যাকাত সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বর্পূণ প্রশ্ন

মুফতী মনসূরুল হক সাহেব৯ জানুয়ারি, ২০২৫যাকাত

প্রশ্ন

(১) ‘বেহেশতী জেওর’-এর যাকাত সংক্রান্ত অধ্যায়ে ১৯ নং মাসআলায় ‘হাজাতে আসলিয়া’-এর যে সংজ্ঞা বলা হয়েছে, তা আমাদের নিকট বোধগম্য নয়। হাজতে আসলিয়া সম্বন্ধে বিস্তারিত বিবরন কি?

(২) যারা সরকারী চাকুরী করে, যাদের প্রতি মাসে বেতন বিল থেকে বাধ্যতামূলকভাবে একটা নির্দিষ্ট হারে টাকা কর্তন করে জি.পি তহবিল জমা করা হয়। আবার যারা স্বায়ত্ব শাসিত এবং আধা সরকারী সংস্থায় চাকুরী করেন, তাদেরও বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি মাসের বেতন বিল থেকে একটা নির্দিষ্ট হারে টাকা কর্তন করে সি,পি,এফ, (প্রদেয় ভবিষ্যত তহবিল) তহবিল জমা করা হয়। এ সংস্থা আবার সমপরিমাণ বা কিছু কম টাকা নিয়মিত প্রতিমাসে কর্মচারীদের সি,পি,এফ এ্যাকাউন্টে জমা দেয়। সরকারী, আধা সরকারী উভয় ক্ষেত্রে এ জমাকৃত টাকা চাকুরী থেকে অবসর গ্রহনের পর সরকারী সংস্থা কর্তৃক ঘোষিত সুদসহ এককালীন পাওয়া যায়। আবার জমাকৃত টাকা থেকে চাকুরীকালীন সময় কিছু শর্তসাপেক্ষে ঋন গ্রহন করা যায় এবং বাধ্যাতামূলকভাবে এ ঋণের টাকা নিয়মিত প্রতি মাসে নিদিষ্ট হারে ফেরত দিতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো, প্রতি বছর যাকাতের হিসাবের সময়ঃ

(ক) জি,পি/সি,পি,এফ তহবিলে জমাকৃত এ টাকা হিসেবে আসবে কি? অর্থাৎ যাকাত প্রদানযোগ্য অন্যান্য পুঁজি/সম্পদের সাথে তা যোগ করতে হবে কি?

(খ) গৃহীত ঋণের টাকা যদি পুরো এক বছর হাতে থাকে (পুরো টাকা হোক বা আংশিক) তবে তা যাকাতের হিসাব নিতে হবে কি? অর্থাৎ অন্যান্য পুঁজি যাকাতযোগ্য সম্পদের সাথে তা যোগ করতে হবে কি?

(৩) কারো নিয়ন্ত্রণে ৮ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে। কয়েক বছর আগে এগুলো সংগ্রহকালীন তৈরি খরচসমূহ মোট (৪০,০০০/=) চল্লিশ হাজার টাকা (আসল ক্রয় মূল্য) ব্যয় হয়। এখন বাজার সোনার মূল্য প্রতি ভরি (৭,০০০/=) সাত হাজার টাকা। এ মূল্য হিসেবে এগুলো স্বর্ণালংকারের মূল্য দাঁড়ায় ৫২৫০ টাকা (বর্তমানে ক্রয় মূল্য)। আবার এগুলো স্বর্ণকারের দোকানে বিক্রি করতে গেলে ৪ আনা বাদ দিয়ে মূল্য দিতে চায়। প্রতি ভরি ৫২৫০ টাকা হিসেবে ৪২০০০ টাকা (বর্তমান বিক্রি মূল্য)। এখন প্রশ্ন হলো, এ ৩টি মূল্যের কোনটির উপর হিসাব করে যাকাত দিতে হবে।

(৪) গত রমাযান মাসে একটি দৈনিক ‘মাহে রমাযান’ শিরোনামে এক নিবন্ধের এক জায়গায় দেশের একজন খ্যাতনামা আলেম বলেছেন, ‘স্বর্ণ বা রূপা হোক’ সর্বপ্রকার ব্যবসার মালে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার ক্ষেত্রে বিক্রয় মূল্যই গ্রহনযোগ্য, ক্রয় মূল্য নয়। যেমন, কারও নিকট যা যাকাতের মাল বর্তমান আছে, তার ক্রয় মুল্য ১ লাখ টাকা, কিন্তু বিক্রি মূল্য ১ লাখ ১০ হাজার টাকা, এখন উক্ত মালের ১ লাখ ১০ হাজার টাকার উপর যাকাত ওয়াজিব। এখন প্রশ্ন হলোঃ

(ক) নিসাব পরিমান সোনা, রূপা তথা ব্যবসার মালের উপর যাকাত দেয়া ফরয, না ওয়াজিব?

(খ) মজুদ ব্যবসা পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রয় মূল্য ধরে যাকাতের হিসাব করতে হবে, এতদিন এমনটা জানতাম। কিন্তু উল্লেখিত নিবন্ধে বিক্রি মূল্যের কথা বলা হয়েছে। কোনটি সঠিক?

(৫) ইদানিং জানতে পারলাম যে, অত্যাবশ্যকীয় আসবাবপত্র না হওয়ায় টেলিভিশনের যাকাত দিতে হবে। ১০ বছর আগে ৭৩০০ টাকা দিয়ে ২০ ইঞ্চি একটি ফিলিপস সাদাকালো টেলিভিশন কিনেছিলাম। বর্তমানে এগুলোর মূল্য আরো বেশী। তবে আমরা পুরাতন টিভিটি বিক্রি করতে চাইলে তেমন ক্রেতা পাওয়া যাবে না এবং পাওয়া গেলেও মূল্য হয়ত ক্রয় মূল্যের অর্ধেকও হবে না। উল্লেখ্য, বাসায় ব্যবহৃত টিভি, ব্যবসার পণ্য হিসেবে হয়ত গণ্য হবে না। এ অবস্থায় যাকাত আদায়ের খাতিরে আমরা পুরাতন টিভি সেট এর মূল্য এখন কিভাবে কত টাকা নির্ধারন করতে হবে?

উত্তর

(১) হাজাতে আসলিয়া দ্বারা উদ্দেশ্য, নিজের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু যথাঃ বাসস্থান, পরিধেয় বস্ত্র, ঘরের আসবাবপত্র, যানবাহন, খিদমতের দাস, সমরাস্ত্র ইত্যাদি। সুতরাং এগুলো বাবদ খরচ করার পর ঋন অতিরিক্ত যা অবশিষ্ঠ থাকে, তা নিসাব পরিমান হলে যাকাত দিতে হবে।

(২) (ক) সরকারী বা কোন প্রতিষ্ঠানের জি,পি এবং সি,পি,এফ তহবিলে বাধ্যতামূলকভাবে যে টাকা কেটে রাখা হয়, তা হাতে আসার আগে তার উপর যাকাত ওয়াজিব হয় না। চাকুরী শেষে যখন ঐ টাকা উঠানো হবে, তখন আগে থেকে নিসাবের মালিক না থাকলে উক্ত টাকার উপর এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর তার উপর যাকাত ওয়াজিব হবে। তবে যদি আগে থেকে নিসাবের মালিক হয়ে থাকে, তাহলে আগের টাকার যাকাত দেওয়ার সময় জি,পি ও সি,পি,এফ তহবিলের প্রাপ্ত টাকারও যাকাত দিতে হবে, সেক্ষেত্রে ঐ টাকার উপর এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া জরূরী নয়। [প্রমাণঃ ফাতওয়া দারুল উলূম, ৬:৩৩১ #আহসানুল ফাতওয়া, ৮:২৬১]

ومن شرائط وجوبها فراغ المال عن حاجته الاصلية فليس في دور السكني وثياب البدن واثاث المنازل ودواب الركوب وعبيد الخدمة وسلاحالاستعمال زكاة وكذا طعام اهله وما يتجمل به من الاواني اذا لم يكن من

الذهب والفضة - كذا فى العالمكيري... ۱۷۲/۱

(খ) মূলতঃ এটা সাধারণ ঋণ হিসাবে গণ্য হয়ে যাকাত যোগ্য সম্পদ থেকে বাদ পড়বে। তাই তার যাকাত দিতে হবে না। [প্রমাণঃ আলমগীরী, ১:১৭২ আহসানুল ফাতওয়া, ৪:২৮২]

(৩) বর্তমান বাজারে ব্যবহৃত অলংকারের বিক্রয় মূল্য হিসাবে যাকাত দিতে হবে। (বর্তমান বাজারে বিক্রয় মূল্য ৪২,০০০ হাজার টাকা) অর্থাৎ ব্যবহৃত সোনা-রুপার যাকাত বর্তমানে বাজারে বিক্রয় মূল্য হিসেবে নির্ণয় করে যাকাত আদায় করতে হবে। তাই ক্রয় মূল্য থেকে বেশী বা কম হোক। [প্রমানঃ মাহমুদিয়া ১৩/৯৬ #ফাতওয়া দারুল উলূম, ৬:১০৮]

وجاز دفع القيمة فى زكاة وعشر وخراج وفطرة ونذر وكفارة غير الاعتاق وتعتبر القيمة يوم الوجوب وقالا يوم الاداء وفى السوائم يوم الاداء اجماعا وهو الأصح كذا في الشامي ٢٨٦/٢

(৪) (ক) আলেম সাহেব যা বলেছেন, তা সঠিক অর্থাৎ ব্যবসায় মালের যাকাত বর্তমান মূল্য হিসাব দিতে হবে। আর নিসাব পরিমান মালের যাকাত দেয়া ফরয, কোন কিতাবে ওয়াজিব লিখলেও তার অর্থ ফরয। [প্রমানঃ ফাতওয়া দারুল ৬:১৪১ #শামী ২:২৮৬]

(খ) ব্যবসায় পণ্যের ক্ষেত্রে বিক্রয়ের মূল্য হিসেবে যাকাত দিতে হবে। এটাই সঠিক।

(৫) অত্যাবশকীয় আসবাবপত্র না হওয়ায় টেলিভিশনের যাকাত দিতে হবে, এই কথাটা সঠিক নয়। কিন্তু কারো নিকট যদি টিভি এবং নিত্য প্রয়োজনাতিরিক্ত অন্যান্য মাল মূল্য হিসাবে নিসাব পরিমান হয় তাহলে সে যাকাত খেতে পারবে না এবং সদকায়ে-ফিতর ও কুরবানী তার যিম্মায় ওয়াজিব হবে।

(৬) সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার বাজার মূল্য বলতে বাজারে উক্ত পরিমাণ নতুন রূপা কিনতে গেলে যে টাকার প্রয়োজন হয়, তা বুঝায়। সুতরাং (বর্তমান বাজার হিসেবে) ১৬০ টাকার দর হিসেবে নিসাব ঠিক করবেন। অবশ্য কারো নিকট সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা থাকলে (নতুন বা পুরাতন) তার ওপর যাকাত ফরয, বাজার মূল্য যাই আসুক।

যাকাত সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বর্পূণ প্রশ্ন | ইসলামী যিন্দেগী