চার ইমামের যে কোন একজনকেই মানতে হবে

Question

আপনাদের আলোচনার দ্বারা বুঝা গেল যে, চার ইমামই হকের উপর আছেন, তাদের সকলেই অনুসরণের যোগ্য। এখন আমার প্রশ্ন হল তাহলে আপনারা যে কোন একজন ইমামের তাকলীদকে ওয়াজিব বলেন কেন? এক সাথে যদি চার জনেরই তাকলীদ করা হয় তাহলে তাতে অসুবিধা কি? সাহাবা ও তাবেঈনদের যুগে তো এই নিয়মই প্রচলিত ছিল যে, যখন যার কাছে সুযোগ হত তার কাছ থেকে মাসআলা জেনে নিতেন। কোন একজনের মধ্যে সেটা সীমাবদ্ধ ছিল না? পরবর্তী যুগে একই মাযহাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়ার কারণ কি?

Answer

কুরুনে উলা তথা ইসলামের প্রাথমিক যুগে চারদিকে আমানতদারী, বিশ্বস্ততা আর কল্যাণ ও ভালাইর জয় জয়কার ছিল। খাহেশাতে নফস আর প্রবৃত্তির পুজা কারো মধ্যে ছিল না বললেই চলে। কোন ব্যক্তি যদি বড় কারো নিকট মাসআলা জিজ্ঞেস করত তাহলে ভাল নিয়তেই জিজ্ঞেস করত এবং তার উপর আমলও করত। চাই সেটা তার মর্জিমত হোক বা মর্জির খেলাফ হোক। কিন্তু পরবর্তী যুগে এটা আর রইলনা, বরং এমন একটা ভাব মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হল যে, কোন আলেমের নিকট হয়ত একটা মাসআলা সে জিজ্ঞেস করল কিন্তু সে মাসআলাটা তার মনমত হল না, তখন আরেক আলেমের নিকট জিজ্ঞেস করল, সেখানে কিছুটা আসানী দেখতে পেয়ে তার উপরই আমল করতে লাগল। এভাবে দেখা গেল যে, প্রতিটি মাসআলার ক্ষেত্রেই সে আসানী আর নরমী তালাশ করে বেড়াচ্ছে। কঠিন কোন মাসআলার উপর আমল করা তার জন্য সম্ভব হচ্ছে না। আর এটা একটা স্পষ্ট কথা যে, একজন সত্যসন্ধানী তথা তালেবে হকের এ ধরনের মেযাজ কখনও কাম্য নয়। এতে করে অনেক সময় বিরাট বড় ফেৎনা দেখা দেয়ারও সম্ভাবনা থাকে।

যেমন উযূ অবস্থায় স্ত্রীর গায়ে হাত লাগলে ইমাম শাফেঈ রহ. এর নিকট উযূ ভেঙ্গে যায় আর ইমাম আবু হানীফা রহ. এর নিকট উযূ ভাঙ্গেনা। অনুরূপ ভাবে বমি করলে ইমাম আবু হানীফা রহ. এর নিকট উযূ ভেঙ্গে যায় আর ইমাম শাফেঈ রহ. এর নিকট উযূ ভাঙ্গেনা। এখন দেখা যাবে কোন ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট কোন ইমামের তাকলীদ না করে তাহলে নিজের সুবিধা মত সে কখনও ইমাম আবু হানীফা রহ. এর মতের উপর আমল করবে আর কখনও ইমাম শাফেঈ রহ. এর মতের উপর আমল করবে। এর ফলাফল হল কোন ইমামের আর তাকলীদ করা হলনা বরং নিজের নফস আর প্রবৃত্তির অনুসরণ করা হল। শরী‘আতে যেটাকে কঠোর ভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এর পরিণাম গোমরাহী ছাড়া আর কি হতে পারে?

কুরআনে পাকের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা এমন লোকদের তাকলীদ করতে বলেছেন যারা আল্লাহ তা‘আলার দিকে পরিপূর্ণরুপে রুজু করেছে।

এরই ভিত্তিতে কেউ আবু হানীফা রহ. কে এই গুণের অধিকারী পেয়েছেন তাই তার তাকলীদ করছেন। কেউ ইমাম মালেক রহ. কে এই গুণে গুণান্বিত মনে করে তার তাকলীদ শুরু করেছেন। সুতরাং এখন এটা জায়েয নেই যে, নিজের ইমামকে ছেড়ে যখন যেটা মন চাইবে তার উপর আমল করতে থাকবে। শরী‘আতে এটাকে তালফীক বলা হয়। এতে পরিশেষে মানুষ গোমরাহ হয়ে যায়।

আহলে হাদীস আন্দোলনের শীর্ষ নেতা মাওলানা মুহাম্মাদ হুসাইন বাট্টালবী দীর্ঘ দিন যাবৎ তাকলীদের বিরোধিতা করে আসছিলেন। কিন্তু তাকলীদ না করলে যে কি করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সেটা স্বচক্ষে অবলোকন করার পর তিনি তার সম্পাদিত পত্রিকা ইশায়াতুস সুন্নাহ-১১তম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যার ৫৩ পৃষ্টায় লেখেন, দীর্ঘ পঁচিশ বৎসরের অভিজ্ঞতায় আমরা এটা উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, যে সমস্ত লোক তাদের মূর্খতা সত্ত্বেও মুতলাক তাকলীদকে পরিহার করে চলে, অবশেষে তারা ইসলাম থেকেই হাত ধুয়ে বসে। তাদের মধ্যে কিছু খৃষ্টান হয়ে যায় আর কিছু হয়ে যায় লামাযহাবী, দ্বীন-ধর্মের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকে না। এই স্বাধীনতার কারণে ফাসেক ফাজের হয়ে যাওয়া তো সাধারণ ব্যাপার। সূত্র-সাবীলুর রশাদ-১২

এসব কারণেই শত শত বৎসর যাবৎ এমন সব গভীর জ্ঞান সম্পন্ন উলামায়ে কেরাম যারা কুরআন-হাদীসে অগাধ ব্যুৎপত্তির অধিকারী ছিলেন, ইলমে হাদীস আর আসারে সাহাবার বিশাল ভাণ্ডার যাদের সামনে দিবালোকের ন্যায় উদ্ভাসিত ছিল, খোদাভীতি আর তাকওয়ায় যাদের অন্তর ছিল পরিপূর্ণ, নিজেদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যারা হুযুর ﷺ এর সুন্নাতের চেরাগে আলোকিত করেছিলেন, এতসব ফযীলত আর কামালাত থাকা সত্বেও তারা তাকলীদ করাকেই পছন্দ করেছেন। তাদের তুলনায় আমরা তো কিছুই নই। তাই তাকলীদই আমাদের একমাত্র মুক্তির পথ। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া-১-৩৮৬)