শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. হানাফী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন
Question
পাক ভারত উপমাহাদেশে ইলমে হাদীস সহ অন্যান্য ইলমের প্রসারের ব্যাপারে যার অবদান সবচাইতে বেশী তিনি হলেন শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী রহ.। উপমহাদেশের সকল মুহাদ্দিসীনদের সনদ তার সূত্রে গ্রোথিত। আমাদের প্রশ্ন হল তিনি মুকাল্লিদ ছিলেন নাকি গায়রে মুকাল্লিদ ছিলেন? যদি মুকাল্লিদ হয়ে থাকেন তাহলে কোন মাসলাকের অনুসারী ছিলেন।
Answer
শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহবলী রহ. প্রচুর ইলম, গভীর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন, উত্তম আখলাক, নেক আমল, তাযকিয়ায়ে নফস, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ, মযবুত নিসবত, আহলে কাশফ ইত্যাদি গুণাগুণে পরিপূর্ণ এক মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কোথাও কোন সমস্যা দেখা দিলে সাথে সাথে রাসূলে আকরাম ﷺ থেকে রুহানী তাওয়াজ্জুহ হাসিল করে তার সমাধান বের করে ফেলতেন। আসারে সাহাবাহ সব তার নখদর্পনে ছিল। সাহাবাদের মাযহাব সম্বন্ধে পরিপূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীনদের উসুল এবং মৌলিক তত্ত্ব সম্মন্ধে সম্যক অবগত ছিলেন। সংঘর্ষপূর্ণ রেওয়ায়েতের মধ্যে সামঞ্জস্যতা পয়দা করার ক্ষমতা ছিল। নাসেখ-মানসুখের হাফেয ছিলেন। এসব গুণাবলীর কারণে তার তাকলীদ করার কোন প্রয়োজন ছিল না এবং তিনি প্রকৃতিগত ভাবে এর প্রতি আকর্ষণও বোধ করতেন না। কিন্তু রাসূলে আকরাম ﷺ তাকে তাকলীদ করার জন্য বাধ্য করেন। এছাড়া আরো কিছু কারণ ছিল যদ্দরুণ তবীয়তের খেলাফ হওয়া সত্বেও তিনি তাকলীদ করতে বাধ্য হন।
ফুয়ুযুল হারামাইন নামক কিতাবে তিনি তার মুকাল্লিদ হওয়ার কারণ এভাবে তুলে ধরেছেন" রাসূলে আকরাম ﷺ এর পক্ষ থেকে তিনটি জিনিষ আমি এমন অর্জন করেছি যা আমার ধারণার বিপরিত ছিল এবং আমার অন্তরের আকর্ষণ সেদিকে কখনও ছিলনা। কিন্তু রাসূলে আকরাম ﷺ এর পক্ষ থেকে এই অর্জন আমার জন্য বুরহানে হক তথা মজবুত দলীল হিসাবে প্রমাণিত হল।
সেই তিনটি জিনিষের দ্বিতীয়টি হল, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে ওসিয়্যত করেছেন আমি যেন চার মাযহাবের তাকলীদ করি এবং এর গণ্ডি থেকে বের না হই। (৬৪-৬৫)
চার মাযহাবের মধ্যে হানাফী মাযহাব শ্রেষ্ঠ হওয়ার ব্যাপারে তিনি লেখেন, রাসূলে আকরাম ﷺ আমাকে বলেছেন, হানাফী মাযহাবের মধ্যে এমন এক উত্তম পন্থা রয়েছে যা অন্যান্য পন্থার তুলনায় ঐ সুন্নতে মাশহুরার বেশী নিকটবর্তী যার একত্রিকরণ ও বাছাইকরণ (তাদবীণ ও তানকীহ) ইমা। বুখারী এবং তাদের সঙ্গীদের যুগে হয়েছিল। (ফুয়ুযুল হারামাইন ৪৮)
শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ. ১১৭৬ হিজরীতে ইন্তিকাল করেন। এবছরই তিনি শেষ বার বুখারী শরীফের দরস দেন এবং সেই দরসে অংশ গ্রহণকারী মৌলবী চেরাগ সাহেবের সনদ নিজ হাতে লেখেন। সনদের মধ্যে নিজের নামের শেষে তিনি "হানাফী" ও লেখেন। শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ. এর সুযোগ্য সন্তান হযরত শাহ রফীউদ্দীন রহ. এই লেখার সত্যায়ন করে বলেন যে, হাঁ এটা আমার পিতার নিজের হাতের লেখা। তাছাড়া তৎকালীন মোগল সম্রাট শাহ আলমের সীল মোহরও তাতে লাগানো আছে। এর দ্বারা বুঝা গেল যে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি হানাফী ছিলেন। কারো জন্য একথা বলার অবকাশ নেই যে, শেষ জীবনে তিনি গায়রে মুকাল্লিদ হয়ে গিয়েছিলেন। কেননা এটাই তার জীবনের শেষ লেখা। তবে তিনি যথা সম্ভব সকল মাযহাবের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করতেন এবং দলীল মজবুত না দুর্বল সেটা নিয়েও বাহাস করতেন। একারণেই অনেকের সন্দেহ হয়ে গেছে যে, তিনি গায়রে মুকাল্লিদ ছিলেন। কিন্তু বাস্তব কথা হল ঐটা যা আমরা বর্ণনা করলাম। উল্লেখ্য যে, শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ. এর স্বহস্তে লিখিত ঐ সনদ সেই বুখারী শরীফের সাথে আজও বিহারের রাজধানী পাটনার খোদাবখশ লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত আছে। (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া-১-৩৮৭, রহীমিয়া-৪-১৩৭)