উযূ ভঙ্গের কারণ

মুফতী মনসূরুল হক সাহেব১ জুলাই, ২০২৩উযূ গোসল ইস্তেন্জা তায়াম্মুম ও মাসাহ

প্রশ্ন

উযূ ভঙ্গের কারণ কয়টি ও কি কি?

উত্তর

মৌলিকভাবে উযূ ভঙ্গের কারণ ৭টি। যথা,

১. পায়খানা পেশাবের রাস্তা দিয়ে কোন কিছু বের হওয়া। যেমন বায়ু, পেশাব পায়খানা, পোকা ইত্যাদি। [হেদায়া-১/৭]

أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ [٥:٦]

তোমাদের কেউ প্রসাব-পায়খানা সেরে আসে [তাহলে নামায পড়তে পবিত্রতা অর্জন করে নাও] {সূরা মায়িদা-৬}

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” الْوُضُوءُ مِمَّا خَرَجَ، وَلَيْسَ مِمَّا دَخَلَ 

হযরত আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। নিশ্চয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, শরীর থেকে যা কিছু বের হয় এ কারণে উযূ ভেঙ্গে যায়, প্রবেশের দ্বারা ভঙ্গ হয় না। [সুনানে কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৫৬৮]

 عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ، أَنَّهُ قَالَ فِي الَّذِي يَتَوَضَّأُ فَيَخْرُجُ الدُّودُ مِنْ دُبُرِهِ، قَالَ: ” عَلَيْهِ الْوُضُوءُ ” وَكَذَلِكَ قَالَ الْحَسَنُ وَجَمَاعَةٌ

হযরত আত্বা বিন আবী রবাহ রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি উযূ করে, তারপর তার পিছনের রাস্তা দিয়ে কোন পোকা ইত্যাদি বের হয়, তাহলে তার উপর পুনরায় উযূ করা আবশ্যক। একই কথা বলেছেন হাসান বসরী রহ. এবং মুহাদ্দিসদের এক জামা‘আত। [সুনানে কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৫৬৮, মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-১/৩৯, মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক-১/১৬৪]

قَالَ عَطَاءٌ: «تَوَضَّأْ مِنْ كُلِّ حَدَثٍ مِنَ الْبَوْلِ، وَالْخَلَاءِ، وَالْفُسَاءِ، وَالضُّرَاطِ، وَمِنْ كُلِّ حَدَثٍ يَخْرُجُ مِنَ الْإِنْسَانِ

হযরত আত্বা রহ. বলেন, উযূ কর প্রত্যেক হদসের কারণে। যেমন পেশাব, পায়খানা, বায়ু বের হওয়া শব্দসহ বা শব্দ ছাড়া। প্রতিটি বস্তু যা মানুষের শরীর থেকে বের হয়। [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক-১/১৩৯, হাদীস নং-৫২৭]

২. রক্ত, পূঁজ, বা পানি বের হয়ে গড়িয়ে পড়া। [হেদায়া-১/১০]

أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ إِذَا رَعَفَ، انْصَرَفَ فَتَوَضَّأَ

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. এর যখন নাক দিয়ে রক্ত ঝড়তো, তখন তিনি ফিরে গিয়ে উযূ করে নিতেন। [মুয়াত্তা মালিক-১১০]

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّهُ كَانَ يُفْتِي الرَّجُلَ إِذَا رَعَفَ فِي الصَّلَاةِ، أَوْ ذَرَعَهُ قَيْءٌ، أَوْ وَجَدَ مَذِيًّا أَنْ يَنْصَرِفَ فَيَتَوَضَّأُ

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি যদি কারো নামাযরত অবস্থায় নাক দিয়ে রক্ত ঝড়তো, বা বমি হতো, বা মজি বের হতো তাহলে তাকে ফিরে গিয়ে উযূ করার ফাতওয়া প্রদান করতেন। [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৩৬১০]

عَنِ الْحَسَنِ، أَنَّهُ كَانَ لَا يَرَى الْوُضُوءَ مِنَ الدَّمِ إِلَّا مَا كَانَ سَائِلًا

হযরত হাসান বসরী রহ. থেকে বর্ণিত। তিনি প্রবাহমান পরিমাণ রক্ত ঝড়লেই উযূ করা জরুরী মনে করতেন। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা-১/১৩৭, হাদীস নং-১৪৫৯]

৩. মুখ ভরে বমি করা।

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ أَصَابَهُ قَيْءٌ أَوْ رُعَافٌ أَوْ قَلَسٌ أَوْ مَذْيٌ، فَلْيَنْصَرِفْ، فَلْيَتَوَضَّأْ

হযরত আয়শা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তির বমি হয়, অথবা নাক দিয়ে রক্ত ঝরে, বা মজি বের হয়, তাহলে ফিরে গিয়ে উযূ করে নিবে। [সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-১২২১]

مُغِيرَةُ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ، قَالَ: سَأَلْتُهُ عَنِ الْقَلْسِ، فَقَالَ: «ذَلِكَ الرَّسْعُ، إِذَا ظَهَرَ فَفِيهِ الْوُضُوءُ

ইবরাহীম নাখয়ী রহ. কে বমির ব্যপারে জিজ্ঞাসা করলেন মুগীরাহ রহ.। তখন তিনি উত্তরে বললেন, যদি তা মুখ ভরে হয়, তাহলে উযূ করতে হবে। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-৪৩৩]

৪. থুথুর সঙ্গে রক্তের ভাগ সমান বা বেশি হওয়া।

عَنِ الْحَسَنِ فِي رَجُلٍ بَزَقَ فَرَأَى فِي بُزَاقِهِ دَمًا، أَنَّهُ لَمْ يَرَ ذَلِكَ شَيْئًا حَتَّى يَكُونَ دَمًا غَلِيظًا، يَعْنِي فِي الْبُزَاقِ

হাসান বসরী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি তার থুথুতে রক্ত দেখে তাহলে থুথুতে রক্ত প্রবল না হলে তার উপর উযূ করা আবশ্যক হয় না।  [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৩৩০]

عَنْ إِبْرَاهِيمَ فِي الرَّجُلِ يَبْزُقُ فَيَكُونُ فِي بُزَاقِهِ الدَّمُ، قَالَ: «إِذَا غَلَبَتِ الْحُمْرَةُ الْبَيَاضَ تَوَضَّأَ، وَإِذَا غَلَبَ الْبَيَاضُ الْحُمْرَةَ لَمْ يَتَوَضَّأْ»

হযরত ইবরাহীম নাখয়ী রহ. বলেন, যে ব্যক্তি তার থুথুতে রক্ত দেখে, তাহলে সাদার উপর লাল রঙ বেশি থাকে, তাহলে উযূ করবে, আর যদি লালের উপর সাদার আধিপত্ব থাকে, তাহলে উযূ লাগবে না। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৩৩২]

عَنِ ابْنِ سِيرِينَ فِي الرَّجُلِ يَبْصُقُ دَمًا قَالَ: «إِنْ كَانَ الْغَالِبُ عَلَيْهِ الدَّمُ تَوَضَّأَ

ইবনে সীরীন রহ. বলেন, যদি থুথুতে রক্তের আধিক্য হয়, তাহলে উযূ করা আবশ্যক। [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৫৬০]

৫. চিৎ বা কাত হয়ে হেলান দিয়ে ঘুম যাওয়া।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: ” لَيْسَ عَلَى مَنْ نَامَ سَاجِدًا وُضُوءٌ، حَتَّى يَضْطَجِعَ، فَإِنَّهُ إِذَا اضْطَجَعَ، اسْتَرْخَتْ مَفَاصِلُهُ

হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সেজদা অবস্থায় ঘুমালে উযূ ভঙ্গ হয় না, তবে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লে ভেঙ্গে যাবে, কেননা, চিৎ বা কাত হয়ে শুয়ে পড়লে শরীর ঢিলে হয়ে যায়। [ফলে বাতকর্ম হয়ে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে] {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২৩১৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২০২]

৬. পাগল, মাতাল বা অচেতন হলে।

عَنْ حَمَّادٍ قَالَ: «إِذَا أَفَاقَ الْمَجْنُونُ تَوَضَّأَ وُضُوءَهُ لِلصَّلَاةِ

হযরত হাম্মাদ রহ. বলেন, যখন পাগল ব্যক্তি সুস্থ্য হয়, তখন নামাযের জন্য তার উযূ করতে হবে। [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৪৯৩]

৭. নামাযে উচ্চস্বরে হাসি দিলে।

عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ , قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ:  «مَنْ ضَحِكَ فِي الصَّلَاةِ قَرْقَرَةً فَلْيُعِدِ الْوُضُوءَ وَالصَّلَاةَ». وَقَالَ الْحَسَنُ بْنُ قُتَيْبَةَ: إِذَا قَهْقَهَ الرَّجُلُ أَعَادَ الْوُضُوءَ وَالصَّلَاةَ.

হযরত ইমরান বিন হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নামাযে উচ্চস্বরে হাসে, সে ব্যক্তি উযূ ও নামায পুনরায় আদায় করবে।

হযরত হাসান বিন কুতাইবা রহ. বলেন, যখন কোন ব্যক্তি উচ্চস্বরে হাসি দেয়, সে ব্যক্তি উযূ ও নামায পুনরায় আদায় করবে। [সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-৬১২]

مَنْ ضَحِكَ أَنْ يُعِيدَ الْوُضُوءَ وَيُعِيدَ الصَّلَاةَ

হযরত আবু মূসা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন, যে ব্যক্তি নামাযে হেসেছে, সে পুনরায় উযূ করে সালাত আদায় করবে। [সুনানে দারা কুতনী, হাদীস নং-৬০৪, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং-১২৭৮]

উযূ ভঙ্গের কারণ | ইসলামী যিন্দেগী