ড্রইংরুমের পুতুল ও প্রাণীর মূর্তি রাখা
প্রশ্ন
হক পয়গাম সীরাত সংখ্যায় কভার ও পোষ্টারে যথাক্রমে মসজিদে নববী ও গারে হেরার সহীত আশ-পাশে বিদ্যামান লোকদের যে ছবি দেওয়া হয়েছে। এ ছবি সম্পর্কে শরী‘আতের হুকুম কি? আমরা জানতে চাই। শরী‘আতে যে ছবি নাজায়িয বলা হয়েছে, এটা তার আওতায় পড়ে কি-না? তেমনিভাবে আজকাল ড্রইংরুমে অনেকেই বিভিন্ন ধরণের পুতুল, সিংহ বা অন্য প্রাণীর মূর্তি রাখে। আবার কেউ নিজের বা নিজের ছেলে-মেয়ের ছবি বাঁধাই করে লটকিয়ে রাখে। এগুলোর কি হুকুম?
উত্তর
পুতুল, ঘোড়া ও সিংহ প্রভৃতি যাবতীয় প্রাণীর মূর্তি বানানো বা ঘরে রাখা সর্বাবসস্থায় নাজায়িয। বর্তমানে অভিজাত শ্রেণীর দাবীদার অধিকাংশ লোকদের ড্রইংরুমে এ ধরনের মূর্তি দেখা যায়। তা খুবই গর্হিত ও গুণাহের কাজ। মূর্তি রাখার কারণে ঐ সব ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না। আর রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ না করলে সে ঘরের দ্বীনদারী থাকে না। মূর্তি যে কোন প্রাণীর হোক তা রাখা হারাম। নবী সাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লাম কোন মূর্তি দেখলে ভেঙ্গে ফেলতেন। তেমনিভাবে সাহাবাগণকে তা ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দিতেন। (মুসলিম শরীফ) ছবি সম্পর্কিত বিস্তারিত মাসআলা হল,
(ক) বাড়ীতে নিজের বা মুরুব্বীর অথবা ছেলে-মেয়েদের ছবি লটকিয়ে রাখা সর্বাবস্থায় নাজায়িয ও হারাম। এতে ঐ ঘরে রহমতের ফেরেশতা ঢুকবে না। আর এ উদ্দেশ্যে ছবি তোলা নাজায়িয ও কবীরা গুনাহ।
(খ) তবে প্রাণবিহীন জিনিষের ছবি তোলা বা আঁকা জায়িয এবং তা ঘরে রাখা বা ব্যবহার করাও জায়িয। যেমন, গাছ-পালা, ফল-ফুল ও পাহাড়-পর্বত ইত্যাদির ছবি।
(গ) যদি প্রাণীর ছবি হয় তাহলে শরী‘আত সম্মত উযরের কারণে ছবি তোলা বা রাখা জায়িয। যেমন, পাসপোর্টের জন্যে, হজ্জের জন্য বা বিদেশে দ্বীনী বা দুনিয়াবী দরকারী কাজে যাওয়ার জন্য ছবি তোলা।
(ঘ) এ ধরণের ছবি হয় তাহলে শরী‘আত সমর্থিত কারণ না থাকলে প্রাণীর ছবি তোলা নাজায়িয ও হারাম। চাই সেই ছবি স্পষ্ট হোক বা অস্পষ্ট হোক, সর্বাবস্থায়ই নাজায়িয। আর সেই ছবির চেহারা স্পষ্ট হলে যার ব্যাখ্যা সামনে আসছে তা ব্যবহার করা বা নিজের কাছে রাখাও নাজায়িয।
(ঙ) তবে জায়িয জিনিষের ছবি তুলতে গিয়ে যদি প্রাণীর ছবি অনিচ্ছাকৃত ভাবে এসে যায়। যেমন, মসজিদের ছবি তুলতে গিয়ে ২/৪ জন মুসল্লীর ছবিও এসে গেলো, সে ক্ষেত্রে প্রাণীর ছবি তোলার গুনাহ হবে না। তবে ঐ ছবির চেহারা অস্পষ্ট হলে যার ব্যাখ্যা সামনে আসছে ব্যবহার করা যাবে। আর প্রাণীর ছবি স্পষ্ট হলে এবং উক্ত মূল মসজিদ ইত্যাদির ছবি ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়লে চেহারা মুছে দিতে হবে।
(চ) তবে যে সব ছবির মাথা কাটা, কিংবা মাথা ও চেহারা অঙ্গসমূহ অস্পষ্ট অথবা মাথার পিছনের দিক দিয়ে ছবি নেয়া হয়েছে, কিংবা খুব ছোট সেসব ছবি ব্যবহার করা বা ঘরে রাখা জায়িয।
(ছ) চেহারা অস্পষ্ট তেমনিভাবে অনেক ছোট ছবি এর ব্যাখ্যা, যা জমিনের উপর রাখা থাকলে, মধ্যম ধরনের চোখের জ্যোতি সম্পন্ন লোক দাঁড়ানো অবস্থায় তার চেহারার অঙ্গসমূহ (তথা চোখ, নাক ও কান ইত্যাদি) স্পষ্টতঃ দেখতে পায় না, উহাকেই অস্পষ্ট ছবি বলে। নতুবা তাকে স্পষ্ট ছবি বলা হয়। আর অস্পষ্ট ছবি মাথা মুছা বা মাথা কাটা ছবির অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তা ঘরে রাখা বা ব্যবহার করা শরী‘আতের দৃষ্টিতে জায়িয। তবে এরূপ ছবিও ইচ্ছাপূর্বক বিনা উযরে তোলা যাবে না। তবে জায়িযের ছবি তুলতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃত প্রাণীর ছবি এসে গেলে সেটা ভিন্ন কথা তা আগেই বলা হয়েছে। প্রাণীর ছবি হলো মাথা ও চেহারা স্পষ্টভাবে বুঝা যাওয়া। সুতরাং, মাথা কাটা ও চেহারা মুছা হলে, তা প্রকৃতপক্ষে আর ছবি থাকে না। তাই তা জায়িয গণ্ডিতে চলে আসে। উল্লেখিত ব্যাখ্যা দ্বারা আশা করি ছবির ব্যাপারে কারো অভিযোগ থাকবে না। কারণ প্রথমতঃ উক্ত ছবিগুলো ইচ্ছাকৃত তোলা হয় নি। বরং জায়িয জিনিষের (পাহাড়-মসজিদ) ছবি তুলতে যেয়ে অনিচ্ছাকৃত মানুষের ছবি এসে গেছে। দ্বিতীয়তঃ ছবিগুলো ছোট এবং অস্পষ্ট যার চোখ, নাক, কান ও ইত্যাদি দাঁড়ানো অবস্থায় মধম্য শ্রেণীর জ্যোতি বিশিষ্ট লোকেরা তো দুরের কথা, উত্তম শ্রেণীর জ্যোতীওয়ালারাও স্পষ্টভাবে বুঝতে সক্ষম হবে না। সুতরাং তা জায়িয ও শরী‘আত সম্মতরূপেই হয়েছে। [জাওয়াহিরুল ফিকহ ৩:২৩৩; ইমদাদুল মুফতীন ৯৯৩]