বিয়েতে বৌভাত ও মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান করা

মুফতী মনসূরুল হক সাহেব১৬ জানুয়ারি, ২০২৫বিবাহ তালাক

প্রশ্ন

আমাদের দেশে প্রচলিত রিওয়াজ আছে, বিবাহ অনুষ্ঠানে বর পক্ষ অনেক লোকজন নিয়ে মেয়ের বাবার বাড়ীতে বরযাত্রী হিসেবে যায়। সেখানে ভাল ভাল উন্নত মানের খানাপিনার ব্যবস্থা হয়। মেয়ের বাবা অক্ষম হলেও সামাজিকতা ও মান সম্মানের ভয়ে উক্ত অনুষ্ঠান করতে বাধ্য হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে মেয়ের পক্ষ থেকে আমন্ত্রিত আত্মীয়-স্বজনেরা বরকনের জন্য বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী নিয়ে আসে। এরপরে রয়েছে ছেলের বাড়িতে বৌ-ভাতের অনুষ্ঠান। উক্ত অনুষ্ঠানে ছেলে পক্ষের আত্মীয়রা নানা ধরনের উপহার সামগ্রী দিয়ে থাকে। এটা একটা নিয়মে পরিনত হয়েছে। বিবাহ অনুষ্ঠানে দাওয়াত খাওয়ার অর্থই হল কোন কিছু উপহার দেয়া। উল্লেখিত বিষয়ের আলোকে আমার জিজ্ঞাসা হচ্ছে,

(১) বরের পক্ষ থেকে ১০০/৫০ করে মেয়ের বাড়ীতে বরযাত্রী যাওয়া কি জায়িয?

(২) বরের বাড়ীতে বৌভাতের অনুষ্ঠান কি জায়িয?

(৩) উক্ত অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত মেহমানদের দেয়া উপহার কি যৌতুকের শামিল?

(৪) শরী‘আতে ছেলের পক্ষ থেকে যে ওলিমা অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে, তা কোনটি?

(৫) শরী‘আতের বিবাহের অনুষ্ঠান কিভাবে করতে হবে? যেমন- বিবাহের কালিমা, বৌ তুলে আনা, বর-কনের গোসল অনুষ্ঠান, বৌভাত অনুষ্ঠান ইত্যাদি।

উত্তর

(১) শরী‘আতে বরযাত্রীর অনুষ্ঠানের নামে কোন অনুষ্ঠান নেই। আমাদের দেশে প্রচলিত নিয়ম যে, বরের সাথে ১০০/৫০ জন বরযাত্রী যাবে। তাদের উন্নতমানের খানা-পিনার ইন্তেজাম মেয়ের বাবার কাধে পড়বে, সামর্থ্য থাক বা না থাক, প্রথা হিসাবে মেয়ের বাবা বাধ্য হয়ে তাদের খানাপিনার ইন্তেজাম করে থাকে। অনেক সময় লোকেরা খানার ব্যাঘাত হলে অসন্তুষ্ট হয়ে যায়। এসবই শরী‘আত পরিপন্থী কাজ। বরং মেয়ের বাবার সামর্থ্য থাকলেও তার বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হবে না। তবে অল্প সংখ্যক লোক বরের সাথে পরামর্শদাতা হিসেবে বা সাহায্যকারী হিসেবে যেতে পারে। মেয়ের বাবা ইচ্ছা করলে তাদেরকে তাওফীক অনুযায়ী খাওয়াতে পারে।

(২) বরের বাড়ীতে ওলিমা শুধু জায়িয নয়, বরং সুন্নাত। তবে তাকে বৌভাত না বলে ওলিমা বলা উত্তম।

(৩) ওলিমার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত মেহমানদের দাওয়াত দিয়ে আনা হয়, তারা স্ব- ইচ্ছায় আসে না। এখন তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে এনে খাওয়ানোর পর তাদের নিকট থেকে উপহার আদায় করা যৌতুকে শামিল না হলেও তা আদায় করা জায়িয হবে না। কেননা, এটা পরোক্ষভাবে খাওয়ার প্রতিদান উসুল করা হচ্ছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা এটা প্রথা হিসাবে বা লোক দেখানোর উদ্দেশে দিচ্ছে। কাজেই এ ধরনের উপহার আদায় না করাই উচিত।

(৪) প্রথম রাত্রে স্ত্রীর সাথে রাত্রি যাপনের পর, স্বামী নিজের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, ফকির-মিসকীন এবং মেয়ের পক্ষের আত্মীয়-স্বজনদেরকে দাওয়াত করে খানা খাওয়াবে। এটাই ওলিমা। তবে সামর্থ্যের অধিক খ্যাতি অর্জনের লক্ষে বিরাট আকারে আয়োজন করা অনুচিৎ।

(৫) শরী‘আত মত বিবাহের নিয়ম হল, তাতে বেশী জাঁকজমক করবে না। নাম দামের জন্য প্রয়োজনাতিরিক্ত খরচ করবে না। খুবই সাদাসিদে ভাবে বিবাহ হতে হবে। যেই পরিমাণ মহর আদায় করার সামর্থ্য থাকে, ঐ পরিমাণ মহর নির্ধারিত করা সুন্নাত। তবে ১০ দিরহামের (বর্তমান বাজর দর অনুযায়ী আনুমানিক পাঁচশত টাকার) কম মহর ধার্য্য করবে না। ইজাব কবুলের দ্বারাই বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের আগে অভিভাবকের জন্য মেয়ে থেকে ইজাযত নেয়া সুন্নাত। কন্যাকে বলা হবে যে, অমুকের কাছে এত টাকা মহর ধার্য করে তোমাকে বিবাহ দিচ্ছি। তুমি রাযী আছো? মেয়ের পক্ষ থেকে অনুমতি পাওয়ার পর কাজী সাহেব বিবাহের খুৎবাহ পড়বেন। অতঃপর ওলী বরের নিকট বিবাহের প্রস্তাব পেশ করবেন। বর কবুল করবেন।

বিবাহ-শাদীতে বর-কনের গোসল ও হলুদ দেয়ার প্রথা, তা নিয়ে বেপর্দা ক্ষীর খাওয়ার উৎসব, নতুন বধুকে বরণ করতে মাত্রাতিরিক্ত ধুম-ধাম, বেপর্দার সাথে পুরুষ-মহিলার সংমিশ্রণ প্রভৃতি শরী‘আত বিরোধী কাজ।

জামাইকে পাটায় উঠানো, উভয়কে মিষ্টি মুখ করে তামাশা করা বরের হাত পায়ে মেহেদী লাগান, রং ছিটা-ছিটি, সকলের সামনে তাদের শোকরানা নামাযের প্রদর্শন ইত্যাদি সবই কু-প্রথা ও গর্হিত কাজ।

শরী‘আতে এ সবের কোন ভিত্তি নেই। এ সমস্থ প্রথা নাজায়িয ও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

[প্রমাণঃ ফাতওয়া মাহমূদিয়া ৭:৩১৮, ৩৮৬, ৩৮৭ #ইসলামী শাদী ২৩৮:২৪০]

বিয়েতে বৌভাত ও মেয়ের বাড়িতে অনুষ্ঠান করা | ইসলামী যিন্দেগী