ফাযায়েলে আমাল

মুফতী মনসূরুল হক সাহেব১৫ অক্টোবর, ২০২৫সুন্নত, উলামা তোলাবা

প্রশ্ন

আমি ফাযায়েলে আমাল পড়তে গিয়ে একটি হাদিস পেলাম যেটা অন্য একটা হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক মনে  হচ্ছে,  তাহলে ফাযায়েলে আমালের হাদিস টি কি ঠিক আছে? বা এটার মান কেমন?

১।  ফাযায়েলে আমাল, পৃষ্ঠা ১০০১

অর্থঃ হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আরজ করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সৎকাজ নিজেরা পুরাপুরি পালন না করা পর্যন্ত সৎকাজের আদেশ করিব না এবং অন্যায় কাজ হতে নিজেরা পুরাপুরি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করবো না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, এমন নয়, বরং তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে, যদিও নিজেরা সকল প্রকার সৎকাজের পাবন্দী না করতে পারো, এবং মন্দকাজে অন্যদেরকে বাধা প্রদান করবে যদিও নিজেরা মন্দকাজ হতে পুরাপুরি বাঁচতে না পার।  [বাংলা ফাযায়েলে আমল-১০০১]

 

২। আবু যায়দ উসামাহ ইবনে যায়দ ইবনে হারেসাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেখানে তার নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে যাবে এবং সে তার চারিপাশে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেমন গাধা তার চাকির চারিপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামীরা তার কাছে একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, ওহে অমুক! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না (আমাদেরকে) সৎ কাজের আদেশ, আর অসৎ কাজে বাধা দান করতে? সে বলবে, অবশ্যই। আমি (তোমাদেরকে) সৎকাজের আদেশ দিতাম; কিন্তু আমি তা নিজে করতাম না এবং অসৎ কাজে বাধা দান করতাম; অথচ আমি নিজেই তা করতাম! [বুখারি৩২৬৭, ৭০৯৮, মুসলিম ২৯৮৯, আহমদ ২১২৭৭, ২১২৮৭, ২১২৯৩, ২১৩১২]

উত্তর

ফাযায়েলে আমলে বর্ণিত হাদীসটির আরবী পাঠ হল,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: قُلْنَا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، لَا نَأْمُرُ بِالْمَعْرُوفِ حَتَّى نَعْمَلَ بِهِ، وَلَا نَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ حَتَّى نَجْتَنِبَهُ كُلَّهُ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «بَلْ مُرُوا بِالْمَعْرُوفِ، وَإِنْ لَمْ تَعْمَلُوا بِهِ كُلِّهِ، وَانْهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ، وَإِنْ لَمْ تَجْتَنِبُوهُ كُلَّهُ»

হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা আরজ করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সৎকাজ নিজেরা পুরাপুরি পালন না করা পর্যন্ত সৎকাজের আদেশ করিব না এবং অন্যায় কাজ হতে নিজেরা পুরাপুরি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করবো না। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, এমন নয়, বরং তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে, যদিও নিজেরা সকল প্রকার সৎকাজের পাবন্দী না করতে পারো, এবং মন্দকাজে অন্যদেরকে বাধা প্রদান করবে যদিও নিজেরা মন্দকাজ হতে পুরাপুরি বাঁচতে না পার।  [আলমু’জামুল আওসাত, তাবারানীকৃত, হাদীস নং-৬৬২৮, আলমু’জামুস সগীর, তাবরানীকৃত, হাদীস নং-৯৮১]

উক্ত হাদীসটির ব্যাপারে আল্লামা মুনাভী রহঃ ফায়জুল কাদীরে বলেন,

قال الحافظ: فيه عبد القدوس بن حبيب أجمعوا على ضعفه وقال الهيثمي: رواه الطبراني في الصغير والأوسط من طريق عبد السلام بن عبد القدوس بن حبيب عن أبيه وهما ضعيفان

হাফেজ ইবনে ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ বলেন, উক্ত বর্ণনায় আব্দুল কুদ্দুস বিন হাবীব নামে রাবী রয়েছে। যার ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, তিনি দুর্বল বর্ণনাকারী। আল্লামা হায়ছামী রহঃ বলেন, উক্ত বর্ণনাটি তাবারানী রহঃ তার মু’জামে সগীর ও আওসাতে আব্দুস সালাম বিন আব্দুল কুদ্দুস বিন হাবীব তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। এ উভয়জনই দুর্বল রাবী। [ফায়জুল কাদীর-৫/৫২২, হাদীস নং-৮১৭৭]

হাদীসটি দ্বারা উদ্দেশ্য কী? আল্লামা মুনাভী রহঃ এর ব্যাখ্যায় বলেন,

لأنه يجب ترك المنكر وإنكاره فلا يسقط بترك أحدهما وجوب الآخر ولهذا قيل للحسن فلان لا يعظ ويقول أخاف أن أقول ما لا أفعل قال وأينا يفعل ما يقول؟ ود الشيطان لو ظفر بهذا فلم يأمر أحد بمعروف ولم ينه عن منكر

দু’টি বিষয় ব্যক্তির উপর আবশ্যক। এক হল, নিষিদ্ধ বিষয় ছেড়ে দেয়া, আরেকটি হল, নিষিদ্ধ বিষয়ের বাঁধা প্রদান। সুতরাং একটি করতে না পারার কারণে আরেকটি বাতিল হবে না। তথা নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত না থাকার কারনে, বাঁধা প্রদানের দায়িত্বমুক্ত হবে না।

এ কারণেই হযরত হাসান বসরী রহঃ কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, ওমুক ব্যক্তি কোন উপদেশ দেয় না, আর বলে যে, আমি ভয় পাই যে, এমন বিষয় আমি বলবো, যা আমি নিজে করি না।

তখন হাসান রহঃ জবাবে বললেন, সে যা বলে তা আর করলো কোথায়? শয়তানতো এটাই কামনা করে যে, যদি এতে সফলকাম হয়ে যায়। তাহলে আর কেউ সৎকাজের আদেশ করবে না, এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে না। [ফাতহুল কাদীর-৫/৫২২]

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা একথা বুঝা গেল যে,

১ ফাযায়েলে আমালে বর্ণিত হাদীসটি দুর্বল।

২ হাদীসটি দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মুসলমানদের উপর দু’টি দায়িত্ব। যথা-

ক) হারাম কাজ বর্জন করা।

খ) হারাম কাজ সংগঠিত হতে বাঁধা প্রদান করা।