একাধিক বিয়ে

মুফতী মনসূরুল হক সাহেব২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬বিবাহ তালাক

প্রশ্ন

গত ৯ বছর যাবৎ আমি এক জনের সাথে সংসার করছি আমার ২ টা মেয়ে আছে ১ম টির বয়স ৪ বছর ১ মাস  এবং ২য় টির ১৫ দিন। গত ২ বছর আগে আমি আমার স্ত্রীকে ডির্ভোস দিয়েছিলাম, কারন- সে ইসলামি অনুশাসন মেনে চলতে চাইত না , আমার দাঁড়ি রাখাটা সহ্য করতে পারত না এই নিয়ে টানা ৭ দিন রান্না করেনি বাসায়, পর্দার ঘোর বিরধীতা করত এবং আমার পরিবারের সবার সাথে আচরন টাও বেশ খারাপ ছিল  বিশেষ করে আমার বাবা-মাকে একেবারেই সহ্য করত না, এমন কি কিছু কিছু বিষয়ে আমার নবীজীর ও ভূল ধরার চেষ্টা করে( নাউজুবিল্লাহ)। তাকে কিছু বললেই সে আত্নহত্যা করার চেষ্টা করেছে বহুবার। এইসব ওর পিতামাতা কে জানালে ও আমাকে ই ঠিক হতে বলে এবং  আমার দাঁড়ি কেটে ফেলতে বলে ।

শেষে কোন উপায় না পেয়ে তাকে তালাক দিয়েছিলাম পরে তার পরিবার বিভিন্ন ভাবে বলতে লাগল আর এমন করবে না বলে ক্ষমা চাইতে ছিল শেষে সব দিক ভেবে দেখলাম যদি ভাল হয়ে যায় শুকরিয়া তাছাড়া বাচ্চার কথাও চিন্তা করে ২ পরিবার বসে একটা সমাধানে আসলাম এবং আবার তাকে আমার বাসায় নিয়ে আসলাম।

আলহামদুলিল্লাহ, এখন সে ১০০% না হলেও ৮৫% ভাল হয়ে গেছে। এবং আমি ও ধরে নিয়েছি এর চাইতে বেশি সোজা করতে গেলে একসময় ভেঙ্গে যাবে, সুতরাং এতটুকুই মেনে নিয়েছি।        

এরই মাঝে আর একটা কথা বলি আমি প্রথম থেকেই ইর্য়ারকির ছলে মাঝে মাঝেই আমার স্ত্রীকে বলে আসছি যে আমি ২টা বিয়ে করব।  

যাইহোক, এখন আমি আমার অতীত বলি- যখন মাদ্রাসায় পড়তাম ২০০৪ সালে তখন এক মেয়ের কাছ থেকে অফার পেয়েছিলাম প্রথম দিকে রাজী না থাকলেও বন্ধুদের চাপে পরে এক সময় হাঁ বলে দিয়েছিলাম এরপর টানা ১.৫ বছর ওর সাথে বেশ ভালই ছিলাম যখন ওর বাড়িতে সব জেনে যায় তখন তার পড়াশুনা বন্ধ করে দেয় (তার পরিবার খুবই ধার্মিক) তখন তো চিঠি ছাড়া আর কোন যোগাযোগ মাধ্যম ছিল না সুতরাং ওর সাথে চিঠি ছাড়া আর কোন ভাবে যোগাযোগ হত না চিঠিতে আরো ১.৫ বছর যোগাযোগ ছিল। উল্লেখ থাকে যে- ওর সাথে ৩ বছরে সব মিলিয়ে ২/৩ বার দেখা হয়েছে এর মাঝে একদিন আমি শয়তানের পাল্লাই পড়ে ওর আঙ্গুল ধরেছিলাম এর বেশি কোন নষ্টামী আমাদের কাছে আসতে পারেনি।

যাইহোক, ২০০৬ সালে আমার বয়স ১৭ বছর হবে তখন আমি তাকে বিয়ে করার জন্য বার বার বললেও সে বলছিল আগে অন্ততো কিছু একটা কর তারপর বিয়ে, এদিকে আমার পরিবারও ২.৫ বছর আগেই জেনে গেছে, আমার মানষিক অবস্থা দেখে বিয়ের জন্য কিছুটা চেষ্টা করলেও তার পরিবার বিভিন্ন ভাবে আমার বাবাকে থেট করেছিল এবং কি কি সব বাজে কথা বলেছিল যা আমার কাছে খুব খারাপ লেগেছিল এবং আমি সেইদিনই  তার সাথে দেখা করে জানতে চাইলে সে কেমন কেমন যেন কথা বলেছিল যা আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তখন পড়ার উদ্দেশ্যে রাগ করে রাজশাহী চলে যাই । সে নিজেও তখন আমাকে চিঠির মাধ্যমে শহরে পড়তে যেতে বলেছিল এবং আমিও তাই করেছিলাম কিন্তু 5/7 দিন পরেই শুনলাম আমি শহরে চলে এসেছি এটা সে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছে না সে এটা খুব খারাপ ভাবে নিয়েছিল মানে সে চেয়েছিল গ্রামের কোন কলেজে পড়ি এবং কাছাকাছি থাকি।

আর আমার বড় ভাইসহ আব্বা চেয়েছিল আমি শহরে পড়তে গেলে হয়ত ঐ মেয়েকে আস্তে আস্তে ভুলে যাব।

যাইহোক, তখন থেকে ওর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা অনেক করেছি কিন্তু সে চলে আশা বিষয়টা কে এত বড় করে নিয়েছে যার দরুন আর আমার সাথে ঠিক ভাবে যোগাযোগ করছিল না আমি বেশ কয়েকবার শহর থেক দেশে গেছি তার সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলব বলে কিন্ত সে আমার  সাথে দেখা করেনি।

এভাই কেটে গেল ১ বছর তখন ২০০৭ সাল আমি মোবাইল কিনেছি।  

কি ভাবে কি ভাবে যেন ওর সাথে মানুষের ফোনে একদিন কথা বলার সুযোগ হয় কিন্তু একি সে ১ বছর আগে যতটা না রাগ করেছিল তার চেয়ে কয়েকশত গুন বেশি রাগ করেছে আমি ফোন দিয়েছি দেখে। কোন কথাই বলার সুযোগ সেদিন সে আমায় দেয়নি শেষে আমি বলেছিলাম তুমি এমন করলে আমি চলে আসব সে বলে আসলে আসতে পার তবে এসে আমাকে পাবে না। তখন আমি বলেছিলাম তাহলে আমি একা একা এখন কি করব সে বলে যা খুশি করতে। সেই কথাই শেষ কথা আর কোন দিন তার সাথে আমার কথা হয়নি তবে একজনের মাধ্যমে খবর দিয়েছে আমি যেন তাকে ভুলে গিয়ে অন্য কোথাও বিয়ে করে নিই।

এভাবে একা একা থাকার পর আমি ২০০৯ সালে পারিবারিক ভাবেই বিয়ে করি আমার বর্তমান স্ত্রীকে। আমার পরিবারে সবাই মোটামুটি ধার্মিক শুধু আমি ছিলাম না মাঝে মাঝে নামাজ ধরতাম ছাড়তাম তবে ২০১২ সালের ১ম দিক থেকেই অন্য একটি কারনে আলহামদুলিল্লাহ এখন আমি চেষ্টা করি এবং আছি পুরোপুরি ইসলামের মাঝেই থাকার।

সংসার জীবন এভাই কেটে গেল ৭ টা বছর কোন দিন আর পিছু ফিরে তাকাইনি বা জানতেও চাইনি সে কেমন আছে তবে গত ১.৫ বছর আগে আমার এক বন্ধু জানাল এখন থেকে ৪.৫ বছর  আগে তার বিয়ে হয়েছিল এক লোকের সাথে সে ঐ লৌককে পছন্দ না করার দরুন ৩ দিন ছিল সেই বাড়িতে এবং ২৮ দিনের মাথাই তাদের ডির্ভোস হয়ে গেছে। এবং এখন সে পাড়াতেই মহিলাদেরক কুরআন শিক্ষা দেয় যা পাই তাই দিয়ে চলে তার জীবন। আর একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার- ওর পিতা-মাতা উভয়েই থেকেও নাই মানে সে যখন ছোট ছিল তখন তার পিতা মাতার সর্ম্পক টিকেনি এখন তারা ২জনেই আলাদা আলাদা সংসার করে আর সে নানার বাসায় থাকে।

সংসার চাকরী পরিবার পরিজন নিয়েই কেটে গেল ১০ বছর কয়েক মাস এর মাঝে প্রথম দিকে খুব মনে পড়লেও আস্তে আস্তে অনেক স্মৃতিই তো ভূলে গেছি।

এত কিছু কেন বললাম এবার শুনুন- গত ১৫-০৫-২০১৬ তাং এ অফিসে আসছিলাম সকাল ৮.৪৫ মিনিট একটা ফোন আসল  

অপরপ্রান্ত থেকে- আসসালামুআলাইকুম (মহিলা কন্ঠ)

আমি- ওআলাইকুম আসসালাম, কে বলছেন? (বুকের মাঝে চনাক করে উঠেছে এবং ইতস্ততো করেই বললাম)

(কয়েক সেকেন্ড পরে)

অপরপ্রান্ত থেকে- ইমরুল না ?

আমি- কারিমা তুমি ? এত বছর পরে ? কেন ফোন দিয়েছ ?

অপরপ্রান্ত থেকে- না মানে এমনি (দীর্ঘশ্বাস) তোমার নাম্বার আমার কাছে ছিল না এক সময় ছিল কিন্তু সাহস হয়নি ফোন দেওয়ার তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই (এক নিশ্বাসে বললো কথা গুলো)।

আমি আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তো রাস্তায় আছি অফিসে পৌঁছে কথা বলব। এরপরে আমি ফোন দিলাম ১৩/১৪ মিনিট কথা হল সব মিলিয়ে সে জানতে চাই আমি কেমন আছি, তার কথা মনে পড়ে কি না ইত্যাদি ইত্যাদি। বিকালে আবার ফোন দিয়েছে। পরের দিন আবার ও ফোন এভাবে ২ দিনের মাথায় বলেই ফেল্লো আমি অতীতের জন্য অনুতপ্ত আমায় ক্ষমা কর আমি তোমার কাছে যেতে চাই ২য় স্ত্রী হিসাবে। কথাটা তার মুখ থেকে শুনার পর ভেতরটা হাহাকার করে উঠল! কি শুনলাম এটা! এখন আমার তো পথ নাই এটা ১০ বছর পরে কেন বললো ?

যাইহোক, এর পরে আরো কয়েকবার কথা হয়েছে সে আমার ২য় বউ হয়েই আসতে চাই আমার যদি সমস্যা থাকে তাহলে সে তাদের বাড়িতেই থাকবে শুধু স্বীকৃতি চাই। আমি বলেছি এটা তো ঠিক না ২য় বিয়ে হয়ত বা করতে পারব তবে উভয়কে সমান ভাবে রাখতে হবে। সে বলে- আমি তো তোমার সবই জানি আর এটা আমিই তো চেয়ে নিচ্ছি সুতরাং তোমার কোন অসুবিধা নেই।

আর একটি বিষয়- তার পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যই চাই না আমার সাথে ওর বিয়ে হউক কারন আমার বউ বাচ্চা আছে তবে ৩/৪ জন চাই হউক।আমি আমার স্ত্রীর সাথে এই বিষয়ে কথা বলেছি সে তো সাভাবিক ভাবেই ভেঙ্গে পড়িছিল এবং বলেছে যদি আমি আর একটা বিয়ে করি তাহলে সে দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবে।

এখন আমি আপনার কাছে জানতে চাই কি করতে পারি ?

আমার পরিবার/বউ কেউ এটা মেনে নিবে না আমি জানি। কিন্তু সেও তো এতিমের মতই তাছাড়া ১০ বছর আগেও তো তাকেই আমার বিয়ে করার কথা ছিল। হা তখন হয়নি কিন্তু এখন তো সে নিজে থেকেই চাইছে এবং আমারও তার প্রতি দূর্বলতা আছে সুতরাং আমি কি করতে পারি।

বিঃদ্রঃ আলহামদুল্লিহা আমি ঢাকায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে বেশ ভাল চাকুরী করি, আমি একে বিয়ে না করলেও কখনো না কখনো অন্য কাউকে বিয়ে করতে ইচেছ আছে ২ দিন আগে অথবা পরে।  

উত্তর

একাধিক বিয়ে ইসলামে জায়েজ আছে। যদি উভয় স্ত্রীর যাবতীয় হক যথাযথ এবং সমভাবে আদায় করতে সক্ষম হয়। সেই হিসেবে যদি দ্বিতীয় স্ত্রীর কারণে প্রথম স্ত্রীর হক আদায়ে গাফলতী না হয়, বা দ্বিতীয় স্ত্রীর উপর কোন জুলুম না হয়, তাহলে একাধিক বিয়ে করতে কোন সমস্যা নেই।

এতে করে প্রথম স্ত্রীর অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত নয়।

তবে যদি কারো হক আদায় করতে বাধা সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে দ্বিতীয় বিয়ে করার অনুমতি নেই।

فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً [٤:٣]

সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভাল লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন, কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে,একটিই। [সূরা নিসা-৩]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِذَا كَانَ عِنْدَ الرَّجُلِ امْرَأَتَانِ فَلَمْ يَعْدِلْ بَيْنَهُمَا جَاءَ يَوْمَ القِيَامَةِ وَشِقُّهُ سَاقِطٌ

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে লোকের নিকট দু’জন স্ত্রী আছে সে লোক যদি তাদের মধ্যে সমতা না রাখে তবে কিয়ামাতের দিন সে লোক তার দেহের এক পার্শ্ব ভাঙ্গা অবস্থায় উপস্থিত হবে। [সুনানে তিরমিজী-১/২১৭, হাদীস নং-১১৪১, মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস নং-২৭৫৯]

ويكون سنة مؤكدة فى الأصح حال الإعتدال أى القدرة على وطء ومهر ونفقة (رد المحتار، كتاب النكاح-4/65)

বিঃদ্রঃ বিবাহ বহির্ভূত ছেলে মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক ইসলাম সমর্থন করে না। তাই অতীত গোনাহের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা উচিত।

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত।

فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الِاسْتِمَاعُ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ، وَالْيَدُزِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ