উপযুক্ত বয়সে বিবাহ করা চাই

মুফতী মনসূরুল হক সাহেব৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫বিবাহ তালাক

প্রশ্ন

(১) আমাদের সমাজে দেখা যায়, বিয়ের ব্যাপারটা খুব কঠিন করে রাখা হয়েছে। যেমন, বিভিন্ন রকম সামাজিকতা পালন করা, আর্থিক সচ্ছলতা এবং বড় বোনকে বিয়ে দেয়া হয়নি বলে ছোট ভাই-বোনের বিয়েতে অনেক বিলম্ব করা। এসব কারণে পিতাও অনেক ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের বিবাহে বাধা দান করে। উপরোক্ত কারণে আমি সময়মত বিয়ে করতে পারিনি, যার জন্য আমার অনেক অন্যায় কাজের শিকার হতে হয় যেমন হস্তমৈথুন ইত্যাদি। এক্ষেত্রে আমার জানার বিষয় হল (ক) বিয়ের ব্যাপারে ইসলাম আমাদেরকে কতটুকু স্বাধীনতা দিয়েছেন (খ) উপরের বিভিন্ন বাধা-নিষেধ উপেক্ষা করে আমি কিরূপ বয়সে বিয়ে করতে পারতাম? এখন কি বিয়ে করতে পারব? যদি পারি, তাহলে কিভাবে? (গ) চরিত্র রক্ষার্থে উপরের বাধা-নিষেধের ব্যাপারে ইসলাম কী নীতি গ্রহগ করেছে?

(২) জনৈক ব্যক্তি চাকুরীজীবী তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়েন। বড় ভাইয়ের আগে তিনি নিজে বিয়ের প্রস্তাব রাখেন। বড় ভাই অবিবাহিত থাকার কারণে তার পিতা রাযী ছিল না। কিন্তু পরে তিনি আগেই বিয়ে করে নিয়েছেন। এ জন্য তার পিতা মনক্ষুণ্ণ হয়েছেন এবং তাকে বাড়ি উঠতে দিচ্ছেন না। এরূপ বিয়ে করাটা কি ইসলামের দৃষ্টিতে দোষণীয়? আর তাকে বাড়িতে না উঠতে দেয়া কি পিতার ঠিক হয়েছে?

উত্তর

(১) (ক) যদি কোন ব্যক্তির পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে, সাথে সাথে সে নিজে স্ত্রীর মহর ও ভরণ-পোষণ আদায়ে ক্ষমতা রাখে এবং স্ত্রীর সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে চলার যোগ্যতাও থাকে, তাহলে উক্ত ব্যক্তির উপর বিবাহ করা ওয়াজিব। এক্ষেতে ইসলাম ছেলেদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। সুতরাং, মাতা-পিতাকে জানিয়ে তাদের সম্মতিতে বিবাহ করতে চেষ্টা করবে।

কিন্তু তারা যদি এ ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে স্বীয় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের অনুমতির প্রয়োজন নেই। আর যদি পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার সম্ভবনা না থাকে এবং উপরোল্লেখিত শর্তগুলোও মওজুদ থাকে, তাহলে বিবাহ করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। এক্ষেত্রেও মাতা-পিতার অনুমতি ও পরামর্শক্রমে বিবাহ করা ভাল। যদি তারা রাযী না হয় তাহলে এ ক্ষেত্রে ইসলাম ছেলেদের বিবাহ করার স্বাধীনতা দিয়েছে।

(খ) আপনি যেহেতু বিবাহ না করার দরুণ গুনাহের কাজে লিপ্ত, তাই পিতার বাধা-নিষেধ ও বাহানাকে উপেক্ষা করে বিবাহ করতে পারতেন। এখনও বিবাহ করতে পারেন, বরং আপনার জন্য অবিলম্বে বিবাহ করা অত্যন্ত জরুরী। আপনার বিবাহ করার পদ্ধতি এই যে, আপনি কারো মাধ্যমে আপনার পিতাকে বুঝাতে চেষ্টা করুন যে, সামাজিকতা পালন করা, বিপুল পরিমাণ অর্থের অধিকারী হওয়া, ছোট বড় বোনদেরকে বিবাহ দিয়ে পরে বিবাহ করা ইত্যাদি শরী’আতে কোন জরুরী বিষয় নয়। এগুলো সম্পূর্ণ মুর্খতা ও কু-প্রথা মাত্র। যদি পিতাকে বুঝানোর পর তিনি রাযী হয়ে যান তাহলে ভালো। অন্যথায় পিতার বাধা উপেক্ষা করেই বিবাহ করে নিন।

(গ) চরিত্র রক্ষার্থে পিতার বাধা সত্বেও বিবাহ করা জরুরী। পিতা-মাতা শরী‘আতের গন্ডির মধ্যে থেকে কোন হুকুম করলে তা মান্য করা জরুরী। কিন্তু শরী‘আতের বরখেলাপ হুকুম করলে তা মান্য করা জায়েয নয়। কেননা, হাদীস শরীফে এসেছে- “আল্লাহর নাফরমানী করে কোন মাখলূকের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা জায়েয নয়।” [বুখারী, ২:৬২২/মিশকাত শরীফ, ৩২১]

আর পিতার জন্য এক্ষেত্রে বাঁধা দেয়াও ঠিক নয়। কেননা, হুযূর ﷺ ইরশাদ করেছেন, “সন্তান যখন বিবাহের উপযুক্ত হয়, তখন বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি বিবাহ করানো পিতার কর্তব্য। আর এমন অবস্থায় যদি পিতা সন্তানদের বিবাহ শাদীর কাজ সমাধা না করে, তাহলে তারা কোন খারাপ কাজে লিপ্ত হলে, পিতাও ঐ গুনাহের মধ্যে শামিল হবে” সুতরাং, ইসলামী নীতি অনুযায়ী উপযুক্ত বয়সে ছেলেদের বিবাহ করানো পিতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ দায়িত্ব আদায় না করে বরং বিবাহ করতে বাধা দেয়া পিতার জন্য চরম মূর্খতা ও গুনাহের কাজ।

উল্লেখ্য সে, হস্তমৈথুন হারাম ও লা‘নত যোগ্য পাপ। যারা এরকম করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টি করবেন না এবং তাদের আঙ্গুলগুলো গর্ভবর্তী হবে এবং তারা চরম অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। তাই আল্লাহর দরবারে খালিস তাওবা করা আপনার জন্য জরুরী। আর আপনার জন্য উচিত ছিল হস্থমৈথুন না করে লাগাতার রোযা রাখা। কেননা হাদীস শরীফে আছে এক্ষেত্রে রোযা রাখা প্রবৃতি দমনের উত্তম পন্থা।

[প্রমাণঃ মিশকাত শরীফ, ২:২৬৭-২৭২ #সুরা মু‘মিন ৩-৪ #মিশকাত, ২:৩২১ #শামী, ৩:৬ আযীযুল ফাতাওয়া ৪৬৬, রহীমিয়া ৫:২২৫]

(২) বড় ভাই বিবাহ না করলে ছোট ভাই বিবাহ করতে পারবে না- এমন কোন বিধান শরী‘আতে নেই। এটা সম্পূর্ণ মূর্খতা ও একটি কু-প্রথা মাত্র। তাই জনৈক চাকুরীজীবীর এ মুহূর্তে বিবাহ করাটা ইসলামের দৃষ্টিতে কোন প্রকার দোষণীয় নয়। আর এ জন্য পিতার উক্ত ছেলেকে বাড়ীতে না উঠানো ঠিক হয়নি। এমনকি এজন্য পিতা মনক্ষুণ্ণ হওয়ার অধিকারও রাখেন না। কারণ সন্তান বালিগ হওয়ার পর তাকে বিবাহ করানো পিতার কর্তব্য ছিল। হাদীস শরীফে আছে- “যখন সন্তান জন্মগ্রহণ করে তখন অভিভাবকের কর্তব্য হল তার ভাল নাম রাখা এবং আদব বা সুন্নাত শিখানো। অতঃপর যখন সে বালিগ হয়, তখন তার বিবাহের কাজ সম্পন্ন করা। আর যদি বালিগ হওয়ার পরও তাকে বিবাহ না করায়, আর ঐ সন্তান যদি এ সংক্রান্ত কোন গুনাহে লিপ্ত হয় তাহলে অভিভাবকও তার ঐ গুনাহের অংশীদার হবে”।

[প্রমাণঃ মিশকাত শরীফ ২:২৬৭, ২৭১ ও ৩২১ #দূররে মুখতার,৩:৬ #ফাতাওয়া শামী ২:২৮৩ #বাদায়িউস সানায়ি, ২:২২৮ #ফাতাওয়া রহীমিয়া, ৫:২৫৭]

উপযুক্ত বয়সে বিবাহ করা চাই | ইসলামী যিন্দেগী