তাবলীগের লোকেরা জিহাদ করে না কেন?

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)March 15, 2025দাওয়াত ও তাবলীগ

Question

যারা তাবলীগ জামা‘আতে সময় লাগায় তারা এটাকেই আসল জিহাদ মনে করে এবং জিহাদের সমস্ত ফযীলত এই কাজের মধ্যে প্রমাণ করতে চায়। রাসূলে আকরাম ﷺ সশস্ত্র জিহাদ করা সত্বেও তাবলীগ আলারা সেটার নাম মুখেও আনে না। তাদের কথাবার্তা দ্বারা বুঝা যায় যে, এই কাজ করলে ঐ জিহাদের আর প্রয়োজন নেই। এখন আমার প্রশ্ন হল তাবলীগ আর জিহাদ কি এক জিনিষ? তাবলীগের দ্বারা কি জিহাদের হক আদায় হয়ে যাবে? আমাদের জন্য কোটি বেশী করণীয় তাবলীগ না কি জিহাদ?

Answer

আভিধানিক অর্থে জিহাদ বলা হয় কষ্ট, পরিশ্রম, সাধনা, শক্তি ইত্যাদিকে। আর পরিভাষায় জান, মাল, বক্তৃতা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর পথে লড়াই করার কাজে নিজের সর্বশক্তি নিয়োগ করাকে জিহাদ বলে। (বাদায়িউস সানায়ি-৭-৯৭)

হযরত মুফতী তাকী উসমানী সাহেব বলেন, হাতিয়ার ধন- সম্পদ, ইলম-আমল, কলম-বক্তৃতা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করার এবং কাফের ও কুফরের প্রভাব প্রতিপত্তিকে সমূলে উৎখাত করার জন্য নিজের সমস্ত শক্তি ব্যয় করাকে জিহাদ বলে। (তাকমিলা-৩য় খন্ড-৪ পৃ.)

মনে রাখা দরকার যে, জিহাদ তিন প্রকার।

(১) নিজের নফস বা প্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করা। রাসূলে অকরাম ﷺ ইরশাদ করেন, প্রকৃত মুজাহিদ সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তা‘আলার আনুগত্য করার ব্যাপারে নিজের নফসের সাথে জিহাদ করে। (মিশকাত-১৫)

হাদীস শরীফে নফসের সাথে জিহাদ করাকে জিহাদে আকবার তথা বড় জিহাদ বলা হয়েছে।

(১) দ্বিতীয় হচ্ছে জিহাদ বিল ইলম তথা ইলমের সাহায্যে জিহাদ করা। এই জিহাদকে কুরআন শরীফে জিহাদে কাবীর বলা হয়েছে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করছেন, হে নবী। আপনি কাফেরদের আনুগত্য করবেন না বরং কুরআনের সাহায্যে তাদের সাথে প্রবল ভাবে জিহাদ চালিয়ে যান। (সুরায়ে ফুরকান-৫২)

ইমাম আবু বকর জাসসাস রহ. স্বীয় গ্রন্থ আহকামুল কুরআনে এ ব্যাপারে আলোচনা করতে যেয়ে বলেন, ইসলামের প্রকৃত প্রাণশক্তি এই জিহাদের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এই জিহাদের মাধ্যমেই ইসলাম গোটা পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করেছে এবং সমগ্র বিশ্বে তা শ্রেষ্ঠতম মতাদর্শের মর্যাদা লাভে সক্ষম হয়েছে।

ইসলামের শত্রুরা যদি এর পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি না করত তাহলে দুনিয়ার বুকে কোন সত্যসন্ধানী আত্মাই এই মতবাদ কবুল করা ছাড়া থাকতে পারত না।

জিহাদ বিল ইলম প্রথমতঃ দুই প্রকার।

(১) প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে দ্বীনের সংরক্ষণ করা। এটি আবার চার প্রকার যথা:

(ক) ভাষা ও যুক্তির দ্বারা জিহাদ করা

(খ) শরীর ও মন দ্বারা জিহাদ করা

(গ) লেখনীর মাধ্যমে জিহাদ করা

(ঘ) সম্পদ ব্যয় করে জিহাদ করা।

(২) বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে যে সব অভিযোগ উত্থাপন করা হয় এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয় অকাট্য যুক্তি প্রমাণের মাধ্যমে তা খণ্ড করা। এটিও চার প্রকার যথা,

(ক) জিহাদ বিল লিসান

(খ) জিহাদ বিন নফস

(গ) জিহাদ বিল কলম

(ঘ) জিহাদ বিল মাল। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী জিহাদ বিল ইলম সর্বমোট আট প্রকার।

(৩) তৃতীয় নম্বর হচ্ছে জিহাদে কিতাল অর্থাৎ দারুল হরবের অধিবাসীদের সাথে সশস্ত্র লড়াই করা। এটি হচ্ছে জিহাদের এক বিশেষ প্রকার। এই জিহাদে কিতাল আবার দুই প্রকার।

(ক) আক্রমণাত্মক জিহাদ (খ) আত্মরক্ষামূলক জিহাদ।

জিহাদের এই বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পরে এবার আসুন প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করি। বর্তমান বিশ্বে তাবলীগ জামা‘আতের যে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তার দ্বারা জিহাদের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকারের উপর আমল হচ্ছে নিঃসন্দেহে। তাই তাবলীগ জামা‘আত যে জেহাদ করে না বা জেহাদের কথা বলে না আপনার এ অভিযোগ ঠিক নয়।

জিহাদের তৃতীয় প্রকার অর্থাৎ সশস্ত্র জিহাদে তারা অংশ নিচ্ছে না তার একটা কারণ আছে। সেটা হল সশস্ত্র জিহাদ করতে গেলে প্রথম দুই প্রকারের জিহাদ কিন্তু বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া জিহাদে কিতাল তো এখন ফরযে আইন নয় বরং ফরযে কিফায়া। যা সকল মুসলমানের জন্য ফরয নয় বরং ছোটখাট একটি গ্রুপ পালন করলে দায়িত্ব আদায় হয়ে যাবে। এবং আলহামদুলিল্লাহ সেরকম ছোট খাট গ্রুপ ময়দানে বিদ্যমান ও আছে। এখন তাবলীগ জামা‘আতকে এটা করার জন্য বাধ্য করার কোন যুক্তি থাকতে পারে না। কেননা একটি দলের জন্য সকল কিছু করা সম্ভবও নয় আর জরুরীও নয়। বরং বিভিন্ন দল নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে একটা একটা দায়িত্ব ভাগ করে নেয়া উচিৎ। যে ডাক্তার তাকে আপনি কখনো জিজ্ঞাসা করেন না যে, ডাক্তার সাহেব! আপনি শুধু ডাক্তারী করেন, শিক্ষকতা করেন না কেন? যে ব্যবসায়ী তাকে আপনি একথা কখনো বলেন না যে, মিঞা আপনি শুধু ব্যবসাই করে গেলেন, জমি জায়গা চাষাবাদ করবে কে? অনুরূপ ভাবে আপনি তাবলীগ আলাদেরকে একথা বলতে পারেন না যে, আপনারা শুধু জিহাদ বিল ইলম আর জিহাদ বিল মালই করে গেলেন, জিহাদে কিতাল কেন করেন না? তারা তো একটা জিহাদ নিয়ে আছেনই, যারা এগুলি করে না তাদেরকে বরং আপনি জিহাদে কিতালের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। এটা আপনি নিজেও চিন্তা করলে বুঝতে পারবেন যে, অনেক সময় বেশ কিছু কাজ একসাথে করতে গেলে কোনটিই সুষ্ঠুভাবে সমাধা করা যায় না। বরং সবগুলিই বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এই জন্যই পার্থিব কাজের ক্ষেত্রেও কিন্তু বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা আলাদা বিভাগ থাকে। এক বিভাগে সব কাজ একত্রে করা হয় না। সুতরাং তাবলীগের নামে যে মেহনত চলছে সেটাও জিহাদেরই একটা অংশ। সুতরাং জিহাদের যে সব ফযীলত কুরআন-হাদীসে বয়ান করা হয়েছে সেগুলি তাবলীগ করলেও পাওয়া যাবে বলে আমরা আল্লাহ পাকের দরবারে আশাবাদী।