সা‘দ সাহেবের অনুসারী ইতা‘আতীদের ব্যাপারে ফাতওয়া-০২
প্রশ্ন
বরাবর
ফাতাওয়া বিভাগ
জামি‘আ রাহমানিয়া আরাবিয়া
সাত মসজিদ, মুহাম্মাদপুর, ঢাকা-১২০
সা‘দ পন্থীদের কার্যক্রম পরিচালনা বিষয়ে ফাতাওয়া প্রসঙ্গে।
আপনার সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে,নিজামুদ্দিনের বিতর্কিত মাওলানা সা‘দ সাহেবের অনুসারী দিন দিন বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছেছেন। এ অবস্থায় উম্মতের বৃহত্তর স্বার্থে আপনার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন রাখছি।
মাওলানা সা‘দ সাহেবের অনুসারী যারা নিজেদেরকে নিজামুদ্দিনের অনুসারী বা মূলধারার বলে থাকে,তারা মসজিদে দাওয়াত ও তাবলীগের নামে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে তাদের এই কার্যক্রম মসজিদে চালানো বৈধ কি?
তাদের পরিচালিত কার্যক্রম তথা বয়ান,তালীম,মাশওয়ারা,মুযাকারা,গাশ্ত,ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ বা সমর্থন করা অথবা কোনভাবে সহযোগীতা করা শরীয়ত সম্মত হবে কি?
মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক বা মোতাওয়াল্লী কর্তৃক তাদেরকে কোনরকম কর্মসূচী পরিচালনা কারার অনুমতিদান বা সুযোগ প্রদান করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হবে কি?
নিবেদক
কাজী নাভিদ হুসাইন
রামপুরা বনশ্রী
০১৭৩৭-৫৩৯৫৬৫
উত্তর
باسمه تعالى
الجواب حامداومصلياومسلما
উল্লিখিত মাসাইলের শরঈ সমাধান
আল্লাহ তাআলা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কেউ স্বতন্ত্রভাবে অনুসরণীয় নয়। তবে যে ব্যক্তি শরীয়তের ইলমের অধিকারী এবং ইলম অনুযায়ী শরীয়তের বিধিবিধান বর্ণনা করে,তাকে একজন শরীয়তের আলেম হিসেবে এবং শরীয়তের বিধান বর্ণনাকারী হিসেবে অনুসরণ করা যাবে। স্বতন্ত্র অনুসরণীয় হিসেবে নয়। আনুগত্য শুধু মা’রূফ বা শরীয়তসম্মত বিষয়গুলোতে হতে পারে। শরীয়তবিরোধী কোন বিষয়ে আনুগত্য জায়িয নেই। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিভিন্ন শব্দে বহু সূত্রে বর্ণিত আছে,আল্লাহর অবাধ্যতা করে কোন মাখলুকাতের আনুগত্য করা যাবে না।(মুসনাদে আহমাদ-১০৯৫)।
কোন ব্যক্তিকে ঐ সময় পর্যন্ত অনুসরণ করা যাবে যতক্ষন পর্যন্ত সে কুরআন-সুন্নাহের উপর থাকে। আর যখন সে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী কথা বলবে তখন শরী‘আতের দৃষ্টিতে সে আর অনুসরণ যোগ্য থাকে না।
মাওলানা সা‘দ সাহেব এমন একজন আলেম, যিনি কুরআনের বিভিন্ন আয়াত ও নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিভিন্ন হাদীসের অপব্যাখ্যাকারী এবং যিনি নবী রাসূলের সমালোচনা করেন এবং উলামায়ে কেরাম থেকে জনসাধারণকে সম্পর্ক ছিন্নকারী বিভিন্ন বক্তব্য জনসম্মুখে উপস্থাপন করে উম্মাতের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করেন। কাজেই শরঈ বিধান মতে তিনি একজন বিভ্রান্ত লোক। আর বিভ্রান্ত ব্যক্তির অনুসারী ইতা‘আতীরাও বিভ্রান্ত ও গোমরাহ।
তাদের গোমরাহীর কয়েকটি কারণ নিম্নরূপ
১.তারা হক্কানী উলামায়ে কেরামের প্রতি বিদ্বেষ রাখে এবং তাদের গালি গালাজ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না,অথচ হাদীসে আছে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসিকী কাজ। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ৪৮]। উক্ত হাদীস মতে যেখানে একজন সাধারণ মুসলমানকে গালি দেওয়া ফাসেকী কাজ,সেখানে দেশের অসংখ্য আলেমকে গালাগাল করা কত মারাত্মক ধরনের গুনাহ, তা সহজেই অনুমেয়। অথচ হযরতজি ইলিয়াস রহ. বলেন: ‘আমাদের তাবলীগী কাজে যে-কোনো মুসলমানের মূল্যায়ন এবং উলামায়ে কেরামের প্রতি সম্মানবোধ বুনিয়াদি বিষয়। প্রত্যেক মুসলমানকে তার ঈমানের জন্যে এবং উলামায়ে কেরামকে তাঁদের ইলমে দ্বীনের মহাদৌলতের কারণে সম্মান করা উচিত।’ [মালফুযাতে মাওলানা ইলিয়াস, পৃষ্ঠা: ৫০]
২.তারা হক্কানী উলামায়ে কেরামের দ্বীনী মাদরাসাসমূহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আকাঙ্খা পোষণ করছে, যেমনটি ইসলাম বিদ্বেষীরা করে থাকে। জনসাধারণকে উলামায়ে কেরাম থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার অপচেষ্টা চালাচ্ছে,যে অপচেষ্টা ইহুদী-খ্রিস্টানরা করে যাচ্ছে।
৩.ব্যক্তি বিশেষের অনুসরণে তারা তাবলীগের বর্তমান পদ্ধতিকে দ্বীনের একমাত্র কাজ মনে করে দ্বীনের অন্যান্য কাজ তথা তা‘লীম তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধি ইত্যাদিকে খাটো ও হেয় প্রতিপন্ন করছে। সর্বোপরি নিজেদের হঠকারিতা বশত হক্কানী আলেমদের কথাগুলোকে মানতে পারছে না।
তাদের এজাতীয় আচার-আচরণ,কথা-বার্তা,চিন্তা-চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যার সামষ্টিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করে বলা যায়,বর্তমানের ইতা‘আতী নামক দলটি নিঃসন্দেহে একটি বাতিল দল। যদি সাধারণ মানুষ ইতা‘আতীদের সাথে উঠা-বসা করে কিংবা তাদের তালীমে বা বয়ানে বসে তাহলে উপরোক্ত একাধিক সমস্যায় জড়িত ইতা‘আতী ব্যক্তির সংশ্রবের প্রভাবে তাদের ঈমান-আক্বীদা বিনষ্ট হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। মসজিদ সঠিক দ্বীন প্রচার প্রসারের মারকাজ। এখানে বাতিল দলকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেয়ার অর্থই হল উম্মতের মাঝে গোমরাহী ছড়ানোর কাজে সহযোগিতা করা। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন,‘তোমরা নেক ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো। আর গুনাহ ও গোমরাহীর কাজে কেউ কাউকে সহযোগিতা করো না।’ [সুরা মায়েদা, আয়াত: ২]
কোনো মসজিদ-কমিটি যদি মসজিদে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেয় আর পরিণতিতে কেউ তাদের গোমরাহী চিন্তাধারার শিকার হয়,তাহলে এর জন্য সংশ্লিষ্ট মসজিদ কর্তৃপক্ষ অবশ্যই দায়ী হবে। মসজিদে সকল ধরণের মুসল্লির নামাজ পড়ার অধিকার থাকলেও দাওয়াতী কাজ একমাত্র হকপন্থী উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে পরিচালিত হতে হবে। কোন বাতিল দলের দাওয়াতী কাজ মসজিদে করতে দেয়ার সামান্যতম সুযোগ নেই। কাজেই মুসল্লীদের ঈমান আকীদার হেফাজতের স্বার্থে মসজিদ কমিটির জন্য ইতা‘আতীদের কার্যক্রমের সুযোগ দেয়া জায়েয হবে না এবং তাদের পরিচালিত কার্যক্রম তথা বয়ান, তালীম, মাশওয়ারা, মুযাকারা, গাশ্ত, ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ বা সমর্থন করা অথবা কোনভাবে সহযোগীতা করা শরীয়ত মতে বৈধ হবে না।
শরঈ দলীলসমূহ
قوله تعالى: فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ - الأنعام: 68
قوله تعالى: ولا تلبسوا الحق بالباطل و تكتموا الحق و انتم تعلمون - سورة البقرة : 42
صحيح البخاري (رقم الحديث:48)
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ.
صحيح البخاري (رقم الحديث100)
عن عبد الله بن عمرو بن العاص قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: «إن الله لا يقبض العلم انتزاعا ينتزعه من العباد، ولكن يقبض العلم بقبض العلماء، حتى إذا لم يُبقِ عالماً اتخذ الناس رءوسا جهالا، فسئلوا فأفتوا بغير علم، فضلوا وأضلوا»-
قال الإمام علي القارئ في «شرح الفقه الأكبر» (ص: 173):
وفي «الخلاصة»: من أبغض عالما من غير سبب ظاهر خيف عليه الكفر. قلت-القائل القارئ-: الظاهر أنه يكفر لأنه إذا أبغض العالم من غير سبب دنيوي أو أخروي فيكون بغضه لعلم الشريعة، ولا شك في كفر من أنكره فضلا عمن أبغضه.
مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح باب ما ينهى عنه من التهاجر(9/ 230) مكتبة رشيدية
قال الخطابي: رخص للمسلم أن يغضب على أخيه ثلاث ليال لقلته ولا يجوز فوقها إلا إذا كان الهجران في حق من حقوق الله تعالى فيجوز فوق ذلك..... قال: وأجمع العلماء على أن من خاف من مكالمة أحد وصلته ما يفسد عليه دينه أو يدخل مضرة في دنياه يجوز له مجانبته وبعده ورب صرم جميل خير من مخالطة تؤذيه.
فتاوی دارالعلوم دیوبندکتاب الحظر والاباحۃ(16/438)مکتبۂ دیوبند
جو لوگ تبلیغ اسلام میں حارج ہیں ان سے قطع تعلق کرنا
سوال: بھورا سقہ لوگوں کو تبلیغ اسلام کرتاہے، ایک خاکروب کو خدانے ہدایت دی اور بھورا سقہ کی نصیحت سے وہ مسلمان ہو گیا، مگر چند مسلمان مرد نومسلم اور بھوراسقہ کو ایذا پہنچانا چاہتے ہیں تاکہ نو مسلم پھر مرتد ہوجاوے اور بھورا سقہ آئندہ تبلیغ اسلام سے بازرہے، لہذا ایسے لوگ جو اس کام میں سدراہ ہوتے ہیں کیا اس قابل ہیں کہ اس کو مسلمان اپنے گورستان میں دفن سے اور مسجد میں آنے سے روک دیں،اور ان سے متارکت کردیں؟
الجواب: جو لوگ تبلیغ اسلام میں حارج ہیں اور مرد نومسلم اور بھوراسقہ کی ایذارسانی کے در پے ہیں وہ گنہ گار اور فاسق وفاجر ہیں،جب تک وہ اس حرکت سے توبہ نہ کریں، اور بازنہ آویں اس سے کسی قسم کا تعلق نہ رکھنا چاہیئے،اس کے علاوہ اور کوئی واسطہ یا میل جول ان سے نہ رکھے۔فقط کما قال تعالی فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
فتاوی دارالعلوم دیوبندکتاب الحظر والاباحۃ(16/439)مکتبۂ دیوبند
جو شخص علماء کو گالیاں دیتاہے اور بدعتی ہے اس سے میل جول رکھنا
سوال:جو شخص علماء کو گالیاں دے اور بدعتی ہو، اس کے ساتھ مواکلت ومجانست کرنا کیساہے؟ اور اس کی زوجہ نکاح سے نکل جائے گی یا نہ؟
الجواب: ایسا شخص جو علماء کو سب وشتم کرتاہے اور بدعات کا مرتکب ہے فاسق اور مبتدع ہے،مواکلت ومشاربت ایسے لوگوں کے ساتھ روا نہیں ،اور چونکہ تکفیر مسلم میں احتیاط تام لازم ہےاس لئے اس کے ارتداد کا اور بینونت زوجہ کا حکم نہ کیا جائے گا۔
فتاوی محمودیہ (2/243) (مکتبہ محمودیہ)
سوال: اگر کوئی مسلمان کسی عالم شریعت کو گالی دے یا دشمنی کے طور پر تمام علماء دین کو گالی دے جیسے کہ کہے علماء دین کے اندر بہت شر ہے یا یہ کہے کہ علماء بہت بد معاش ہیں تو ایسے آدمی کو شریعت کیا حکم دیتی ہے؟ آیا کافر یا فاسق یا منافق کوئ آدمی اگر کسی امام کو ناجائز طور پر گالی دے تو اس کا کیا حکم ہے؟
الجواب: گالی دینا معمولی مسلم کو بھی درست نہیں بلکہ فسق ہے سباب المسلم فسوق الحديث علماء حق کو اگر کسی ذاتی مخاصمت وغیرہ کی وجہ سے گالی نہیں دیتا بلکہ علماء حق ہونے کی وجہ سے گالی دیتا ہے تو ایمان کا سلامت رہنا دشوار ہے سوء خاتمہ کا قوی خطرہ ہے اس کو توبہ لازم ہے۔
ملفوظات حضرت مولانا الیاس رحمہ اللہ از مولانا منظور نعمانی ص 50 ملفوظ :54
اگر حضرت علماء توجہ میں کمی کریں تو ان کے دلوں میں علماء پر اعتراض نہ آنے پاے، بل کہ یہ سمجھ لیں کہ علما ہم سے بھی زیادہ اہم کام میں مشغول ہیں، وہ راتوں کو بھی خدمت علم مییں مشغول رہتے ہیں جب کہ دوسرے آرام کی نیند سوتے ہیں اور ان کی عدم توجہ کو اپنی کوتاہی پر محمول کریں کہ ہم نے ان کے پاس آمد و رفت کم کی ہے، اس لیے وہ ہم سے زیادہ ان لوگوں پر متوجہ ہیں جو سالہا سال کے لیے ان کے پاس آپڑے ہیں۔
پھر فرمایا-
ایک عامی مسلمان کی طرف سے بھی بلا وجہ بدگمانی ہلاکت میں ڈالنے والی ہے اور علما پر اعتراض تو بہت سخت چیز ہے۔
پھر فرمایا- ہمارے طریقۂ تبلیغ میں عزت مسلم اور احترام علما بنیادی چیز ہے، ہر مسلمان کی بوجہ اسلام کے عزت کرنا چاہیےاور علما کا بوجہ علم دین کے بہت احترام کرنا چاہیے۔
پھر فرمایا کہ علم اور ذکر کا کام ابھی تک ہمارے مبلغین کے قبضے میں نہیں آیا، اس کی مجھے بڑی فکر ہے اور اس کا طریقہ یہی ہے کہ ان لوگوں کو اہل علم اور اہل ذکر کے پاس بھیجا جاے کہ ان کی سرپرستی میں تبلیغ بھی کریں اور ان کے علم و صحبت سے بھی مستفید ہوں۔
واﷲ اعلم بالصواب
الاعداد
مشتاق أحمد ابن سعيد احمد
المتدرب بدار الافتاء (السنة الثانية)
الجامعة الرحمانية العربية محمد بورداكا
المؤرخة17 \6\1446هـــ21 \12\2024مــ