হালাল উপার্জন এবং মা-বাবার আনুগত্য
প্রশ্ন
আমার বাবা একজন উকিল। প্রতি মাসে সিভিল ও ক্রিমিনাল কেস করে ২০/২৫ হাজার টাকা রোজগার করে। কিন্তু আমার বাবা আমি ছোট থাকতে মাকে ভিন্ন করে দিয়েছে এবং পিতা ২য় বিবাহ করেছে কিন্তু মা আর ২য় বিবাহ করেনি। আমার বড় ভাই ওকালতী পড়ছে আর আমি পিতার ওকালতীর টাকা এবং একটি দোকান বিক্রির টাকায় গড়া একটি মুরগীর ফার্মে কাজ করি। এখন আমি ইসলাম মুতাবিক চলতে চাই। এজন্য আপনাদের থেকে কয়েকটি প্রশ্নের সমাধান কামনা করছি।
১। ওকালতীর টাকা এবং দোকান বিক্রির টাকায় গড়া ফার্ম থেকে যে লাভ আসে তা সন্তানের জন্য হালাল না হারাম? অর্থাৎ পিতার হারাম টাকা সন্তানের জন্য হালাল কি?
২। পিতার ওকালতীর টাকা এবং ধার করে টাকা নিয়ে বা ওকালতীর টাকা ও ফার্মের টাকা দিয়ে যদি সন্তানকে বিদেশ পাঠায় তাহলে সন্তান বিদেশে গিয়ে যে অর্থ উপার্জন করবে তা হালাল হবে, না হারাম হবে?
৩। পিতা স্বচ্ছল, মাতা অসহায়। পিতার সাথে থেকে মাতাকে কোন সাহায্য সহযোগিতা করলে পিতা বাধা দেয়। আর আমি চলে গেলে পিতা কষ্ট পাবে, এখন আমার করণীয় কি?
৪। ইসলামের দৃষ্টিতে ওকালতী কি? বর্তমানে মিথ্যা ও প্রতারণা ছাড়া ওকালতী করা যায় না। তাই এইভাবে অর্থ উপার্জন হবে তা কি পর্যায় পড়ে।
৫। আমি পিতার ফার্মে কাজ করতে চাই না, শুধু পিতার ভয়ে কাজ করি। আমার ধারণা অমনোযোগিতার সাথে কাজ করার কারণে পিতার সাথে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে। তাই এই গুনাহ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আমি পিতা থেকে চলে আসতে চাই। এখন আসতে পারব কি-না?
উত্তর
(১ ও ৪) শরী‘আতের দৃষ্টিতে মিথ্যা, প্রতারণা ও ধোঁকার আশ্রয় নিয়ে কোন মামলা মোক্কাদ্দমায় যে ওকালতী করা হয়, সে ওকালতী ব্যবসা নাজায়েয হবে। তবে কেউ যদি মিথ্যা প্রতারণার আশ্রয় না নিয়ে সত্য ও সঠিকভাবে মামলা মোকাদ্দমায় ওকালতি করে তাহলে সে ওকালতী ব্যবসা জায়িয হবে এবং এর দ্বারা অর্জিত অর্থ হালাল হবে।
আর নাজায়েয পন্থায় উপার্জিত অর্থ উপার্জনকারী এবং তার সন্তানের জন্য হালাল হবে না। সর্বাবস্থায় তা মালিককে ফেরত দিতে হবে। আর মালিকের অবর্তমানের তার ওয়ারিশদেরকে দিতে হবে। মালিক বা তার ওয়ারিশ কাউকে না পেলে সে পরিমাণ অর্থ মালিকের সদকা করে দিতে হবে। তবে ওকালতীর টাকা এবং দোকান বিক্রির টাকায় গড়া মুরগীর ফার্ম থেকে যে লাভ আসে তা তার জন্য হালাল হবে। [ফাতাওয়া মাহমূদিয়া ১৪:৪১৫, নিজামুল ফাতাওয়া ১:৩৭]
২। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ ব্যয় করে কাউকে বিদেশ পাঠালে কাজটি নাজায়িয ও হারাম হবে বটে, তবে সে বিদেশে হালাল পথে অর্থ উপার্জন করলে সে অর্থ হালাল হবে, হারাম হবে না। সুতরাং হারাম উপায়ে অর্জিত মালামাল মালিককে বা তার ওয়ারিশকে ফেরত দিতে হবে। অন্যথায় হাশরের ময়দানে নেকী দিয়ে গুনাহ গ্রহণ করে তা পরিশোধ করতে হবে। [প্রমাণঃ ইমদাদুল ফাতাওয়া ৩:১৭০,৪:১৪৭]
৩। আল্লাহ রাব্বুল আ‘লামীন কুরআন শরীফে পিতা মাতার উভয়ের সাথে ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের সাথে কটূ ব্যবহার এবং তাদেরকে ধমক দিয়ে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং আপনার দ্বায়িত্ব হল, ব্যক্তিগত ভাবে আপনার মাতার জানি এবং মালী অর্থাৎ আত্মীক ও আর্থিক সব ধরনের সাহায্য সহযোগীতা করা এবং আপনার পিতার সাথে আদব ইহতেরাম বজায় রাখা এবং তার সাথে কোন খারাপ আচরন না করা। আপনার মাতার সাহায্য সহযোগিতা করতে পিতা যদি অসন্তুষ্ট হন তাহলে এর পরওয়া না করে আপনি আপনার মাতার সাহায্য-সহযোগিতা করবেন এবং পিতাকে হেকমতের সাথে বোঝাতে চেষ্টা করবেন যে, আল্লাহ তা‘আলা সন্তানকে পিতা-মাতা উভয়ের প্রতি ভাল ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কারো সাথে কটূ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। এর পরেও যদি মাতার সাহায্য সহযোগিতা করার কারণে পিতা আপনাকে তার কাছ থেকে চলে যেতে বলে, তাহলে চলে গিয়ে হলেও অসহায় মাতার সাহায্য সহযোগিতা করা আপনার কর্তব্য। [সূরা বনী ইলরাঈ:২৩, তাকমিলায়ে ফাতহুল মুলহিম শরহে মুসলিম: ৫:৩২, মুসলিম শরীফ, ২:৩১২]
৫। পিতা যদি হারাম অর্থের দ্বারা ফার্ম বানায় তাহলে সে ফার্মে সন্তানের জন্য কাজ করা জায়িয হবে না। এক্ষেত্রে আদবের সাথে অপারগতা প্রকাশ করে সন্তানের জন্য ফার্মের কাজ ছেড়ে চলে আসা কর্তব্য। কিন্তু যদি পিতা হালাল অর্থের দ্বারা ফার্ম বানায় এবং সন্তানের সে ফার্মে কাজ করতে শরয়ী কোন বাধা না থাকে তাহলে পিতার আদেশ অনুযায়ী সন্তানের সেখানে কাজ করা ওয়াজিব। পিতার হুকুম অমান্য করে ফার্মের কাজে অমনোযোগি হওয়া বা ফার্ম থেকে চলে আসা সন্তানের জন্য জায়িয হবে না। [সূরা মায়িদা:২, তাফসীরে মা‘আরিফুল কুরআন ৫:৪৬৪]