একাধিক রোযার কাফফারা কয়টি আদায় করতে হয়?
Question
মাননীয় মুফতী সাহেব, আমার উপর একাধিক রমাযানের একাধিক রোযা কাযা আছে। উদাহরণ স্বরূপ, ৩টি রমাযানের ৩টিকরে রোযা ভেঙ্গেছি। তো ২ জন মাওলানাকে জিজ্ঞেস করেছি ১ জনকে ফোনে আর ১ জনকে সরাসরি। ২য় জন ফাতাওয়ায়ে ইমদাদিয়া দেখে বলেছেন, স্ত্রী সহবাস করলে প্রতিটি রোযার আলাদা করে কাফফারা আদায় করতে হবে অন্যথায় একাধিক রমাযানের একাধিক রোযার কাযার ক্ষেত্রে ১টি কাফফারাই যথেষ্ট (অর্থাৎ তিনি এখানে খেয়ে রোযা ভাঙ্গা ও প্রবৃত্তির চরিতার্থ করে রোযা ভাঙ্গা-২টি শ্রেণিবিন্যাস করেছেন)। ১ম জন একই ধরণের মন্তব্য করেছিলেন। তবে খোলাখুলি (অর্থাৎ, সহবাসের কথা) বলেননি। (যেহেতু তিনি ১টি নির্দিষ্ট সময়ে মোবাইলে অনেকের প্রশ্নের জবাব দেন তাই সংক্ষেপণ অবলম্বন করেছেন।)
এখন আমার প্রশ্ন হলো,
(১) একাধিক রমাযানের একাধিক কাযার ক্ষেত্রে ১টি কাফফারাই কি যথেষ্ট? নাকি উপরের শ্রেণিবিন্যাসের নিমিত্ত ২ হুকুম সাব্যাস্ত হবে?
(২) উপরে মাওলানা সাহেব তো বললেন, সহবাসের কারণে হলে সহবাস জনিত প্রতিটি রোযা ভাঙ্গার কারণে আলাদা করে কাফফারা আদায় করতে হবে, তাহলে কেউ যদি সহবাস না করে পর্ণোগ্রাফী ভিডিও দেখে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে তার বীর্য স্খলিত হয়ে যায় তাহলে উপরে বর্ণিত ২ শ্রেণীর কোন শ্রেণীর আওতায় পড়বে? অর্থাৎ, পানাহার জাতীয় রোযা ভঙ্গের আচরণের শ্রেণীতে পড়বে নাকি প্রবৃত্তির চরিতার্থ জাতীয় রোযা ভঙ্গের আচরণের শ্রেণীতেপড়বে? যেহেতু উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, পানাহার জাতীয় রোযা ভঙ্গের একাধিক কাযার জন্য ১টি কাফফারা আদায় করতে হবে আর সহবাসের কারণে রোযা ভঙ্গের জন্য একাধিক কাযার জন্য তদানুযায়ী একাধিক কাফফারা আদায় করতে হবে।
বিঃদ্রঃ প্রথমে মাফ চেয়ে নিচ্ছি এমন কিছু শব্দ প্রশ্নে প্রয়োগ করেছি যা সাধারণত উলামাদের সামনে উচ্চারণ করা বেয়াদবীর শামিল। কারণ ফোনে বা সরাসরি এসব কথা বলতে লজ্জ্বা লাগে ও বলাও যায় না। তাই লিখনীর মাঝে আপনাদের কাছে প্রকাশ করলাম। মাসআলা জানা হয়ে যাবে আর পরিচয় ও প্রকাশ পাবে না। আর উপরে বর্ণিত সূরতের সাথে বর্তমানে প্রশ্নকর্তার কোনো সম্পর্ক নেই। বয়ঃসন্ধিকালের ভালো পরিবেশের সুযোগ না থাকার কারণে কিছু অনাকাংখিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। তবে তিনি আল্লাহর পক্ষ হতে বুঝ আসার পরে তাওবা করেছেন তাই কোনো খারাপ ধারণার সুযোগ নেই। প্রশ্নটি আমি গোপনে করেছি; সমীচিন মনে করলে সাইটে প্রকাশ করতে পারেন। সেটা আপনাদের ব্যাপার। প্রশ্নটি করলাম দুনিয়াতে দায়িত্বমুক্তি ও আখেরাতে রবের সন্তুষ্টি লাভের অভিপ্রায়ে। এই অভাগাকে যদি সমাধান না দেন তাহলে মনে হয় না কোথাও এ ধরণের প্রশ্ন করতে পারবো আর সমাধান পাবো ।
[দ্বীনী বিষয়ে স্বল্প জ্ঞানের ধরুন প্রশ্নের উদ্দেশ্যটি বুঝাতে পারলাম কিনা হীনমন্যতায় ভুগছি অনুগ্রহ করে রিপ্লাই দিতে পারেন যদি অসঙ্গতি থেকে থাকে]
আল্লাহ আপনাদেরকে নেক হায়াত দান করুন। আপনাদের দ্বীনী খেদমতে বরকত দান করুন। আমীন!
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান
Answer
মাসাইল জানতে লজ্জার কিছু নেই। যাদের নাম প্রকাশে অনীহা আছে আমরা তাদের নাম আমাদের সাইটে প্রকাশ করি না। মাসআলা জেনে শরী‘আতের উপর আমল করা মাকসাদ। নাম প্রকাশ করে কাউকে খাটো করা উদ্দেশ্য নয়। যেহেতু আপনার প্রশ্নটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই নাম প্রকাশ না করে আপনার প্রশ্নের উত্তরটি সাইটে প্রকাশ করা হচ্ছে।
দৈনন্দিন জীবনের যেকোন ধরণের সমস্যার শরয়ী সমাধান জানতে আমাদের কাছে নিঃসংকোচে প্রশ্ন করতে পারেন। এবার প্রশ্নটির উত্তর খেয়াল করুন।
একাধিক রোযার কাফফারা কয়টি আদায় করতে হয়?
মৌলিকভাবে উক্ত মাসআলায় মতভেদ আছে। এ ব্যাপারে মোট তিনটি বক্তব্য ফুক্বাহায়ে কেরাম থেকে পাওয়া যায়। যথা-
১. একাধিক রমাযানের কাযা হোক বা এক রমাযানের একাধিক রোযার কাযা হোক, চাই সহবাসের কারণে রোযা ভঙ্গ করা হোক বা অন্য কোন কারণে রোযা ভঙ্গ করা হোক সর্বাবস্থায় যদি কোন একটির কাফফারা আদায় করার আগেই আবার রোযা ভঙ্গ করা হয়, তাহলে একটি কাফফারাই যথেষ্ঠ হয়ে যাবে। একাধিক রোযার জন্য বা একাধিক রমাযান মাসের রোযার জন্য বা সহবাস বা সহবাস ছাড়া রোযা ভঙ্গের জন্য আলাদা আলাদা কাফফারা আদায় করতে হবে না। বরং একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে।
উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি ২০১২ সালে রমাযান মাসে দুইটি রোযা ভঙ্গ করল সহবাস করে, তারপর দুইটি রোযা ভঙ্গ করল পানাহার করে। তারপর রমাযান মাস শেষে কাফফারা আদায় করেনি।
তারপর ২০১৩ সালের রমাযান এসে গেল। এ রমাযানেও সে দুইটি রোযা ভঙ্গ করল সহবাস করে। তারপর আরো দুটি রোযা ভঙ্গ করল পানাহার করে। তাহলে রমাযান শেষে যদি লোকটি উভয় রমাযানের রোযার কাফফারা আদায় করতে চায়, তাহলে একটি কাফফারা আদায় করলেই উভয় রমাযানের ভঙ্গ করা রোযার কাফফারা আদায় হয়ে যাবে। দুই রমাযানের জন্য দুইটি কাফফারা আদায় করা জরুরী নয়। সহবাসের দ্বারা ভঙ্গ করা রোযার কাফফারাও আলাদা আলাদা একাধিকবার আদায় করার প্রয়োজন নেই। এক কাফফারাই যথেষ্ট হয়ে যাবে।
২. এক রমাযানের একাধিক রোযা ভঙ্গের জন্য এক কাফফারাই যথেষ্ট। তাই তা যে কারণেই ভঙ্গ করা হোক না কেন। চাই সহবাসের জন্য বা পানাহারের জন্য। সর্বক্ষেত্রেই এক কাফফারাই সকল রোযার জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে। তবে একাধিক রমাযানের রোযা ভঙ্গের জন্য একাধিক কাফফারা আদায় করতে হবে। এক কাফফারা যথেষ্ট হবে না।
যেমন, ২০১২ সালের রমাযানে দুই রোযা ভঙ্গ করা হল সহবাস করে। আবার দুই রোযা ভঙ্গ করা হল পানাহার করে, তারপর রমাযান শেষে এসব রোযার কাফফারা আদায় করা হয়নি। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের রমাযানেও দুই রোযা ভঙ্গ করা হল সহবাস করে, আবার দুই রোযা ভঙ্গ করা হল পানাহার করে। তাহলে কয়টি কাফফারা আদায় করতে হবে?
দুইটি কাফফারা। ২০১২ সালের রমাযানের রোযা ভঙ্গের একটি কাফফারা। আর ২০১৩ সালের রমাযানের রোযা ভঙ্গের জন্য একটি কাফফারা। এই মোট দুইটি কাফফারা আদায় করতে হবে।
তাহলে কী দাঁড়াল? এ দ্বিতীয় বক্তব্য অনুপাতে এক রমাযানে যে কারণেই হোক একাধিক রোযা ভঙ্গ হলে একটি কাফফারা আদায় করলেই যথেষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু অন্য রমাযানের জন্য যথেষ্ট হবে না এক কাফফারা। বরং প্রতিটি রমাযানের জন্য আলাদা কাফফারা আদায় করা জরুরী। সহবাসের কারণে ভঙ্গ হওয়া না হওয়ার মাঝে কোন পার্থক্য নেই।
৩. সহবাস ছাড়া অন্য কারণে যদি রোযা ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে একাধিক রমাযানের একাধিক রোযার জন্যও এক কাফফারাই যথেষ্ট।
কিন্তু সহবাসের কারণে রোযা ভঙ্গ করলে প্রত্যেক রোযার জন্য আলাদা কাফফারা আদায় করতে হবে। অর্থাৎ এক রমাযানে যদি একাধিকবার সহবাস করে রোযা ভঙ্গ করে, তাহলে প্রতিটি রোযা ভঙ্গের জন্য আলাদা কাফফারা আদায় করতে হবে। তেমনি অন্য রমাযানের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। তথা প্রত্যেক ঐ রোযা যেটি সহবাস করে ভঙ্গ করা হয়েছে, তার প্রতিটির জন্য আলাদা কাফফারা আদায় করা জরুরী। এক কাফফারা যথেষ্ট হবে না।
উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি ২০১২ সালের রমাযান মাসে দুইটি রোযা ভঙ্গ করল পানাহার করে। তারপর রমাযান শেষে উক্ত রোযার কাফফারা আদায় করেনি। তারপর ২০১৩ সালের রমাযানে এসে আরো দুটি রোযা ভঙ্গ করল। তাহলে রমাযান শেষে তার উপর কয়টি কাফফারা আবশ্যক হবে?
একটি কাফফারা। যেহেতু সহবাস ছাড়া অন্য কারণে রোযা ভঙ্গ হয়েছে, তাই এক কাফফারাই একাধিক রোযা ও একাধিক রমাযানের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে।
পক্ষান্তরে যদি ২০১২ সালের রমাযানে দুইটি রোযা ভঙ্গ করে সহবাস করে, তারপর রমাযান শেষে কাফফারা আদায় করেনি। তারপর আবার ২০১৩ সালের রমাযানে এসে আরো দুইটি রোযা ভঙ্গ করে সহবাস করে, তাহলে তার উপর কয়টি কাফফারা আবশ্যক হবে?
চারটি কাফফারা। ২০১২ সালের দুই রোযার জন্য দুই কাফফারা। ২০১৩ সালের দুই রোযার জন্য দুই কাফফারা। এই মোট চার কাফফারা আবশ্যক লোকটির উপর। যেহেতু সহবাসের জন্য রোযা ভঙ্গের কাফফারা একটি অন্যটির মাঝে তাদাখুল হয় না। তাই প্রতিটি রোযা ভঙ্গের জন্য আলাদা কাফফারা আবশ্যক হবে।
এই হল তিনটি বক্তব্য রমাযানে রোযা ভঙ্গের কাফফারার ক্ষেত্রে। এ কারণেই মুফতীয়ানে কেরামের ফাতওয়ার মাঝে একাধিক বক্তব্য পাওয়া যায়। কেউ প্রথম বক্তব্য অনুসরণ করে বলে থাকেন, একাধিক রোযার একাধিক রোযার ক্ষেত্রে চাই তা সহবাসের কারণে ভঙ্গ করুক বা পানাহার করে ভঙ্গ করুক একটি কাফফারা আদায় করলেই চলবে। একাধিক কাফফারা লাগবে না।
কোন কোন মুফতী সাহেব দ্বিতীয় বক্তব্য অনুপাতে বলে থাকেন যে, এক রমাযানের একাধিক রোযা ভঙ্গের জন্য একটি কাফফারা আদায় করলেই হবে সহবাসের কারণে ভঙ্গ করুক বা পানাহার করে ভঙ্গ করুক। আর একাধিক রমাযানের রোযা ভঙ্গের জন্য একাধিক কাফফারা আদায় করতে হবে। যে কারণেই রোযা ভঙ্গ করা হোক না কেন।
আবার আরেক দল মুফতীয়ানে কেরাম তৃতীয় বক্তব্য অনুপাতে একথা বলেন যে, সহবাসের মাধ্যমে রোযা ভাঙ্গলে একাধিক রোযা ভঙ্গের জন্য একাধিক কাফফারা আদায়ের কথা বলে থাকেন।
আর সহবাস ছাড়া পানাহারের কারণে রোযা ভঙ্গকারীর ক্ষেত্রে একাধিক রমাযানের একাধিক রোযা বা এক রমাযানের একাধিক রোযা ভঙ্গের জন্য এক কাফফারা আদায়কেই যথেষ্ট বলে থাকেন।
সমাধান কি?
এক্ষেত্রে আসলে চূড়ান্ত সমাধান বলা দুস্কর। আকাবীর মুফতীয়ানে কেরাম থেকে একাধিক ফাতাওয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে হাকীমুল উম্মত আশরাফী থানবী রহ. এর ফাতাওয়া গ্রন্থ ইমদাদুল ফাতাওয়ার টিকায় মুফতী যাফর আহমাদ উসমানী রহ. একটি মধ্যপন্থী সমাধান দিয়েছেন। যাতে তিনটি মতেরই সন্নিবেশন রয়েছে। সেটিই আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়েছে, আমরাও এমনটিকে প্রাধান্য দিতে পারি।
তিনি বলেন, “সহবাস ছাড়া অন্য কারণে রোযা ভঙ্গ করলে এক রমাযানের একাধিক রোযা ভঙ্গের জন্য যেমন একটি কাফফারা যথেষ্ট। তেমনি একাধিক রমাযানের একাধিক রোযা ভঙ্গের জন্যও একটি কাফফারাই যথেষ্ট হবে। একাধিক কাফফারা আদায় করা জরুরী নয়।
কিন্তু যদি সহবাসের দ্বারা রোযা ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে এক রমাযানে যদি একাধিক রোযা ভঙ্গ করে থাকে সহবাস করে তাহলে এক কাফফারা আদায় করলেই সকল রোযা ভঙ্গের কাফফারা হয়ে যাবে। একাধিক আদায় করা জরুরী নয়।
কিন্তু যদি দুই রমাযানে সহবাসের দ্বারা রোযা ভঙ্গ করে থাকে, তাহলে দুই রমাযানের জন্য আলাদা দুইটি কাফফারা আদায় করতে হবে। এক কাফফারা আদায় যথেষ্ট হবে না”।
ولو تكرر فطره ولم يكفر للأول يكفيه واحدة ولو في رمضانين عند محمد وعليه الاعتماد بزازية ومجتبى وغيرهما واختار بعضهم للفتوى أن الفطر بغير الجماع تداخل وإلا لا (رد المحتار، كتاب الصوم، مطلب فى الكفارة-3/391، مراقى الفلاح، فصل فى الكفارة-552، البحر الرائق-2/277)
বিস্তারিত জানতে পড়ুন
১. ইমদাদুল ফাতাওয়া-২/১৩৪-১৩৬।
২. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া-১৫-২০৫-২০৬।
৩. ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ-৬/৪৫৩-৪৫৫।
৪. আপকে মাসাইল আওর উনকা হল-৩/২২৬-২২৭।
৫. ফাতাওয়া হক্কানিয়া-৪/১৮০।