চক্ষু, রক্ত ইত্যাদি দান করা
Question
মানুষের চক্ষু, রক্ত ও অন্যান্য অঙ্গ দান বা ক্রয়-বিক্রয় করা জায়িয আছে কিনা? আজকাল মরণোত্তর চক্ষুদান দ্বারা সমাজের অন্ধ মানুষের অনেক কল্যাণ সাধিত হচ্ছে। শরী‘আতের দৃষ্টিতে তা কতটুকু বৈধ? দলীল-প্রমানসহ জানতে চাই।
Answer
কোন কিছুর প্রচলন ব্যাপক হওয়া তা জায়িয হওয়ার দলীল নয়। যেমন, সুদ, ঘুষ, ও ব্যভিচার ও যামানায় ব্যাপক হয়ে গিয়েছে তাই বলে এ সবকে জায়িয বলা যায় না। তেমনি কোন কিছুর মধ্যে ফায়দা থাকলেই তা জায়িয হয় না। যেমন, চুরি, ডাকাতি, লুণ্ঠন, ইত্যাদির মধ্যে ফায়দা দেখা গেলেও এর কোনটাই জায়িয নয়। উল্লেখিত বিষয়টির অবস্থাও তাই। যদিও বর্তমানে মরণোত্তর চক্ষুদান সর্বস্তরে ব্যাপকতা লাভ করেছে। কিন্তু শরী‘আতের দৃষ্টিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হল, চক্ষু বা (রক্ত ব্যতিত) শরীরের যে কোন অঙ্গ দানের অসীয়ত করা বা ক্রয়-বিক্রয় করা হারাম ও নাজায়িয।
দলীলসমূহঃ
(ক) আল্লাহ পাক বলেন, “আমি (সমগ্র জীবের মধ্যে) মানব জাতিকে (সবচেয়ে) সম্মানী করে সৃষ্টি করেছি”। (সূরা বাণী-ইসরাঈল ৭০) “পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টি জীবই মানুষের খাদিম হিসাবে আল্লাহ তা‘আলা তৈরি করেছেন”। (সূরা বাক্বারা)। সুতরাং, অন্য জিনিস-পত্রের ন্যায় মানব অঙ্গের লেনদেন ও ক্রয়-বিক্রয় মানব জাতির সম্মান ও মর্যাদার পরিপন্থী।
(খ) আল্লাহ পাক মানুষের অঙ্গসমূহকে তাদের উপকারার্থে তাদের নিকট আমানত হিসাবে দিয়ে নির্ধারিত ক্ষেত্র সমূহে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। মানুষ সে সবের প্রকৃত মালিক নয়। এ কারনেই আত্নহত্যা হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং অত্যন্ত ক্ষুধা বা পিপাসার সময় মৃত জানোয়ার অথবা যে কোন হারাম জিনিষ দ্বারা হলেও প্রান রক্ষা করা ওয়াজিব করা হয়েছে। তাই তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বেচা-কেনা বা দান করার কোনই অধিকার তার নাই। কারন, বেচা-কেনা ও দানের জন্য মালিকানা জরুরী।
(গ) রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, “ মৃত ব্যক্তির হাড় ভেঙ্গে দেয়া জীবিত ব্যক্তির হাড় ভাঙ্গার সমান অপরাধ”। (আবু দাউদ শরীফ)। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি জীবিতের ন্যায় কষ্ট অনুভব করে। যদিও প্রকাশ করতে পারে না। আর এর দ্বারা জীবিত ব্যক্তির ন্যায় মৃত ব্যক্তির অসন্মানী করা হয়। (মিশকাত)
(ঘ) হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, হুযুর ﷺ -এর হিজরতের সময় তুফাইন বিন আমর দাউসী রা. হিজরত করেন এবং তার সাথে তার গোত্রের এক ব্যক্তিও হিজরত করেন। অতঃপর সেই ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় অধৈর্য্য হয়ে ছুরি দ্বারা নিজ আঙ্গুল কেটে ফেলেন। ফলে অধিক রক্তক্ষরণ হয়ে লোকটি মারা যান। তুফাইল রা. স্বপ্নে তার সাক্ষাৎ লাভ করে তার হাত আবৃত অবস্তায় দেখতে পান। তখন তুফাইল রা. জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহ পাক আপনার সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন? তিনি বললেন, হিজরতের কারনে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন।
অতঃপর তুফায়েল রা. জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার হাত আবৃত কেন? তিনি বললেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে বলা হয়েছে, যে অঙ্গ তুমি নষ্ট করে এসেছ, সেই অঙ্গ আমি দুরস্ত করে দেব না। তুফাইল রা. হুযুর ﷺ -এর দরবারে ঘটনা আরজ করলেন। হুযুর ﷺ দু‘আ করলেন, হে খোদা! হাতের ব্যাপারে তাকে ক্ষমা করো। (মুসলিম শরীফ)
(ঙ) ফাতওয়ার কিতাবে বর্নিত আছে, “মানুষের চুল বিক্রয় করা নাজায়িয এবং তার দ্বারা উপকৃত হওয়াও নাজায়িয। কারন মানুষ সম্মানিত”। (হিদায়া,শামী আলমগীরী) তবে স্বেচ্ছায় রক্তদানের বিষয়টি এর ব্যতিক্রম। শরী‘আতের দৃষ্টিতে রক্তদান করা জায়িয। দুধের সাথে সাদৃশ্য হওয়াই রক্তদানের বৈধতার কারন। তাই মাতা যেমন অন্যের সন্তানকে দুধপান করাতে পারেন, তেমনি কোন ব্যক্তি ঠেকার সময় তার রক্ত অন্যকে দান করতে পারেন। কিন্তু রক্তের বিনিময় গ্রহণ করা হারাম। কারন- রক্ত বিনিময়যোগ্য মাল নয়। (জাওয়াহির)
শরী‘আতের বিধি-নিষেধে সংকটের কোনই কারন নেই। কারণ, চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ যদি মানব অঙ্গের বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে জড় পদার্থ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রানী নিয়ে গবেষণা করেন, তাহলে তা থেকে ইস্পৃত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হওয়া মোটেও অসম্ভব নয়। আর তা মানব কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়া সম্পুর্ন শরী‘আত সম্মত পদ্ধতিতে হতে পারে। প্রমান স্বরূপ প্লাষ্টিকের বৈজ্ঞানিক সংস্কারের কথা উল্লেখ করা যায়। যা দ্বারা মানুষ বর্তমানে অনেক উপকৃত হচ্ছে। তেমনিভাবে বিভিন্ন প্রাণীর নানা প্রকার অঙ্গ দ্বারা উপকার লাভ প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। কিন্তু যদি শরী‘আতের এ বিধানের প্রতি অবহেলা দেখিয়ে আল্লাহ তা‘আলার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা হয় তাহলে সে দিন আর বেশী দূরে নয়, যে দিন সুস্থ-সবল ব্যক্তির কিডনী, চক্ষু ইত্যাদি অপর মানুষের শোভা বর্ধনে লাগানো হবে, গরীবদের এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধনীদের কাছে বিক্রি হবে এবং পর্যায়ক্রমে এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ লুণ্ঠন বা হাইজ্যাক হওয়াও বিচিত্র নয়। বরং বর্তমানে পত্র-পত্রিকা এসব আশংকাকে বাস্তব বলে প্রমান করেছেন। দুর্বৃত্তরা ইদানিং সুস্থ-সবল লোকদের ধরে সমুদ্রবক্ষে নিয়ে তাদের শরীরের দামী অংশ নিয়ে দেহের অবশিষ্টাংশ সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে। এরূপ ঘটনা পত্রিকায় অনেক ছাপা হয়েছে।