শরী‘আতের আলোকে দাড়ী রাখার গুরুত্ব
Question
শরী‘আতের দৃষ্টিতে দাড়ী রাখা কতটুকু জরুরী? দাড়ী রাখা সুন্নত না ওয়াজিব? এক মুষ্ঠি হওয়ার আগে কাটা বা ছাটার কী হুকুম?
Answer
(১) এ বিষয়ের উপর চার মাজহাবের সকল ইমামগণ একমত যে, একমুষ্ঠি পরিমাণ দাড়ী রাখা ওয়াজিব এবং একমুষ্টির নিচে কাটা ছাটা, বা কামানো সম্পূর্ণ হারাম। এমন ব্যক্তি শরী‘আতের দৃষ্টিতে ফাসেক। তার সাক্ষ্য গ্রহণীয় নয়, এবং তার পিছনে নামায মাকরুহ তাহরীমা।
কুরআনে কারীমের সূরা নিসার ১১৮ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে, মানুষকে শয়তান নির্দেশ দিবে, যদ্দরুন তারা আল্লাহ তা‘আলার দেয়া সূরত পরিবর্তন করবে। এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে মুফাস্সিরীনে কেরাম লিখিছেন যে, দাড়ী মুণ্ডানো বা ছাটাও এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত।
দেখুন,
(১) তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন ২:৫৪৯ পৃঃ
(২) বয়ানুল কুরআন ২:১৬৫ পৃঃ
(৩) কুরতুবী ৫:৩৯৩ পূঃ
(8) বাহরুল মুহীত ৪:৩৫৩ পৃঃ
(৫) রুহুল মাআনী- ৩:১৫০ পৃঃ
(৬) শাইখুল হিন্দ ১২৭ পৃঃ
(৭) কামালাইন ১৪:৬৫০ পূঃ
(৮) হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২:৪৮৫ পৃঃ
হযরাত মুফাসসিরীনে কেরাম আরো বলেছেন যে, হযরত লূত আ. এর জাতী ধ্বংস হওয়ার দশটি কারণের মধ্যে একটি ছিল দাড়ী মুণ্ডানো। তাফসীরে দুররে মানসূর ৪: ৩২৪ পৃঃ
বিভিন্ন হাদীসে দাড়ী লম্বা করা এবং মোচ ছোট করার নির্দেশ এসেছে, এবং দাড়ী না রাখার উপর ধমকী এসেছে। দাড়ী রাখা স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ বলে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করে বলেছেন, আমার প্রতিপালক আমার গোঁফ খাট করা ও দাড়ী লম্বা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তাবকাত ইবনে সাআদ নামক গ্রন্থে বর্ণিত আছে, দাড়ী রাখা সমস্ত আম্বিয়াদের তরীকা, এবং দাড়ী না রাখা অগ্নি পুজকদের স্বভাব বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। মুসলীম শরীফ ২: ১২৯ পৃঃ
এই সমস্ত তাফসীর এবং নির্দেশ সূচক ও ধমকীসূচক হাদীস দ্বারা দাড়ী রাখা ওয়াজিব হওয়া সুস্পষ্ট ভাবে বুঝে আসে। যেমন, শায়েখ আঃ হকু মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. বলেছেন, এক মুষ্ঠি পরিমাণ দাড়ী রাখা ওয়াজিব।
কিন্তু তাকে সুন্নাত বলা হয়ে থাকে, কারণ তা সুন্নাত দ্বারা সাবেত। (আশিআতুল সুমআত ১৪ ২১২) সূতরাং দাড়ীর হুকুম ওয়াজিব। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেখেছেন এই হিসাবে একে সুন্নাত বলা হয়ে থাকে।
শরী‘আতে দাঁড়ী রাখার যেমন আদেশ রয়েছে, তেমনি ভাবে তার পরিমাণও ঠিক করে দেয়া হয়েছে, সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ থেকে ছোট করাও শরী‘আত সমর্থন করেনা। আর দাড়ী রাখার পরিমাণ ন্যূনতম এক মুষ্ঠি। এর চেয়ে ছোট করা সকল উলামায়ে কিরামের ঐক্যমতে অবৈধ ও হারাম। তবে এক মুষ্ঠির অধিক হলে দাড়ীর সেই অতিরিক্ত পরিমাণটুকু কাটার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কারণ হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দাড়ী মুবারক নীচেও পার্শ্বে উভয় দিকে কাটতেন। (তিরমিযী শরীফ ২:১০৫ পৃঃ)
অন্য এক হাদীসে দাড়ীর ব্যাপারে এক মুষ্ঠির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, হুজুর সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাড়ী মুবারক এক মুষ্ঠির অধিক হলে তিনি তা কেটে ফেলতেন। (শরহে শিরআতুল ইসলাম ২৯৮পৃঃ)
তেমনিভাবে যেহেতু ছাহাবায়ে কেরাম নবীজীর কথা ও কার্যের প্রতক্ষদর্শী তাই ইমাম বুখারী রহ. এই ব্যাপারে তাদের আমলকে মাপকাঠি হিসাবে নির্ধারণ করেছেন।
আর যেহেতু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. নবীজীর পদাংক অনুসরণে অগ্রগামী ছিলেন সেহেতু তার আমলকে পরিমাপের মাপকাঠি হিসাবে ইমামগণ পেশ করেন।
তাই ইমাম বুখারী রহ. সহীহ বুখারীতে উল্লেখ করেছেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. যখন হজ্জ অথবা উমরা করতেন, তখন নিজের দাড়ী মুঠ করতেন এবং এক মুষ্ঠির অতিরিক্তটুকু কেটে ফেলতেন। (বুখারী শরীফ ২:৮২৮ পৃঃ।)
তেমনি ভাবে হযরত আবু হুরাইরা রা. এক মুষ্ঠির অধিকটুকু কেটে ফেলতেন। (তিরমিযী শরীফ ২:১০৫ পৃঃ)
এই সমস্ত হাদীস এবং বড় বড় ছাহাবায়ে কিরামের আমলের দ্বারা সমস্ত ফুকাহায়ে কেরাম দাড়ীর পরিমাণ এক মুষ্ঠি নির্ধারণ করেছেন।
সুতরাং এক মুষ্ঠি পরিমাণ দাড়ীই ওয়াজিব।