যুগশ্রেষ্ঠ উলামায়ে কিরাম সকলেই মাযহাবের অনুসারী ছিলেন
যুগশ্রেষ্ঠ মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ উলামায়ে কিরাম সকলেই মাযহাবের অনুসারী ছিলেন
বস্তুত: এটাই কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার নিরাপদ পথ ও পন্থা
কুরআন-সুন্নাহ ও তা থেকে আহরিত সকল বিধি-বিধান মেনে চলার মধ্যেই মুসলমানদের দো’জাহানের শান্তি ও কামিয়াবী নিহিত। তবে কুরআন-সুন্নাহর কিছু বিধান সাধারণ শিক্ষিত ব্যক্তিও বুঝতে সক্ষম; আর কিছু বিধান সংক্ষিপ্ততা ও সূক্ষ্মতার কারণে সবাই বুঝতে সক্ষম নয়। আবার কিছু বিধান বাহ্যিকভাবে বিরোধপূর্ণ। সংক্ষিপ্ত, সূক্ষ্ম ও বাহ্য বিরোধপূর্ণ বিধানসমূহের ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দু’টি পথ খোলা আছে। হয়তো নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি ও বুঝ মত সমাধান বের করে সে অনুযায়ী আমল করব, অথবা উম্মাহর স্বীকৃত সর্বোত্তম যুগের ইমামগণের দেয়া সমাধান মেনে চলব। ইনসাফ ও বাস্তবতার বিচারে প্রথমটি আশঙ্কাপূর্ণ ও ভয়ানক, আর দ্বিতীয়টি সতর্কতাপূর্ণ ও নিরাপদ। এ জন্যই গোটা মুসলিম উম্মাহ হাজার বছর ধরে সর্বোত্তম যুগের সাহাবায়ে কিরাম ও তাবেঈদের ব্যাখ্যার আলোকে কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণ করে আসছে। তাদের ব্যাখ্যা ও মতামতগুলোই আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালায় পরবর্তীকালে চার মাযহাবের আকৃতিতে প্রকাশ পেয়েছে। যেগুলো ‘হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব’ নামে পরিচিত।
সুতরাং মাযহাব কোনো নতুন জিনিস নয়। খাইরুল কুরূনের পর থেকে সকল মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ কোনো না কোনো ইমামের ব্যাখ্যার আলোকে কুরআন-সুন্নাহ মেনে আসছেন। তাঁরা সবাই কোনো না কোনো মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। বড় বড় কলেবরে রচিত যুগের ক্রমধারা অনুযায়ী এ যাবতকালের সকল মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের মাযহাব ভিত্তিক জীবনীগুলোই এর প্রমাণ। এখানে মৃত্যু-সনসহ শাস্ত্রজ্ঞ উলামায়ে কিরামের মাযহাব ভিত্তিক একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেয়া হলো।
কুতুবে সিত্তাহ-এর লেখকগণ যে মাযহাবের অনুসারী ছিলেন
কিতাব | লেখক | মৃত্যু | মাযহাব |
১. সহীহ বুখারী | ইমাম বুখারী | ২৫৬ হি. | শাফেয়ী |
২. সহীহ মুসলিম | ইমাম মুসলিম | ২৬১ হি. | শাফেয়ী |
৩. সুনানে আবূ দাউদ | ইমাম আবূ দাউদ | ২৭৫ হি. | হাম্বলী |
৪. সুনানে নাসায়ী | ইমাম নাসায়ী | ৩০৩ হি. | হাম্বলী |
৫. জামে’ তিরমিযী | ইমাম তিরমিযী | ২৭৯ হি. | শাফেয়ী |
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ | ইমাম ইবনে মাজাহ | ২৭৫ হি. | শাফেয়ী |
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুফাস্সিরগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুফাস্সিরগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুফাস্সিরগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুফাস্সিরগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
কিতাব | লেখক | মৃত্যু |
১. কিতাবুল আসার | ইমাম আবূ ইউসুফ রহ. | ১৮২ হি. |
২. মুয়াত্তা | ইমাম মুহাম্মাদ রহ. | ১৮৯ হি. |
৩. ত্বহাবী শরীফ | ইমাম ত্বহাবী | ৩১১ হি. |
৪. কিতাবুল জিহাদ | আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক | ১৮১ হি. |
৫. মুসনাদে আবূ ইয়া’লা | আবূ ইয়া’লা আল মূসিলী | ৩০৭ হি. |
৬. ইকমালু তাহযীবিল কামাল | আলাউদ্দীন মুগলতায়ী | ৭৬২ হি. |
৭. আল জাওহারুননাকী | আলাউদ্দীন ইবনুত তুরকুমানী | ৭৪৫ হি. |
৮. উমদাতুল ক্বারী | বদরুদ্দীন আল আইনী | ৮৫৫ হি. |
৯. মিরক্বাত | মুল্লা আলী কারী | ১০১৪ হি. |
১০. তারীখে ইবনে মাঈন | ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন | ২৩৩ হি. |
১১. নাসবুর রায়া | ইউসুফ যাইলাঈ | ৭৬২ হি. |
মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
কিতাব | লেখক | মৃত্যু |
১. সহীহ ইবনে হিব্বান | ইবনে হিব্বান | ৩৫৪ হি. |
২. সহীহ ইবনে খুযাইমা | ইবনে খুযাইমা | ৩১১ হি. |
৩. মুসনাদে ত্বয়ালিসী | আবূ দাউদ আত ত্বয়ালিসী | ২০৪ হি. |
৪. সুনানে দারাকুতনী | আলী ইবনে উমর আদ দারাকুতনী | ৩৮৫ হি. |
৫. সুনানে বাএটাকী | আবূ বকর আল বাএটাকী | ৪৫৮ হি. |
৬. মুসতাদরাকে হাকেম | হাকেম আবূ আব্দিল্লাহ | ৪০৫ হি. |
৭. আল কামেল ফিত তারীখ | ইবনুল আসীর | ৬০৬ হি. |
৮. রিয়াযুস সালিহীন | মুহিউদ্দীন আন নববী | ৬৭৬ হি. |
৯. তাহযীবুল কামাল | আবুল হাজ্জাজ আল মিযযী | ৭৪২ হি. |
১০. তাযকিরাতুল হুফফায | শামসুদ্দীন আয যাহাবী | ৭৪৮ হি. |
১১. ফাতহুল বারী | হাফেয ইবনে হাজার | ৮৫২ হি. |
হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফকীহগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
মালেকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফকীহগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
শাফেয়ী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফকীহগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
হাম্বলী মাযহাবের প্রসিদ্ধ ফকীহগণ এবং তাদের লিখিত কিতাবসমূহ
|
মুসলিম উম্মাহর এ সকল প্রসিদ্ধ মুফাস্সির, মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের মাধ্যমেই আমরা লাভ করেছি তাফসীর, উসূলে তাফসীর, হাদীস, উসূলে হাদীস, ফিকহ, উসূলে ফিকহসহ সকল প্রকার ইলমের ভান্ডার। তাদের কাছে উম্মত সর্বোতভাবে ঋণী এবং যাদের ইলম থেকে এক মুহূর্তের জন্য বিমুখ হওয়ার কল্পনা করাও উম্মতের জন্য অসম্ভব। বলা বাহুল্য, তাঁরা সকলেই ছিলেন কোনো না কোনো মাযহাবের অনুসারী। এখন এ সকল ব্যক্তিবর্গ যদি শুধুমাত্র মাযহাব মানার কারণে কিছু লা-মাযহাবী বন্ধুর দাবি অনুযায়ী মুশরিক হয়ে থাকেন; তাহলে তারা কীভাবে এ সকল মুশরিকদের (নাউযুবিল্লাহ) কিতাব থেকে তাফসীর, হাদীস ও ফিকহসহ অন্যান্য ইলম গ্রহণ করছেন? আসলে ‘মাযহাব মানলে মুশরিক হয়ে যায়’ এ কথার কোনো ভিত্তি নেই। বরং খাইরুল কুরূন থেকে এ যাবতকাল মুসলিম উম্মাহ কোনো না কোনো মাযহাবের অনুসরণ করে আসছে।
অতএব যারা কয়েকটি হাদীসের অনুবাদ পড়েই মুজতাহিদ-ইমাম বনে যাচ্ছেন, তাদেরকে তাদেরই একজন ইমাম মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বাটালবীর বিশ বছরের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া ভাল মনে হচ্ছে। তিনি তার ‘ইশাআতুস সুন্নাহ’তে বলেছেন, ‘আমার বিশ বছরের অভিজ্ঞতা হলো যে ব্যক্তি ইলম ছাড়া স্বাধীন মুজতাহিদ বনে যায়, অর্থাৎ মাযহাব ত্যাগ করে; শেষ পর্যন্ত সে দীন থেকেই বের হয়ে যায়।’ ইশাআতুস সুন্নাহ, খন্ড:১ পৃষ্ঠা ৪ (১৮৮৮ ইং)
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপর চলার ও অটল থাকার তাউফীক দান করুন। আমীন, ইয়া রব্বাল আলামীন।