জীবিত অবস্থায় ওয়ারিশদের সম্পদ বন্টন করা
প্রশ্ন
জীবিত অবস্থায় কেউ স্বীয় ওয়ারিশদের মধ্যে সম্পদ বন্টন করতে পারবে কি-না?
উত্তর
সম্পদ বন্টনের মাসআলা খুবই নাজুক। এ ব্যপারে ভুল করলে বা কোন ওয়ারিশকে ঠকালে জাহান্নামের শাস্তির হুমকি এসেছে। এ জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা খুবই জরুরী। অথচ এ ব্যাপারে সাধারণ লোকের কথা বাদ দিলেও দ্বীনদার পরিবেশেরও যথেষ্ট উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়।
স্বীয় জীবদ্দশায় সম্পদ বন্টন করতে শরী‘আতে উৎসাহিত করেনি। বরং বলেছে এটা যেহেতু মীরাছ নয়, বরং হেবা; আর একান্ত কোন ঠেকার কারণে যদি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে হেবা হিসেবে সম্পদ বন্টন করতে হয়, তাহলে ছেলে-মেয়ে সকলকে সমান দিতে হবে। ছেলে-মেয়েদের মাঝে বেশ-কম করা যাবে না, এটাই শরী‘আতের ফায়সালা। অনুরূপ নিয়মে স্বামী সম্পদ বন্টন করতে চাইলে, স্ত্রীকে সন্তানদের সমান অংশ দিবে।
তবে শর‘ঈ উজরের কারণে যদি কম-বেশী করা হয়, তাহলে তা জায়িয হবে। যেমন, একজন সন্তান অঙ্গহানির কারণে উপার্জন করতে পারে না; তাকে জরুরত মত বেশী দেয়া যায়। তেমনিভাবে ছোট ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে বিয়ে শাদী করাতে পারেনি। অন্যদের জন্য এসব ব্যবস্থা করছে। তখন এই ছোট সন্তানকে বেশী দিতে পারে। তেমনিভাবে একজন সন্তান চরম অবাধ্য ও আল্লাহর নাফরমান। কোন প্রচেষ্টায় তাকে সু-পথে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তার ব্যাপারে এটাই প্রবল ধারণা যে, বাবার সম্পদ হাতে পেলে তার নাফরমানী আরো বৃদ্ধি পাবে। সে ক্ষেত্রে তাকে খাওয়া-পরার পরিমাণ দেয়া এবং তার চেয়ে বেশী না দিয়ে অন্য সন্তানদের তুলনায় তাকে কম দেয়া জায়িয হবে। এ ধরনের উজর না থাকলে, সকল আওলাদকে সমান দেয়া চাই। ফাতাওয়ার কিতাবে এ কথাই বর্ণনা করা হয়েছে। আজকাল অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, পিতা স্বীয় জীবদ্দশায় শুধু ছেলেদেরকে সম্পদ দেয়, মেয়েদেরকে মোটেও দেয় না। আর কেউ কেউ আছে, মেয়েদেরকে দেয় কিন্তু ছেলেদের সমান মেয়েদেরকে দেয় না। এটা জুলুম এবং অন্যায়। এসব ক্ষেত্রে পিতা মনে করেন মেয়েদেরকে বলে রাজী করিয়ে নিবো। এটাও ঠিক নয়। তাতেও নিজের ঔরষজাত সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করা হলো না। কারণ, তারা কি এটা করবেন যে মেয়েদের বেশী দিবেন এবং ছেলেদের কম দেবেন তারপরে ছেলেদের বলে রাজী করে নিবেন? তাতো তারা কখনও করবেন না, তাহলে এই দুই চোখে দেখার কারণ কি? ছেলেও নিজের সন্তান, মেয়েও নিজের সন্তান। মেয়েকে বিয়ে দিলে কি সন্তান থাকে না? ছেলে সন্তানদের জন্য অনেক ফিকির করা হয়। কিন্তু মেয়ে সন্তানদের জন্য সেই পরিমাণ ফিকির করা হয় না কেন?
তারা শুধু দেখা-সাক্ষাতের সময় আদর-মুহাব্বত পাওয়ার উপযুক্ত; বাকি যিম্মাদারী শেষ, এর নাম কি দ্বীনদারী? উভয় ধরনের নাতী-নাতনীদের সমান ফিকির রাখা উচিত। আজকাল অধিকাংশ-লোকের প্রবণতা হয়েছে- দুর্বলদের বঞ্চিত করার বা ঠকাবার। এজন্য বাবা ও তার ছেলে-সন্তানরা মিলে বুদ্ধি পরামর্শ করে যে, কিভাবে মেয়েদেরকে কম দিয়ে বা না দিয়ে পারা যায়; এটা নেহায়েত অন্যায়। কুরআনে কারীমের সূরায়ে নিসার বিভিন্ন আয়াতে মেয়েদের সঠিক হিসসা প্রদানের তাকীদ করা হয়েছে। ৭ নং আয়াতে কয়েকভাবে তাকিদ করা হয়েছে মেয়েদের মাহরূম বা ঠকানোর পথ বন্ধ করার জন্য। ১১ নং আয়াতে মেয়েদের অংশকে মূল ভিত্তি করে মীরাছ হিসেবে ছেলেদেরকে মেয়েদের ডাবল বা দ্বীগুন দিতে বলা হয়েছে। এখানে পুরুষদের হীসসাকে বুনিয়াদ বানানো হয়নি। অর্থাৎ এমন বলা হয়নি যে, মেয়েদের মীরাছ হিসেবে ছেলেদের অর্ধেক পাবে। বরং বলা হয়েছে যে, ছেলেরা মেয়েদের দ্বিগুণ পাবে। এর দ্বারাও মেয়েদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এরপর মেয়েদের ব্যাপারে টাল-বাহানা ঈমানদারীর পরিপূর্ণ খিলাফ। এ ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন জরুরী।
তবে একান্ত যদি মেয়েদের হিসসা ছেলেদের বৈধভাবে দেয়ার ইচ্ছা থাকে, যাতে কোন প্রকারের আপত্তি থাকে না, তাহলে তার পদ্ধতি হলো, মেয়েদের প্রাপ্য সম্পূর্ণ অংশ আলাদা করে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। তাদেরকে মালিক বানিয়ে দিতে হবে এবং তাদেরকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে তারা তাদের ন্যায্য হিসসা গ্রহণ করার পরেও ভাইগণ আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে আগের ন্যায় খোঁজ খবর ও খিদমত করে যাবেন। এর মধ্যে কোন প্রকার ক্রটি করবেন না। তখন যদি বোনেরা খুশী হয়ে ভাইদেরকে কিছু অংশ হাদিয়া হিসেবে দেয়, তাহলে সেটা ভাইদের জন্য হালাল হবে তবে সবটুকু ভাইদের দেয়া মুনাসিব হবে না। কারণ-তাদেরও তো সন্তান আছে। তারাও মায়ের থেকে নিশ্চয় কিছু পাওয়ার আশা রাখে। আরো উল্লেখ্য বর্তমানে মৌখিকভাবে যে বোনেরা ভাইদের খাতিরে বাবার সম্পত্তি দাবী ছেড়ে দেয়, অথচ সম্পদ তারা হাতে বুঝে পায় না, এটা ভাইদের আদর-আপ্যায়ন দেওয়ার জন্য একটা লৌকিকতা মাত্র। এটা শরী‘আত সম্মত নয়। আর এক্ষেত্রে এ সম্পত্তি ভাইদের জন্য হালাল হবে না। অন্যের মাল শুধুমাত্র তখনই হালাল হবে, যখন সে অন্তর থেকে সেটা দিবে। আর লৌকিকতা দ্বারা তা কখনও হয় না। [প্রমাণঃ সূরা নিসা, আয়তঃ ২৯, #তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন ২:৩৭৭, #মিশকাত ১:২৪১, #আসসুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী ৪:৯৬, #মাহমূদিয়া ৫:৬৯৬, #রাহীমিয়া ২/২৫৯, #ইমদাদূল ফাতাওয়া ৩:৪৭০]