শরী‘আতের দৃষ্টিতে পর্দা
পর্দা আল্লাহর বিধান, লঙ্ঘন করার উপায় নেই। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন: প্রতিটি প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ বদলা প্রাপ্ত হবে; তারপর যাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেয়া হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে হবে সফলকাম। বস্তুত পার্থিব জীবন ধোঁকা ছাড়া কিছুই নয়। (সূরায়ে আলে ইমরান-১৮৫)
ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসমূহের মধ্যে পর্দা অন্যতম। নারী ও পুরুষের যথাযথ অধিকার সংরক্ষণের জন্যই ইসলাম তাদের প্রতি পর্দার বিধান করেছে। পর্দার বিধান পালনের ফলে মানুষের অন্তর থাকে স্বচ্ছ ও পবিত্র। ফলে সমাজ থেকে অন্যায়, অপকর্ম লোপ পেয়ে সেখানে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। পক্ষান্তরে পর্দার বিধান লঙ্ঘনের কারণে সমাজে দেখা দেয় চরম বিপর্যয়, ধ্বংস হয় মানুষের দীন ও ঈমান। নারীরা হয় লাঞ্ছিত ও অপমানিত। যুব সমাজ হারিয়ে ফেলে তাদের নৈতিক চরিত্র। সমাজ ও রাষ্ট্র হয়ে পড়ে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত। বর্তমান বাস্তব অবস্থা এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সুতরাং আমাদের পর্দা সংক্রান্ত বিধান জেনে সে অনুযায়ী আমলে ব্রতী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। তাই পুরুষ ও মহিলাগণ যাদের সাথে দেখা করতে পারবেন, তাদের একটি বিস্তারিত তালিকা নিম্নে প্রদান করা হল। তালিকায় উল্লেখিত লোকদের ছাড়া অন্য সকলের সাথে পর্দা করা ফরয।
পুরুষগণ নিম্নবর্ণিত ১৫ শ্রেণীর মহিলাগণের সাথে দেখা করতে পারবেন।
১. স্ত্রী। (সূরা আহযাব-৫৫)
২. মা, দাদী, নানী, ও তাদের ঊর্ধ্বতন মহিলাগণ।
৩. আপন মেয়ে এবং তার গর্ভজাত যে কোন কন্যা সন্তান।
৪. আপন বোন, বৈমাত্রেয় বোন এবং বৈপিত্রেয় বোন।
৫. ফুফু অর্থাৎ, পিতার সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন।
৬. খালা অর্থাৎ, মায়ের সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোন।
৭. ভাতিজী অর্থাৎ, সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাইয়ের মেয়ে।
৮. ভাগ্নি অর্থাৎ, সহোদর, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের মেয়ে।
৯. দুধ সম্পর্কীয় মা, দাদী, নানী, খালা, ফুফু ও তাদের ঊর্ধ্বতন মহিলাগণ।
১০. দুধ বোন, দুধ বোনের মেয়ে, দুধ ভাইয়ের মেয়ে এবং তাদের গর্ভজাত যে কোন কন্যা সন্তান।
১১. শাশুড়ি, আপন দাদী শাশুড়ি ও নানী শাশুড়ি এবং তাদের ঊর্ধ্বতন মহিলাগণ।
১২. যে স্ত্রীর সঙ্গে দৈহিক মিলন সংঘটিত হয়েছে তার পূর্ববর্তী স্বামীর কন্যা সন্তান।
১৩. আপন ছেলের স্ত্রী, এবং তাদের গর্ভজাত যে কোন কন্যা সন্তান। (সূরা নিসা-২৩)
১৪. যৌন শক্তিহীন এমন বৃদ্ধা যার মাঝে পুরুষের প্রতি কোন প্রকার আকর্ষণ নেই।
১৫. অপ্রাপ্ত বয়স্কা এমন মেয়ে যার মাঝে এখনো যৌন আকর্ষণ সৃষ্টি হয়নি। (সূরা নূর-৬০)
মহিলাগণ নিম্নবর্ণিত ১৫ শ্রেণীর পুরুষের সাথে দেখা করতে পারবেন
১. স্বামী
২. পিতা, দাদা, নানা ও তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ।
৩. শ্বশুর, আপন দাদা ও নানা শ্বশুর এবং তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ।
৪. আপন ছেলে, ছেলের ছেলে, মেয়ের ছেলে ও তাদের ঔরসজাত পুত্র সন্তান এবং আপন মেয়ের স্বামী।
৫. স্বামীর অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্র।
৬. আপন ভাই, বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাই।
৭. ভাতিজা অর্থাৎ, আপন ভাইয়ের ছেলে এবং বৈমাত্রেয় বৈপিত্রেয় ভাইয়ের ছেলে।
৮. ভাগ্নে অর্থাৎ, আপন বোনের ছেলে এবং বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় বোনের ছেলে।
৯. যৌনশক্তিহীন এমন বৃদ্ধ যার মাঝে মহিলাদের প্রতি কোন আকর্ষণ নেই।
১০. এমন বালক যার মাঝে মহিলাদের প্রতি কোন আকর্ষণ নেই। (সূরা নূর-৩১)
১১. দুধ সম্পর্কীয় পিতা, দাদা, নানা, চাচা, মামা এবং তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ।
১২. দুধ ভাই, দুধ ভাইয়ের ছেলে, দুধ বোনের ছেলে এবং তাদের ঔরসজাত যে কোন পুত্র সন্তান।
১৩. দুধ সম্পর্কীয় ছেলে, তার ছেলে, দুধ সম্পর্কীয় মেয়ের ছেলে এবং তাদের ঔরসজাত যে কোন পুত্র সন্তান। এবং দুধ সম্পর্কীয় মেয়ের স্বামী। (বুখারী শরীফ হাদীস নং ৫০৯৯, মুসলিম শরীফ হাদীস নং ১১৪৪)
১৪. চাচা অর্থাৎ, বাপের আপন এবং বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাই।
১৫. মামা অর্থাৎ, মায়ের আপন এবং বৈমাত্রেয় ও বৈপিত্রেয় ভাই। (সূরা নিসা-২৩)
উপরোক্ত পুরুষ এবং মহিলাগণ যাদের সাথে দেখা করতে বা দেখা দিতে পারবে তারা ছাড়া অন্য সমস্ত পুরুষ এবং মহিলার জন্য একে অপরকে দেখা বা দেখা দেওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েয এবং হারাম।
গায়রে মাহরামের আসল চেহারা দেখা যেখানে হারাম, সেখানে নকল চেহারা দেখা জায়িয হবে কিভাবে? অতএব টেলিভিশনের মাসআলাও এর দ্বারা বুঝে নেয়া যায় যে, “ পুরুষের জন্য গায়রে মাহরাম নারী দেখা আর নারীর জন্যে গায়রে মাহরাম পুরুষ দেখা সম্পূর্ণ হারাম”। তাছাড়া গায়রে মাহরাম আত্মীয়কে দেখা যেখানে হারাম, সেখানে অনাত্মীয় গায়রে মাহরাম টি, ভি তারকাদের দেখা কিভাবে জায়িয হবে? (মাজালিসে আবরার)
বি:দ্র: বর্তমান কতিপয় অসৎ আলেম বলে বেড়ায় যে মহিলাদের চেহারা ও হাত-পা পর্দার অন্তর্ভুক্ত নয়। বস্তুত এ একটা ধোঁকা। অনেক সহীহ হাদীসে পুরুষদেরকে পর মহিলাদের চেহারার দিকে তাকাতে নিষেধ করা হয়েছে। অনুরূপ সূরায়ে আহযাবের ৫৯ নং আয়াতে মহিলাদের পূর্ণ শরীর ঢাকতে বলা হয়েছে।