দেওবন্দীয়াত বনাম মওদুদীয়াত: কওমী অঙ্গনে বাতিলের অনুপ্রবেশ

মাওলানা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী সাহেব১৯ জুলাই, ২০২৬অপসংস্কৃতি ও বাতিল সম্প্রদায়, বর্তমান প্রেক্ষাপট রাজনীতি ও সামাজিকতা

বিগত ২৪ জুন, ২০২৬ ঈসায়ী তারিখে মাসজিদুল আবরারে ‘তাহযীবুল মাদারিসিল কওমিয়া’ কর্তৃক একটি বিশেষ সেমিনার আয়োজন করা হয়। উক্ত সেমিনারে কওমী অঙ্গনে বাতিল মতবাদের অনুপ্রবেশ রোধে উস্তাযুল আসাতীযা, হযরত মাওলানা ‍নূরুল ইসলাম ওলীপুরী সাহেব দা. বা. এক দিকনির্দেশনামূলক বয়ান পেশ করেন। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তাঁর এই তাত্ত্বিক আলোচনাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ। রেকর্ডকৃত সেই জীবন্ত বয়ানের শ্রবণ রূপ থেকে সংগৃহীত অনুশ্রুত লিখন পাঠকদের সুবিধার্থে এখানে হুবহু উপস্থাপন করা হলো।

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ نَسْتَعِيْنُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ وَنُؤْمِنُ بِهِ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْهِ، وَنَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُورِ أَنْفُسِنَا وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللَّهُ فَلَا مُضِلَّ لَهُ، وَمَنْ يُضْلِلْهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ سَيِّدَنَا وَنَبِيَّنَا وَمَوْلَانَا مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، صَلَّى اللَّهُ تَعَالَىٰ عَلَيْهِ وَعَلَىٰ آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَبَارَكَ وَسَلَّمَ. أَمَّا بَعْدُ، فَأَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ، بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ‌. الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا بَارَكَ اللَّهُ لَنَا وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيمِ، وَنَفَعَنَا وَإِيَّاكُمْ بِالْآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيمِ...

হযরত উলামায়ে কেরাম, আমার প্রিয় ছাত্র ভাইয়েরা ও সর্বস্তরের মুসলমান ভাইয়েরা!

পবিত্র কুরআনের সূরায়ে মায়েদার তিন নম্বর আয়াতের সামান্য একটু অংশ আমি আপনাদের সামনে তিলাওয়াত করেছি। তাতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ এর অর্থ হলো, আজকে আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

এখানে তিনটি কথা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।

·        প্রথমত, ‘আজকে’ বলতে আল্লাহ তা‘আলা কোন দিন বুঝালেন?

·        দ্বিতীয়ত, ‘দ্বীন’ বলতে কী বুঝালেন?

·        তৃতীয়ত, ‘পরিপূর্ণ’ বলতে কী বুঝালেন? এই তিন কথার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এক দিনেই বলে শেষ করে ফেলার মতো নয়। তবে আমি প্রথম কথার ব্যাখ্যা থেকে শুরু করি। নির্ধারিত সময়ে যতটুকু বলতে পারি আল্লাহ তা‘আলা তাউফীক দেন। অসমাপ্ত থাকলে বাকি কথা অন্য সময়ে সমাপ্ত করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

আয়াতুল ইকমাল অবতীর্ণ হওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্ত ও বিদায় হজ্বের ভাষণ

এখানে আল্লাহ তা‘আলা যে ""الْيَوْمَ বা ‘আজকে‘ বলেছেন, এই আজকে বলতে কোন দিন? এর সংক্ষিপ্ত জবাব হলো, আয়াতটি আল্লাহ তা‘আলা যেদিন নাযিল করেছিলেন, সেই দিনটাকে আল্লাহ তা‘আলা এখানে ‘আজকে’ বলেছেন। তাই বুঝতে হয়, আয়াতটি নাযিল করেছিলেন কোন দিন? আয়াতটি নাযিল করেছিলেন রাসূলে কারীম ﷺ-এর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের ভাষণের দিন। শুধু তাই নয়, বরং কোনো কোনো বিবরণ মতে, রাসূলের বিদায় হজ্বের ভাষণ চলাকালে রাসূলের কাছে আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াত নাযিল করেছেন।

রাসূলে কারীম ﷺ জীবনের শেষ হজ্ব পালন করার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেছেন। এজন্য এই হজ্বটাকে রাসূলের বিদায় হজ্ব বলা হয়। হজ্বের তিন ফরযের বড় ফরয হলো উকূফে আরাফাহ। জিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখের সন্ধ্যা পর্যন্ত আরাফার ময়দানে অবস্থান করা। সেই হজ্বে রাসূলে কারীম ﷺ-এর সাথে লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরাম অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য করে আল্লাহর রাসূল আরাফার ময়দানে অবস্থানকালে, জাবালে রহমতের পাদদেশে রাসূলের বাহনের পিঠে আরোহিত অবস্থায় আসরের সময় এক মহামূল্যবান ভাষণ দিয়েছিলেন। এটাকেই রাসূলের বিদায় হজ্বের ভাষণ বলা হয়।

রিসালাতের মহান দায়িত্ব ও রাসূল ﷺ এর ঘোষণা:

ভাষণের এক পর্যায়ে রাসূল সমবেত সাহাবাদেরকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ​‘هَلْ بَلَّغْتُ؟’ আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?

সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিয়েছিলেন, ‘بَلَى’ হ্যাঁ, পৌঁছে দিয়েছেন।

তখন রাসূল ﷺ আল্লাহ তা‘আলাকে তিনবার সাক্ষী করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ তা‘আলা, তুমি সাক্ষী থেকো, আমি পৌঁছে দিয়েছি।’

এখন প্রশ্ন থেকে যায়, কী পৌঁছে দিয়েছেন? কেন একবার সাহাবাদেরই জিজ্ঞেস করে সাক্ষ্য নিলেন, আবার কেন তিনবার আল্লাহ তা‘আলাকেই সাক্ষী করলেন? বিষয়টা কী, কী পৌঁছে দিয়েছেন? এমর্মে ইতিপূর্বে রাসূলের কাছে এক আয়াত নাযিল করে আল্লাহ তা‘আলা বলেছিলেন, ​‘يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ’— হে রাসূলে কারীম ﷺ, আপনি পৌঁছে দিন। কী পৌঁছে দিবেন? যা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়।

সমস্ত নবী-রাসূলগণেরই দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত বার্তাগুলি বান্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ​‘بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ’— আপনার রবের পক্ষ থেকে যা কিছু নাযিল করা হয়, সবগুলি পৌঁছে দিন। মাদরাসার ছাত্র ভাইদের বলার প্রয়োজনীয়তা বাকি থাকে না যে, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে যে ওহী নবীর কাছে নাযিল হয়, এই ওহী দুই প্রকার। একটা ওহীয়ে মাতলু, আরেকটা ওহীয়ে গায়রে মাতলু। ওহীয়ে মাতলুকে কুরআন বলা হয়, আর ওহীয়ে গায়রে মাতলুকে হাদীস বলা হয়। সারমর্ম দাঁড়ালো— কুরআন-হাদীসের সব কথা বান্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাসূলের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,‘وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ’ একটি কথাও যদি পৌঁছাবার বাকি থাকে, তাহলে আপনার রিসালাতের দায়িত্ব ত্রুটিপূর্ণ হবে। দায়িত্ব অসম্পন্ন থেকে যাবে।

অত্যন্ত সতর্কতার নির্দেশ যে, আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে যা কিছু নাযিল হয় সবগুলি পৌঁছে দিন। কোনো কিছু পৌঁছাবার বাকি থাকলে আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত দায়িত্ব সম্পন্ন হবে না। এজন্য বিদায় হজ্বের ভাষণের দিনে রাসূল প্রথমে সাহাবাদের বলেছিলেন, আমি কি সব পৌঁছে দিয়েছি?” কী পৌঁছে দিয়েছেন? কুরআন-হাদীসের সব কথা। সাহাবায়ে কেরাম স্বীকার করলেন। তখন রাসূল আল্লাহ তা‘আলাকে তিনবার সাক্ষী করে বললেন, ‘আপনি সাক্ষী থাকুন, আপনার পাঠানো সব কথা আমি বান্দাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি।’

এই ভাষণ চলাকালীন সময়ে আল্লাহ তা‘আলা আয়াত নাযিল করে বলেন, ​‘الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ’— আজকে আমি তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। এখানে আল্লাহ তা‘আলা দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন রাসূলের কথা পৌঁছানো সম্পন্ন হওয়ার কারণে। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে যা কিছু নাযিল হয়েছিল, সবগুলি রাসূল পৌঁছে দিয়েছেন, এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা দিয়েছেন, আমি আমার দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

একটা কথা এখানে ওয়াযাহাতের জন্য উল্লেখযোগ্য, সেটা হলো— ইসলামের বিধান সংক্রান্ত যা কিছু নাযিল করার, এই ভাষণ পর্যন্তই আল্লাহ তা‘আলা তা নাযিল করে সমাপ্ত করে দিয়েছেন। বিদায় হজ্বের ভাষণের পরবর্তী দিনগুলিতে আর যে কয়েকদিন রাসূল দুনিয়াতে ছিলেন, এর ভেতরে বিধান সংক্রান্ত কোনো আয়াত নাযিল হয়নি। নসীহতের দুই-একটা আয়াত নাযিল হয়েছে মাত্র। এজন্য এখানে ​‘أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ’ এর মধ্যে ‘দ্বীন’ শব্দের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরীনে কেরাম লিখেছেন, ‘আহকামে ইসলাম’ অর্থাৎ ইসলামের বিধি-বিধান ইতিপূর্বেই পরিপূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে।

রাসূলে কারীম ﷺ দাবি করলেন, আমি আল্লাহ তা‘আলার নাযিল কৃত সব কথা পৌঁছে দিয়েছি। এর উপর সাহাবায়ে কেরাম সাক্ষ্য দিলেন— হ্যাঁ, আপনি সব কথা পৌঁছে দিয়েছেন। এর মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার সত্যায়ন হলো— ‘أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ’, এই সব কথা পৌঁছানোর কারণেই তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। তাহলে এখানে তিনটি কথা হলো— রিসালাতের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করার দাবি করলেন রাসূল, সাক্ষী দিলেন সাহাবায়ে কেরাম এবং সত্যায়ন করলেন আল্লাহ তা‘আলা।

এই তিন কথা বুঝলে তাফহীমুল কুরআনের একটা গুমরাহী বুঝা সম্ভব হবে। এই কথাগুলো না বুঝলে তাফহীমুল কুরআনের গুমরাহী বুঝা সম্ভব হবে না।

‘তাফহীমুল কুরআন’ এর বিভ্রান্তি:

তাফহীমুল কুরআনের লেখককে অনেকে মাওলানা মওদুদী সাহেব বলেন। কাউকে মাওলানা বলতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমাদের ভারত, বাংলা, পাকিস্তান— এই উপমহাদেশের দেশগুলিতে যথারীতি কমপক্ষে দাওরায়ে হাদীস অথবা কামিল ক্লাস পর্যন্ত লেখাপড়া করে যারা পাশ করেন, তাদেরকেই মাওলানা বলা হয়। দাওরা বা কামিল পাশ করার আগে কেউ কাউকে মাওলানা বলে না। মওদুদী সাহেব কামিল পাশও না, দাওরা পাশও না, বিএ পাশও না। এই সমস্ত কোনো ডিগ্রির লেখাপড়ায় তিনি পাশ নন। এজন্য যারা তাকে মাওলানা বলেন আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু আমার মাওলানা বলতে আপত্তি আছে। তিনি কোন হিসাবে মাওলানা? এজন্য আমি মাওলানা মওদুদী সাহেব বলি না, আমি বলি জনাব সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী সাহেব।

জনাব সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী সাহেব তার ‘তাফহীমুল কুরআন’ তাফসীরের নামে লিখেছেন। এই তাফহীমুল কুরআন হলো তার লিখিত এবং তার দলের কাছে স্বীকৃত একটা তাফসীরের কিতাব। এই কিতাবের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘আমি পূর্ববর্তী মুফাসসিরগণের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করিনি, পরবর্তী মুফাসসিরগণের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করিনি। আমি কুরআন নিজে নিজে পড়ে মনে মনে যা বুঝেছি, তাই তাফহীমুল কুরআনে লিখেছি।‘

তিনি নিজে নিজে পড়েন আর মনে মনে বুঝেন। এর নাম হলো তাফহীমুল কুরআন। মাদরাসার তাফসীরের ক্লাসের ছাত্রদেরকে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কুরআন নিজে নিজে পড়ে আর মনে মনে বুঝে করা তাফসীরটা কেমন? এটা মনগড়া। আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ‘আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন‘ নামক কিতাবে লিখেছেন, মনগড়া তাফসীর পাঁচ প্রকার। এর মধ্যে এক প্রকার হলো, যে কোনো উস্তাদের কাছে তাফসীর শেখে না, নিজে নিজেই তাফসীর করে। সুতরাং তাফহীমুল কুরআনের ভূমিকার বিবরণ অনুযায়ী এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণটাই মনগড়া তাফসীর।

তিনি কোনো উস্তাদের কাছে তাফসীর শিখেননি, তিনি নিজে নিজেই তাফসীর করেছেন। তাহলে আমরা যে তাফসীর পড়ি, পড়াই, আমরা কোথায় পাই? আমি মনে করি এটা আমাদের মাদরাসার ছাত্রদের অন্তত জানা থাকা দরকার। এমর্মে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন,

‘لَا تُحَرِّكْ بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ ٭ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرْآنَهُ ٭ فَإِذَا قَرَأْنَاهُ فَاتَّبِعْ قُرْآنَهُ ٭ ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ

“হে রাসূলে কারীম ﷺ, আমি যখন আপনার কাছে কুরআন নাযিল করতে থাকি, তাৎক্ষণিকভাবে আপনি তাড়াহুড়ো করে তা জপতে থাকবেন না। আপনার কুরআন জপে মুখস্ত করতে হবে না। আমি আল্লাহ নিজ দায়িত্বে আপনার কাছে কুরআন নাযিল করি, নিজ দায়িত্বেই আপনাকে কুরআন স্মরণ করিয়ে দেব।” তাই নাযিল করার সময় জপাজপি না করে শুধু গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করবেন। এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ثُمَّ إِنَّ عَلَيْنَا بَيَانَهُ’— অতঃপর এই কুরআনের ব্যাখ্যা আপনাকে শিক্ষা দেওয়া আমি আল্লাহর দায়িত্ব।

এই কুরআনের ব্যাখ্যা রাসূলকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলার। আয়াতটা বুঝে থাকলে বলুন তো, রাসূল কি কুরআন নিজে নিজেই বুঝেছিলেন না কোনো উস্তাদের কাছে শিখেছিলেন? তার উস্তাদ হলেন আল্লাহ তা‘আলা। আল্লাহর কাছ থেকে রাসূল কুরআনের তাফসীর শিখেছেন এবং সাহাবাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। সাহাবাগণ রাসূলের কাছ থেকে শিখেছেন, তাবেঈনকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাবেঈন সাহাবাদের কাছ থেকে শিখে তাবে-তাবেঈনকে শিক্ষা দিয়েছেন। তাবে-তাবেঈন পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়েছেন। এভাবে শিক্ষকরা তাদের ছাত্রদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের তাফসীর শিক্ষাদান করে যাবেন।

কুরআন শিক্ষার এই ধারাবাহিকতা, এই সিলসিলা বুঝে থাকলে এবার বলুন, কুরআন নিজে নিজে পড়ে মনে মনে বুঝার কোনো অবকাশ আছে? না। অথচ এই তাফহীমুল কুরআনে জনাব সৈয়দ আবুল আলা মওদুদী সাহেব এর ভূমিকাতেই লিখেছেন, ‘কুরআন নিজে নিজে পড়ে আমি মনে মনে যা বুঝেছি, তাফহীমুল কুরআনে হুবহু তাই লিখে দিয়েছি।‘ তাহলে তাফহীমুল কুরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত “তাফসীরুল কুরআন” বলতে কিছু আছে, না শুধুমাত্র কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা আছে? পুরোটাই মনগড়া তাফসীর। তিনি কোনো উস্তাদের কাছে তাফসীর শিখেননি, তিনি নিজে নিজেই তাফসীর করেছেন।

তাহলে আমরা যে তাফসীর পড়ি বা পড়াই, আমরা তা পাই কোথায়? আমি মনে করি আমাদের অন্তত মাদরাসার ছাত্রদের এটি জানা থাকা দরকার। এবার একটি মনগড়া ব্যাখ্যা শুনুন..."

রিসালাতের যিম্মাদারী ও রাসূল ﷺ কে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর অপচেষ্টা:

“রাসূল বলেন, আমি আল্লাহ তা‘আলার নাযিল কৃত সব কথা বান্দাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। সাহাবায়ে কেরাম দিলেন সাক্ষী, কী বলে? ‘বালা’। ‘বাল্লাগতু’ বলে রাসূল করলেন দাবি, সাহাবাগণ ‘বালা’ বলে দিলেন সাক্ষী, আল্লাহ তা‘আলা ‘আকমালতু’ বলে করলেন সত্যায়ন। এই তিন কথা অন্তত আপাতত মনে রাখি সামনের কথাগুলি বুঝার জন্য।

‘بَلَّغْتُ’ শব্দের দ্বারা রাসূল দাবি করলেন আল্লাহ তা‘আলার সব কথা রাসূল পৌঁছে দিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম সাক্ষী দিলেন কোন শব্দের দ্বারা? ‘بَلَى’ । আল্লাহ তা‘আলা সত্যায়ন করলেন কোন শব্দের দ্বারা? ‘أَكْمَلْتُ’। রাসূল দাবিদার, সাহাবাগণ সাক্ষী, আল্লাহ তা‘আলা সত্যায়নকারী। এইটুকু বুঝার পরে, এবার মওদুদী সাহেবের মনগড়া তাফসীরে কী লেখা আছে দেখুন।

মওদুদী সাহেবের লিখিত ‘তাফহীমুল কুরআন’-এর সূরায়ে নাসরের চতুর্থ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তিনি লেখেন,

‘یعنی اپنے رب سے دعا مانگو کہ جو خدمت اس نے تمہارے سپرد کی تھی، اس کو انجام دینے میں تم سے جو بھول چوک یا کوتاہی بھی ہوئی ہو، اس سے چشم پوشی اور درگزر فرمائے۔’

আল্লাহ তা‘আলা রাসূলকে যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই দায়িত্ব পালনে ভুলত্রুটি এবং অসম্পূর্ণতা যা কিছু হয়েছিল এর জন্য আপনি আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।

ওই যে সূরায়ে নাসরের শেষের দিকে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ’। এই ‘ওয়াসতাগফিরহু‘-এর মর্ম তিনি লেখেন, ইস্তেগফারের অর্থ হলো মাফ চাওয়া। ইস্তেগফার শব্দের শাব্দিক অর্থ হলো মাফ চাওয়া। আল্লাহ তা‘আলা রাসূলকে মাফ চাইতে বলেছেন। কিসের মাফ? এখানে শব্দে উল্লেখ নাই। কিন্তু কিসের মাফ, এটা ওয়াজাহাত করতে গিয়ে মওদুদী সাহেব বলেন, আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত দায়িত্ব পালনে যত ত্রুটি হয়েছে সেগুলির মাফ। আল্লাহ তা‘আলা শুধু বলেছিলেন মাফ চান, তিনি বলেন রিসালাতের দায়িত্ব পালনে যত ত্রুটি হয়েছে সেগুলির মাফ চান। আল্লাহ তা‘আলা মাফ চান কেন বললেন সেই প্রশ্ন ভিন্ন। কিন্তু রিসালাতের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি হয়েছে, এটা কি বিদায় হজ্বের ভাষণের ঘটনার দ্বারা প্রমাণিত? বিন্দুমাত্র ত্রুটি হয়নি। রাসূল রিসালাতের দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র ত্রুটি করেননি। কাজেই এখানে রিসালাতের দায়িত্ব পালনে ত্রুটিকারী বলে রাসূলকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল এই মওদুদী সাহেব।

বাকি রইল মাদরাসার ছাত্রদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা কিসের মাফ চাওয়ার কথা বললেন? এটা আমি পরে বলব। এর আগে আমি মাদরাসার ছাত্রদেরকে বলব, আপনারা ইস্তেঞ্জাখানা থেকে বের হয়ে কোন দু‘আ পড়েন? দু‘আর প্রথম শব্দটা কী? অর্থ কী? প্রস্রাব করলে গুনাহ হয়? মাফ চাইলেন কেন? পায়খানা করলে গুনাহ হয়? মাফ চাইলেন কেন? আমার প্রশ্নের যেই জবাব, তোমার প্রশ্নের সেই জবাব।

হাদীস শরীফে রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি দৈনিক সত্তর বার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ি। প্রতিদিন সত্তর বার আল্লাহ তা‘আলাকে বলি— আল্লাহ তা‘আলা মাফ চাই, মাফ চাই, মাফ চাই। মাফ চাইলেই যদি গুনাহ অবধারিত হয়ে পড়ে, তাহলে কি রাসূল দৈনিক সত্তর বার গুনাহ করতেন? না। এই প্রশ্নের যেই জবাব, এখানে আল্লাহ তা‘আলা মাফ চাইতে বললেন কেন— ওই প্রশ্নেরও সেই জবাব। বাকি এর বেশি অতিরিক্ত তাফসীর অন্তত মাদরাসার ছাত্রগণ আপন আপন সবকে উস্তাদের কাছে বুঝে নিতে পারেন। সব ক্ষেত্রে অপরাধের বিপরীতে মাফ শব্দ ব্যবহৃত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিনয় প্রকাশের ভাষা হিসেবে মাফ শব্দ ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিনয় প্রকাশের ভাষা হিসেবে ইস্তেগফার শব্দকে ব্যবহার করা হয়। কাজেই চূড়ান্ত বিনয় প্রকাশের একটা ভাষা হলো— মাফ চাই।

এক ব্যক্তি একজনের কাছে একটু সাহায্য চাইল। বলল আমাকে একটু সাহায্য করুন। এটা কি তার কাছে তার প্রাপ্য না দয়া? কিন্তু পারলাম না বলার আগেই বলে, মাফ করবেন পারলাম না। কী গুনাহ করেছিল মাফ করবেন বলল? এইসব প্রশ্নের যেই জবাব, আল্লাহ তা‘আলা কেন রাসূলকে মাফ চাইতে বললেন— ওই প্রশ্নেরও সেই জবাব। সারমর্ম হলো মাফ চাওয়াটা শুধু গুনাহর কারণে হয় না, মাফ চাওয়াটা অনেক সময় চূড়ান্ত বিনয় প্রকাশের ভাষা হিসেবে মাফ চাওয়ার শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখানে এসে মওদুদী সাহেব করলেন কী? রাসূলকে রিসালাতের দায়িত্ব পালনে ত্রুটিকারী অপরাধী আসামি সাব্যস্ত করে দিলেন।

সুন্নিয়্যাত বনাম মওদুদীবাদ

এই পর্যন্তই মওদুদী সাহেব থেমে নেই। বরং মওদুদী মতবাদে সমস্ত নবী-রাসূলগণই পাপিষ্ঠ গুনাহগার। মওদুদীয়্যাত বা মওদুদী মতবাদ... অনেকগুলি ভ্রান্ত মতবাদের সমষ্টির নাম মওদুদীবাদ।

আমাদের মাদরাসার ছাত্রদের এই কথা ভুলে গেলে চলবে না, অনেকগুলি ভ্রান্ত মতবাদের সমষ্টির নাম মওদুদী মতবাদ। আর আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের সকল মতবাদের সমষ্টির নাম দেওবন্দিয়্যাত। দেওবন্দিয়্যাত, কওমীয়্যাত আর দেওবন্দিয়্যাত একই কথা। সমস্ত কওমী মাদারিস দেওবন্দ মাদরাসার অনুসারী, দারুল উলুম দেওবন্দের অনুসারী। সুতরাং দেওবন্দিয়্যাত বলতে যা বুঝায় কওমীয়্যাত বলতে তাই বুঝায়।

কওমীয়্যাত আর দেওবন্দিয়্যাত হলো সমস্ত আকাঈদে সুন্নিয়ার সমষ্টি। দেওবন্দিয়্যাত সমস্ত আকাঈদে সুন্নিয়ার সমষ্টি। আর মওদুদীয়্যাত হলো সমস্ত বাতিল আকীদার সমষ্টি। মওদুদীবাদে অনেকগুলি বাতিল মতবাদ আছে, সবগুলি বাতিল মতবাদের সমষ্টির নাম মওদুদীবাদ, মওদুদীয়্যাত। আর আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের যত আকীদা বিশ্বাস আছে সবগুলির সমষ্টি হলো দেওবন্দিয়্যাতের মধ্যে। সুতরাং দেওবন্দিয়্যাতের মানেই হলো সুন্নিয়্যাত, আর মওদুদীয়্যাতের মানেই হলো দালালাত। দেওবন্দিয়্যাতের সারমর্ম হলো সুন্নিয়্যাত আর মওদুদীয়্যাতের সারমর্ম হলো দালালাত। আমাদের মাদরাসার ছাত্রদের এই দুই কথা ভালোভাবে জানা থাকা দরকার।

কওমীয়্যাত বলতে কী বুঝায়? সুন্নিয়্যাত বুঝায়। দেওবন্দিয়্যাত বলতে কী বুঝায়? সুন্নিয়্যাত বুঝায়। মওদুদীয়্যাত বলতে কী বুঝায়? দালালাত বুঝায়। এক কথায় মওদুদীয়্যাতের অর্থ হলো দালালাত আর কওমীয়্যাতের এক কথায় অর্থ হলো সুন্নিয়্যাত. কাজেই সুন্নিয়্যাত আর দালালাতের পার্থক্য বুঝে নিতে হবে। তা নাহলে সুন্নিয়্যাত আর দালালাত একাকার করে ফেলবে। এই একাকার করে ফেলার অত্যন্ত সুগভীর চক্রান্ত বর্তমানে কওমী অঙ্গনে চলেছে। যেটাকে আমি আমার ভাষায় বলি, মওদুদীয়্যাতের চোর কওমীয়্যাতের ঘরে ঢুকে পড়েছে।

এবার কওমীওয়ালাদের দায়িত্ব দুইটা। এক নম্বর দায়িত্ব হলো চোর খেদাও। দুই নম্বর দায়িত্ব হলো ঘর সামলাও। চোর খেদাও ঘর সামলাও, চোর খেদাও ঘর সামলাও, চোর খেদাও ঘর সামলাও। মওদুদীয়্যাতের চোর কওমীয়্যাতের ঘরে ঢুকে পড়েছে। কীভাবে ঢুকেছে, এটার বিবরণ দেওয়ার সময় আমার হাতে এখন নাই। আর অনেক বিবরণ এমন আছে যা কৌশলগত কারণে এক্ষুনি বলা যাবে না। কীভাবে মওদুদীয়্যাতের চোর কওমীয়্যাতের ঘরে ঢুকে পড়েছে এর বিস্তারিত বিবরণ কৌশলগত কারণে অনেকটাই এখনো বলা যাবে না।

দায়িত্ব আমাদের দুইটা। কওমী অঙ্গন থেকে মওদুদীয়্যাত খেদাও। দুই কওমী অঙ্গনের ঘর সামলাও। এই দুই দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে বলি, রাসূল আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন— এটা সুন্নিয়্যাত। এটা কী? সুন্নিয়্যাত। দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছেন— সেটা মওদুদীয়্যাত। দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন এই মতবাদের নাম সুন্নিয়্যত। দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছেন এই মতবাদের নাম মওদুদীয়্যাত।

এখন যদি কওমী মাদরাসার কোনো ছাত্র তাফহীমুল কুরআন পড়ে? কওমী মাদরাসার কোনো ছাত্র যদি কুরআনের আয়াত দ্বারা নবীকে গুনাহগার সাজাবার জন্য দলিল দেয়, তাহলে কি প্রমাণ হবে না চোর যে ঘরে ঢুকছে? আপাতত একটা বললাম কীভাবে ঢুকল। এজন্য এই নবীগণ অপরাধী না নিরপরাধ? নবীগণ গুনাহগার না বে-গুনাহ এই ব্যাপারেও সুন্নিয়্যাতে আর মওদুদীয়্যাতে বিরোধ আছে। সুন্নিয়্যাত হলো সমস্ত নবী-রাসূলগণ আজীবন বে-গুনাহ। মওদুদীয়্যাত হলো সমস্ত নবী গুনাহগার। মওদুদী সাহেব লেখেন, আল্লাহ তা‘আলা নবীগণের মাথার উপর থেকে নিষ্পাপত্বের পর্দা সরিয়ে নিয়ে কিছু পদস্খলন ঘটতে দেন, যেন মানুষ মনে করে তিনিও মানুষ, তিনি খোদা নন।

পদস্খলনের ব্যাখ্যা আমি পরে করতে যাই, আগে বলি যেই পদস্খলন নিষ্পাপত্বের পর্দার নিচে থেকে হয় না। যেই পদস্খলন নিষ্পাপত্বের পর্দার বাইরে গিয়ে হয়। এই পদস্খলনের দ্বারা কি মাসুমিয়্যাত থাকে না মাসুমিয়্যাত বাতিল হয়? বাতিল হয়। নিষ্পাপত্বের পর্দার বাইরে গিয়ে তাদের যত পদস্খলন ঘটে, এগুলোর দ্বারা তারা আর বে-গুনাহ থাকেন না, তারা গুনাহগার সাব্যস্ত হয়ে যান। এই ঘোষণার মাধ্যমে মওদুদী সাহেব সমস্ত নবীগণকে গুনাহগার সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। তাহলে নবীগণ গুনাহগার— এই একটা মতবাদ। এটা কি সুন্নিয়্যাত না মওদুদীয়্যাত? “মওদুদীয়্যাত”।

কওমীরা সুন্নিয়্যাত গ্রহণ করবে না মওদুদীয়্যাত গ্রহণ করবে, সেই বিবেককে জাগ্রত করার জন্যই বিষয়টা আমি আরও একটু পরিষ্কারভাবে আলোচনা করতে চাই।

নবীগণ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা পাক রাব্বুল আলামিন কুরআনে একটা সার্বজনীন মূলনীতির ঘোষণা দিয়েছেন। সেটা হলো আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ​‘لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ’। এর অর্থ হলো গুনাহগারদেরকে আমি নবুয়তের পদ দান করি না। গুনাহগারদেরকে নবী বানান না। এটা কি এক-দুইজন নবীর বেলায় স্বতন্ত্র ব্যাপার না সকল নবীর বেলায় সার্বজনীন? সকল নবীর বেলায় সার্বজনীন।

সুতরাং সমস্ত নবীদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে একটা সার্বজনীন মূলনীতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে— ​‘لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ’, গুনাহগারদেরকে আমি নবী বানাই না। এখন যদি কোনো নবীর জীবনের কোনো ঘটনাকে অপব্যাখ্যা করে গুনাহগার সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে আল্লাহ তা‘আলার সার্বজনীন মূলনীতি বহাল থাকে না লঙ্ঘন হয়? লঙ্ঘন হয়। সুতরাং যত নবীর ব্যাপারে যত ব্যাখ্যার দ্বারা নবীর ইসমত বাকি থাকে না, সবগুলি তাফহীমুল কুরআনের অপব্যাখ্যা।

যত নবীর জীবনের যত ঘটনার বিশ্লেষণের দ্বারা কোনো নবীর ইসমত বাকি থাকে না, সবগুলি তাফহীমুল কুরআনের অপব্যাখ্যা। এই অপব্যাখ্যার একটা অংশ হলো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়তের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছিলেন। নবী বলেন আমি ত্রুটি করিনি, সাহাবা বলেন করেননি, আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা দিলেন করেননি বলেই আমি আমার দ্বীনকে/ইসলামের বিধি-বিধানকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। মওদুদী সাহেব বলেন, করেন। আমার কথা যারা শুনেছেন, বুঝেছেন, তারা একটু বলুন, সুন্নিয়্যাত বলেন, দেওবন্দিয়্যাত বলেন, কওমীয়্যাত বলেন— একই কথা। একই মতবাদের তিন নাম। দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগের নাম সুন্নিয়্যাত, দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরের নাম দেওবন্দিয়্যাত, দেওবন্দের অনুসরণে লক্ষ লক্ষ কওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরের নাম কওমীয়্যাত।

একই মতবাদের তিন নাম। এই সুন্নিয়্যাত বলেন, দেওবন্দিয়্যাত বলেন, কওমীয়্যাত বলেন— এই মতবাদে সকল নবী গুনাহগার না সকল নবী নিষ্পাপ? নিষ্পাপ। এটা হলো সুন্নিয়্যাত, এটা হলো দেওবন্দিয়্যাত, এটা হলো কওমীয়্যাত। পক্ষান্তরে মওদুদী সাহেবের মতবাদ হলো সকল নবী গুনাহগার। তাহলে দেওবন্দিয়্যাতে আর মওদুদীয়্যাতে কোনো বেশকম নাই? না আকাশ-পাতাল বেশকম? দেওবন্দিয়্যাতের মতবাদে সকল নবী বে-গুনাহ, মওদুদীয়্যাতের মতবাদে সকল নবী গুনাহগার। এই গুনাহ বা অপরাধের একটা অংশ হলো— মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছেন।

নবীগণের গুনাহর ব্যাপারে আরও অনেক কথা আমার বলতে হবে আপনাদের, এটা ইনশাআল্লাহ পরে বলব। এর আগে একটা বিষয়ের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। যেহেতু মওদুদী সাহেবের অপব্যাখ্যামতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছেন, এর মানে আল্লাহ তা‘আলার সব কথা পৌঁছে দিয়েছেন? না অনেক কথা পৌঁছাবার বাকি? মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তা‘আলার সব কথা আমাদের কাছে পৌঁছাননি, অনেক কথাই পৌঁছাবার বাকি রেখেছেন বলেই নবুয়তের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি হয়েছে। এই কথার দ্বারা ইসলামের সমস্ত বিধি-বিধানকে সন্দেহযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এই কথার দ্বারা ইসলামের কতগুলি বিধান নিশ্চিত রাখা হয়েছে না সকল বিধান সন্দেহযুক্ত হয়ে গেল? কীভাবে? হয়তো আল্লাহ তা‘আলা বলেছিলেন যে, আপনি আমার বান্দাদের কাছে পৌঁছে দিন, لا إله إلا الله ومحمد""

“আল্লাহ তা‘আলা এবং মুহাম্মাদ ছাড়া কোন মাবুদ নাই, হয়তো আল্লাহ তা‘আলা এমনটা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি এমনটা না বলে বলে দিলেন, ‘لا إله إلا الله محمد رسول الله’ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ)। আল্লাহ তা‘আলা যেমনটা বলেছিলেন রাসূল তেমনটা বলেননি, এটা মেনে নিলে কালিমাটাও আল্লাহ তা‘আলা যেমনটা শিক্ষা দিয়েছিলেন রাসূল তো তেমনটা আমাদেরকে বলেননি, তাই কালিমাও সন্দেহযুক্ত হয়ে গেল। যদি রাসূল আল্লাহ তা‘আলার নাযিল কৃত সব কথা পৌঁছাবার দায়িত্ব পালন না করে থাকেন, তবে সম্ভাবনা আছে যে, কালিমাটা এভাবে ছিল না, সেভাবে ছিল। রাসূল সেভাবে না পৌঁছিয়ে এভাবে পৌঁছালেন। আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে নবীকে শিক্ষা দিয়েছিলেন সেই কালিমায় উল্লেখ ছিল, আল্লাহ তা‘আলা এবং মুহাম্মাদ ছাড়া তোমাদের কোন মা‘বুদ নাই; কিন্তু তিনি নিজের নামটা বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহ তা‘আলার নামটা পৌঁছে দিয়েছেন— এমন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয় কিনা? আর এই সম্ভাবনার দ্বারা আমাদের ঈমানটাই ধ্বংস হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, পাঁচ ওয়াক্তের নামায। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের দ্বারা পাঁচ ওয়াক্তের নামায ফরয সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। হাদীসেও আল্লাহ তা‘আলার রাসূল পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন, এই পাঁচ ওয়াক্তের নামায ফরয। কিন্তু যেহেতু রাসূল আল্লাহ তা‘আলার সব কথা পৌঁছাননি, কিছু কথা পৌঁছাবার বাকি রেখেছেন তাই সম্ভাবনা আছে, হয়তো আল্লাহ তা‘আলা বলেছিলেন, কেউ যদি না পড়ে, তাহলে কোন আপত্তি নাই; আর এই কথাটা রাসূল পৌঁছাতে বাকি রেখেছেন। মওদুদীর কথার দ্বারা এই সম্ভাবনাই দাঁড়ায় যে, এই কথাটা রাসূল পৌঁছাতে বাকি রেখেছেন। পাঁচ বেলার নামায ফরয— এই কথাটা নবী পৌঁছিয়েছেন, কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা যে বলেছিলেন কেউ না পড়লে কোন অপরাধ হবে না, ওই কথাটা তিনি পৌঁছাতে বাকি রেখেছেন। তাহলে পাঁচ বেলার নামাজের ফরযিয়তের আর কোন নিশ্চয়তা বাকি থাকে?

রমজান মাসের রোযা ফরয— আল্লাহ তা‘আলা বলেছিলেন, নবী পৌঁছে দিয়েছেন। কিন্তু হয়তোবা আল্লাহ তা‘আলা শেষ পর্যন্ত বলে দিয়েছিলেন, রমজান মাসের রোযা কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে না রাখে, তাহলে তার কোন শাস্তি হবে না। ঐ কথাটা রাসূল পৌঁছাতে বাকি রেখেছেন। এমন সন্দেহ জাগে কিনা? কোন কথার দ্বারা? যে, আল্লাহ তা‘আলার নাযিল করা সব কথা তিনি পৌঁছাননি। এর দ্বারা ইসলামের সমস্ত বিধি-বিধানের ব্যাপারে একটা সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে যায়। গোটা ইসলামী বিধানের ভিত্তিটাই ভিত্তিহীন ও নড়বড়ে হয়ে যায়। সুদ, ঘুষ, চুরি, ডাকাতি, জিনা, ব্যভিচার, রাহাজানি, খুনখারাবি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জালিয়াতি— সবগুলিকে হারাম ঘোষণা দেওয়ার পর, হয়তো আল্লাহ তা‘আলা বলেছিলেন, কেউ যদি এসকল হারাম কাজ করেই ফেলে, আমি তাকে কোন শাস্তি দেবো না। কথাটা রাসূল পৌঁছাতে বাকি রেখেছেন। এমন সম্ভাবনা দাঁড়ায় কিনা? এর দ্বারা সমস্ত হারাম কাজ হালাল হওয়ার এবং সমস্ত ফরয কাজ ফরয না থাকার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।

শরীয়ত নিয়ে তামাশা ও শয়তানির ঐতিহাসিক সূত্রপাত:

আল্লাহ তা‘আলার দ্বীন নিয়ে এমন তামাশার সৃষ্টি করা আমার কল্পিত কথা নয়, বরং ইতিহাসের দ্বারা প্রমাণিত। ইতিহাসটা হলো, ইহুদীরা হযরত মূসা আলাইহিস সালামকে বলেছিল, ‘لَن نُّؤْمِنَ لَكَ حَتَّى نَرَى اللَّهَ جَهْرَةً‘ (আমরা আপনার প্রতি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনব না, যতক্ষণ না আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে প্রকাশ্যে দেখতে পাই)। অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত চাক্ষুষভাবে আপনি আল্লাহ তা‘আলাকে দেখাতে না পারবেন। তখন মূসা নবী বললেন, তোমরা কে কে আল্লাহ তা‘আলা দেখতে চাও, আমার সাথে তুর পাহাড়ে চলো। তারা তাদের মধ্য থেকে বাছাই করে ৭০ জন সর্দার মূসা আলাইহিস সালামের সাথে দিয়ে বলল, এদেরকে তূর পাহাড়ে নিয়ে আল্লাহ তা‘আলা দেখাতে পারো, আর তারা ফিরে এসে যদি সাক্ষী দেয়, তাহলে তাদের সাক্ষীর দ্বারাই আমরা বিশ্বাস করে তোমার উপর ঈমান আনবো।

৭০ জন সর্দারকে নিয়ে মূসা নবী তূর পাহাড়ে গেলেন। আল্লাহ তা‘আলাকে দেখা তো দুনিয়ার জীবনে সম্ভব নয়, তারা আল্লাহ তা‘আলার নূরের ঝলক দেখেছিল। আর এই ঝলক দেখেই ৭০ জনের ৭০ জনই মৃত্যুবরণ করেছিল। মূসা আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন, ‘হে আল্লাহ তা‘আলা! এরা দেশে গিয়ে সাক্ষী দেওয়ার কথা। এরা যে মরে গেল, আমি সাক্ষী দেবো তো দূরের কথা, এদের মরণেরই তো কারণ দর্শাতে পারবো না, আমি তো জাতির কাছে আসামি হয়ে যাবো। দয়া করে এদেরকে জিন্দা করে দিন, যেন গিয়ে সাক্ষীটা দিতে পারে। ‘নবীর দু‘আ কবুল করে আল্লাহ তা‘আলা ৭০ জন ইহুদী মুর্দা সর্দারকে জিন্দা করে দিলেন। দেশে গিয়ে তারা সাক্ষী দিল, ‘আল্লাহ তা‘আলাকে দেখা তো দূরের কথা, আল্লাহ তা‘আলার নূরের ঝলক দেখেই দুনিয়ার কোনো মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলার নূরের ঝলক দেখেই আমরা মরে গিয়েছিলাম। সুতরাং মূসা নবী যেই আল্লাহ তা‘আলার দাওয়াত দেন, সেই দাওয়াত সত্য। তবে ফেরার সময় আল্লাহ তা‘আলা বলে দিয়েছিলেন, এই নবীকে তোমরা না মানলেও চলবে!’

বলেন তো, এরকম ইতরামির ইতিহাস কি আমার কল্পিত, না অতীতের ইতিহাস দ্বারাই প্রমাণিত? যেই রকমের ইতরামিটা বনী ইসরাঈল মূসা নবীর শরীয়ত নিয়ে করেছিল, সেই রকমের ইতরামি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর ইসলাম ধর্ম নিয়েও যেন করতে পারে, এই শয়তানির দরজাটাই খুলে দেওয়া হয়েছে— ‘নবী নবুয়তের দায়িত্ব পালনে ত্রুটি করেছিলেন’ এই উক্তির মাধ্যমে।

নবীগণের নিষ্পাপত্ব ও কুরআনের বাহ্যিক স্ববিরোধিতার নিরসন:

এবার আমরা বুঝার চেষ্টা করবো, নবীগণ কি পরিমান গুনাহগার। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ‘ (গুনাহগারদের আমি নবী বানাই না)। এটা সমস্ত নবীদের বেলায় আল্লাহ তা‘আলার একটি সার্বজনীন মূলনীতি। এমতাবস্থায় মওদুদীবাদীদের পক্ষ থেকে এই আয়াতের বিরুদ্ধে দুই ধরণের আপত্তি উত্থাপন করা হয়। এক ধরণের আপত্তি হলো, আদম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে একটি গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু তিনি সেই নিষেধ লঙ্ঘন করে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন। এভাবে বিভিন্ন নবীর জীবনের বিভিন্ন বিক্ষিপ্ত ঘটনাকে উল্লেখ করে তারা প্রমাণ করতে চায় যে, এই ঘটনার কারণে এই নবী গুনাহগার, ঐ ঘটনার কারণে ঐ নবী গুনাহগার।

আরেকটা পদ্ধতি হলো, কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন নবীর নামের সাথে গুনাহ অর্থবোধক শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন আদমের নামে ‘عَصَى‘ শব্দ ব্যবহার করেছেন। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যাপারে ‘مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ‘ শব্দ উল্লেখ করেছেন। তারা বলে, নবী গুনাহগার না হলে আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে কেন অমুক নবীকে বা তমুক নবীকে গুনাহগার বললেন? এইগুলিকেও তারা ওই সার্বজনীন মূলনীতির বিরুদ্ধে দাঁড় করায়।

এখান থেকেই সুন্নিয়্যাত আর মওদুদীয়্যাতের সংঘাত সৃষ্টি হয়। সুন্নিয়্যাতের ভিত্তি হলো ‘لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ‘, আর মওদুদীয়্যাতের ভিত্তি হলো ‘مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ‘। এই ব্যাপারে আমি মাদরাসার ছাত্র ভাইদের সামনে যেই ওয়াযাহাতটা তুলে ধরতে চাই, সেটা হলো, কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ‘وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا‘ (কুরআন যদি আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে নাযিল হতো, তাহলে কুরআনে অনেক স্ববিরোধিতা পাওয়া যেত)। যেহেতু কুরআন আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে নাযিল কৃত, তাই এতে কোনো স্ববিরোধিতা নাই।

আমি উলামায়ে কেরাম ও ছাত্র ভাইদের কাছে জিজ্ঞাসা করবো, আপনাদের ঈমান-আকীদামতে কুরআনে কোনো স্ববিরোধিতা আছে? না। কার কথায় স্ববিরোধিতা হয়? যার আগের কথা মনে থাকে না। অনেকদিন আগে কোন কথা বলেছিল তা ভুলে গিয়ে পরবর্তীতে এর বিপরীত একটা কথা বলে দিলো— এমন লোকের কথার মধ্যেই স্ববিরোধিতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা কি লক্ষ কোটি বছর আগে কোন কথা বলে পরে ভুলে গিয়ে বিপরীত কথা বলতে পারেন? না। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কুরআনে কোন স্ববিরোধিতা নাই।

কুরআনে যদি কোন স্ববিরোধিতা না থাকে, তাহলে এক আয়াতে বললেন ‘গুনাহগারকে নবী বানাই না‘, আবার আরেক আয়াতে বললেন ‘আপনার গুনাহ মাফ করে দিলাম।‘ আল্লাহ তা‘আলা যদি গুনাহগারকে নবী না-ই বানান, তাহলে উনার গুনাহ আসলো কোথা থেকে? প্রশ্নটা তখন দাঁড়ায়। এর একটা সমাধান তো লাগবে। কুরআনের কোন দুই আয়াতের মধ্যে যদি আমাদের স্থূল বা বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোন স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত হয়, তাহলে তার সমাধানের জন্য সালাফে সালেহীনের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হয়।

সালাফে সালেহীন হলেন সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন। তাবে-তাবেয়ীন তাবেয়ীনের কাছে কুরআন শিখেছেন, তাবেয়ীন সাহাবাদের কাছে শিখেছেন, সাহাবাগণ রাসূলের কাছে শিখেছেন, আর রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তা‘আলার কাছে কুরআন শিখেছেন। ১৪০০ বছর পরে এসে আমাদের দৃষ্টিতে দুই আয়াতের মধ্যে বাহ্যিক স্ববিরোধিতা দেখা দিলে সমাধান কি আমরা নিজে নিজে করবো, না পূর্ববর্তীদের অনুসরণে যাবো? এই পূর্ববর্তী অনুসরণীয় তিন দল হলেন সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে-তাবেয়ীন। হাদীস শরীফে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘خَيْرُ الْقُرُونِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ‘ (আমার যুগের মুসলমান সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলমান— অর্থাৎ সাহাবায়ে কেরাম। দ্বিতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ মুসলমান তাবেয়ীন এবং তৃতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ মুসলমান তাবে-তাবেয়ীন)। সুতরাং এই বাহ্যিক স্ববিরোধিতার সমাধান তাদের কাছ থেকেই নিতে হবে।

শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ বুঝার গুরুত্ব

এবার আমরা একটু খুঁজে দেখবো সেখানে কী সমাধান পেলাম। বিভিন্ন শব্দ এমন আছে, যেগুলোর একটা মূল বা আভিধানিক অর্থ থাকে, আবার আরেকটা রূপক অর্থ থাকে। এই বিষয়টা বুঝলে সালাফে সালেহীন থেকে আমরা কী সমাধান পেলাম তা বুঝা সহজ হবে। অভিধানে একটি শব্দের যে অর্থ লেখা থাকে, তা হলো আভিধানিক অর্থ। কিন্তু ওই শব্দটাকেই যদি কোন দল, সম্প্রদায় বা শাস্ত্রবিদ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করতে থাকে এবং তা সমাজে চালু হয়ে যায়, তবে তাকে রূপক বা পারিভাষিক অর্থ বলে।

এর একটা উদাহরণ দিই। ‘نُور‘ (নূর) শব্দের মূল বা আভিধানিক অর্থ হলো আলো (যেমন বাতির আলো, দিনের আলো, চন্দ্র বা সূর্যের আলো)। কিন্তু ইসলামের পরিভাষায় ‘নূর‘ অর্থ আলো নয়, বরং ‘হেদায়েত’। মাদরাসার ছাত্র ভাইয়েরা ভালোভাবে স্মরণ রাখুন, নূর শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো আলো, আর শরীয়তের পরিভাষায় নূর অর্থ আলো নয়, হেদায়েত। উভয় অর্থেই আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে নূর শব্দ ব্যবহার করেছেন।

এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘أَلَمْ تَرَوْا كَيْفَ خَلَقَ اللَّهُ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ طِبَاقًا * وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا وَجَعَلَ الشَّمْسَ سِرَاجًا‘

(তোমরা কি গবেষণার মন নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পারো না, আল্লাহ তা‘আলা কেমনভাবে স্তরে স্তরে সাতটি আসমান সৃষ্টি করে নিম্নতম মহাশূন্যে সূর্যকে বাতিস্বরূপ আর চন্দ্রকে আলোস্বরূপ স্থাপন করেছেন?)। এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা চন্দ্রকে ‘নূর‘ বা আলো বলেছেন আভিধানিক অর্থে। এখানে যদি আপনি পারিভাষিক অর্থ (হেদায়েত) গ্রহণ করেন, তাহলে ঈমান থাকবে না। আপনি যদি বলেন, চন্দ্রকে যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা নূর বলেছেন, সুতরাং চন্দ্রই হেদায়েতের মালিক..."

চন্দ্রকে যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা নূর বলেছেন, তাই চন্দ্রই হেদায়েতের মালিক। এখানে আভিধানিক অর্থের ক্ষেত্রে পারিভাষিক অর্থ গণ্য করলে ঈমান থাকবে না। পক্ষান্তরে, সূরায়ে নূরের এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ’—আল্লাহ তা‘আলা আসমান ও জমিনের নূর। এখানে নূর অর্থ আলো নয়; বাতির আলো আল্লাহ তা‘আলা নয়, চন্দ্রের আলো আল্লাহ তা‘আলা নয়, সূর্যের আলো আল্লাহ তা‘আলা নয়, বরং এখানে নূর শব্দকে আল্লাহ তা‘আলা হেদায়েত অর্থে ব্যবহার করেছেন। আয়াতের মর্ম হলো আসমান-জমিনের সকলের হেদায়েতের মালিক আল্লাহ তা‘আলা। এখানে যদি আপনি নূর শব্দকে আভিধানিক অর্থে ব্যবহার করেন, ঈমান থাকবে না। এখান থেকে আমরা শিখলাম, একটা শব্দকে যে আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আভিধানিক অর্থে ব্যবহার করেন, সেখানে পারিভাষিক অর্থ ব্যবহার করা কুরআনের অপব্যাখ্যা। আর যেখানে পারিভাষিক অর্থে ব্যবহার করেছেন, সেখানে আভিধানিক অর্থ গণ্য করা কুরআনের অপব্যাখ্যা। এর আলোকে আমরা এবার নবীগণ গুনাহগার কিনা সেটা আলোচনা করবো।

এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, কোনো গুনাহগারকে নবী বানাই না। আরেক আয়াতে বলেছেন, নবী আপনার গুনাহ মাফ করে দিলাম। বাহ্যিক দৃষ্টিতে স্ববিরোধিতা দেখা যায়। সালাফে সালেহীন, সাহাবা, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন রাসূলের কাছ থেকে যে ব্যাখ্যা শিখেছিলেন, রাসূল আল্লাহর কাছ থেকে যে ব্যাখ্যা শিখেছিলেন, সেই ব্যাখ্যার আলোকে তারা সমাধান দিয়েছেন। যে আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন গুনাগারকে নবী বানাই না, সেখানে গুনাহ মূল অর্থে বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ অর্থে ব্যবহৃত। আর যে আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা অমুক নবী-তমুক নবীকে গুনাহগার বলেছেন, সেখানে গুনাহ শব্দের মূল অর্থে নয়, রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। যে আয়াতে বলেছেন কোনো গুনাগারকে নবী বানাই না, সেখানে গুনাহ মূল অর্থে ব্যবহৃত—শাস্তিযোগ্য অপরাধী যারা, এদেরকে নবী বানাই না। আর যে আয়াতে আল্লাহ অমুক নবীর অমুক গুনাহ, তমুক নবীর তমুক গুনাহ বলেছেন—তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ অর্থে নয়, সে গুনাহ শব্দের মূল অর্থে নয়, রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। সুতরাং ‘مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ’র মধ্যে ‘ذَنْبٌ’ শব্দ মূল অর্থে নয়, রূপক অর্থে ব্যবহৃত। ​‘لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ’ আয়াতে গুনাহ রূপক অর্থে নয়, মূল অর্থে ব্যবহৃত। এক আয়াতে আল্লাহ গুনাহকে মূল অর্থে ব্যবহার করেছেন, আরেক আয়াতে গুনাহকে রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। সুতরাং দুই আয়াতে কোনো স্ববিরোধিতা নাই।"

বাকি মাদরাসা ছাত্রদের মনে কৌতূহল জাগতেই পারে, বিভিন্ন নবীর নামের সাথে আল্লাহ তা‘আলা গুনাহ অর্থবোধক যে শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেখানে গুনাহ শব্দের রূপক অর্থটা কী? সেখানে গুনাহ শব্দটাকে ধমক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে; শাস্তিযোগ্য অপরাধী বলা হয়নি। এইভাবে সালাফে সালেহীন দুই আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করেছেন। এমতাবস্থায় কেউ যদি সালাফে সালেহীনের এই সামঞ্জস্যকে না মেনে এক আয়াতকে আরেক আয়াতের বিরুদ্ধেই দাঁড় করায়, সেটা মওদুদীবাদের বৈশিষ্ট্য। এদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে রাসূলে কারীম ﷺ বলেছেন, ​‘الْمِرَاءُ بِالْقُرْآنِ كُفْرٌ’ কুরআনের এক আয়াতকে আরেক আয়াতের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো একটি কুফরী মতবাদ।

সালাফে সালেহীন সমাধান দিয়েছেন, ওই আয়াতে আর এই আয়াতে কোনো বিরোধ নাই। সেই আয়াতে মূল অর্থে, আর এই আয়াতে আল্লাহ রূপক অর্থে গুনাহ শব্দ ব্যবহার করেছেন। কাজেই কোনো বিরোধ নাই। সালাফে সালেহীনের দেওয়া এই সমাধান না মেনে যারা কুরআনের এক আয়াতকে ওই আয়াতের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, ​‘الْمِرَاءُ بِالْقُرْآنِ كُفْرٌ’-এর ব্যাখ্যা হলো: কুরআনের এক আয়াতের অর্থ নিয়েছে একভাবে, আর আরেক আয়াতের সমাধান সালাফে সালেহীন যেভাবে দিয়েছেন সেভাবে না নিয়ে এই আয়াতটাকে ঐ আয়াতের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে সমাজে ঝগড়া বাধায়; এরা কুফরী কাজ করে। সুতরাং নবীগণ বে-গুনাহ—যারা তা মানে না এবং কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের দ্বারা নবীগণকে গুনাহগার সাব্যস্ত করার জন্য সমাজে যারা ঝগড়া বাধায়, এই রকম ঝগড়া বাধানোকে হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল কুফরী কাজ বলে উল্লেখ করেছেন। যেসমস্ত ভ্রান্ত মতবাদের সমষ্টির নাম মওদুদীবাদ, এর মধ্যে একটা হলো এই কুফরী মতবাদ। “এই হলো গুনাহ শব্দ সম্বলিত আয়াত সম্পর্কে তাদের উত্থাপিত অভিযোগের জবাব।”

হযরত আদম আ.-এর ঘটনা: খ্রিষ্টান মিশনারি ও মওদুদীবাদের অভিন্ন সুর

এবার, কোনো কোনো নবীর জীবনের ঘটনার অপব্যাখ্যার মাধ্যমেও তারা নবীগণকে গুনাহগার সাব্যস্ত করে। যেমন হযরত আদম (আ.)-এর জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার ব্যাপার। জান্নাতে আল্লাহ তা‘আলা আদমকে একটিমাত্র গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইবলিসের ধোঁকায় পড়ে আদম জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন। এ পর্যন্ত ঘটনা কুরআন-হাদীসে বর্ণিত আছে। মওদুদীবাদীরা বলে, ‘তাফহীমুল কুরআনে‘ লেখা আছে, জান্নাতে সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া ছিল আদমের গুনাহ। জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়াকে গুনাহ গণ্য করা সুন্নিয়তের মতবাদ তো দূরের কথা, এটি ইসলামী মতবাদই নয়; এই মতবাদটা হলো খ্রীস্টানি মতবাদ। এজন্য নবীগণকে গুনাগার সাব্যস্ত করার খ্রীস্টানি মতবাদের ইতিহাসটাও আমাদের কওমী অঙ্গনের ছাত্রদের ভালো রকম জানা থাকা দরকার।

বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য স্বাধীনতার সূচনালগ্ন থেকেই একটা খ্রীস্টান সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। সংগঠনটির নাম হলো ‘ক্রিশ্চিয়ান মিশনারি বাংলাদেশ‘। বাংলাদেশের মুসলমানদেরকে খ্রীস্টান বানাবার জন্য যে সমস্ত বইপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে একটা বইয়ের নাম ‘কুরআনের আলোকে বেহেশতে যাওয়ার পথ’। এই বইয়ে খ্রীস্টানেরা লিখেছে, প্রথম মানুষ আদম, প্রথম নবী আদম, প্রথম পাপিষ্ঠ। তাহলে প্রথম মানুষ এবং প্রথম নবী আদমকে পাপিষ্ঠ সাব্যস্ত করার মতবাদ মুসলমানদের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, এটি খ্রীস্টানদের কাছ থেকে আমদানিকৃত মতবাদ।

বইটিতে বেশ কতগুলি মজার কথা আছে। এক নম্বর কথা হলো, প্রথম নবী আদম ছিলেন প্রথম পাপিষ্ঠ। দ্বিতীয় কথা হলো, এই পাপিষ্ঠ আদমের বংশে যত নবী জন্মগ্রহণ করেছে, সবগুলি জন্মগত পাপিষ্ঠ। তিন নম্বর কথা হলো, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা একজন নবীকে নিষ্পাপ বানাবার জন্য পাপিষ্ঠ আদমের বংশে জন্ম না দিয়ে আল্লাহ নিজের ঔরসে জন্ম দিলেন; তিনি হলেন ঈসা (আ.)। শুধুমাত্র ঈসা নবী নিষ্পাপ কেন? তাদের মতে, তিনি পাপিষ্ঠ আদমের বংশে জন্মগ্রহণ করেননি। সুতরাং আদম নবী পাপিষ্ঠ, আদমের বংশে জন্মগ্রহণকারী নবীগণ পাপিষ্ঠ—এটা হুবহু খ্রীস্টানি মতবাদ। এই মতবাদটাই মওদুদীবাদীরা গ্রহণ করে নিয়েছে। এখন তো কওমীর ঘরে মওদুদীয়তের চোর ঢুকে পড়েছে! মওদুদীয়তে আর সুন্নিয়তের পার্থক্যটা বুঝবে কে আর বোঝাবে কে?

সেই বইয়ে আদমকে পাপিষ্ঠ সাব্যস্ত করার জন্য যেই দলীল প্রদান করেছিল, মওদুদী সাহেব তাফহীমুল কুরআনে হুবহু সেই দলীল প্রদান করেছেন। ওই বইয়ের মধ্যে খ্রীস্টানেরা আদম নবীর নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়াকে পাপিষ্ঠ হওয়ার দলিল হিসাবে বর্ণনা করেছে। মওদুদী সাহেব তাফহীমুল কুরআনেও আদমের জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়াকে আদম পাপিষ্ঠ হওয়ার দলিল হিসাবে পেশ করেছেন। উভয়ের একই দলিল! খ্রিষ্টানেরও দাবি আদম পাপিষ্ঠ, মওদুদী সাহেবেরও দাবি আদম পাপিষ্ঠ। খ্রিষ্টানেরও পাপিষ্ঠ হওয়ার দলিল নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া, মওদুদী সাহেবেরও পাপিষ্ঠ হওয়ার দলিল হলো নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া। বলেন, দাবি আর দলিলে খ্রিষ্টানে আর মওদুদীতে ব্যবধান রইলো, না একাকার হয়ে গেলো? দাবি আর দলিলে খ্রীস্টানে আর মওদুদীতে একাকার হয়ে গেলো। তাইলে মওদুদীয়তের মিল হলো নাসরানিয়তের সাথে। সুন্নিয়্যাত, দেওবন্দিয়ত বা কওমীয়তের সাথে মওদুদীয়তের কোনো সামঞ্জস্য নাই।

দুঃখিত, আমি শানে নুযুল প্রসঙ্গের আলোচনায় রইলাম, আয়াতের ভিতরে ঢুকি নাই এখনো। আয়াত ছিল, ​‘الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ’। এখানে শুধু الْيَوْمَ সম্পর্কে আলোচনা শুরু হলো। আজকে বলতে কোন্ দিন? বিদায় হজের ভাষণের দিন। বিদায় হজের ভাষণে কী হইলো? বিদায় হজের ভাষণে নবী নিজেকে দায়িত্ব পালনকারী দাবি করলেন, সাহাবাগণ সাক্ষ্য দিলেন, আল্লাহ সত্যায়ন করলেন। এখান থেকে আলোচনা অন্যদিকে গেল, বাকি আলোচনা সামনে রইলো। এটা পরে দেখা যাবে, আমার এই আলোচনা শেষ করি।

এখানে আমরা দেখতে পেলাম, মওদুদীয়ত এবং নাসরানিয়তের আকীদা হলো, প্রথম নবী আদম পাপিষ্ঠ হওয়ার দলিল জান্নাতে নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া। এই দলিল না মানার এক নম্বর কারণ হলো, আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বলেছেন গুনাহগারদেরকে নবী বানাই না। সালাফে সালেহীন গুনাহ সম্বলিত আয়াতের ব্যাখ্যায় এখানে রূপক অর্থ গণ্য করেছেন। আর তিন নম্বর কারণ হলো, মানুষের কোনো কাজে সওয়াব হয়, কোনো কাজে গুনাহ হয় দুনিয়ার জীবনে। জান্নাতি জীবনের কোনো কাজে সওয়াবও নাই, গুনাহও নাই। আদম নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছিলেন জান্নাতি জীবনে। এই ব্যাখ্যাটা মেনে নিলে ​‘لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ’ (গুনাগারদের নবী বানাই না)-আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, না সামঞ্জস্য হয়? সামঞ্জস্য হয়। সুতরাং যে ব্যাখ্যার দ্বারা আল্লাহর মূলনীতি রক্ষা হয়, সেই ব্যাখ্যা সহীহ ব্যাখ্যা। আর যে ব্যাখ্যা আল্লাহর মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, সেই ব্যাখ্যা মনগড়া ব্যাখ্যা।" আর যে ব্যাখ্যা আল্লাহ তা‘আলার মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, সেই ব্যাখ্যা মনগড়া ব্যাখ্যা।

দুই নম্বর কারণ হলো, দুনিয়ার জীবনেও কেউ আল্লাহ তা‘আলার নিষিদ্ধতার কথা ভুলে গিয়ে লঙ্ঘন করলে গুনাহ হয় না। যেমন রোযাদারদেরকে আল্লাহ তা‘আলা দিনের বেলায় খানাপিনা করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু কোনো রোযাদার যদি নিজের রোযার কথা ভুলে গিয়ে খানাপিনা করেই ফেলে, আপনাদের জানামতে কি পরিমাণ গুনাহ হয়? আল্লাহর নিষেধ রক্ষা হইলো না লঙ্ঘন হইলো? (লঙ্ঘন হইলো), কিন্তু গুনাহ হইলো না। আল্লাহর নিষেধ লঙ্ঘন হইলো, গুনাহ হলো না কেন? ভুলের কারণে। আদম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘نَسِيَ آدَمُ’—আদম ভুলে গেলো। তুমি ভুলে গেলে যেখানে গুনাহ হয় না, তোমার বাবার বাবার বাবা ১৪ গুষ্টির বাবা আদমে ভুলে গেলে গুনাহ হয়? তুই বেটা কুরআন শিখছোস কার কাছে আর নবী চিনছোস কার কাছে?" আদম সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, সুতরাং নবীগণকে গুনাহগার সাব্যস্ত করার বেলায় খ্রিষ্টানদের যে মতবাদ, মওদুদীদেরও সেই একই মতবাদ। অতএব খ্রিষ্টান ও মওদুদীবাদীরা বাতিলপন্থী। এই ব্যাপারে হকপন্থী হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত, উলামায়ে দেওবন্দ এবং কওমী উলামা-তলাবা। কোনো কওমী আলেম এই ঘটনার কারণে আদমকে গুনাহগার মনে করেন না। সুতরাং সুন্নিয়্যাত, দেওবন্দিয়ত, কওমীয়ত হক; মওদুদীয়ত, নাসরানিয়ত বাতিল। এখান থেকে আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝে নিলাম নবীদেরকে গুনাহগার সাব্যস্ত করার মতবাদ কোনো মুসলমানের মস্তিষ্কপ্রসূত মতবাদ নয়, খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে আমদানিকৃত মতবাদ। “গেল নবীগণের ব্যাপার।”

সাহাবা সমালোচনার বিষবাষ্প ও হাদীসের কঠিন হুঁশিয়ারি:

যে সমস্ত ভ্রান্ত মতবাদের সমষ্টির নাম মওদুদীয়ত, তার একটি হলো নবীগণকে গুনাহগার সাব্যস্ত করা। আরেকটা ভ্রান্ত মতবাদ হলো সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনার দ্বার উদঘাটন করা। সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতবাদে হারাম। দেওবন্দীরা এই হারামকে হারাম মানে কিনা? কওমীরা এই হারামকে হারাম মানে কিনা? তাইলে কওমীয়ত আর দেওবন্দীয়ত আর সুন্নিয়ত মুতারাদিফ—একই অর্থ। কওমীয়ত বলতে যা বুঝায়, দেওবন্দীয়ত বলতে তাই বুঝায়, সুন্নিয়ত বলতে তাই বুঝায়। কওমী আলেমরাও সাহাবাদের সমালোচনাকে হারাম বিশ্বাস করেন, দেওবন্দী উলামায়ে কেরামও সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনাকে হারাম বিশ্বাস করেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতবাদে সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা হারাম।

এই ব্যাপারে হাদীস শরীফে রাসূলে কারীম ﷺ বলেন, এই ব্যাপারে হাদীস শরীফে রাসূলে কারীম ﷺ বলেন, ​‘إِذَا رَأَيْتُمُ الَّذِينَ يَسُبُّونَ أَصْحَابِي فَقُولُوا لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى شَرِّكُمْ’ অর্থাৎ, ‘হে আমার উম্মত মুসলমানেরা, তোমরা যদি ওই সমস্ত লোকদের দেখতে পাও যারা আমার সাহাবাদের সমালোচনা করে, তাদেরকে বলে দিও সাহাবা সমালোচকদের উপর আল্লাহর লানত।’ বলেন, যেই কাজে আল্লাহর লানত হয়, সেই কাজ হালাল হয় না হারাম? হারাম। যেই কাজের দ্বারা লানত হয় সেটা হালাল কাজ নয়, সেটা হারাম কাজ। কোন কাজ হারাম আর কোন কাজ হালাল, এটা যাচাইয়ের একটা মাপকাঠি এইটা। যত কাজে আল্লাহর লানত সবগুলি হারাম। সাহাবাদের সমালোচকদের ওপর আল্লাহর রাসূল লানত বলেছেন।"

কাজেই সাহাবায়ে কেরামের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতবাদ হলো সমালোচনা করা হারাম। মওদুদীবাদের মতবাদ হলো সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করা শুধু হালাল নয়, ওয়াজিব; সমালোচনা না করা মূর্তিপূজার সমান। আর এমন মূর্তি পূজাকে বন্ধ করার জন্যই মওদুদীবাদের উত্থান! এই হলো তাদের মতবাদের মোটামুটি কথা।

যখন কওমী ও দেওবন্দী উলামারা বলেন যে সাহাবাদের সমালোচনা করা হারাম, এবং সত্যিকারের আহলু সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের অনুসারী কোনো আলেম যখন এই কথা বলেন, তখন মওদুদীবাদীরা যে সমস্ত প্রশ্ন উত্থাপন করে, সেগুলি হলো:

·        ​কেন? সাহাবি কি জিনা করেননি? তাহলে জিনা করছেন বলা হারাম হবে কেন? সত্য কথা বললে হারাম হবে কেন?

·        ​সাহাবী কি চুরি করে ধরা পড়েননি? তাহলে চুরি করেছেন এইটা সমালোচনা করলে, সত্য কথা বললে হারাম হবে কেন?

এই প্রশ্ন কি আমার, কওমীদের বা দেওবন্দীদের বিরুদ্ধে যায়, নাকি রাসূলের হাদীস এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বিরুদ্ধে যায়?

তারপরেও বর্তমানে আমাদের কওমী অঙ্গনের কিছু ছাত্র এই সমস্ত শয়তানি প্রশ্ন ওদের কাছ থেকে শিখে গোপনে কওমী ছাত্রদেরকে পুশিং করে বেড়াচ্ছে। এজন্য এই শয়তানিরও দাঁতভাঙ্গা জবাব হওয়া দরকার।

সাহাবায়ে কেরাম ‘মি‘য়ারে হক’: শরয়ী ও যৌক্তিক প্রমাণ

মওদুদী সাহেব তার গঠিত দলের ম্যানুফেস্টোতে লিখেছেন, ‘আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর কাউকে সত্যের মাপকাঠি মানা যাবে না।‘ আপনারা যখন বলেন সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি, তখন আমার কাছে সরাসরি অনেক মওদুদী অনেকদিন জিজ্ঞাসা করেছে, ‘সাহাবা সত্যের মাপকাঠি‘ কুরআনের কোন সূরায় কত নম্বর আয়াতে আছে? বা রাসূলের কোন কিতাবের কত নম্বর হাদীসে আছে? আমি জবাবে কী বলেছি জানেন? জবাবটা মাদরাসার ছাত্রদের মনে থাকা দরকার।

আমি জবাব দিয়েছি, ‘রাসূল সত্যের মাপকাঠি‘ এই কথাটা কুরআনের যেই আয়াতে এবং যেই হাদীসে আছে, ‘সাহাবা সত্যের মাপকাঠি‘ সেই আয়াতে ও হাদীসেই আছে। বুঝতে পেরেছেন জবাবটা? ‘সাহাবা সত্যের মাপকাঠি‘ কথাটা সরাসরি কুরআন-হাদীসে নেই বলে যদি সাহাবাকে সত্যের মাপকাঠি মানা না যায়, তবে ‘রাসূল সত্যের মাপকাঠি‘ এই কথাও তো সরাসরি কুরআন-হাদীসের কোথাও নেই। তাহলে কোন আক্কেলে রাসূলকে সত্যের মাপকাঠি মানতে গেলে?

আমার প্রশ্নের যেই জবাব, তোমার প্রশ্নেরও সেই জবাব। জবাব হলো, ‘রাসূল সত্যের মাপকাঠি‘ সরাসরি কথাটা কুরআন-হাদীসে নেই, কিন্তু কুরআন-হাদীসের অনেক বিবরণের দ্বারা নিশ্চিতভাবে সাব্যস্ত হয়। এই কারণে রাসূল সত্যের মাপকাঠি। যেভাবে রাসূল সত্যের মাপকাঠি, ঠিক সেভাবেই সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি।

যেভাবে রাসূল সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে সরাসরি সত্যের মাপকাঠি বলা হয়নি, কিন্তু কুরআন-হাদীসের বিবরণের দ্বারা সাব্যস্ত হয়; ঠিক তেমনিভাবে সাহাবায়ে কেরামকে সরাসরি কুরআন-হাদীসের কোথাও সত্যের মাপকাঠি বলা হয়নি, কিন্তু বিবরণের দ্বারা সাব্যস্ত হয়। বিবরণগুলো আমি একদিনে বলে শেষ করতে পারবো না। শুধু একটা হাদীসের একটা টুকরা বলি।

মুহাদ্দিসীনে কেরামের ভাষায় এই হাদীসটার নাম হলো ‘হাদীসে ইফতেরাকে উম্মত‘। সামান্য শাব্দিক তারতম্যের দ্বারা হাদীসটা বর্ণিত হলেও সবগুলোর মর্ম এক, এ কারণে মুহাদ্দিসীনে কেরাম বলেন হাদীসটা ​‘مُتَوَاتِرُ الْمَعْنَى’।

এই হাদীসের এক পর্যায়ে উল্লেখ আছে, রাসূল ﷺ বলেন,

‘تَتَفَرَّقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلَّا وَاحِدَةً. وَفِي رِوَايَةٍ قَالَ: ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ، وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ’

আল্লাহর রাসূল বলেন, আমার উম্মত মুসলমানেরা ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, তন্মধ্যে ৭২ দল জাহান্নামী হবে। হাদীসের ক্লাসের ছাত্রদের কাছে জবাব চাই, আল্লাহ তা‘আলার রাসূল ৭২ দল মুসলমানকে জাহান্নামী বলেছেন আমলের ত্রুটির কারণে নাকি আকীদা খারাপ হওয়ার কারণে? আকীদা খারাপ হওয়ার কারণেই রাসূল বলেছেন ৭২ দল মুসলমান হবে জাহান্নামী।

আর বর্তমানে কওমীয়তের ঘরে মওদুদীয়তের চোর ঢুকে বলতেছে—আকীদা-টাকিদা যাচাই করার সময় এখন নাই, এখন বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করার সময়। অথচ রাসূল বলেন, আকীদা খারাপ হওয়ার কারণে ৭২ দল মুসলমান জাহান্নামী। নামায পড়ো, রোযা রাখো, হজ্ব করো, যাকাত দাও, তসবি পড়ো, জিকির করো, যত ইবাদত-বন্দেগী করো না কেন, আকীদা খারাপ হলে তুমি জাহান্নামী। একটামাত্র মুসলমানের দল আকীদা খারাপ নয় বলে জাহান্নামী হবে না।

এ কথা বলা মাত্রই সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘قَالُوا: مَا هِيَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ হে আল্লাহর রাসূল, একটামাত্র মুসলমানের দল যে আকীদা খারাপ না হওয়ার কারণে জাহান্নামী হবে না, এই মুসলমানের দলটার পরিচয় কী? জবাবে আল্লাহর রাসূল বলেন, ‘مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي’ আমি রাসূলের সুন্নত আর আমার সাহাবায়ে কেরামের জামাআতের মাপকাঠিতে যারা আকীদা পোষণ করবে, তারাই নাজাতপ্রাপ্ত বা জান্নাতি মুসলমান।

৭২টি বাতিলপন্থী মুসলমানের দল থেকে হকপন্থী একটি মুসলমানের দলকে পার্থক্য করার জন্য যারা নবীর সুন্নত এবং সাহাবায়ে কেরামের জামাআতকে মাপকাঠি রূপে মেনে নেবে, তাদের আকীদা খারাপ নয়, তারাই জান্নাতি দল। যারা রাসূলের সুন্নতকে আদর্শ মাপকাঠি মানতে রাজি নয় তারা যেমন জাহান্নামী, তেমনিভাবে যারা সাহাবায়ে কেরামের জামাআতকে সত্যের মাপকাঠি মানতে রাজি নয়, তারাও জাহান্নামী। এই হাদীসের দ্বারা সাব্যস্ত হলো- ​‘رسولِ خدا کے سوا کسی کو معیارِ حق نہ سمجھنا’ (রাসূল ছাড়া অন্য কাউকে সত্যের মাপকাঠি না মানা) এই কথাটি ভুল। ‘مَا أَنَا عَلَيْهِ وَأَصْحَابِي’ এখানে ‘হক‘ এর দ্বারা আকীদার হক এবং ‘বাতিল‘ এর দ্বারা আকীদার বাতিলকে বোঝানো হয়েছে।

৭২ দল মুসলমানের আকীদা বাতিল হওয়ার কারণে রাসূল এদেরকে জাহান্নামী বলেছেন, আর একদলের আকীদা সহিহ হওয়ার কারণে তাদেরকে জান্নাতি বলেছেন। তাই সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করেছিলেন এদের পরিচয় কী? ৭২ টা দল বাতিল দল থেকে একটা হক দলকে পার্থক্য করার জন্য রাসূল দুইটা স্কেল বা মাপকাঠি সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। একটা স্কেলের নাম সুন্নতে রাসূল, আরেকটা স্কেলের নাম জামাআতে সাহাবা। এইজন্য এই দুই মাপকাঠির ভিত্তিতে যারা আকীদা পোষণ করে, তাদের নাম হয় 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত'।

‘আহলে সুন্নাত’ অর্থ সুন্নতের অনুসারী, কার সুন্নত? রাসূলের সুন্নত। ‘ওয়াল জামাআত’ অর্থ জামাআতের অনুসারী, কার জামাআত? সাহাবায়ে কেরামের জামাআত। যারা হক-বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য সুন্নতে রাসূল ও জামাআতে সাহাবাকে মাপকাঠি মানতে রাজি, আল্লাহ এদেরকে জান্নাতী; যারা রাজি নয় তাদেরকে জাহান্নামী বলেছেন।

এখানে সাহাবায়ে কেরামকে সমালোচনা করার কথা বলা হয়েছে নাকি অনুসরণ করার কথা? চাপাবাজি করতে করতে এক পর্যায়ে গিয়ে তারা বলে, সাহাবারা তো গুনাহও করেছেন। গুনাহগার কীভাবে সত্যের মাপকাঠি হয়? সাহাবারা গুনাহ করেছেন এজন্যই যদি তারা সত্যের মাপকাঠি না হন, তবে সমস্ত নবীকে যে মওদুদী গুনাহগার সাজিয়ে রেখেছে, ওই নবীরা কীভাবে সত্যের মাপকাঠি হন? ফার্সি ভাষায় একটি কথা আছে, دروغ گو را حافظه نباشد, অর্থাৎ মিথ্যাবাদীদের স্মরণশক্তি থাকে না।

একবার যে সমস্ত নবীদেরকে গুনাহগার সাজিয়ে রেখেছে, তা আর মনে নেই। এখানে এসে বলে সাহাবী যেহেতু গুনাহ করেছেন তাই সত্যের মাপকাঠি হতে পারেন না, রাসূল ছাড়া কেউ সত্যের মাপকাঠি নয়। এই ব্যাটা! এখানে সাহাবীদের গুনাহর কারণে মাপকাঠি থেকে বাদ দিলে, ওইখানে সমস্ত নবীরে গুনাহগার বানাইয়া রাখছস। ক, তোর জীবনে কোন মাপকাঠি আছে না লাগাম ছাড়া ঘোড়া তোর নাম? এই মতবাদের নামই হলো মওদুদীবাদ। আমি কি আপনাদেরকে মওদুদীবাদ আর দেওবন্দীবাদের পার্থক্য বুঝাতে পারছি?

এখন তাদের একটা কথা হলো, এখন আর আকীদা-টাকিদা দেখার সময় নাই, এখন হইলো বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করার সময়। আপনারা ধৈর্যের সাথে শুনলে কয়েক মিনিটে আমি আপনাদের সামনে এই ইতিহাস তুলে ধরবো যে, আকীদা খারাপ ব্যক্তিরা যদি ইসলামী শাসনের নামে গদি দখল করতে পারে, তবে ইসলাম এবং মুসলমানের বারোটা কীভাবে বাজে। এই ইতরামি প্রশ্নের জবাবে আমি সেই ইতিহাস তুলে ধরতে চাই।

তারা বলে এখন আকীদা-টাকিদা দেখার সময় নাই, এখন হইলো বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করার সময়। কিন্তু এর আগে, সাহাবাদের সমালোচকদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে রাসূল বলেছেন, ‘সাহাবা সমালোচকদের যখন তোমরা দেখবে...’। ‘যখন তোমরা দেখবে’ কেন বললেন? কারণ তখন দুনিয়াতে কোনো সাহাবা সমালোচক ছিল না। যতদিন নবী দুনিয়াতে ছিলেন, বা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা. ও হযরত উমর ফারুক রা.-এর শাসনামলে দুনিয়ার কোনো মুসলমান সাহাবাদের সমালোচনা করতো না। সাহাবা সমালোচকের জন্ম হয়েছিল হযরত উসমান রা.-এর শাসনামলে।

আমাদের কওমী মাদরাসার ছাত্রদের ইতিহাস জানা থাকা দরকার। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সাহাবা সমালোচনার সূত্রপাত হয় কুখ্যাত মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার মাধ্যমে। সুতরাং মাদরাসার যেসব ছাত্ররা ইবনে সাবার ইতিহাস জানে না, তারা সাহাবা সমালোচনার গোড়ার কথা জানে না। সাহাবা সমালোচনার গোড়ার কথা জানতে হলে কুখ্যাত মুনাফিক ইবনে সাবার ইতিহাস জানতে হবে। অতি সংক্ষেপে আমি আগে এই ইতিহাসটা তুলে ধরবো।

এরপর দ্বিতীয় একটি ইতিহাস তুলে ধরবো, ইসলামী শাসনের নামে আকীদা খারাপ ব্যক্তিরা যদি গদি দখল করতে পারে, তবে সেই দেশের ইসলাম ও মুসলমানের দুর্দশা কেমন হয়। এই দুটো ইতিহাস আজকের মতো অতি সংক্ষেপে বলে শেষ করার চেষ্টা করবো, অন্য কোনো সময় সুযোগ পেলে বাকি আয়াতের আলোচনার দিকে যাবো।

সাহাবা সমালোচনার ঐতিহাসিক উৎস: ইবনে সাবার চক্রান্ত

হযরত আবু বকর রা. এবং হযরত উমর ফারুক রা.-এর যুগে দুনিয়ার কোনো মুসলমান সাহাবাদের সমালোচনা করতো না, কারণ তারা জানতো রাসূল বলেছেন সাহাবা সমালোচকদের উপর আল্লাহ তা‘আলার লানত। তাই হযরত উসমান রা.-এর যুগে মুসলমান সমাজের ভেতর সাহাবা সমালোচনার বিষবাষ্প ছড়ানোর জন্য কুখ্যাত মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা অবতীর্ণ হলো। তার পরিচয়গুলো মনে রাখা দরকার। তার বাড়ি ছিল ইয়েমেন দেশে। ধর্মবিশ্বাসে সে ছিল ইহুদী, তাওরাত কিতাবের পণ্ডিত এবং সমাজের কুখ্যাত চাপাবাজ।

মুসলমান সমাজের মধ্যে সাহাবা সমালোচনার বিষবাষ্প ছড়ানোর জন্য সেই কুখ্যাত চাপাবাজ সুদূর ইয়েমেন থেকে মদীনায় এসে হযরত উসমানের রা. হাতে ধরে কলেমা পড়ে মুসলমান হওয়ার নাটক সাজালো। সে সত্যি মুসলমান হয়নি, বরং নাটক সাজিয়েছিল। হযরত উসমান সরল মনে তাকে মুসলমান হিসেবে বিশ্বাস করলেন।

এই সুযোগে সে মুসলমান পরিচয় দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্রমণ করতে লাগলো। সাহাবা বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়ানোর জন্য সে কুফা এবং বসরায় গিয়ে চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। সর্বশেষে মিশরে গিয়ে সফল হলো। মিশরে গিয়ে সে অশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত মুসলমানদেরকে নিয়ে একটি মহাসমাবেশ করলো।

সেই সমাবেশে মুনাফিক ইবনে সাবা বক্তৃতা দিয়ে বললো, ‘আগে আমাকে তোমরা চেনো। আমি হলাম ইয়েমেন দেশের তাওরাত কিতাবের পণ্ডিত, ইহুদী ধর্মাবলম্বী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা। আমি মদীনায় এসে হযরত উসমানের হাতে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়েছি। তোমরা এই খবর পেয়েছো কিনা?’ তারা বললো, ‘পেয়েছি’। সে বললো, ‘আমিই সেই আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা।’ তারা বললো, ‘ভালো কথা, আপনি একজন নওমুসলিম আমাদের দেশে এসেছেন, আমাদেরকে কিছু কথা শোনান’।

সে বক্তৃতা শুরু করলো, ‘আমি তোমাদেরকে কথা শোনানোর জন্যই এসেছি। আমার প্রথম কথা হলো, আমি একজন নতুন মুসলমান, আমার ঈমান তাজা। তোমরা সব পুরনো মুসলমান, তোমাদের ঈমান ঘুণে ধরা। তোমাদের ঈমানের ঘুণে ধরা সারাবার জন্যই আমি তোমাদের দেশে এসেছি।‘

এ কথা শুনে তারা উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের ঈমানে ঘুণে ধরলো কোথায়?‘ সে বললো, ‘হ্যাঁ, তাই তো বলছি শোনো। তোমাদের ঈমানে ঘুণে ধরলো কোথায়, তা আমি একটা একটা করে চিহ্নিত করে দিচ্ছি। বলতো, ঈসা আ. বেশি মর্যাদার অধিকারী, নাকি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ বেশি মর্যাদার অধিকারী?’ আপনারা কি জানেন? এক হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন,

‘إِنَّ اللَّهَ فَضَّلَنِي عَلَى الْأَنْبِيَاءِ وَفَضَّلَ أُمَّتِي عَلَى الْأُمَمِ’

আল্লাহ তা‘আলা আমাকে সমস্ত নবীগণের উপর শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দান করেছেন। সুতরাং রাসূলের হাদীস এই কথার জ্বলন্ত প্রমাণ যে, আমাদের নবীর মর্যাদা সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠ। মিশরের মুসলমানেরা অশিক্ষিত বা মূর্খ হলেও আমাদের নবী যে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী, তা সব মুসলমানই জানে।

তাই মিশরের মুসলমানেরা জবাব দিলো, ঈসা নবীর থেকে আমাদের নবীর মর্যাদা শ্রেষ্ঠ। তখন ইবনে সাবা বললো, ‘যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নন, তিনি যদি দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার পর আবারো দুনিয়াতে ফিরে আসবেন বলে বিশ্বাস করতে পারো (আমরা তো বিশ্বাস করি ঈসা নবী আবার দুনিয়াতে আসবেন), তিনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী নন। সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী না হয়েও যদি তিনি দুনিয়াতে ফিরে আসতে পারেন, তবে আমাদের নবী তো সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী। তিনি কেন বিদায়ের পর আবারো আসতে পারবেন না?’ তারা বললো, ‘যুক্তি তো ঠিক’।

এই যুক্তির ভিত্তিতে তারা মেনে নিলো যে, আমাদের নবীও দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার পর আবার দুনিয়াতে আসতে পারেন, চলাফেরা বা ঘোরাফেরা করতে পারেন। এখান থেকেই কুখ্যাত মুনাফিক ইবনে সাবা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ‘হাযির-নাজির‘ বিশ্বাস করার শিরকী মতবাদের বীজ বপন করলো।

এরপর তার দ্বিতীয় বক্তৃতা। সে বললো, ‘হে ঘুণে ধরা পুরাতন মুসলমানের দল! তোমরা বলতো, হযরত আবু বকর রাসূলের আত্মীয়তার দিক থেকে শ্বশুর হতেন, তিনি কি রক্ত সম্পর্কীয় কোনো আত্মীয়?’ আপনারা তো জানেন, শ্বশুর রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় নন। তারা বললো, না, আবু বকর রাসূলের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় নন। সে জিজ্ঞেস করলো, উমর হলেন রাসূলের শ্বশুর, তিনিও রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় নন। উসমান হলেন রাসূলের জামাতা, তিনিও রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় নন। কিন্তু হযরত আলী হলেন রাসূলের আপন চাচাতো ভাই।"

কাজেই রাসূলের রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয় আলীকে বাদ দিয়ে যারা আবু বকরকে খলীফা বানাইলো, যারা উমরকে খলীফা বানাইলো, যারা উসমানকে খলীফা বানাইলো, এই সবগুলি জালিম, যারা খলীফা হইলো তারাও জালিম। রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়ের সাথে এই জুলুম মেনে নেওয়া যায় না।" তারা বললো, যুক্তি তো খারাপ না।

এখানেই আলোচনা করতে হয় খেলাফত কি আত্মীয়তার ভিত্তিতে হয় না যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়? এই আলোচনা তো এখন যাওয়া আর সম্ভব না। খেলাফত আত্মীয়তার ভিত্তিতে হয় না, খেলাফত যোগ্যতার ভিত্তিতে হয়।

​মুসলমানের আমীর হওয়ার জন্য প্রধান চারটা শর্ত আছে। এক নম্বর শর্ত হইলো ডাক্তার হওয়া।

মুসলমানদের আমীর হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত কয়টা? এক নম্বর? ডাক্তার হওয়া। না?

এক নম্বর, সাহেবে এলেম। দুই নম্বর, সাহেবে আমল। তিন নম্বর, সাহেবে রায়। চার নম্বর, সাহেবে যাবত। এই চার যোগ্যতার ভিত্তিতে মুসলমানের নেতা হয়, আমীর হয়, শাসনকর্তা হয়। সুতরাং ইহুদি মুনাফিক ইবনে সাবার বক্তৃতা কি যোগ্যতার ভিত্তি থেকে গেল, না আত্মীয়তার ভিত্তিতে গেল? এখান থেকে এরা হযরত আলীর পক্ষপাতিত্বের নামে তিন খলীফার বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু করলো। এইভাবেই কুখ্যাত মুনাফিক ইবনে সাবা সর্বপ্রথম মুসলমান সমাজে সাহাবাদের সমালোচনার দ্বারোদঘাটন করে।

সুতরাং মুসলমান সমাজে সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনার ব্যবস্থা এটা কোন মুসলমানের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়। মুসলমান সমাজে সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনার ব্যবস্থা চালু করা কুখ্যাত মুনাফিক ইবনে সাবার কাজ। সুতরাং সাহাবা সমালোচনার মতবাদ মুসলমানী মতবাদ নয়, মুনাফিকী মতবাদ। এই জন্য আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতবাদে, উলামায়ে দেওবন্দের মতবাদে, কওমী আলেমদের মতবাদে সাহাবাদের সমালোচনা করা হারাম। দুইটা মতবাদে সাহাবাদের সমালোচনা হালাল; একটা হইল মুনাফিকী মতবাদ আরেকটা হলো মওদুদী মতবাদ।

​আমি কি আপনাদেরকে মওদুদীয়াত আর দেওবন্দিয়াতের পার্থক্য বুঝাতে পারছি? কওমী ছাত্রদেরকে কি এখনই সময় নয় মওদুদীয়াত আর দেওবন্দীয়াতের পার্থক্য বোঝার? দেওবন্দী মতবাদে সাহাবাদের সমালোচনা হারাম, মওদুদী মতবাদে সাহাবাদের সমালোচনা করা ওয়াজিব। কাজেই দুই মতবাদে কোন বেশকম নাই, না আকাশ পাতাল বেশকম? কিন্তু সমস্যা হলো, এইগুলি মতবাদ হইল আকীদাগত ব্যাপার। “এখন আকীদা টাকিদা আলোচনার টাইম নাই। এখন হইলো ইসলামী শাসন কায়েম করার টাইম”।

​আমি প্রায় সময় বলে থাকি, দেশে যারা ইসলামী শাসনের আন্দোলন করেন, তাদের দায়িত্ব হলো সরকারের কাছে জনগণের প্রাপ্য কয়টা কি কি বলে দেওয়া। জনগণের কাছে সরকারের প্রাপ্য কয়টা কি কি বলে দেওয়া। আমি যেহেতু কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত নই, তাই এটা আমার দায়িত্ব না; যারা রাজনীতি করে তাদের দায়িত্ব।

ইকামতে দ্বীনের এর রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা ও আয়াতের হাকীকত:

তোমরা যারা যারা বাংলাদেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করার আন্দোলন করে যাচ্ছ, আজ পর্যন্ত বলো না কেন সরকারের কাছে জনগণের প্রাপ্য কয়টা আর জনগণের কাছে সরকারের প্রাপ্য কয়টা? এর দ্বারা যদি আমি ধরে নেই তোমরা রাজনীতি ঘোড়ার ডিমও বুঝো না? যারা ঘোড়ার ডিমও রাজনীতি বুঝেনা, তারা দেশে কী ইসলামী হুকুমত কায়েম করবে? ইসলামী নেতা হওয়ার জন্য, সর্দার হওয়ার জন্য, শাসনকর্তা হওয়ার জন্য যোগ্যতা কত লাগে, কি কি? ঘোড়ার ডিম জানেই না; সে আন্দোলন করে ইকামতে দ্বীনের।

আমি দুঃখিত ইকামতে দ্বীনের আলোচনাটা ওই ​‘أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ’ এর মধ্যে দ্বীন শব্দের ব্যাখ্যার মধ্যে আসবে ইকামতে দ্বীন কাকে বলে। এই ইকামতে দ্বীনের আন্দোলন তারা করে ইসলামী হুকুমত কায়েমের আন্দোলন নামে। অথচ যে আয়াত দিয়া তারা ইকামতে দ্বীনের দলিল দেয়, আয়াতটা হলো সূরায়ে শুরার ১৩ নম্বর আয়াত। সেখানে আল্লাহ বলেছেন, ​‘أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ’। তোমরা দ্বীন কায়েম করো, দ্বীনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করো না। এখানে দ্বীন বলতে কি? ঘোড়ার ডিমও জানে না। এখানে ‘দ্বীন’ বলতে এরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বোঝায়। নাউজুবিল্লাহ। أَقِيمُوا الدِّينَ আয়াত আল্লাহ নাযিল করেছেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বুঝাবার জন্য নয়, এটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়াত না। أَقِيمُوا الدِّينَ আল্লাহ নাযিল করেছেন নামাজ রোযা এবাদত বন্দেগী বুঝাবার জন্য নয়, এটা তো নামাজ রোযা এবাদত বন্দেগীর আয়াত না। أَقِيمُوا الدِّينَ আল্লাহ নাযিল করেছেন সহীহ আকীদা বুঝাবার জন্য, এটা আকীদার আয়াত।

​বুঝে থাকলে বলেন أَقِيمُوا الدِّينَ এটা কি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়াত, না নামায রোযার আয়াত, না আকীদার আয়াত? আয়াতের অর্থ হলো, তোমরা ইসলামের সহীহ আকীদায় অটল থাকো, ইসলামের সহীহ আকীদার ব্যাপারে মতভেদ সৃষ্টি করো না।

"أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ" এখানে ইসলামের সহীহ আকীদায় অটল থাকার কথা বলা হয়েছে। ইসলামের সহীহ আকীদার ব্যাপারে বিভেদ সৃষ্টি করতে নিষেধ করা হয়েছে। যাদের আকীদা গলদ, এরা এই আয়াত দিয়া দলিল দেয় আর আকীদার কথা বাদ দিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ব্যবহার করে। কুরআনের অপব্যবহার হলো কিনা?

​ইকামতে দ্বীন সহীহ আকীদার নাম, ইকামতে দ্বীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নাম নয়। এই আয়াতে যে ইকামতে দ্বীনের কথা আল্লাহ বলেছেন সেটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নাম নয়, সেটা আকীদা সংশোধন করার নাম। অথচ আকীদা ভুল লইয়া বলে “আমরা ইকামতে দ্বীনের কাজ করি। ইকামতে দ্বীন হইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা”। ঘোড়ার ডিম জানো ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, কার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়?

আকীদা সংশোধন ছাড়া ক্ষমতা লাভ, ইতিহাস ও সীরাতের শিক্ষা:

যাই হোক, এখন এরা বলে যে আকীদা সংশোধন করার টাইম নাই। এখন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা দরকার। এই ব্যাপারে আমি একটা ইতিহাসের সামান্য আভাস দিয়ে আজকের মত কথা শেষ করতে চাই। আমি আশা করি মাদরাসার ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই ইসলামের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা রাখেন।

​এই ইতিহাসের মধ্যে একজন ইতিহাস বিখ্যাত শাসনকর্তার নাম ছিল বাদশাহ হারুনুর রশীদ। বাদশাহ হারুনুর রশীদের ছেলের নাম ছিল বাদশাহ মামুনুর রশীদ। বাদশাহ হারুনুর রশীদের পরে মামুনুর রশীদ যখন ইসলামী শাসনের নামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছিল, তখন মু‘তাযিলাদের ভ্রান্ত আকীদার অনুসারী হয়ে গিয়েছিল। যেমনভাবে মওদুদীবাদীদের অনেকগুলি ভ্রান্ত আকীদা আছে, ঠিক তেমনিভাবে মু‘তাযিলাদের অনেকগুলি ভ্রান্ত আকীদা আছে। মু‘তাযিলাদের সবগুলি ভ্রান্ত আকীদার মধ্যে একটা ভ্রান্ত আকীদার নাম ছিল খালকে কুরআন।

​এই খালকে কুরআন শব্দটা আকীদার কিতাব যারা বুঝে শুনে পড়ে নি, এদেরকে বোঝানো সম্ভব নয়। এজন্য যারা আকীদার কিতাব, আকীদার উচ্চস্তরের কিতাবগুলি ভালোভাবে বুঝে শুনে পড়েন নি, তাদের জন্য সহজ দুইটা বাংলা শব্দ আমি বলে দেই। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা হলো কুরআন আল্লাহর অনাদি কালাম। এর বিপরীতে মু‘তাযিলাদের ভ্রান্ত আকীদা হলো কুরআন নবরচিত। শব্দ দুইটা মনে রাখেন। মু‘তাযিলাদের ভ্রান্ত আকীদা কুরআন নবরচিত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদা কুরআন আল্লাহর অনাদি কালাম।

​বুঝে থাকলে বলেন কুরআন নবরচিত না অনাদি কালাম, এই ব্যাপারে আকীদার মধ্যে হক বাতিল নাই? আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের হক আকীদা হলো, “কুরআন আল্লাহর অনাদি কালাম”। মু‘তাযিলাদের বাতিল আকীদা হলো, ‘কুরআন নবরচিত’। এই বাতিল আকীদায় বিশ্বাসী ছিল বাদশাহ মামুন।

​বাদশাহ মামুন ইসলামী শাসনের নামে গদি দখল করার সাথে সাথে কুরআন নবরচিত এই ভ্রান্ত আকীদা পোষণ করার জন্য সারা দেশের সমস্ত মুসলমানদের উপর জুলুম অত্যাচার চালায়, সমস্ত আলেমদের উপর জুলুম অত্যাচার চালায়। একদল আলেম জুলুম অত্যাচারের ভয়ে হক আকীদা বাদ দিয়া বাতিল আকীদা গ্রহণ করে ফেলেছিল। আরেকদল আলেম গ্রহণ না করার কারণে এদেরকে বাদশাহ মামুন হত্যা করে ফেলেছিল। আরেকদলকে বাতিল আকীদা গ্রহণ না করার কারণে জেলখানায় বন্দি করে পাশবিক নির্যাতন করেছিল। এইরকম নির্যাতিত আলেমদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ.।

​মাদরাসার ছাত্ররা ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের ইতিহাস পড়, যদি কওমীয়ত আর মওদুদীয়তের পার্থক্য বুঝতে চাও। আকীদার সংশোধন আগে না ইসলামী শাসন কায়েম আগে? যদি বুঝতে চাও মামুনুর রশীদের ইতিহাস পড়। মামুনুর রশীদের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, ইসলামী রাষ্ট্র যদি প্রতিষ্ঠা করতে চাও তাহলে আকীদা সংশোধন করো।

​কেউ যদি বলে আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিব কেন, কুরআন-হাদীস থাকতে? ভালো কথা, কুরআন-হাদীস থাকতে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিব না। যাও হাদীসে দেখতো মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ ওহী নাযিল শুরু হওয়ার পর থেকে আরও ১৩ বছর মক্কা শরীফে অবস্থান করেছিলেন। এই ১৩ বছরের পবিত্র জিন্দেগীকে মাক্কী জিন্দেগী বলা হয়। আর ৫৩ বছর বয়সে রাসূল মক্কা শরীফ থেকে হিজরত করে মদিনা শরীফ গিয়ে একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ওইখানের ১০ বছরের জিন্দেগীকে মাদানী জিন্দেগী বলা হয়। মাদানী জিন্দেগী আগে না মাক্কী জিন্দেগী আগে? মাক্কী জিন্দেগীতে রাসূল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন না আকীদা আমল আর আখলাক সংশোধন করেছিলেন?

​রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে তিন জিনিস জরুরী। আকীদা সংশোধন করা, আমল সংশোধন করা, আখলাক সংশোধন করা। যারা ইসলামী রাষ্ট্র চায়, তাদের এই তিন জিনিস অপরিহার্য।

​রাসূলে কারীম ﷺ মাক্কী জিন্দেগীতে মুসলমানের আকীদা শুদ্ধ করে দিলেন, আমল সংশোধন শুদ্ধ করে দিলেন, আখলাক শুদ্ধ করে দিলেন। মাদানী জিন্দেগীতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন। সীরাতুন্নবীর এই ধারাবাহিকতা বুঝে থাকলে বলুন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আগে না আকীদা শুদ্ধ আগে? পন্ডিতের ঘরের পন্ডিত, তুই আকীদা শুদ্ধ করবি পরে আর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবি আগে, তাইলে বল মাক্কী জিন্দেগী আগে না মাদানী জিন্দেগী আগে?

আখলাকবিহীন আন্দোলনের অসারতা এবং নীতিহীন জোটের পরিণতি:

এইভাবে রাসূলের সীরাতুন্নবীর ইতিহাস বাদ দিয়া, কুরআন-হাদীসের বিবরণ বাদ দিয়া, মামুনুর রশীদের ইতিহাস বাদ দিয়া, এই মওদুদীবাদীর চেলারা কওমী অঙ্গনের একটা তুফান বসাইয়া দিছে, “আকীদা আকীদা শুদ্ধ হবে পরে আগে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করব।” এক নম্বরে আকীদা, দুই নম্বরে আমল, তিন নম্বরে আখলাক। তিন নম্বরটাও শুদ্ধ না কইরা যদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যায়, পরকীয়া করবে, জিনা করবে, বদমাশি করবে। আখলাক অশুদ্ধ, চরিত্রহীন লম্পট ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নামে আন্দোলন করে— এমন যদি হয়, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকারীরা চরিত্রবান না চরিত্রহীন? এই চরিত্রহীনতার কারণে পরকীয়া করবে, জিনা করবে, বদমাশি করবে, ধরা খাইলে কইব ইতা নবীরাও করছে সাহাবীরাও করছে, আমি করলে দোষ কি? ঠিক?

​আর কিভাবে আপনাদেরকে আমি বুঝাবো? আকীদা শুদ্ধ হওয়ার আগে যদি গদি পায়, আমল শুদ্ধ করার আগে যদি গদি পায়, চরিত্র শুদ্ধ করার আগে যদি গদি পায়, কত বড় বদমাশ হবে।

​আমি যদিও আমার কোন কথা শেষ করতে পারলাম না, শুধু বিক্ষিপ্তভাবে কিছু কিছু কথা বললাম ওই আয়াতের শানে নুযূল প্রসঙ্গে। মনোযোগ দিয়ে যারা শুনেছেন, বুঝেছেন, দয়া করে বলুন আমাদের দেওবন্দীয়াতের আর মওদুদীয়তে কি কোন বেশকম নাই? আকীদা শুদ্ধ করব পরে, আগে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে নিব? না কি আকীদা, আমল, আখলাক শুদ্ধ করার পরে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা? এই শিক্ষা রাসূল মাক্কী আর মাদানী জিন্দেগীতে দিলেন।

​আর কেউ কেউ বলে, আকীদা যতই খারাপ হোক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের জন্য তাদের সাথে ঐক্যজোট করলাম দোষ কি? ভালো কথা, দলিলও দেয়। মুফতী আমিনী সাহেব বাতিল আকীদাওয়ালাদের সাথে ঐক্যজোট করে নির্বাচন করেছেন। শাইখুল হাদীস সাহেব বাতিল আকীদাওয়ালাদের সাথে ঐক্যজোট করে নির্বাচন করেছেন। পাকিস্তানের ফজলুর রহমান সাহেব বাতিল আকীদাদের সাথে ঐক্যজোট করে নির্বাচন করছেন, চলেছেন। আমি করলে দোষ কি? এই এই যুক্তির ইতরামিটা কোথায়?

​আমি জিজ্ঞেস করি আপনাদেরকে, আমিনী সাহেব বাতিল আকীদাওয়ালাদের সাথে রাজনৈতিক জোট করার কারণে কয়জন কওমী মৌলভী মওদুদী হইছিল? কয়জন কওমী ছাত্র মওদুদী হইছিল? শাইখুল হাদীস সাহেব বাতিল আকীদাওয়ালার সাথে রাজনৈতিক ঐক্য করার কারণে কয়জন কওমী উলামা-তুলাবা মওদুদী হইছিল? পাকিস্তানের ফজলুর রহমান সাহেব কতটা মওদুদী কতটা বাতিল আকীদাদের সাথে ঐক্যজোট করার কারণে কতটা কওমী মওদুদী হইছে? একটাও না। আর তুমি বাতিল আকীদাদের সাথে ঐক্যজোট করার কারণে মওদুদীয়তের চোর কওমীয়তের ঘরে ঢুকে গেছে।

​সুতরাং তাদের ঐক্যজোট আর তোমার ঐক্যজোটে কোনো সামঞ্জস্য নেই। আল্লাহ আপনাদের আমাদের সবাইকে মওদুদীয়ত আর কওমীয়তের পার্থক্য যথাযথভাবে বুঝার এবং বুঝাবার তৌফিক দান করুন। আমিন।

​سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ ۝ وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ ۝ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

বিনীত আরজ:

এই দীর্ঘ বক্তব্যের অনুলিখন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে মানবিক সীমাবদ্ধতাবশত কোনো ভুলত্রুটি বা অসঙ্গতি হয়ে থাকলে, তা একান্তই আমার অসাবধানতা ও দুর্বলতার ফসল। পক্ষান্তরে, লেখার ভেতরের সত্য ও কল্যাণকর সবটুকুর প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহর এবং এর ইলমী গভীরতা বক্তার প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।

​কোনো সহৃদয় পাঠকের দৃষ্টিতে কোনো স্খলন ধরা পড়লে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে সংশোধন করে নেওয়ার অনুরোধ রইলো। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং এই ক্ষুদ্র প্রয়াস কবুল করুন। আমীন।