমস্ত আমলে আমলদার বানানোর আজীবন চেষ্টা করতে হবে। কুরআন ও হাদীসের বিভিন্ন স্থানে এর গুরুত্বের বর্ণনা রয়েছে। বিশেষ করে হুজুর ﷺ এর বিদায় হজ্বের সময় স্বীয় অমীয় বাণীতে “তোমরা যারা উপস্থিত আছে, তারা অনুপস্থিত ব্যক্তিদের নিকট আমার কথা পৌঁছে দিবে” সমস্ত উম্মতের উপর দাওয়াতের কাজকে ফরজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বাণী বাহক হয়ে সমস্ত সাহাবায়ে কিরাম এ দায়িত্ব পালন করেছেন। অসংখ্য সাহাবায়ে কিরাম বিশ্বের আনাচে-কানাচে পৌঁছে গিয়ে দাওয়াতের কাজ করেছেন। তাই আজ লক্ষ্য করলে দেখা যায় মক্কা-মদীনায় সাহাবায়ে কিরামের কবর খুব কমই রয়েছে।

মক্কা মদীনার সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে আনুমানিক দশ হাজার সাহাবীর রা. কবর মক্কা-মদীনায় পাওয়া যায়। আর অন্যদের কবর সুদূর চীন, রাশিয়া, সুদান, আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বিদ্যমান। মোট কথা নামায, রোজা ইত্যাদির মত দাওয়াতের কাজও ফরজ। উল্লেখ্য যে, দাওয়াতের কাজ দু'প্রকারে বিভক্ত। নিজের শক্তি ও সামর্থের মধ্যে থেকে নিজের পরিবার পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করতে থাকা-এটা ফরজে আইন। মুসলমানদের পক্ষ থেকে কিছু লোক সব সময় নিজের মহল্লায় এবং দূর দূরান্তে দাওয়াতের কাজ করতে থাকা। দূরবর্তী এলাকায় একদল কাজ করতে থাকবে। অন্য দল ঘরের জরুরত পুরা করে নিবে। এবং যারা দ্বীনের রাস্তায় বের হয়ে গেছে তাদের পরিবারের খোজ খবর নিবে। অতপর বাড়ীতে অবস্থান কারীরা দাওয়াতের কাজে বের হয়ে যাবে। এবং ময়দানের গ্রুপ বাড়ীতে ফিরে আসবে। এভাবে মুসলমানগণ জামা‘আত ভুক্ত হয়ে মুসলিম-অমুসলিম সকলকেই দ্বীনের দিকে আহ্বান করবে। লোকদেরকে ভাল কাজের আদেশ করবে এবং মন্দ কাজ ও জাহান্নামের কাজ থেকে বিরত থাকতে বলবে। এ ধরনের পর্যাপ্ত পরিমাণ জামা‘আতের সর্বক্ষণ ময়দানে কাজ করা ফরজে কিফায়া।

শরী‘আতের দৃষ্টিতে দাওয়াতের কাজের জন্য নির্ধারিত বা অবধারিত বিশেষ কোন তারতীব নেই। বরং ইসলাম সমর্থিত যে কোন তারতীবে দাওয়াতের কাজ করা যায়। হুজুর ﷺ এর যামানায় দাওয়াতের কাজ বিভিন্নভাবে করা হত। কখনও হুজুর ﷺ মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে ঈমান ও আমলের দাওয়াত দিতেন। মুসলমানদেরকে বিভিন্ন স-য়ে বিভিন্ন কাজের দাওয়াত দিতেন। এবং তাদেরকে দ্বীনের তালিম দিতেন। আবার কখনও কাফিরদেরকে দাওয়াত দিতেন। কখনও কাফিরদের কোন মজলিসে গিয়ে ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছাতেন। আবার কখনও সবাইকে জমা করে বেহেশতের সুসংবাদ ও দোযখের ভয় দেখিয়ে দ্বীনের উপর চলার জন্য দাওয়াত পেশ করতেন। কখনও নিজের এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় গিয়ে দাওয়াত পেশ করতেন। এমনিভাবে সাহাবায়ে কিরামকে নিজ নিজ গোত্রের নিকট এবং বিভিন্ন এলাকায় বা ব্যক্তি বিশেষের নিকট পাঠিয়ে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর কাজ হুজুর পাক ﷺ আনজাম দিতেন। দ্বীনি দাওয়াত এর তাগিদে রাসুল ﷺ প্রয়োজনবোধে হিজরতও করেছেন। আবার কখনও চিঠির মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রের সরদার ও রাজা-বাদশাহদের নিকট দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন। অনুরূপভাবে জিহাদের মাধ্যমেও আমর বিল মা'রূফ ও নাহী 'আনিল মুনকার এর কাজ করেছেন। মোট কথা, হুজুরের ﷺ যমানায় দাওয়াতের কাজ নির্দিষ্ট কোন তারতীবে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং অবস্থার চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন তরিকায় দাওয়াতের কাজ করা হয়েছে। হুজুর ﷺ -এর দাওয়াতী জিন্দেগী সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য জানতে হলে হযরত মাওলানা ইউসুফ রহ. রচিত হায়াতুস সাহাবা হাদীস গ্রন্থটি দ্রষ্টব্য।

বর্তমান তাবলীগী জামা‘আত দ্বারা যেহেতু প্রত্যেক মহল্লায় এবং বিশ্বের আনাচে-কানাচে দ্বীনের কাজ চলছে, আর এর তরয-তরীকা শরী‘আতের কোন বিধানের পরিপন্থী নয়। বরং তা বিজ্ঞ আলেমগণের কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক চিন্তা ফিকির এর উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত। সুতরাং তাবলীগী জামাতের তরয বা তরীকা সম্পূর্ণ সঠিক। উল্লেখ্য যে প্রচলিত তাবলীগী জামাতের উমুমী গাশত, খুসুশী গাশত, বিভিন্ন এলাকায় জামাত পাঠানো, মসজিদে তালিম করা ইত্যাদি এসবের প্রত্যেকটির নমুনা এবং বুনিয়াদ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত। তবে একটা লক্ষ্যণীয় বিষয় এই যে, নবী ﷺ কে তাবলীগ, তালীম ও তাযকীয়ার জন্য দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছিল এবং এই তিনটা কাজ মিলিয়েই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনী দাওয়াত। তাবলীগের দ্বারা দ্বীনের উপর চলার বুঝ পয়দা হয়। আর তালীম দ্বারা আমলের নকশা তৈরি হয় এবং তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি ও ইখলাসের দ্বারা আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হওয়া যায়। প্রচলিত তাবলীগ জামাতের মেহনত দ্বীনি দাওয়াতের জবর দস্ত অংশ বটে। কিন্তু দ্বীনের দাওয়াতের কাজ কেবল যে শুধু এর মধ্যে সীমাবদ্ধ এমন ধারণা করা সহীহ নয়। সুতরাং এমন মনে করা যাবে না যে, এর বাইরে আর দাওয়াতের কাজ নেই। রাসূলুল্লাহ ﷺ রাজা বাদশাহদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াত কবুল না করলে তাদের সাথে পর্যায়ক্রমে জিহাদ করেছেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে। কোন গোত্রের নিকট দ্বীন প্রচার করে কবুল না করলে তাদেরকে বশ্যতা স্বীকার করতে বলতেন, তাও না করলে তাদের সাথে জিহাদ ঘোষণা করতেন।

তাই দ্বীনি পত্র প্রেরণ, জিহাদ ইত্যাদিও তাবলীগী কাজের ভেতর গণ্য। কেউ যদি ব্যক্তিগত ভাবে দাওয়াতের কাজ করতে থাকে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে থাকে তাহলেও তার দাওয়াতী দ্বায়িত্ব পালন হবে। তবে জামাতের সাথে থাকার ফায়িদা ও খাইর বারাকাত আলাদা। তা হাসিল করতে হলে হক্কানী জামাতের সাথে জুড়ে থাকা কর্তব্য। সে জন্য তাবলীগী জামাত বা অন্য কোন আহলে হক জামাতের সাথে মিলে দ্বীনের কাজ করতে থাকা উচিত? হযরত মাওলানা ইলিয়াস রহ. প্রবর্তিত তাবলীগী জামাতের ন্যায় হযরত আশরাফ আলী থানবী রহ. এর দাওয়াতুল হক নামক দ্বীনি দাওয়াতী জামাত ও দাওয়াত ও তাবলীগের যথেষ্ট কাজ করে যাচ্ছে। এমনিভাবে যারা ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে, তাফসীরের মাধ্যমে, দরস তাদরীসের দ্বারা, কিতাব লিখে অন্যের কাছে দ্বীন পৌঁছাচ্ছেন তাদের এ কাজও দাওয়াত ও তাবলীগের অন্তর্ভুক্ত। মোদ্দা কথা আসল হচ্ছে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের মেহনত করা। যুগের চাহিদার ভিত্তিতে তার তারতীব বিভিন্ন রকম হতে পারে। বস্তুত: পরিবেশ পারিপার্শিকতা ও মানুষের হালাত ইত্যাদির তাকাজায় আল্লাহ পাক স্বয়ং এক এক যুগের উলামাদের জেহেনে কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক এক এক রকম যুযোপযুগী তারতীব ইলহাম করেন। তারা সেই তারতীবে কাজ করে দ্বীনের দিকে টেনে আনেন উম্মতদেরকে। সেই পদ্ধতিতে অনেক আল্লাহ ভুলা মানুষ আল্লাহর পথে ফিরে আসে। তাই মূল জিনিস হল ঈমান ও আমলের মেহনত ও দাওয়াত। তারতীব শুধু কাজের দ্রুত প্রচারও প্রসারের জন্য। একটি কথা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়, তাবলীগ, তালীম, তাযকীয়া এই তিনটি দ্বীনের কাজের শাখা, সুতরাং এই তিন লাইনে যারা কাজ করছে। অর্থাৎ মারকায, মাদরাসা ও খানকায় যারা কাজ করছেন তারা আপোষে আপন ভাইএর মত অবস্থান করবে। নিজে এক লাইনে কাজ করলেও অন্য লাইনে যারা কাজ করছে তাদেরকেও দ্বীনের খাদেম মনে করে সম্মান ও সহযোগিতা করবেন, ভিন্ন মনে করবেন না। মনে রাখবেন এর কোনটি দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ কাজ নয় বরং এসবগুলি মিলেই দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ খিদমত আনজাম পায়। রড মিস্ত্রি, উস্তাগার, ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রিসহ বিভিন্ন ধরনের লোকের চেষ্টায় একটি বিল্ডিং তৈরি হয়। কোন একটি গ্রুপ দ্বারা বিল্ডিং পূর্ণ হয় না। (প্রমাণ: ফাতওয়া মাহমুদীয়া ১:৪১৬-৪৬৫। ফাতওয়া আলমগীরী ৫/৩৫৮)