ইজমা-কিয়াস ছেড়ে শুধু কুরআন-হাদীস মানা

Question

আমরা জানি শরী‘আতের মূলনীতি চারটি কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াস। এখন কেউ যদি ইজমা-কিয়াস না মেনে শুধু মাত্র কুরআন আর হাদীস মানে এবং এর উপরেই আমল করে জীবন কাটাতে চায় তাহলে সেটা কি সম্ভব? এবং এই ইজমা-কিয়াস না মানার ব্যাপার টি কতটুকু গ্রহণ যোগ্য?

Answer

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। কুরআন হাদীসে প্রতিটি বিষয়ের সমাধান পাওয়া যায়। এমন কোন বিষয় নেই যার সমাধান কুরআন হাদীসে নেই। তবে কুরআন ও হাদীসে কিছু আহকাম বা বিষয় এমন রয়েছে যেগুলি বুঝতে কারো কোন অসুবিধা হয় না। যারা আরবী বোঝেন তারা কুরআন-হাদীসের সে সব স্পষ্ট আহকামগুলি অতি সহজেই বুঝতে পারেন এবং সর্বসাধারণও যদি এর বাংলা অর্থ পড়ে বুঝতে চায় তাহলে তারাও সে গুলি বুঝতে পারবে। এর জন্য কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে না এবং কারো অনুসরণ ও অনুকরণও করতে হবে না। পক্ষান্তরে সেখানে এমন কিছু বিষয় আছে যার একাধিক অর্থ রয়েছে। তার কোন ব্যাখ্যা বা বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয় নাই। আবার কিছু বিষয় এমনও রয়েছে যা বাহ্যিক ভাবে পরস্পর বিরোধী বলে মনে হয়। কিন্তু বিস্তারিত ব্যাখ্যার পরে তাতে আর কোন বিরোধ থাকে না। যেমন একটি হাদীসে আছে, "ইমামের কিরাআতই মুক্তাদীদের কিরাআত।" তাদের কিরাআত পড়ার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু অপর হাদীসে উল্লেখ আছে, সুরা ফাতিহা না পড়লে নামায হবে না। এর দ্বারা বুঝা যায় মুক্তাদির জন্যও সুরাহ ফাতিহা পড়া জরুরী। তাহলে এ দুটি হাদীস সংঘর্ষপূর্ণ বুঝা যাচ্ছে। এখন এর সমাধানের জন্য সকলে হয়ত বা নিজের জ্ঞান অনুযায়ী ফয়সালা করবে এবং সেই অনুযায়ী আমল করবে অথবা নিজেরা কোন ফায়সালা না করে আমাদের পূর্বসূরী মুজতাহিদীন যাদের কুরআন ও হাদীসের সার্বিক বিষয়ে গভীর জ্ঞান ছিল তারা যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন এবং সমাধান দিয়েছেন সেই অনুযায়ী আমল করবে। এই দুটি পথের যে কোন একটি অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে। এর বিকল্প তৃতীয় কোন পথ নেই। তবে স্বরণীয় বিষয় হল, এসমস্ত বিষয়ের সমাধান নিজে নিজে বের করে বা এর সঠিক ব্যাখ্যা নির্ণয় করে আমল করা আমাদের পক্ষে বড়ই জটিল ব্যাপার। কারণ কুরআন হাদীসের সার্বিক বিষয়ের ইলম আমাদের নেই এবং ইজতিহাদ করে সমাধান বের করার মত যোগ্যতাও আমাদের নেই। ফলে ইজতিহাদের মাধ্যমে উপরোক্ত বিষয়গুলির সঠিক ব্যাখ্যা বা সঠিক তথ্য অনুসন্ধান করে দ্বীনের উপর চলা সম্ভবপর নয়। সুতরাং আমাদেরকে মুজতাহিদীনদের পদাংক অনুসরণ করতে হবে। আর এ ব্যাপারে তাদের অনুসরণ কোন ব্যক্তি বিশেষের অনুসরণ বলে গণ্য হবে না বরং প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তার রাসূলের অনুসরণ করারই নামান্তর। কুরআন হাদীসে মুজতাহিদীনদের অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করছেন, তোমরা আহলে যিকিরদের কাছে জিজ্ঞেস কর, যদি তোমাদের জানা না থাকে। (সুরা নাহল)

অর্থাৎ যারা বিধি বিধানের জ্ঞান রাখেনা তারা যারা জানে তাদের নিকট থেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিবে, তাদের কথা মত আমল করবে। অন্য আরেক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করছেন তোমরা আল্লাহ, আল্লাহর রাসুল এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর তাদের অনুসরণ কর। (সুরাহ নিসা-৫৯)

সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মুফাসসির নামে খ্যাত বিশিষ্ট সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস রা. ও হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. এবং বিশিষ্ট তাফসীর কারকগণ আলোচ্য আয়াতে “উলূল আমর” দ্বারা উদ্দেশ্য মুজতাহিদ-ইমাম বলে উল্লেখ করেছেন। অতএব যে সব বিধান কুরআন হাদীসে পরিস্কার ভাবে উল্লেখ নেই অথবা যেগুলি কুরআনী আয়াতে বা হাদীসে পরস্পর বিরোধী বলে মনে হয় এবং যে গুলিতে সাহাবী ও তাবেয়ী গণের মধ্যে আয়াত ও হাদীসের অর্থ- মতলব নির্ধারণের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে, সে সব বিধি বিধানের ব্যাপারে কুরআন এর নির্দেশ অনুযায়ী সাধারণ লোক থেকে শুরু করে নিজে মুজতাহিদ নয়-এমন আলিমদের জন্যও সমস্ত মাসআলার ব্যাপারে কোন একজন মুজতাহিদের অনুসরণ করা জরুরী।

ব্যক্তিগত অভিমতের ভিত্তিতে একটি আয়াত কিংবা হাদীসকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেটাকে গ্রহণ করা এবং অন্য আয়াত বা হাদীসকে বর্জন করা ও তার উপর আমল ছেড়ে দেয়া তাদের জন্য জায়েয হবে না। কেননা কুরআন সুন্নাহতে যে সব বিধান পরিষ্কার ভাবে উল্লেখ নেই সেগুলো কুরআন সুন্নাহতে বর্ণিত মূলনীতি অনুসরণ করে বের করা হয়েছে। আর এই মহান কাজটি সুসম্পন্ন করেছেন এমন মুজতাহিদীনগণ যারা আরবী ভাষায় এবং কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী। তাদের খোদাভীতি ও পরহেযগারী ছিল বর্ণনাতীত। এসব যোগ্যতা দক্ষতা ও মর্যাদার বিষয় বিবেচনা করে উলামায়ে কেরাম প্রসিদ্ধ চারজন ইমামকে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব বলে মনোনীত করেছেন। কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে নুবুওয়ত যুগের নৈকট্য এবং সাহাবা ও তাবেয়ীগণের সংসর্গের বরকতে শরী‘আতের মূলনীতি ও উদ্দেশ্য বুঝার বিশেষ জ্ঞান দান করেছিলেন এবং বর্ণিত বা স্পষ্ট বিধানের উপর যা বর্ণিত হয় নি ও অস্পষ্ট রয়েছে সেগুলিকে কিয়াস করে শরী‘আত সম্মত নির্দেশ বা বিধান বের করার মত অসাধারণ যোগ্যতা দান করেছিলেন। এ কারণেই পরবর্তীতে বড় বড় আলিম মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের আরবী ভাষা ও শরী‘আত সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী হওয়া সত্বেও তারা ইজতিহাদী মাসআলার ব্যাপারে সর্বদা উপরোক্ত ইমামগণের অনুসরণ করে গেছেন। সুতরাং বর্তমান যুগের আলিমদের জন্যও ইজতিহাদী মাসায়েলের ব্যাপারে যে কোন একজন ইমামের অনুসরণ করা অপরিহার্য্য কর্তব্য। ইমাম গণের মতের বিরুদ্ধে নতুন কোন মত অবলম্বন করা জায়েয নেই। কেননা বর্তমানে ইলমের গভীরতা অনেকগুণে হ্রাস পেয়েছে। এমনিভাবে তাকওয়া পরহেযগারী ও খোদাভীতিও পর্যায় ক্রমে বিদায় নিচ্ছে। এহেন নাযুক পরিস্থিতিতে ইমামদের অনুসরণ না করে দ্বীনের উপর টিকে থাকা বা চলা সম্ভবপর নয়। তাছাড়া এই মুহূর্তে কোন মাসআলার ব্যাপারে এক ইমামের, অপর মাসআলায় আরেক ইমামের অনুসরণ করাও জায়েয নেই। বরং সর্বক্ষেত্রে এক ইমামেরই অনুসরণ করতে হবে। কেননা এর অনুমতি থাকলে মানুষ প্রবৃত্তি ও স্বার্থের অনুসারী হয়ে যাবে। যেখানে যার দ্বারা তার স্বার্থ সিদ্ধি হবে সে বিষয়ে তাকেই অনুসরণ করবে। কাজেই চার ইমামের যে কোন একজন ইমামের অনুসরণ করার উপর উলামায়ে কিরামের সর্ব সম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে একজনকে অনুসরণ করে বাকি ইমামদেরকেও হক ও সত্য বলে মেনে নিতে হবে। আর যারা ইজমা কিয়াস বাদ দিয়ে শুধু মাত্র কুরআন-হাদীসের উপর আমল করার দাবী তুলছে এবং কারো অনুসরণ করাকে জরুরী মনে করছে না বা কারো অনুমণ করাকে শরী‘আত বিরোধী মনে করে দূরে রয়েছে তারা মূলত ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে এবং দ্বীনের নামে তারা নিজেদের কু প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে আর মানুষের মাঝে ফেৎনার বীজ বপন করছে। এদের থেকে সকলের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। (মাআরিফুল কুরআন-১-৭৫; তাকলীদ কী শরঈ হাইসিয়াত-১৬ ফাতাওয়া শামী ১-৭৭)