‘আখেরী চাহার শম্বা’ দিবস পালনের শরঈ বিধান
শরী‘আতের দৃষ্টিতে কোন কাজ আল্লাহর কাছে সাওয়াবের উপযুক্ত হওয়ার জন্য র্শত হলো,
(১) শিরকমুক্ত ঈমান।
(২) নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত।
(৩) ইখলাস তথা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত।
কাজেই যে কোনো কাজ সওয়াব মনে করে করার আগে আমাদেরকে অবশ্যই এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে যে, সংশ্লষ্টি কাজটি শিরকমুক্ত কিনা? নবীজীর আমল বা সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত কিনা? এবং তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি উদ্দেশ্য থাকে কিনা? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিবাচক হলে তা করা বধৈ হবে। তাতে প্রতিশ্রুত সওয়াবও পাওয়া যাবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিরও কারণ হবে। পক্ষান্তরে যদি উপরোক্ত তিনটি র্শত কিংবা অন্তত কোনো একটি না পাওয়া যায়, তবে উক্ত কাজ নিঃসন্দেহে ভ্রষ্টতা এবং গোমরাহী হবে এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনবে।
আমাদের সমাজে ‘আখেরী চাহার শম্বা’র দিবস পালনের একটি রীতি রয়েছে। এক্ষেত্রেও রীতি পালনের ‘অযৌক্তিক রীতি’ বিশ্বাসী না হয়ে উপরিউক্ত তিনটি শর্তের কষ্টিপাথরে তা যাঁচাই করে নেওয়া কাম্য।
আখেরী চাহার শম্বার বাস্তবতা
‘আখেরী চাহার শম্বা’-এর র্অথ হলো,“সফর মাসের শেষ বুধবার”। মুসলমান ঐতিহাসিকগণের মতে নবী ‘আলাইহসি সালাম বিদায় হজ্জ করে এসে এই সফর মাসের শেষ বুধবারে অসুস্থ হয়ে পহেলা রবীউল আউয়াল সোমবার ইন্তকোল করলেন। বুখারী শরীফের এক হাদীসে (৪৪৩১) হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর সূত্রে এসেছে যে, বৃহষ্পতিবার হুজুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসুস্থতা বেড়ে গিয়েছিল।
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইবনে হাজার রহ. বলেন, বৃহষ্পতিবার বলার মাধ্যমে এর সর্মথন পাওয়া যায় যে, নবীজীর অসুস্থতা বৃহষ্পতিবারের আগে শুরু হয়েছিল। (ফাতহুল বারী: ৭/৮০২)
নবীজী এ সময় এত অসুস্থ ছিলেন যে, মসজিদে যাওয়ার মত শক্তি ছিল না, যে কারণে আবূ বকর সিদ্দিক রা. কে নিজের জায়গায় নামায পড়ানোর দায়িত্ব দিলেন। বুধবারে ইশার সময় অসুস্থ হলেন। আর সোমবারে যুহরের আগে ইন্তিকাল করলেন।
অসুস্থতার এই খবরে সাহাবায়ে কেরাম, প্রিয়জন অসুস্থ হলে যে পরিমাণ কেঁদেছেন,তার চেয়েও হাজারো গুণ বেশি কেঁদেছেন। কারণ তাঁরা রাসূলের পিছনে নামায পড়তে পারছেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আম্মাজান আয়েশা রা. এর ঘরে থাকার কারণে তাঁকে দেখতেও পারছিলেন না ।
কিন্তু এর বিপরীতে ইহুদী ও মুনাফেকরা খুব খুশি হয়ে ঈদ পালন করলো। মিষ্টি বিতরণ করলো। কত রকম নাচানাচি করলো। তারা ধারণা করলো, এইবার বোধহয় বিপদটা কেটে যাবে, নাঊযুবল্লিাহ। তারা তো রাসূলুল্লাহকে বিপদ মনে করতো।
পরর্বতীকালে নবীজীর অসুস্থতার দিবস এই আখেরী চাহার শম্বা তথা সফর মাসের শেষ বুধবার একটি দিবস আকারে ইহুদীদের চক্রান্তের কারণে ইসলামের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে। এভাবেই যা ছিল মুসলমানদের দুঃখের দিন, সেটাকে বানিয়ে দেয়া হলো ফুর্তি-আনন্দের দিন।
আখেরী চাহার শম্বা পালনের হুকুম
আমাদের সমাজের এক শ্রেণীর ভাইয়েরা এ দিবস পালন রীতিতে বিভিন্ন স্থানে লাইটিং করে, মিষ্টি বিতরণ করে। আরো অনকে রকম আনন্দ-র্ফূতি করে থাকে। এই দিনে বিশেষ পদ্ধতিতে নামাযও পড়ে থাকে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে একাধিক কারণে আখেরী চাহার শম্বা পালনও সর্ম্পূণরূপে নিষিদ্ধ প্রমাণিত হয়-
১. দুই ঈদ ছাড়া অন্য কোনে দিন “দিবস পালন”-এর বৈধতা ইসলামে নেই। তার উপর যখন দিনটি ছিল মুসলমানদের জন্য চরম শোকের দিন, সেখানে সেদিন আনন্দ উদযাপন করা বড় মূর্খতার কথা।
২. এই দিন পালনের এবং বিশেষ ইবাদতের কোন দলীল-প্রমাণ কুরআন-হাদীসের মধ্যে, ইসলামের তিন সোনালী যুগে এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের কোন নির্ভরযোগ্য কিতাবের থেকে বা আলেমের থেকে পাওয়া যায় না। কাজেই নিঃসন্দেহে আখেরী চাহার শম্বা পালন ইসলামের মধ্যে একটি নব আবিষ্কিৃত বিষয়, তথা বিদ‘আত। আর বিদ‘আতের ব্যাপারে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কঠিন ধমকির কথা পাওয়া যায়। তিনি বলনে, তোমরা বিদ‘আত বা নতুন আবিষ্কিৃত আমল থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকো। কেননা প্রত্যকে নতুন আবিষ্কিৃত আমলই বিদ‘আতের মধ্যে গণ্য এবং প্রত্যকে বিদ‘আতই গোমরাহী। (তিরমীযি পৃ. ২৯২, আবূ দাঊদ:২/২৭৯, মুসনাদে আহমাদ:৪/২৭)
তাছাড়া বিদ‘আতে লিপ্ত ব্যক্তি নিজ অজ্ঞতার দরুন অনুধাবনও করতে পারে না যে, আমার কাজটা শরী‘আত অনুযায়ী হচ্ছে না, আমি নেক ও সাওয়াবের কাজ মনে করে কবীরা গুনাহে লিপ্ত, যার ফলে তার তাওবাও নসীব হয় না। এভাবে সে এক সময় কবীরা গুনাহ থেকে তাওবা করা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এসব গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার তাউফীক দান করুন। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হুজুর সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অনুযায়ী চলার তাউফীক দান করুন। আমীন।