তেত্রিশ বছরের আটটি শিক্ষা

সংগ্রহ৭ জুন, ২০২৩আত্মশুদ্ধি

শাকীক বলখি রহ.। হিজরী ২য় শতকের খ্যাতনামা বুযুর্গ। যুহদ, তাকওয়া এবং ইবাদতে যিনি সময়ের সেরাদের একজন। দূর দূরান্ত থেকে লোকজন এসে শায়েখের সান্নিধ্যে পড়ে থাকেন। এ যেন আসহাবুস সুফফার অনুসারী দল। এ দলেরই একজন হাতেম আসাম রহ.। উপনাম আবু আব্দির রহমান। ইমাম যাহাবির মতে হাতেম আসাম রহ.-কে বলা হয় এই উম্মাতের লুকমান হাকীম।

৩৩ বছর যাবত তিনি শায়খ শাকীক বলখির সান্নিধ্যে আছেন। প্রতিনিয়ত শিখছেন, নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ছেন।

একদিন শায়েখের পক্ষ থেকে ডাক পড়লো হাতেম আসামের। শাকীক বলখি রহ. জিজ্ঞেস করলেন, আবু আব্দির রহমান! তোমার সাথে আমার এই পথ চলা কতদিনে গড়ালো? হাতেম আসাম রহ. উত্তর দিলেন, হযরত তেত্রিশ বছর। শাকীক বলখি রহ. একটু অবাক হয়ে বললেন, বলো কি! তেত্রিশ বছর? হাতেম আসাম রহ. বললেন, জ্বি, হযরত!

শাকীক বলখি রহ. এবার জিজ্ঞেস করলেন, তো এই তেত্রিশ বছরে আমার সুহবতে থেকে কী কী শিখলে? হাতেম আসাম রহ. খুব বিনয়ের সাথে বললেন, হযরত, আটটি জিনিস শিক্ষা লাভ করেছি। শাকীক বলখি রহ. অবাক হলেন। তারপর বললেন, আটটি! মাত্র আটটি? হাতেম আসাম রহ. বললেন, জ্বি হযরত। শাকীক বলখি রহ. খুবই আশ্চর্য হয়ে বললেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন! জীবনের তেত্রিশটি বছর তুমি আমার সাথে কাটিয়ে দিলে আর তুমি কিনা মাত্র আটটি বিষয় শিখেছো? আফসোস! তাহলে কী তোমার পেছনে আমার মেহনত সব বিফলে গেল?

এবার হাতেম আসাম রহ. বললেন, আসলে হযরত, আমি এই আটটি বিষয়-ই শিখেছি। এখন মিথ্যা তো আর বলা সম্ভব হচ্ছে না।

শাকীক বলখি রহ. বললেন, আচ্ছা, বলো দেখি কী সেই আটটি বিষয়, যা তুমি এতদিনে শিখলে। হাতেম আসাম রহ. বললেন,  জ্বি, বলছি।

হাতেম আসাম রহ. এবার তার তেত্রিশ বছর জীবনের সেই আটটি বিষয় বলা শুরু করলেন।

এক. আমি দেখলাম সমস্ত মাখলুকের মধ্যে কারো না কারো সাথে মহব্বত আছে (স্ত্রীর সাথে, সন্তান-সন্ততির সাথে, সম্পদের সাথে, বন্ধু-বান্ধবের সাথে ইত্যাদি)। কিন্তু আমি দেখলাম-যখন সে কবরে যায়, তখন তার প্রিয়জন তার নিকট থেকে পৃথক হয়ে যায়। এইজন্য আমি নেক আমলসমূহের সাথে মহব্বত করে নিলাম। যেন আমি যখন কবরে যাবো, তখন আমার প্রিয়জনও যেন আমার সাথে যায় এবং মৃত্যুর পরেও যেন সে আমার নিকট থেকে পৃথক না হয়।

হযরত শাকীক রহ. বলিলেন, অনেক ভাল করেছ।

দুই-আমি আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ কুরআন পাকে দেখেছি,

وَاَمَّا مَنۡ خَافَ مَقَامَ رَبِّہٖ

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি (দুনিয়াতে) আপন রবের সামনে (আখেরাতে) দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করেছে এবং নফসকে (হারাম) খায়েশ থেকে বিরত রেখেছে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। (নাযিআতঃ ৪০)

আমি বিশ্বাস করে নিয়েছি যে, আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ সত্য। আমি আমার নফসকে খাহেশাত থেকে অনবরত বিরত রেখেছি। অবশেষে সে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্যের উপর স্থির হয়ে গিয়েছে।

তিন-আমি দুনিয়াকে দেখেছি যে, প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট যে জিনিস বেশী মূল্যবান হয়, বেশী প্রিয় হয়, সে সেটাকে বড় সাবধানতার সাথে উঠিয়ে রাখে; এর হেফাজত করে। অতঃপর আমি আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ দেখলাম,

مَا عِنۡدَکُمۡ یَنۡفَدُ وَمَا عِنۡدَ اللّٰہِ بَاقٍ

অর্থাৎ, যাকিছু তোমাদের নিকট দুনিয়াতে আছে, তা শেষ হয়ে যাবে (চাই তা এমনিই নিঃশেষ হয়ে যাক অথবা তোমরা মৃত্যুবরণ কর-সর্ব অবস্থায় তা শেষ হয়ে যাবে)। আর যা আল্লাহ তা‘আলার নিকট আছে, সেটা সবসময় বাকী থাকবে। (নাহল: ৯৬)

এই আয়াত শরীফের কারণে যদি কোন জিনিস আমার নিকট কখনও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে এবং আমার বেশী পছন্দ হয়েছে, সেটা আমি আল্লাহ তা‘আলার নিকট পাঠিয়ে দিয়েছি। যাতে চিরদিনের জন্য তা সংরক্ষিত হয়ে যায়।

চার-আমি সারা দুনিয়াকে দেখেছি, (নিজের ইযযত ও বড়ত্বের জন্য) কেউ সম্পদের প্রতি আসক্ত হয়, কেউ বংশ মর্যাদার প্রতি। কেউ অন্য কোন গর্বের বিষয়ের প্রতি অর্থাৎ এইসব জিনিসের দ্বারা নিজের মধ্যে বড়ত্ব পয়দা করে এবং নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করে। আমি আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ দেখলাম,

اِنَّ اَکۡرَمَکُمۡ عِنۡدَ اللّٰہِ اَتۡقٰکُمۡ ؕ

আল্লাহ তা‘আলার নিকট তোমাদের সকলের মধ্যে বড় সম্মানী ঐ ব্যক্তি যে সর্বাপেক্ষা বেশী পরহেজগার। (হুজুরাতঃ ১৩) এই ভিত্তিতে আমি তাকওয়া অবলম্বন করেছি। যাতে আল্লাহ তা‘আলার নিকট সম্মানী হয়ে যাই।

পাঁচ-আমি লোকদেরকে দেখেছি, তাহারা পরস্পর দোষারোপ করে, দোষ তালাশ করে, গালিগালাজ করে। আর এই সবকিছু হিংসার কারণে হয়। একজনের প্রতি অপরজনের হিংসা হয়। আমি আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ দেখলাম,

نَحۡنُ قَسَمۡنَا بَیۡنَہُمۡ مَّعِیۡشَتَہُمۡ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَرَفَعۡنَا بَعۡضَہُمۡ فَوۡقَ بَعۡضٍ دَرَجٰتٍ لِّیَتَّخِذَ بَعۡضُہُمۡ بَعۡضًا سُخۡرِیًّا ؕ

অর্থাৎ, দুনিয়ার জীবনে তাদের রুজি আমিই বন্টন করে রেখেছি এবং (এই বন্টনের মধ্যে) আমি একজনকে অপরজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়া রেখেছি। যেন একজন অপরজন দ্বারা কাজ নিতে থাকে (যদি সকলে সমান, এক বরাবর, একই ধরনের হয়ে যায়, তবে একে অন্যের কাজ কেন করবে, কেন চাকুরি করবে-আর এইভাবে দুনিয়ার শৃংখলা নষ্ট হয়ে যাবে)। (যুখরুফ: ৩২)

আমি এই আয়াত শরীফের কারণে হিংসা করা ছেড়ে দিয়েছি। সমস্ত মাখলুক থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিয়েছি এবং আমি বিশ্বাস করে নিয়েছি যে, রুজি বণ্টন একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই হাতে। তিনি যার অংশে যে পরিমাণ ইচ্ছা দান করবেন-এইজন্য মানুষের প্রতি শত্রুতা ছেড়ে দিয়েছি। আর এটা বুঝে নিয়েছি যে, কারো নিকট সম্পদ বেশী অথবা কম হওয়ার ব্যাপারে তাদের মেহনতের কোন দখল নাই। এটা তো আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে বণ্টন হয়েছে। এইজন্য এখন কারো প্রতি গোম্বাই আসে না।

ছয়-আমি দুনিয়াতে দেখেছি-প্রায় প্রত্যেক ব্যক্তির কারোনা কারো সাথে ঝগড়া আছে, কারো না কারো সাথে শত্রুতা আছে। আমি চিন্তা করলাম, তখন দেখলাম যে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

اِنَّ الشَّیۡطٰنَ لَکُمۡ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوۡہُ عَدُوًّا ؕ

অর্থ: নিঃসন্দেহে শয়তান তোমাদের দুশমন। অতএব, তার সাথে দুশমনী রাখো (তাকে দোস্ত বানাইও না)। (ফাতির: ৬)

সুতরাং আমি শত্রুতা করার জন্য শয়তানকে নির্বাচন করেছি, আর তার নিকট থেকে দূরে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করি। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা যখন শয়তানকে শত্রু বলে দিয়েছেন, তখন আমি তাকে ছাড়া অন্যদের প্রতি শত্রুতা বর্জন করেছি।

সাত-আমি দেখেছি যে, সমস্ত মখলুক রুটি-রোজগারের তালাশে লেগে আছে। এরই কারণে নিজেকে অন্যদের সামনে অপমানিত করে এবং নাজায়েয পথ অবলম্বন করে। অতঃপর আমি দেখলাম যে,

وَمَا مِنۡ دَآبَّۃٍ فِی الۡاَرۡضِ اِلَّا عَلَی اللّٰہِ رِزۡقُہَا وَیَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّہَا وَمُسۡتَوۡدَعَہَا ؕ

অর্থাৎ, কোন প্রাণী জমিনের উপর বিচরণকারী এমন নাই, যার রুজি আল্লাহ তা‘আলার যিম্মায় না আছে। (হুদঃ ৬)

আমি দেখলাম যে, আমিও জমিনের উপর বিচরণকারীদের মধ্য থেকে একজন, যাদের রুজি আল্লাহ তা‘আলার জিম্মায় আছে। অতএব, আমি আমার সময়কে ঐ সমস্ত কাজে মশগুল করে নিলাম, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উপর জরুরী করা হয়েছে। আর যে জিনিস আল্লাহর জিম্মায় ছিল, তা থেকে আমি আমার সময়কে অবসর করে নিলাম।

আট-আমি দেখলাম যে, সমস্ত মাখলুকের আস্থা ও ভরসা এমন কোন বিশেষ জিনিসের উপর রয়েছে, যা নিজেই মাখলুক। কেউ নিজের সম্পত্তির উপর ভরসা করে, কেউ নিজের ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর ভরসা করে, কেউ নিজের হাতের কাজের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছে, কেউ নিজের শরীরের স্বাস্থ্য এবং শক্তির উপর (অর্থাৎ যখন ইচ্ছা যেভাবে ইচ্ছা কামাই করে নিবে)। আমি দেখলাম, আল্লাহ তা‘আলার ইরশাদ,

وَمَنۡ یَّتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ فَہُوَ حَسۡبُہٗ ؕ

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার উপর তাওয়াক্কুল (এবং ভরসা) করে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য যথেষ্ট। (তালাক:৩)

এইজন্য আমি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার উপর তাওয়াক্কুল ও ভরসা করে নিয়েছি।

হযরত শাকীক রহ. বলেন, হে হাতেম! আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে তৌফিক দান করুন। আমি তৌরাত, ইঞ্জিল, যাবুর ও কুরআন শরীফের ইলমসমূহ দেখেছি-সমস্ত ভাল ও কল্যাণের কাজ এই আটটি মাসআলার মধ্যেই পেয়েছি। অতএব, যে ব্যক্তি এই আটটি বিষয়ের উপর আমল করে নিবে, সে যেন আল্লাহ তা‘আলার চারটি কিতাবের বিষয়সমূহের উপর আমল করে নিলো। (ইমাম গাযালী; ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/৬৫,৬৬)

কুতুবুল আলম, শাইখুল হাদীস হযরত যাকারিয়া সাহেব রহ. বলেন, এই ধরনের ইলম আখেরাতের উলামায়ে কেরামই পেতে পারেন। দুনিয়াদার আলেম তো সম্পদ ও সম্মান হাসিল করার মধ্যেই লেগে থাকে।