ওহাবী ও সুন্নী কাকে বলে?
প্রশ্ন
ওহাবী ও সুন্নীর অর্থ কি? অনেক জায়গায় সুন্নী-ওহাবী ঝগড়া মারামারী হয়। এর কারণ কি?
উত্তর
'সুন্নী' বলা হয় ঐ সকল লোককে, যারা রাসূলুল্লাহ ﷺ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনদের পথের হুবহু অনুসারী। অর্থাৎ যারা আক্বাইদ, আমল আখলাক ইত্যাদির দিক দিয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের পুরাপুরি অনুসারী। আর যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের সাথে একমত পোষণ করে না, বরং শরী‘আতের মধ্যে নতুন নতুন আক্বীদা ও আমল জুড়ে দেয় এবং সেগুলো নেকীর কাজ মনে করতে থাকে, শরী‘আতের দৃষ্টিরে তাদেরকে বিদঅতী বলা হয় এবং তাদের ধর্মের নামে গর্হিত কাজকে বিদ‘আত বলা হয়। (যেমন রাসূলুল্লাহ ﷺ হাজির নাজির, তিনি আলিমাল গায়িব-এর উপর বিশ্বাস করা। মাজার পূজা করা, কবরে গিলাফ দেয়া, আগরবাতি ইত্যাদি দেয়া, ওরছ করা, পীরের পায়ে বা পীরের নামে সিজদা করা। মিলাদের কিয়ামকে জরুরী মনে করা, রবিউল আউয়াল মাসে জশনে জুলুসে ঈদে মীলাদুন্নবী নামে বর্ণাঢ্য মিছিল বের করা ইত্যাদি সকল কাজ গর্হিত- বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। এ সকল কাজ যারা করে শরী‘আতের ভাষায় তারা বিদ‘আতী নামে অভিহিত। আফসোস 'বর্তমান যামানায় বিদআতী লোকেরা নিজেদেরকে সুন্নী বলে দাবী করে। আর প্রকৃত পক্ষে যারা সুন্নী বা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অনুসারী, যারা উল্লেখিত শিরক-বিদ‘আতকে প্রশ্রয় দেয় না, বরং এসবের প্রতিবাদ করে, তাদেরকে 'ওহাবী' বলে গালি দেয়। এর উদাহরণ এমন, যেমন চোর নিজেই "চোর" "চোর" বলে সাধুকে ধাওয়া করল। বিদ‘আতীরা প্রকৃত সুন্নীদেরকে ওহাবী এজন্য বলে যে, আরব দেশে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওহাব নামে এক ব্যক্তি আবির্ভূত হন। তিনি প্রচলিত অনেক শিরক, বিদ'আতের মূলোৎপাটন করে সুন্নাত কায়িম করেছিলেন। তবে তার ভিতর কঠোরতা ছিল অত্যাধিক। তাই তিনি বিভিন্ন মাসআলার মধ্যে অতিরিক্ত কঠোরতা করে সুন্নতের খিলাফ করেছেন। যেমন, তিনি বলেছেন, হুযুর ﷺ বা কোন নবী-ওলীদের কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে সফর করা নাজায়েয। নবী- ওলী বা কোন বজুর্গ ব্যক্তির ওসীলা ধরে দু'আ করা নাজায়েয প্রভৃতি। এসব বাড়াবাড়ির কারণে অনেক মানুষ তার প্রতি বিতৃষ্ণা হয়ে তার সমালোচনা ও বিরোধীতা করে, তা অনেক লম্বা ইতিহাস। তার আন্দোলন ওহাবী আন্দোলন নামে পরিচিত। কিন্তু আমাদের দেশে ওহাবী নামের প্রয়োগ সেই ওহাবীদের সহিত কোন যোগসূত্রে নয়, বরং হকাকানী উলামাগণকে ঘায়েল করার জন্য বিদ‘আতীদের একটি অপপ্রয়োগ। ওহাবী বলে এ বিদ‘আতীরা দেওবন্দী উলামা-মাশায়েখ ও তাদের অনুসারীগণকে বুঝিয়ে থাকে। উলামায়ে দেওবন্দ যখন বৃটিশ ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন তাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য ইংরেজ সরকার ভারতের উল্টা বাঁশ বেরেলীর আহমদ রেজা খান নামে এক প্রভাবশালীকে লেলিয়ে দেয়। বহু রকম প্রলোভনে তারা একে হাত করে। সে জনগণকে উলামায়ে দেওবন্দ থেকে বিমূখ করার জন্য তাদের প্রতি "ওহাবী" নামের প্রয়োগ প্রবর্তন করে। এর স্বপক্ষে পুঁজি তৈরির জন্য দেওবন্দী উলামাগণের কিতাবাদি হতে সহীহ ইবারত নিয়ে কাটছাঁট করে কুফরী কালাম রূপে প্রচার শুরু করে এবং নিরীহ মানুষকে দেওবন্দী উল। নাগণের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে ওহাবী বলে গালী দিতে প্রয়াস চালায়। কিন্তু আল্লাহ পাক স্বীয় মেহেরবানীতে মুসলমানদেরকে তার খপ্পর থেকে হিফাজাত করেন। মুষ্টিমেয় কিছু লোক ছাড়া মুসলমানগণ উলামায়ে দেওবন্দের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ও সুন্নতী তা'লীম তরবিয়্যত ও আমল আখলাকের বদৌলতে তার প্রতারণা বুঝাতে পারেন এবং নিজেদেরকে তার বিদ‘আতী বেড়াজাল থেকে রক্ষা করেন। বর্তমানে আমাদের দেশের কোন কোন অঞ্চলে যে ওহাবী-সুন্নী সংক্রান্ত ঝগড়া মারামারি হয়, তা সেই আহমদ রেজা খানেরই জন্ম দেয়া বৃটিশ গোলামীর ফসল। (প্রমাণঃ ফাতওয়া মাহমুদিয়া, ১৪ ১৫৮ কিফায়াতুল মুফতী, ১৪১৯৭)