পুরুষদের জামা‘আতে মহিলাদের অংশ গ্রহণ!

মুফতী মনসূরুল হক সাহেবJuly 31, 2021নামায, বিবিধ, মহিলাদের বিষয়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বর্ণনায় মহিলাদের নামাযের উত্তম স্থান

ক. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ رضي الله عنه এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ইরশাদ করেছেন, মহিলার জন্য নির্ধারিত হুজরায় নামায অপেক্ষা তার  ঘরে নামায পড়া উত্তম, আর ঘরে নামায অপেক্ষা নিভৃত ও একান্ত কোঠায় নামায পড়া উত্তম। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৫৭০)

খ. একদা হযরত উম্মে হুমাইদ رضي الله عنه রাসূল صلى اللهعليه وسلم এর দরবারে এসে বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার সঙ্গে নামায পড়তে ভালবাসি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি জানি তুমি আমার সঙ্গে নামায পড়তে ভালবাসো কিন্তু, তোমার ঘরে নামায তোমার বাইরের হুজরায় নামায অপেক্ষা উত্তম। আর তোমার হুজরায় নামায তোমার বাড়ীতে নামায অপেক্ষা উত্তম। আর তোমার বাড়ীতে নামায তোমার মহল্লার মসজিদে নামায অপেক্ষা উত্তম । আর তোমার মহল্লার মসজিদে নামায আমার মসজিদে নামায অপেক্ষা উত্তম। অত:পর উক্ত মহিলা নিজ ঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নামাযের স্থান নির্ধারণ করিয়ে নিলো এবং আমরণ তাতেই নামায আদায় করল। মুসনাদে আহমাদ, সহীহ ইবনে খুযাইমা ও সহীহ ইবনে হিব্বান, সূত্র “তারগীব-তারহীব”হাদীস নং ৫১৩

গ. হযরত উম্মে সালামা رضي الله عنه এর সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, গৃহাভ্যন্তরই হল মহিলাদের জন্য উত্তম মসজিদ। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ২৬৫৯৮

উপর্যুক্ত সহীহ হাদীসসমূহ দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয়

ক. মহিলাদের নামাযের জন্য তাদের নিজ গৃহকোণ মসজিদ অপেক্ষা উত্তম।

খ. রাসূল صلى اللهعليه وسلم নিজেই মহিলাদেরকে মসজিদে গমন থেকে নিরুৎসাহী করেছেন।

গ. রাসূল صلى اللهعليه وسلم যে পন্থাকে উত্তম বলেছেন তার বিপরীতটা উত্তম ও সওয়াবের কাজ হতেই পারে না।

বি. দ্র. হাদীসের কয়েকটি বর্ণনা যা মহিলাদের মসজিদে আসা প্রসঙ্গে পাওয়া যায় তা প্রাথমিক যুগের কথা, তখন পুরুষরাও সকল মাসআলা জানত না, তখন কয়েকটি কঠিন শর্ত সহকারে রাতের আধারে নির্দিষ্ট দরজা দিয়ে একদম পিছনের কাতারে দাঁড়ানোর অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে নবী صلى اللهعليه وسلم উক্ত অনুমতি প্রত্যাহার করে তাদেরকে ঘরে নামায পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেমনটি উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, সুতরাং ঐ সকল হাদীস দ্বারা বর্তমানে মহিলাদের মসজিদে গমন জায়িয বলা যাবে না।

মহিলাদের মসজিদে গমন প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবীদের উক্তি

ক. সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারিণী ও উম্মতের শ্রেষ্ঠ মহিলা আলেম আম্মাজান হযরত আয়িশা رضي الله عنه বলেন,  যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতেন যে, মহিলারা ( সাজ-সজ্জা গ্রহণে, সুগন্ধি ব্যবহারে ও সুন্দর পোশাক পরিধানে (মুসলিম শরীফের টীকা দ্রষ্টব্য)) কী পন্থা উদ্ভাবন করেছে তাহলে অবশ্যই তাদেরকে মসজিদে যেতে নিষেধ করে দিতেন, যেমন নিষেধ করা হয়েছিল বনী ইসরাঈলের মহিলাদেরকে। (সহীহ বুখারী হাদীস নং ৮৬৯, সহীহ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৪৪৫)

খ. হযরত আমর শাইবানী رحمة اللہ علیه বলেন, আমি (এ উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ফিকাহবিদ) সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ رضي الله عنه কে দেখেছি যে, তিনি জুমআর দিনে মহিলাদেরকে মসজিদ হতে বের করে দিতেন এবং বলতেন, তোমরা নিজ ঘরে চলে যাও, তোমাদের জন্য উহাই উত্তম। হাদীসটি ইমাম তাবারানী নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণনা করেছেন। “তারগীব-তারহীব” হাদীস নং ৫২৩

 উল্লেখ্য যে, এ হলো নবীযুগের পর-পরই মসজিদে গমনকারিণী মহিলাদের অবস্থার পরিবর্তনে হযরত আয়িশা رضي الله عنه এর উক্তি ও হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ رضي الله عنه এর আমল। যদিও তখনকার মহিলারা ছিলেন সাহাবী অথবা তাবেঈ, অন্য কেউ নন। পক্ষান্তরে আজ চৌদ্দশতাব্দি পরে যখন মহিলাদের তেল, সাবান, শেম্পুসহ সকল প্রকার প্রসাধনই সুগন্ধিযুক্ত। অধিকাংশ মহিলারা পর্দা করে না। যারা বোরকা পরে তাদের অধিকাংশই সৌন্দর্যের কেন্দ্রস্থল চেহারাকে উন্মুক্ত রাখে এবং তাদের বোরকা ও পোশাক হয় নজরকাড়া ফ্যাশনের। এ অবস্থা রাসূল صلى اللهعليه وسلم দেখলে মহিলাদেরকে মসজিদে গমনের অনুমতি দিতেন এটা বিবেকবান কেউ কি কল্পনা করতে পারে?

মহিলাদের মসজিদে গমনের ব্যাপারে হানাফী, মালেকী ও শাফেয়ী মাযহাবের সিদ্ধান্ত

ক. হানাফী মাযহাব: সকল মহিলাদের জন্য জামাআত, জুমআ, ঈদ ও পুরুষদের মাহফিলে অংশগ্রহণ সর্বাবস্থায় মাকরূহে তাহরীমী। আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু: খণ্ড-২, পৃঃ ১১৭২

খ. মালেকী মাযহাব: অতিবৃদ্ধা মহিলা ছাড়া সকল মহিলার জন্যে জুমআয় অংশ গ্রহণ হারাম।

গ. শাফেঈ মাযহাব: অতিবৃদ্ধা মহিলা ছাড়া সকল মহিলার জন্য জুমআসহ যে কোন জামা‘আতে অংশ গ্রহণ সর্বাবস্থায় মাকরূহে তাহরীমী।  আল ফিকহু আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আ: খণ্ড-১, পৃঃ ৩১১-১২

প্রিয় পাঠক! উপর্যুক্ত আলোচনায় আমরা যা পেলাম এর বিপরীতে এমন কোন নির্ভরযোগ্য  হাদীস ও ফিকহী বর্ণনা নেই যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো যুগে মহিলাদের মসজিদে গমন ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব কিংবা অধিক সওয়াবের কাজ ছিল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবীগণ ও পরবর্তী ফিকাহবিদ ইমামগণ মহিলাদেরকে মসজিদে গমনে উৎসাহিত করেছেন। তাহলে বর্তমানে নৈতিক অবক্ষয়ের চরম মুহূর্তে কী করে তা সাওয়াব ও আগ্রহের কাজ হতে পারে? যে সকল আলেম বা স্কলারগণ বর্তমানে মহিলাদেরকে মসজিদে গমনে উৎসাহিত করেন, তাঁরা কি রাসূল صلى اللهعليه وسلم, হযরত আয়িশা ও ইবনে মাসঊদ رضي الله عنه এবং মুজতাহিদ ইমামগণের চেয়েও বেশী যোগ্য ও অনুসরণীয় হয়ে গেলেন? যে সকল স্কলার অসংখ্য বেগানা মহিলাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ইসলামী লেকচার প্রদান করেন। কিংবা লক্ষ্য লক্ষ্য বেগানা মহিলাদের দেখার জন্য বিনা প্রয়োজনে নিজেকে উপস্থাপন করেন। অথচ সহীহ হাদীসের আলোকে এ সবই নিষিদ্ধ। (দেখুন: সুনানে তিরমিযী হাদীস নং ২৭৮২, সুনানে আবূ দাউদ হাদীস নং ৪১১২) বাস্তব দ্বীন ও ইসলামের ক্ষেত্রে এরাও কি গ্রহণযোগ্য হয়ে গেলেন ?

মাসআলা ক.

একই নামাযে জামা‘আতে নামায পড়ার ক্ষেত্রে যে সকল পুরুষের সম্মুখে কিংবা পাশে কোন মহিলা থাকবে সে সকল পুরুষের নামায ফাসিদ হয়ে যাবে। ফাতাওয়ায়ে শামী: ১ম খণ্ড, পৃ.৫৭৩, আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃঃ ৯৭

একারণেই হারাম শরীফে পুরুষদের সম্মুখে ও পাশে দাঁড়ানো থেকে মহিলাদেরকে নিবৃত্ত করতে কর্তৃপক্ষ সর্বশক্তি নিয়োগ করে থাকেন।

মাসআলা খ.

মসজিদের যে তলায় মহিলারা জামা‘আতে অংশগ্রহণ করে তার উপর তলায় বরাবর স্থানের পিছনে যে সকল পুরুষ দাঁড়াবে  তাদের সকলের নামায ফাসিদ হয়ে যাবে।  ফাতাওয়ায়ে শামীসহ দুররে মুখতার: ১ম খণ্ড, পৃ. ৫৮৪ , ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী: ১ম খণ্ড, পৃ. ৯৭

উল্লেখ্য যে, টার্মিনাল, জংশন, এয়ারপোর্ট ও মুসাফিরদের যাত্রা বিরতির স্থানসমূহে, অনুরূপ হাসপাতাল ও বিভিন্ন কেন্দ্রীয় স্থানে মহিলাদের নামায আদায়ের ব্যবস্থা রাখা জরুরী। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট। হারামাইন শরীফাইন ও মক্কা-মদীনার পথে মহিলাদের নামাযের ব্যবস্থা মূলত এ প্রেক্ষিতেই। যেন তাওয়াফ-সাঈর জন্য আগমনকারিণী, যিয়ারত ইত্যাদির জন্য বাইরে গমনকারিণীরা ও ভ্রমণরত মহিলারা সময় হলে নামায পড়ে নিতে পারে। এসকল স্থানে স্থানীয় আরব মহিলাদেরকে সাধারণত দেখা যায় না, তারা নিজেদের ঘরেই পড়ে নেয়। আমাদের দেশের সাধারণ লোকেরা হারামাইন শরীফাইনে আগন্তুক শরীয়তের হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞ মহিলাদের জামা‘আতে হাজির হওয়া দেখে এসে নিজেদের আবাসিক এলাকার মসজিদে মহিলাদের ব্যবস্থা রাখার দাবি তোলে। অথচ সকল বালেগ পুরুষদের জন্য যে পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামা‘আতে শরীক হয়ে পড়া ওয়াজিব, এর জন্যও যে কিছু করণীয় আছে তা চিন্তাও করে না। বিষয়টি এক প্রকার গোমরাহী যা গভীরভাবে ভাবা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল প্রকার গোমরাহী থেকে হিফাজত করুন। আমীন।