মহিলা মাদরাসায় শিক্ষকতা
প্রশ্ন
মেয়েদের মাদরাসায় পড়ানো যাবে কিনা? প্রচলিত স্বতন্ত্র এসব মহিলা-মাদরাসা ভবন গড়ে উঠেছে, যেখানে ঘরোয়া পরিবেশ অবশিষ্ট থাকে না, এ ধরণের মাদরাসা কায়িম করা কতটুকু ঠিক? মহিলাদের দ্বীনী তালীম দেয়ার ভালো পদ্ধতি কি হতে পারে? এ ব্যপারে বিশেষভাবে হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এর মাসলাক জানতে চাই।
উত্তর
আমাদের আকাবিররগনের মধ্যে স্বতন্ত্র মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার নিয়ম ছিল না। পরিবারে পিতা, স্বামী বা ভাই অধীনস্থ মহিলাদেরকে দীন শিক্ষা দিতেন- এ নিয়ম চলে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে দ্বীন শিক্ষা দিতেন এ নিয়মই চলে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে যেহেতু অধিকাংশ পুরুষ অভিভাবরাই দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ, অথচ মেয়েদেরকে দ্বীন শিখানো ফরজ তাই এ দায়িত্ব পালনে স্বল্প পরিসরে ঘরোয়া পরিবেশের মাদরাসায় মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা শর্তাধীন জায়িয হবে।
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, পুরুষদের ন্যায় মহিলাদেরও জরুরত পরিমাণ ইলম দ্বীন শিক্ষা দেয়া ফরয আইন। যাতে ইলম দ্বীন শিখে মেয়েরা তাদের ঈমান-আকীদা, ইবাদত-বন্দেগী ইত্যাদি বিষয় শিক্ষা লাভ করে আল্লাহর হুকুম মুতাবিক যিন্দেগী পরিচালনা করতে পারে। এখন জানতে হবে, এর জন্য কি ব্যবস্থা উপকারী, কি ব্যবস্থা ক্ষতিকর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্র মহিলা বিদ্যালয় অথবা মহিলা মাদরাসার মাধ্যমে মহিলাদের শিক্ষা দেয়া বিষতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি মহিলা মাদরাসা মোটেই পছন্দ করি না। যদিও সে মহিলা মাদরাসা কোন বিজ্ঞ আলেমের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হোক না কেন। আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি যে, স্বতন্ত্রভাবে পুরুষদের মাদরাসার ন্যায় মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্টা করা আদৌ ঠিক হবে না। আমার এ পরামর্শের প্রতি দৃষ্টিপাত না করে যদি কেউ এ কাজ করে, তাহলে পরবর্তীতে তার আফসোস করতে হবে। কাজেই তোমরা মহিলা স্কুল এবং মহিলা মাদরাসা ছেড়ে দাও। সেখানে মেয়েদেরকে না পাঠিয়ে বাড়িতেই তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা কর। যদি পবিত্র কুরআন ও দ্বীনী আরবী কিতাব শিক্ষা দাও, তাহলে তো ভালই, তা না হলে, মাতৃভাষায় রচিত দ্বীনী কিতাবের মাধ্যমে তালীমের ব্যবস্থা করা উচিত ।
তিনি বলে, হুকুকুল বাইত নামে আমার একটি নসীহতনামা আছে। সেখানে এ ব্যপারে বিস্তারিত বলেছি, দেখে নেয়ার অনুরোধ করছি। তিনি বলেন, সম্মানী লোকেরা কখনো স্বতন্ত্র মহিলা মাদরাসা পছন্দ করতেন না। বড় গ্রাম-গঞ্জের অনেক মেয়েই দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে থাকে, কিন্তু তারা মাদরাসায় না গিয়ে নিজ-নিজ বাড়িতেই শিক্ষা গ্রহণ করেছে। কেউই মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। থানভী রহ. বলেন, স্বীয় বাড়িতে থেকে শিক্ষিত হলে মেয়েদের চারিত্রিক বা অন্য কোন দিকের ক্ষতির কোন আশংকা থাকে না। কেননা সেক্ষেত্রে শিক্ষিকাও উপযুক্ত থাকে এবং পর্দাও রক্ষা হয়ে যায়। আর মেয়েরাও পর্দায় থেকে দ্বীনী শিক্ষা অর্জন করতে পারে। অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানা গেছে যে, বর্তমান সমাজে স্বতন্ত্র যে সমস্ত বালিকা বিদ্যালয় বা বালিকা মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হযরত থানভী রহ. বলেন, এখন প্রশ্ন হল, এ সমস্ত মেয়েদের স্কুল বা মাদরাসা ক্ষতিকর হল কিভাবে? কেউ কেউ বলে থাকেন, মহিলা মাদরাসা বা স্কুলে পর্দার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছে। এমন কি পর্দা রক্ষা করে গাড়ি দ্বারা মেয়েদেরকে মাদরাসা বা স্কুলে পৌঁছানো হচ্ছে। তারপরও কিভাবে ক্ষতিকর বলে মনে হচ্ছে? হযরত থানভী রহ. বলেন, কারণটা কি, তা আমার জানা নেই। কিন্তু অভিজ্ঞতার দ্বারা এতটুকু বুঝা যায় যে, স্কুল বা মাদরাসার তালীম মেয়েদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা, এর দ্বারা মেয়েরা স্বাধীনমনা এবং লজ্জাহীনা হয়ে যায়, পর্দার প্রতি তাদের অনীহা ভাব সৃষ্টি হয়। মহিলাদের সব চেয়ে বড় একটি গুণ হল হায়া বা লজ্জা। এই হায়াই হল সমস্ত কল্যাণ বা মঙ্গলের চাবি-কাঠি। মেয়েদের মধ্যে যদি এই হায়া (লজ্জা) না থাকে, তাহলে তাদের থেকে কখনো কোন প্রকারের কল্যাণের আশা করা যায় না। এক হাদীসে হুযূর ﷺ বলেন, যখন তুমি নির্লজ্জ হয়ে যাবে তখন তুমি যা খুশি তা করতে পারবে।
অবশ্য এ পর্যন্ত যা কিছু বলা হলো এটা আমার নিজস্ব মতামত, কোন ফাতাওয়া নয়।
হযরত থানভী রহ. আরো বলেন, ছেলেদের ন্যায় মেয়েদের জন্য নিয়ম মাফিক স্বতন্ত্র মকতব, মাদরাসা প্রতিষ্ঠার বিষটা আমার কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না। কেননা, এতে এমন কতগুলো সূক্ষ্ম বিষয়ের উপর লক্ষ করলে একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মহিলাদের জন এ ধরণের ধারাবাহিক মকতব, মাদরাসার ব্যবস্থা মোটেই ভাল বলে মনে হয় না। এটা পরীক্ষিত হয়ে যাওয়ার পর এর কারণ বর্ণনা করা প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। তবে একথা লক্ষণীয় যে, এটা আমার কোন ফাতাওয়া নয়, বরং আমার ব্যক্তিগত মতামত। অতএব, কোন ব্যক্তি যদি তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মহিলাদের তালীমের জন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেন এবং তাতে কোন প্রকার ক্ষতিরও আশংকা না থাকে, তাহলে তা বাস্তবায়ন করতে চেষ্টা করবেন। তবে যে কোন উপায়ে হোক না কেন, মেয়েদের জন্য ইসলাম শিক্ষার ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। যার দ্বারা তারা ঈমান-আকীদা, আমল- আখলাক শিক্ষা অবশ্যই করতে পারে। কিন্তু তাদেরকে আধুনিক শিক্ষা দিবে না। এতে তাদের ঈমান-আকীদা, আমল-আখলাক নষ্ট ও বরবাদ হয়ে যাবে।
পরবর্তীতে হযরত থানভী রহ. মেয়েদের স্বতন্ত্র শিক্ষার বিবেচনা করে এর পক্ষে যে মত প্রকাশ করছেন এবং স্বয়ং তিনি নিজে মেয়েদের ঘরোয়া পরিবেশের মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে এর যে রুপরেখা পছন্দ করেছেন, সে সম্পর্কে হযরত রহ. বলেন,
আমি থানভবনে মেয়েদের জন্য একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছি। তার পদ্ধতি হল এই যে, মেয়েরা একজন দ্বীনদার শিক্ষিকার নিজস্ব ঘরে শিক্ষার জন্য একত্রিত হয়ে যায়, সেই ঘরটাকেই পক্ষান্তরে মহিলা মাদরাসা মনে করা হত। অর্থাৎ মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র কোন ঘর বা মাদরাসা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে এমন নয়, শিক্ষিকার আবাসই মেয়েদের মাদরাসা রূপান্তরিত হয়েছে। কিন্তু আমি এতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করেছি যে, আমি নিজে কোন মেয়েকে ঐ বাড়িতে পাঠানোর জন্য উৎসাহিত করিনি। বরং ঐ শিক্ষিকাকে বলে দিয়েছি, ছাত্রী জমা করার দায়-দায়িত্ব তোমাদের। তোমরা যত বেশি পরিমাণ ছাত্রী জমা করাতে পারবে, সেই হিসাবে অতিরিক্ত ভাতাও প্রদান করা হবে। এই মাদরাসা মাসিক পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা দেয়ার জন্য মেয়েরা নিজারাই আমার বাড়িতে চলে আসে। আমার স্ত্রীর বা আমার পরিবারের কোন মেয়ে তাদের পরীক্ষা গ্রহণ করে। আমি নিজে কখনো তাদের পরীক্ষা গ্রহণ করি না এবং তাদেরকে পরীক্ষার জন্য আমার বাড়িতে ডাকাও হত না। বরং তারা নিজেরাই সময়মত পরীক্ষা দেয়ার জন্য চলে আসে, আর পরীক্ষা গ্রহণকারীণীরা তাদের পরীক্ষা গ্রহণ করে। আমার কাছে শুধু পরীক্ষার ফলাফল পেশ করা হয়। নাম্বারের উপর আমার কোন প্রকার দখল বা কর্তৃত্ব থাকে না। বরং পরীক্ষা গ্রহণকারীণীরা নাম্বার দেয়। আর আমি নাম্বারের উপর পুরস্কারের সিদ্ধান্ত করে দেই।
আলহামদুলিল্লাহ, এই পদ্ধতিতে নিয়মিতভাবে মেয়েদের মাদরাসা চলে আসছে, এতে কোন প্রকার বদনাম হয়নি। মোটকথা, মেয়েদের তালীমের ইন্তেজাম এভাবে হবে যে, মেয়েরা তালীমের জন্য স্বতন্ত্র কোন মাদরাসায় একত্রিত হবে না, বরং তারা নিজেদের ঘরে থেকেই দ্বীনী শিক্ষা অর্জন করবে। কিন্তু বর্তমানে তালীমের এই নিয়মটাও পালন করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে অগত্যা যদি কোথাও একত্রিত হয়ে তালীম গ্রহণ করতে চায়, তাহলে এতটুকু অবশ্যই করতে হবে যে কোন পুরুষেকে তালীমের জিম্মাদার বানাবে না। বরং পুরুষগণ নিজেদের পরিবারবর্গের মহিলাদের মাধ্যমে মেয়েদের তালীম তরবিয়্যত ও দেখাশুনা ব্যবস্থা করবে। পুরুষ সরাসরি ঐ সব মেয়েদের সাথে কোনভাবেই কথা বলবে না।
এক্ষেত্রে অন্য একটি বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখা জরুরী। তা হলো, সেক্রেটারী বা অন্য যে ব্যক্তি উক্ত মাদরাসার বাহ্যিক যিম্মদার, তিনি মুত্তাকী ও খোদাভীরুতা অবলম্বনকারী হবেন। যদিও তিনি আলেম নন, কিন্তু তাকে আলেম-মাওলানাদের বেশ-ভূষা অবশ্যই ধারন করা কর্তব্য। যাতে করে তার এই তাকওয়ার বেশ-ভূষা মহিলাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
আমার জ্ঞান বা মতামত অনুযায়ী মহিলাদের দ্বীনী ইলম শিক্ষা দেয়ার এটাই নীতী। এখন অন্যান্য লোকেরা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে মহিলাদের শিক্ষার ব্যাপারে যদি কোন আরো ভাল ত্রুটিমুক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করে কাজ করে যেতে পারে, তাহলে আমার খেয়াল বা মতামতের অনুস্মরণ করা জরুরী নয়।
হযরত থানভী রহ. বলেন, মেয়েদের তালীমের জন্য সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি যা দীর্ঘ দিন যাবৎ চলে আসছে, তা হল-২/৪ জন মেয়ে নিজেদের পরিচিত আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে দ্বীনদার শিক্ষিকার বাড়িতে এসে লেখাপড়া করবে। সম্ভব হলে, এমন মহিলার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করবে, যিনি তালীমের কোন বিনিময় গ্রহণ করেন না। তাহলে সেই তালীম খুবই বরকতময় হবে। তবে প্রয়োজনে অপরাগতার ক্ষেত্রে বেতন দিয়েও পড়া-লেখা করতে পারবে। তাতে কেন প্রকার অসুবিধা নেই। যদি কোথাও পড়ানোর মত কোন যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষিকা পাওয়া না যায়, তাহলে নিজের পরিবারের পুরুষ লোকে মেয়েদের দ্বীনী ইলম দিবে। পরিবারের কোন ব্যক্তি যদি আলেম হন, তাহলে তো তিনিই পড়াবেন। আর যদি পুরুষদের মধ্যে কোন ব্যক্তি আলেম না হন, তাহলে পরিবারের মেয়েদের মধ্যে যদি কেউ শিক্ষিতা হন, তখন তিনিই পড়াবেন। তাও যদি সম্ভবপর না হয়, তাহলে অন্য কোন দ্বীনদার মহিলা দ্বারা পড়ানোর ব্যবস্থা করবেন।
হযরত থানভী রহ. এর এ আখিরী বয়ান দ্বারা উপযুক্ত তত্ত্বাবধান ও শর‘ঈ পর্দা বজায় রেখে মেয়েদের ঘরোয়া পরিবেশের মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে মাশওয়ারা পাওয়া যায়। তাই মেয়েদের ঘরে দ্বীন শিক্ষা দেয়ার মত বন্দোবস্ত করতে না পারলে, মাদরাসায় পড়াতে পারে। মোট কথা, যেভাবেই হোক, শরী‘আতের গন্ডি বজায় রেখে মেয়েদের দ্বীন শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। [প্রমাণঃ হযরত থানভী রহ. এর ইসলাহে খাওয়াতিন ৩৩৭ পৃঃ]