হরতাল পালন

মুফতী মনসূরুল হক সাহেব৩ জানুয়ারি, ২০২৬সামাজিকতা আচার ব্যবহার ও রাজনীতি

প্রশ্ন

ইসলামের দৃষ্টিতে হরতাল করা জায়িয আছে কিনা? জায়িয হলে কোন পদ্ধতিতে জায়িয? প্রয়োজনীয় উদাহরণ বা প্রমাণসহ জানতে চাই। নাজায়িয হলে অধিকার আদায়ে কিংবা জোরালো প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে ইসলাম কোন ধরণের কাজ করতে উৎসাহিত করে?

উত্তর

প্রচলিত হরতাল সাধারণতঃ জবরদস্তিমূলক করা হয়ে থাকে এবং এতে জনগণের জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়ে থাকে। সুতরা তা কোন ক্রমেই জায়িয নয়। শরী‘আতের দৃষ্টিতে তা হারাম ও নিষিদ্ধ।

অবশ্য আল্লাহ পাক সর্বপ্রকার বাতিলের প্রতিরোদ করা জরুরী ঘোষণা করেছেন। কিন্তু তার জন্য একক কোন পন্থা বা নিয়ম বেধে দেননি। যাতে করে স্থান-কাল-পাত্র হিসাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে শরী‘আতের গণ্ডির মধ্যে থেকে যে পন্থাই বাতিল প্রতিরোধ কার্যকরী হয়, তা যেন গ্রহণ করার রাস্তা খোলা থাকে। বর্তমান যুগে যদি জনগণকে বুঝিয়ে দ্বীন ও ঈমানের দাবী হিসাবে তাদের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল করানো যায়-অর্থাৎ তারা নিজেরা নিজেদের দোকান পাট বন্ধ রাখবে এবং গাড়ী-ঘোড়া চালাবে না, এবং অযথা মানুষের জান-মালের ক্ষয়-ক্ষতি না করা হয় তাহলে এসব শর্ত পালন স্বাপেক্ষে দ্বীনী জরুরত ও বাতিল প্রতিরোধ হরতাল, লংমার্চ, মিটিং, মিছিল, বিক্ষোভ প্রদর্শন ইত্যাদি কর্মসূচী পালন করা জায়িয বরং জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। যেমন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তীর, তরবারী দ্বারা যুদ্ধ করা সত্ত্বেও বর্তমান যুগে যুদ্ধের সময় আধুনিক সমরাস্ত্রে অবলম্বন করা জরুরী অথচ এসব অস্ত্রের নাম কুরআন-হাদীসে নেই। তাই বলে কি তা নাজায়িয? দুশমনদের তৈরি অস্ত্র দিয়ে দুশমনদের প্রতিরোধ এবং ইসলামের হিফাজত কি নিষেধ? আজকাল অনেক সম্প্রদায় বিভিন্ন সাধারণ দাবী আদায়ের জন্যও হরতাল ডাকছে। সে ক্ষেত্রে দ্বীনের ন্যায্য দাবী আদায়ের জন্য অবশ্যই এসব কর্মসূচী জায়িয, বরং ক্ষেত্র বিশেষে জরুরীও বটে। এগুলো নাজায়িয বলার অর্থ হলো বাতিল প্রতিরোধের ফরয দায়িত্ব আদায় ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা, মার খেতে থাকা, মাদরাসা-মসজিদ বন্ধ হতে দেয়া এবং গোটা সমাজ ফিতনা-ফাসাদে ভরে যেতে দেয়া। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন, হক্বের শক্তি দ্বারা যদি বাতিল শক্তি প্রতিহত না করা হয় তাহলে পৃথিবী বিশৃংখলায় পূর্ণ হয়ে যাবে। অন্যত্র আছে, ইবাদতগাহ সমূহ বরবাদ ও ধ্বংস হয়ে যাবে। (সূরা হজ্জঃ ৪০) আর এ জন্যই আকাবিরে দেওবন্দ দ্বীনের জন্য মিটিং-মিছিল ইত্যাদি নতুন উদ্ভাবিত কর্মসূচিকেও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করেছেন। (আসীরানে মাল্টাঃ) অবশ্য এর এ অর্থ নয় যে, এগুলোকেই জিহাদ ধরে নিয়ে জিহাদের জযবা ও প্রস্তুতি থেকে দূরে সরে পড়া।

তবে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, উলামায়ে কিরামের নেতৃত্বে পরিচালিত হরতাল ও লংমার্চ ইত্যাদি দুনিয়াদারদের আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও আর্দশভিত্তিক হওয়া অবশ্যই জরুরী। সে হিসাবে বাতিল প্রতিরোধ বা শরী‘আত সম্মত দাবী আদায়ের লক্ষ্য হরতাল বা লংমার্চ ডাকতে হলে, তা আগে অবশ্যই সমাজ সচেতন উলাময়ে কিরাম ও দ্বীনদার বুদ্ধিজীবীদের এ ব্যপারে ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে এবং হরতাল ইত্যাদি ডাকার আগে প্রাথমিক স্তরসমূহ অবশ্যই পাড়ি দিতে হবে। যথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট দাবী পৌঁছানো ও সঠিক বিষয় বুঝানো। তাতে কাজ না হলে সভা-সমতি করা, স্মারকলিপি দেয়া, সেই সাথে সর্ব সাধারণকে বিষয়টির হুকুম সম্পর্কে জ্ঞাত করা ইত্যাদি। এতে কাজ না হলে হরতাল বা লংমার্চ এর ঘোষণা দিবে। পাশা-পাশি উল্লেখিত কর্মসূচী চলাকালে নাজায়িযভাবে যেন কোন জান বা মালের ক্ষয়-ক্ষতি না হয় এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে কোন নাজায়িয ও হারাম কাজ প্রকাশ না পায় তার জন্য তার সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা ও সর্তক দৃষ্টি রাখা কর্তব্য। কারণ আন্দোলনকারীদের দ্বারা হারাম বা নাজায়িয কাজ প্রকাশ হলে তা আর ইসলামী আন্দোলন থাকবে না। ঐ আন্দোলনের রূহানিয়াত এবং তাছীর নষ্ট হয়ে যাবে এবং তার দ্বারা বাতিলের উপর কোন প্রভাব পড়বে না। এর দ্বারা আখিরাতেও কামিয়াবীর আশা করা যায় না। উক্ত শর্ত সমূহ মান্য করা সম্ভব না হলে নাজায়িয হরতাল করে দ্বীনের ক্ষতি না করা জরুরী। [জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া ১:৬০৫, ইসলাহী খুতবাত ৩:১৪৭]

হরতাল পালন | ইসলামী যিন্দেগী