শরী‘আতের আলোকে তাকলীদ
Question
বর্তমানে আমাদের সমাজে লা-মাযহাবীদের দৌরাত্ম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাদা সিদা মুসলমানদেরকে তারা বিভিন্ন ভাবে বিভ্রান্ত করতে চেষ্টা করছে। তাকলীদ করা নাকি শিরক। শরী‘আতে এর নাকি কোন প্রমাণ নেই। এসব তারা বলে বেড়াচ্ছে। তাদের এই প্রোপাগাণ্ডার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের জানার বিষয় হল, শরী‘আতে তাকলীদের দর্জা কি? কুরআন হাদীসে এর স্বপক্ষে কোন দলীল থাকলে তা জানতে চাই।
Answer
আহলে হাদীস নামধারী লামাযহাবীদের অপপ্রচারের ফলে সাধারণ মুসলমানরাও আজ তাকলীদের ব্যাপারে দ্বিধা দ্বন্দের মধ্যে পড়ে গেছে। বিভিন্ন প্রশ্ন আর সন্দেহ তাদের মনে দানা বাঁধছে। তাই আলোচ্য প্রশ্নের উত্তরটি আমরা একটু বিশদ ভাবে দেয়ার চেষ্টা করব। আশা করি কেউ নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে এটি পড়লে তার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।
দ্বীনের আসল দাওয়াত আর আহ্বান হল শুধু মাত্র আল্লাহ তা‘আলারই আনুগত্য করতে হবে। অন্য কারো আনুগত্য করা যাবে না। এমন কি স্বয়ং রাসূলে আকরাম ﷺ এর আনুগত্য আর অনুসরণও শুধু মাত্র এই জন্যই করা হয়ে থাকে যে, তিনি স্বীয় কথা ও কাজের দ্বারা আল্লাহ তা‘আলার হুকুম-আহকামের ব্যাখ্যা করে গেছেন। হালাল-হারাম জায়েয-নাজায়েয, ইত্যাদি সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলারই ইতাআত আর আনুগত্য করা জরুরী। কিন্তু রাসূলে আকরাম ﷺ যেহেতু এসব বিষয়গুলিকে উম্মত পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন তাই আমরা তারও অনুসরণ করে থাকি। বস্তুতঃ তার অনুসরণ-আনুগত্য করা আল্লাহ তা‘আলারই আনুগত্য করার নামান্তর। আল্লাহ তা‘আলা নিজেই ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। সুতরাং শরী‘আতের সমস্ত ব্যাপারে আনুগত্য করার হকদার একমাত্র আল্লাহ ও তার রাসুল। যদি কোন ব্যক্তি তৃতীয় কারো আনুগত্য করাকে জরুরী মনে করে এবং তাকে হুকুমদাতা মনে করে তাহলে নিশ্চয় এটা নিন্দনীয় কাজ হবে। অতএব সকল মুসলমানের জন্য জরুরী হল, কুরআন-হাদীসে বর্ণিত হুকুম-আহকামের অনুরসরণ করা।
কুরআন হাদীসে কিছু হুকুম আহকাম এমন আছে যা সরাসরি আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, তার মধ্যে কোন ধরনের অস্পষ্টতা নেই। এ ধরনের হুকুম আহকামকে (মানছুছ) বলা হয়। এর বিপরীতে কিছু হুকুম এমনও আছে যাতে কিছুটা অস্পষ্টতা এবং সংক্ষিপ্ততা থাকে অর্থাৎ সেগুলি বিশদ ব্যাখ্যার মুখাপেক্ষী। আবার কিছু আয়াত ও হাদীস এমনও আছে যার কয়েকটি অর্থ হতে পারে। কিছু আছে মুহকাম, কিছু আছে মুতাশাবিহ। কিছু আছে মুশতারাক, আবার কিছু আয়াত ও হাদীস এমনও আছে বাহ্যিক দৃষ্টিতে যে গুলিকে অন্য কোন আয়াত বা হাদীসের সাথে সংঘর্ষপূর্ণ মনে হয়। যেমন হাদীসে আছে, যে ব্যক্তির ইমাম আছে সেই ইমামের কিরাআতই তার জন্য যথেষ্ট। (ইবনে মাজাহ-৬১)
অন্য হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে, ইমাম নিযুক্ত করা হয় তার অনুসরণ করার জন্য। সুতরাং যখন সে তাকবীর বলে তখন তোমরাও তাকবীর বল আর যখন সে কিরাআত পাঠ করে তখন তোমরা চুপ থাক। (মুসলিম শরীফ-১-১৭৪)
এই হাদীসদ্বয়ের একই মতলব যে, মুক্তাদিদের জন্য কিরাআত পড়তে হবেনা। এর মুকাবিলায় অন্য একটি হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি নামাযে সুরায়ে ফাতেহা পড়ল না তার নামাযই হল না। (বুখারী শরীফ ১-১০৪)
এরকম আরো অনেক দৃষ্টান্ত আছে যাতে দেখা যায় একটি হাদীস আরেকটি হাদীসের সাথে সংঘর্ষপূর্ণ। এছাড়াও আরো শত শত মাসআলা মাসায়িল এমন রয়েছে যা কুরআন-হাদীসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয় নাই।
সেখানে ইস্তিমবাত এবং ইজতিহাদের সাহায্য নেয়া জরুরী হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় আমলকারীরা পেরেশানী আর দ্বিধাদ্বন্দের মধ্যে পড়ে যায় যে, আমরা কোন হাদীসের উপর বা কোন হুকুমের উপর আমল করব? এই পেরেশানী দূর করার এবং সঠিক মাসআলা বুঝার একটি পদ্ধতি হচ্ছে মানুষ নিজের ইলম আর বিবেকের উপর ভরসা করে নিজেই কোন একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হবে এবং তার উপর আমল করতে শুরু করবে। আরেকটি পন্থা হল এ ধরনের বিরোধ পূর্ণ মাসায়েলের ব্যাপারে নিজে কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে এবং নিজে কোন ফায়সালা না করে সে এটা দেখবে যে, আমাদের পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম, সাহাবা, তাবেইন, মুজতাহিদীনগণ-যারা রাসূলে আকরাম ﷺ এর নিকটবর্তী যুগের ছিলেন, ইলম-আমলে যারা আমাদের চেয়ে হাজার গুণে উত্তম ছিলেন, যাদের যুগকে রাসূলে আকরাম ﷺ উত্তম যুগ বলে অভিহিত করেছেন-তারা এসব আয়াত ও হাদীসের কি মতলব বুঝেছিলেন এবং কোনটার উপর আমল করেছিলেন। সেটা খুঁজে বের করে তার উপর আমল করা। আলোচ্য এই দুই পন্থার মধ্যে দ্বিতীয়টা যে বেশী যুক্তিযুক্ত তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা দুনিয়াবী ব্যাপারেও আমরা দেখি যে, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সে ভাল যোগ্য ডাক্তারের স্বরণাপন্ন হয়, নিজে ডাক্তারী বই পড়ে কেউ উযূধ নির্বাচন করে না। কোর্টে মামলা উঠলে উকিলের স্বরণাপন্ন হয়। বাড়ী বানাতে গেলে ইঞ্জিনিয়ারের কাছে পরামর্শের জন্য যায় এবং এরা যা বলে তা নির্দ্বিধায় মেনে নেয়। তাদের কাছে কোন দলীল চায় না যে, এটা এরকম কেন হবে। এটা কোন বইয়ে লেখা আছে?
ঠিক অনুরূপ ভাবে দ্বীনী ব্যাপারে ও ঐ সব সম্মানিত বুযুর্গদের ইলম দুরদর্শীতা আর বিচক্ষণতার উপর নির্ভর করে তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যাকে নির্দ্বিধায় মেনে নেয়ার নামই হচ্ছে তাকলীদ।
তাকলীদের দর্জা ব্যস এতটুকু যে, তাকলীদ কারী তথা মুকাল্লিদ স্বীয় ইমামের তাকলীদ এই ভেবে করে যে, প্রকৃত পক্ষে আমি কুরআন হাদীসের উপরই আমল করছি এবং রাসূলে আকরাম ﷺ এরই অনুসরণ করছি আর এই ইমাম আমার এবং সাহেবে শরী‘আতের মধ্যে শুধু মাত্র মাধ্যম বৈ অন্য কিছু নয়।
যেমন মনে করুন কোথাও যদি নামাযে বড় জামা‘আত হয় আর ইমামের তাকবীর ইত্যাদির আওয়ায পিছন পর্যন্ত না পৌঁছে তাহলে সেখানে মুকাব্বির নিয়োগ করা হয়, যার কাজ হল ইমামের আওয়াযটাকে দূরদূরান্ত পর্যন্ত পৌছে দেয়া। সেখানে পিছনের মুসল্লীরা একথা কখনও মনে করে না যে, আমরা এই মুকাব্বিরের ইক্তিদা করছি বরং মনে করে আমরা মুকাব্বিরের মাধ্যমে ইমামেরই অনুসরণ করছি। অনুরূপ ভাবে মুকাব্বিরও নিজেকে কখনও ইমাম মনে করেনা বরং সে ইমামের আওয়াজ নকলকারী রূপেই নিজেকে ভাবে। তাকলীদের ব্যাপারটাও ঠিক এরকম। মুকাল্লিদ কখনও মনে করে না যে, ইমাম আবু হানীফা বা ইমাম শাফেয়ী শরী‘আতের প্রবর্তক আর আমরা তাদের আনুগত্য করছি। বরং তারা ভাবে- আমরা প্রকৃত পক্ষে আল্লাহ এবং তার রাসূলেরই আনুগত্য করছি তবে কম ইলমির কারণে আমরা যেহেতু সঠিক ভাবে কুরআন-হাদীস বুঝার যোগ্যতা রাখিনা তাই তাদেরকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছি। অনুরূপ ভাবে যিনি মাযহাবের ইমাম তিনি ও কখনো এটা ভাবেন না যে, আমি সাহেবে শরী‘আত বা নবীর দর্জায় পৌঁছে গেছি, বরং তিনি নিজেকে শরী‘আতের হুকুম আহকাম নকলকারী রূপেই গণ্য করে থাকেন।
মোট কথা হল, মাসায়েলের ক্ষেত্রে যখন এ ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ দেখা দেয় তখন তার থেকে মুক্তি পাওয়ার দুটি পথ রয়েছে। হয়ত সে পূর্ববর্তী আকাবের-আসলাফ-মুজতাহিদীনদের জ্ঞান-গরীমা আর বিচক্ষণতার উপর ভরসা করে তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা মেনে নেবে অথবা নিজের বিদ্যাবুদ্ধির উপর ভরসা করে নিজেই কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে তার উপর আমল করতে শুরু করবে। কিন্তু এই ভুরতে শরী‘আতের উপর আমল করা হবেনা বরং স্বীয় প্রবৃত্তি আর খাহেশাতের পায়রবী করা হবে। কেননা বিরোধপূর্ণ মাসায়েলের মধ্যে সঠিক সমাধানে উপনীত হওয়ার জন্য নাসেখ-মানসূখ, রাজেহ-মারজুহ ইত্যাদি জানা প্রয়োজন, অথচ আমরা তা জানিনা। কেননা আপনি আমি তো মুজতাহিদ নই। এমতাবস্থায় নফসের তাকাজার উপর আমল হবে। নফস যেটাকে ভাল বলবে তার উপর আমল করতে শুরু করব। আর মানুষকে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট করার জন্য শয়তানের সবচেয়ে কামির ও সফল হাতিয়ার হচ্ছে এটা যে, মানুষের গলা থেকে তাকলীদের রশি সে খুলে ফেলতে সক্ষম হয়। এভাবে বেদ্বীন করাও তার জন্য সহজ হয়ে যায়।
এই জন্যই কুরআন-হাদীসে অসংখ্য জায়গায় নফস এবং খাহেশাতের অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং জায়গায় জায়গায় নফসের নিন্দা করা হয়েছে। সুতরাং সেই নফস আপনাকে যে সঠিক পথে নিয়ে যাবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। এই জন্যই মানুষের মুক্তির সহজ পথ হল নিজের থেকে কোন ফায়সালা না করে তাকওয়া, খোদাভীতি, পরহেযগারী, ইলম আমল সহ সবক্ষেত্রে সকলের শীর্ষে অবস্থান কারী চার ইমামের কোন একজনের অনুসরণ করে তার প্রদত্ত ব্যাখ্যা মেনে নেয়া। কেননা এর উপরে সমস্ত উম্মতের ইজমা তথা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, চার ইমামের কোন একজনের অনুসরণ করা ওয়াজিব। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ. বলেন, মনে রাখা উচিৎ যে, এই চার মাযহাবের কোন একটির অনুসরণের মধ্যেই কামিয়াবী রয়েছে আর এগুলি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার মধ্যে ভীষণ ক্ষতি রয়েছে। (ইকদুল জীদ-৩১)
তিনি অন্যত্র বলেন, মাযহাবের পাবন্দী করার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে রাসূলে আকরাম ﷺ ইরশাদ করেছেন "তোমরা বড় জামা‘আতের অনুসরণ কর, আর বর্তমানে যেহেতু এই চার মাযহাব ছাড়া অন্য কোন মাযহাব বাকী নেই তাই এর অনুসরণ করাই বড় জামা‘আতের অনুসরণ করা। আর এর থেকে বের হয়ে যাওয়া বড় জামা‘আত থেকে বের হয়ে যাওয়ার শামিল। (ইকদুল জীদ-৩১)
তাছাড়া ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে একথা স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, তাকলীদ তথা কারো অনুসরণ করা এটা একটা ফিতরী এবং জন্মগত জিনিষ মানুষের সাথে এটা ছায়ার মত মিশে আছে। আমাদের লা মাযহাবী ভায়েরাও কিন্তু পদে পদে তাকলীদ করে চলেছেন। তাদের বাড়ীর ছোট ছোট বাচ্চারা বড়দেরকে দেখেই নামায পড়া শেখে। তাদের ঘরের মহিলারা সবাই নিশ্চয় মুহাদ্দিস, ফকীহ, মুজতাহিদ নয় তারা অবশ্যই পুরুষদেরকে জিজ্ঞাসা করেই মাসআলা মাসায়িল জেনে তার উপর আমল করে থাকে। এই জিজ্ঞেস করে আমল করাটাকে কিন্তু তারা নিন্দনীয় মনে করে না, শিরক আর বিদ‘আত বলে অভিহিত করে না। তাছাড়া ছোট বড় পেশার কাজও কিন্তু অন্যের তাকলীদ করা ছাড়া কেউ শিখতে পারে না। কেউ ডাক্তারী বই একা একা পড়ে যদি ক্লিনিক খুলে বসে তাহলে তার কাছে কি কোন রোগী যাবে? মোট কথা সামান্য সামান্য কাজও শুধু বই পড়ে হয় না বরং সেই বিষয়ে অভিজ্ঞ কোন ব্যক্তিকে ফলো করতে হয়, তাকলীদ করতে হয়। এটা দুনিয়ার একটা সর্বস্বীকৃত ফর্মুলা। তাহলে দ্বীনের ব্যাপারে কয়েকটি হাদীসের উর্দু-বাংলা অনুবাদ পড়ে নিজেকে পণ্ডিত আর মুজতাহিদ মনে ঝরতে শুরু করা, হেদায়াত প্রাপ্ত আয়িম্মাদের শানে কুট বাক্য প্রয়োগ করা, তাদের তাকলীদকে শিরক আর বিদআ' বলে অভিহিত করা আর নিজের অসম্পূর্ণ ইলম-আমলকে যথেষ্ট মনে করে তার উপর ভরসা করা এবং নফস • প্রবৃত্তির অনুরসণ করাকে খালেছ তাওহীদ মনে করা হঠধরমী এবং গোড়ামী নয়তো আর কি? লা মাযহাবী ভাইরা ঠাণ্ডা মাথায় বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখেছেন কি?
কুরআন হাদীসে তাকলীদের প্রমাণ
কুরআন পাকের অসংখ্য আয়াত দ্বারা তাকলীদ ওয়াজিব হওয়া প্রমাণিত হয়। আমরা এখানে অল্প কয়েকটি আয়াতের অর্থ উল্লেখ করছি। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, তোমরা যদি না জান তাহলে আলেমদের থেকে জেনে নাও। (সুরায়ে নাহল-৪৩)
হে মুমিনগণ! যদি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস কর তবে তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা উলুল আমর তাদের আনুগত্য কর। (সুরায়ে নিসা-৫৯)
এই আয়াতে উলুল আমর দ্বারা অন্যান্যের মধ্যে আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন বিশেষ করে চার ইমামও দাখিল।
যদি তারা এই ঘটনা রাসুল এবং উলুল আমরের গোচরে আনত তাহলে তাদের মধ্যে যারা আহলে ফিকহ এবং ইস্তিমবাতের ক্ষমতা রাখে তারা এর যথার্থতা নির্ণয় করে দিত। (সুরায়ে নিসা-৮৩)
এই আয়াতেও স্পষ্ট ভাবে আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীনদের অনুসরণ করার কথা প্রমাণিত হয়। আরো ইরশাদ হচ্ছে, তাদের প্রত্যেক দলের এক অংশ কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বীন সম্মন্ধে জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে। যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে। যাতে তারা সতর্ক হয়। (সুরায়ে তাওবা-১২২)
আর আমি তাদের মধ্যে থেকে নেতা মনোনিত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথ প্রদর্শন করত। যেহেতু তারা ধৈর্য্যধারণ করেছিল এবং আমার আয়াতের উপর বিশ্বাস রাখত। (সুরায়ে সিজদা-২৪)
যে ব্যক্তি আমার দিকে মনোনিবেশ করেছে তার অনুসরণ কর। (সুরায়ে লুকমান-১৫)
হে ঈমানদারগণ। আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক। (সুরায়ে তাওবা-১১৯)
এসকল আয়াতে অনুসরণ এবং তাফলীদের জন্য তাকীদ করা হয়েছে। এবার আমরা তাকলীদ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করছি।
(১) হযরত হুযায়ফা রা. ইরশাদ করেন, রাসূলে কারীম ﷺ ইরশাদ করেছেন, আমি জানিনা কতদিন তোমাদের মধ্যে জীবিত থাকব। সুতরাং আমার পরে তোমরা এই দুই ব্যক্তি অর্থাৎ আবু বকর এবং উমরের তাকলীদ করবে। (মিশকাত শরীফ ৫৬০)
(২) তোমরা আমার সুন্নত এবং হেদায়েত প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধর। (মিশকাত-৩০)
(৩) আমার সাহাবারা তারকারাজীর ন্যায়, তোমরা যারই অনুসরণ করবে হেদায়েত পেয়ে যাবে। (মিশকাত, ৫৫৪)
(৪) হযরত মুআয রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, যখন রাসূলে আকরাম ﷺ আমাকে ইয়ামানের গভর্ণর করে পাঠালেন তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন সমস্যা দেখা দিলে তুমি কিভাবে তার ফায়সালা করবে? আমি বললাম, কিতাবুল্লাহ দ্বারা ফায়সালা করব। ইরশাদ করলেন সেই মাসআলা যদি কিতাবুল্লায় না থাকে? আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদীস দ্বারা ফায়সালা করব। ইরশাদ করলেন, হাদীসে যদি তার সমাধান না থাকে? আমি বললাম, তাহলে ইজতিহাদ আর ইস্তিমবাত করে নিজের রায় অনুযায়ী ফায়সালা করব।
রাসূলে আকরাম ﷺ আমার এই উত্তর শুনে অত্যন্ত প্রফুল্ল চিত্তে আমার সীনার উপরে হাত মেরে বললেন, ঐ আল্লাহর শুকরিয়া যিনি তার রাসূলের কাসেদকে এমন কথার তাওফীক দিয়েছেন যার উপর আল্লাহর রাসুল সন্তুষ্ট। (মিশকাত শরীফ-৩২৪, আবু দাউদ শরীফ-১৪৯)
এই হাদীস দ্বারা কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয়। (ক) অনেক মাসায়িল এমন আছে যা কুরআন হাদীসে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ নেই। (খ) এরকম অনুল্লেখিত মাসআলার ব্যাপারে স্বীয় রায় এবং ইজতিহাদ দ্বারা ফায়সালা করা পছন্দনীয় এবং এটা আল্লাহ ও তার রাসূলের মর্জিরও মুআফিক।
(গ) রায় এবং ইজতিহাদ আল্লাহ তা'আলার একটি নেয়ামত ও অনুগ্রহ ও বটে। যার উপরে রাসূলে আকরাম ﷺ আলহামদুলিল্লাহ বলেছেন এবং খুশির আতিশয্যে হযরত মুআয রা. এর সীনায় হাত মেরেছেন। এর দ্বারা এদিকে ইশারা করা হয়েছে যে, উলুমে নুবুওয়াতের ফয়েজ ও বরকত ফফীহ এবং মুজতাহিদের সাথে রয়েছে।
(ঘ) হযরত মুআয রা. কে যখন ইয়ামানের কাজী এবং গভর্ণর করে পাঠাচ্ছিলেন তখনকার ঘটনা এটা। হুযুর ﷺ জানতেন যে, ইয়ামানে যাওয়ার পরে ইয়ামানবাসীরা বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য তারই স্বরণাপন্ন হবে এবং তারই তাকলীদ করবে, তাই বিদায়ের প্রাক্কালে তাকে সমাধানের পথ স্পষ্ট ভাবে বলে দিলেন।
(৫) উলামায়ে কেরাম আম্বিয়াদের ওয়ারিস। (আহমাদ-আবু দাউদ তিরমিযী, মিশকাত) আম্বিয়াদের অনুসরণ করা যেমন ভাবে ওয়াজিব তেমনভাবে তাদের ওয়ারিস তথা উলামায়ে কেরামের অনুসরণ করাও জরুরী।
এ যাবৎ আমরা যেসব আয়াত ও হাদীস উল্লেখ করলাম এর দ্বারা নফসে তাকলীদ প্রমাণিত হয়। এখন এই তাকলীদ আবার দুই প্রকার। এক প্রকার হল বিশেষ কোন ইমাম বা মাযহাবকে নির্দিষ্ট না করে যখন যেটার উপর মন চায় আমল করা। একে মুতলাক তাকলীদ বলে। আর দ্বিতীয় প্রকার হল তাকলীদের জন্য কোন একজন মুজতাহিদকে নির্দিষ্ট করা এবং প্রত্যেক মাসআলায় তার অনুসরণ করা। একে তাকলীদে শাখসী তথা ব্যক্তি বিশেষের তাকলীদ বলে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে তাকলীদের উভয় প্রকারই চালু ছিল। সে যুগে যেসব সাহাবা ফকীহ ছিলেন না তারা ফকীহ সাহাবাদের নিকট জিজ্ঞাসা করে করে আমল করতেন। প্রশ্নকারীর উত্তরে উত্তরদাতা যে হুকুম বলতেন তা দলীল সহ বলুক বা দলীল ছাড়া বলুক প্রশ্ন কারী নির্দ্বিধায় তার উপর আমল করতেন এবং উত্তর দাতার নিকটে কোন দলীল তলব করতেন না।
এ ব্যাপারে শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ. বলেন, সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে নিয়ে চার মাযহাব বিন্যস্ত হওয়া পর্যন্ত এই নিয়মই চালু ছিল যে, কোন আলেম মুজতাহিদ পাওয়া গেলে তারই তাকলীদ করা হত। কোন গণ্য মান্য এবং নির্ভর যোগ্য আলেম কখনও এই নিয়মের সমালোচনা করেন নাই। তাকলীদ যদি বাতিলই হত তাহলে সেসব হযরতরা অবশ্যই এর বিরোধিতা করতেন। (ইকদুল জীদ-২৯)
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. স্বয়ং তাকলীদে শাখসীকে অপরিহার্য সাব্যস্ত করে লেখেন, এরা কখনও এক ইমামের তাকলীদ করে যিনি বিবাহ কে ফাসেদ বলেন, আবার কখনও আরেক ইমামের তাকলীদ করে যিনি বিবাহকে জায়েয বলেন, এ ভাবে তারা নিজেদের প্রবৃত্তিরই অনুসরণ করে থাকে, অথচ এ ভাবে আমল করা সর্ব সম্মতি ক্রমে নাজায়েয। (ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যা-২-২৪০)
বর্তমানের লামাযহাবীদেরকে শায়েখ আব্দুল ওয়াহাব নজদীর সম আকীদা সম্পন্ন মনে করা হয়ে থাকে। অথচ এই তথাকথিত আহলে হাদীসরা তার থেকে ও দু কদম আগে বেড়ে কথা বলে। শায়েখ নজদী চার ইমামের তাকলীদকে জায়েয বলেন এবং বলেন আমি নিজে হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী।
আল্লামা আহমাদ আব্দুল গফুর আত্তার শায়েখ আব্দুল ওয়াহাব নজদীর জীবনীতে তার নিজস্ব কওল এ ভাবে নকল করেছেন, আলহামদুলিল্লাহ আমরা পূর্ববর্তী আকাবের ও সালাফদের অনুসারী। নতুন কোন তরীকা এবং বিদ‘আত আমরা আবিষ্কার করি নাই এবং আমরা ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বালের মাযহাবের অনুসারী। (১৭৪)
শায়েখ আব্দুল ওয়াহাব নজদীর ছেলে শায়েখ আব্দুল্লাহ তার নিজের এবং পিতার মাসলাকের বর্ণনা দিতে যেয়ে লিখেন: উসুলে দ্বীন তথা ঈমান-আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আমাদের মাসলাক এবং দৃষ্টিভংগি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের দৃষ্টিভংগিরই অনুরূপ। আমাদের তরীকা আয়িম্মায়ে সালাফের তরীকা। আর ফুরুয়ে দ্বীন তথা ফিকহী মাসায়েলের ক্ষেত্রে আমরা ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মাযহাবের উপর আছি। যারা চার ইমামের অন্যান্যদের তাকলীদ করে আমরা তাদের কারো সমালোচনা করি না। আল হাদিয়াতুস সুন্নিয়াহ-৩৮-৩৯
আল্লামা ইবনে তাইমিয়া এবং শায়েখ আব্দুল ওয়াহাব নজদী আহলে হাদীসদের নিকটও গ্রহণীয় ব্যক্তিত্ব। তাদেরই লেখনী দ্বারা আমরা বুঝতে পারলাম যে, তাকলীদ করাকে তারা শিরক বা গুনাহ মনে করতেন না, বরং তারা এটাকে জরুরী মনে করতেন। অথচ এই আহলে হাদীস হিসাবে দাবীদারগণ তাকলীদকে শিরক ও বিদ‘আত ফাতাওয়া দিয়ে বসে আছে। (ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়া-৪-১৭২; ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া-১-৩৭৮)