অমুসলিম দেশে বসবাস করা

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)২৩ এপ্রিল, ২০২৫সামাজিকতা আচার ব্যবহার ও রাজনীতি

প্রশ্ন

মুসলিম দেশের নাগরিক হওয়া সত্বেও নিজের দেশ ছেড়ে অন্য কোন অমুসলিম দেশ যথা ইউরোপ, আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করা কেমন? যেসব মুসলমান স্বীয় মাতৃভূমি ছেড়ে পাশ্চাত্যের দেশসমূহে বসবাস করছে তাদের বিভিন্ন যুক্তি রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মুসলিম দেশে অপরাধ ছাড়াই সাজা ভোগ করতে হয়, কানুনের কোন গুরুত্ব এখানে নেই, বিনা কারণে জেল খাটতে হয়, সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়, কাজেই বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, মুসলিম দেশে যখন ইসলামী আইন-কানুন জারী নেই তখন মুসলিম দেশ আর অমুসলিম দেশের মধ্যে পার্থক্যটা থাকলো কোথায়? এ ধরনের আরো বিভিন্ন যুক্তি পেশ করতে দেখা যায়। আমার প্রশ্ন হল এসব যুক্তিকে সামনে রেখে মুসলিম দেশ ছেড়ে অমুসলিম দেশে বসবাস করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর

কোন অমুসলিম দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করা, সেখানের নাগরিকত্ব ও জাতীয়তা গ্রহণ করা, একজন নাগরিক হিসাবে সে দেশকে নিজের আবাসভূমি বানিয়ে নেয়া এমন একটি বিষয় যেটাকে এক কথায় জায়েয বা নাজায়েয বলা যায় না। বরং স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এবং বসবাসকারীদের নিয়তের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হুকুম হয়ে থাকে। যেমন,

(১) একজন মুসলমানকে তার স্বদেশে কোন অপরাধ ছাড়াই যদি অত্যাচার করা হয়, বন্দী করা হয়, তার সহায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং কোন অমুসলিম দেশে আশ্রয় নেয়া ছাড়া তার যদি বাঁচার বিকল্প কোন পথ না থাকে তাহলে এমতাবস্থায় তার জন্য কোন অমুসলিম দেশে বসবাস করা এবং সেদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা অবশ্যই জায়েয হবে। তবে সেখানে যাওয়ার আগে এ ব্যাপারে তাকে নিশ্চিন্ত হতে হবে যে, সেখানে যেয়ে তার দ্বীনদারীর মধ্যে কোন কমি আসবে না, দ্বীনী আহকামের উপর আমল করতে তাকে কোন বাধার সম্মুখীন হতে হবে না এবং সেখানে প্রচলিত কুসংস্কার, নির্লজ্জতা ও ঈমান বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড থেকে সে নিজেকে বাঁচাতে পারবে।

(২) অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি যদি আর্থিক সংকটে জর্জরিত থাকে এবং অনেক চেষ্টা-সাধনার পরেও স্বীয় মুসলিম দেশে সম্মানজনক কোন ব্যবস্থা করতে না পারে তাহলে এমতাবস্থায় কোন অমুসলিম দেশে যদি সে জায়েয কোন চাকরীর ব্যবস্থা করতে পারে এবং এই কারণে তাকে অমুসলিম দেশে বসবাস করতে হয় তাহলে উপরিউক্ত দুই শর্তের সাথে এটা তার জন্য জায়েয হবে। কেননা হালাল কামাই করাও এক ফরজের পরে আরেক ফরয। এজন্য শরী‘আত কোন জায়গাকে নির্দিষ্ট করে নাই বরং ঢালাও অনুমতি দিয়েছে। যেখানে পার হালাল রিযিক অন্বেষণ কর। ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলা এমন সত্ত্বা যিনি জমীনকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, তোমরা তার রাস্তা সমূহে চল এবং আল্লাহ প্রদত্ত রিযিক থেকে ভক্ষণ কর। তার নিকটেই পুনরায় জীবিত হয়ে প্রত্যবর্তন করতে হবে। (সূরায়ে মুলক- ৫০)

(৩) অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি যদি কোন অমুসলিম দেশে এই নিয়তে বসবাস করতে শুরু করে যে, সেখানের অমুসলিমদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেবে, তাদেরকে মুসলমান বানাবে অথবা সেখানে যেসব মুসলমান বসবাস করছে তাদেরকে শরী‘আতের হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেবে, তাদেরকে দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকার জন্য উৎসাহিত করবে তাহলে এই নিয়তে সেখানে বসবাস করা শুধু জায়েযই নয় বরং সওয়াবের কারণও বটে। তাই দেখা যায় অনেক সাহাবা এবং তাবেঈন এই নেক নিয়তে অমুসলিম দেশে যেয়ে আস্তানা গেড়েছেন।

(৪) কোন ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে কিংবা নিজ শহরে যদি এই পরিমাণ জীবীকার্জনের ব্যবস্থা থাকে, যদ্দারা সে স্বীয় এলাকার লোকদের মান অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারে কিন্তু শুধুমাত্র বিলাসিতা এবং আলীশান জীবন যাপনের জন্য অমুসলিম দেশে পাড়ি জমায় তাহলে এটা মাকরূহ। কেননা এক্ষেত্রে দ্বীনী-দুনিয়াবী প্রয়োজন ছাড়াই সে নিজেকে সেখানে প্রচলিত বেহায়াপনা আর নির্লজ্জতার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। আর একথা স্পষ্ট যে, বিনা প্রয়োজনে নিজের দ্বীনী এবং আখলাকী হালতকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া কোনভাবেই জায়েয নেই। কেননা অভিজ্ঞতার আলোকে একথা বলা যায় যে, যারা শুধুমাত্র আরাম-আয়েশের জন্য এবং ধন-দৌলত বৃদ্ধির জন্য ঐ সব দেশে বসবাস করছে তাদের দ্বীনী চেতনা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে এবং কুফরী ব্যবস্থার সামনে আস্তে আস্তে তারা আত্মসমর্পণ করে। এই জন্যই ভীষণ প্রয়োজন ছাড়া অমুসলিমদের সাথে একত্রে বসবাস করার ব্যাপারে হাদীসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

* হযরত সামুরা ইবনে জুনদুব রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম ﷺ ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মুশরিকের সাথে সামঞ্জস্যতা বজায় রাখে এবং তার সাথে একত্রে বসবাস করে সে তারই মত। (আবু দাউদ শরীফ, কিতাবুযযহায়া)

* হযরত জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে আকরাম ﷺ ইরশাদ করেন, আমি প্রত্যেক ঐ মুসলমান থেকে দায়িত্ব মুক্ত, যে মুশরিকদের সাথে বসবাস করে। সাহাবায়ে কেরাম আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসুল। এর কারণ কি? ইরশাদ করলেন, ইসলামের আগুন আর কুফরের আগুন একত্রে থাকতে পারে না। তোমরা এটা পার্থক্য করতে পারবে না যে, এটা মুসলমানের আগুন না মুশরিকের আগুন।

ইমাম খাত্তাবী রহ. এই হাদীসের ব্যাখ্যা করতে যেয়ে বলেন, একেক আলেম এই হাদীসের একেক রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কেউ কেউ বলেছেন এই হাদীসের অর্থ হল হুকুমের দিক দিয়ে মুসলমান আর মুশরিক বরাবর নয়, উভয়ের জন্য আলাদা আলাদা বিধান রয়েছে।

কোন কোন আলেম বলেন, এই হাদীসের মতলব হল আল্লাহ তা‘আলা দারুল ইসলাম এবং দারুল কুফরকে পৃথক করে দিয়েছেন, তাই কোন মুসলমানের জন্য কাফেরের দেশে তাদের সাথে বসবাস করা জায়েয নয়।

কেননা মুশরিক যখন নিজের আগুন প্রজ্জলিত করবে আর এই মুসলমান তাদের সাথে বসবাস করতে থাকবে তখন দেখার দ্বারা এই কথাই মনে হবে যে, এও তাদেরই একজন। উলামায়ে কেরামের এই ব্যাখ্যা দ্বারা একথাও বুঝা যায় যে, কোন মুসলমান যদি ব্যবসার খাতিরে কোন অমুসলিম দেশে গমন করে তাহলে তার জন্য সেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অবস্থান করা মাকরূহ। (মাআলিমুস সুনান ৩-৪৩৭)

* অন্য একটি হাদীসে রাসূলে খোদা ﷺ ইরশাদ করেন, স্বীয় সন্তানদেরকে মুশরিকদের মাঝে ছেড়ে দিও না। (তাহযীবুস সুনান ৩-৪৩৭)

এই জন্যই ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, শুধুমাত্র চাকরীর জন্য কোন মুসলমানের অমুসলিম দেশে বসবাস করা এবং তাদের সংখ্যাধিক্যের কারণ হওয়া এমন একটি কাজ যার দ্বারা তার আদালত (ন্যায়পরায়ণতা) ক্ষতিগ্রস্ত হয়। (তাকমিলা রদ্দুল মুহতার ১-১০১)

(৫) পঞ্চম সূরত হল, সমাজে সম্মানিত হওয়ার জন্য এবং অন্যান্য মুসলমানের উপর নিজের বড়ত্ব ও কৃতিত্ব দেখানোর জন্য অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা, অথবা অমুসলিম দেশের সুনাম ও জাতীয়তাকে মুসলিম দেশের জাতীয়তার উপর প্রাধান্য দিয়ে এবং সেটাকে শ্রেষ্ঠ মনে করে তাদের জাতীয়তা গ্রহণ করা অথবা নিজের জীবনে তাদের কৃষ্টি-কালচার ও সভ্যতাকে ধারন করার মানসে এবং তাদের মত হওয়ার লক্ষ্যে সেখানে বসবাস করা। এই সকল উদ্দেশ্যে অমুসলিম দেশে বসবাস করা এবং সেখানে নাগরিকত্ব গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম। এর জন্য আলাদা কোন দলীলের প্রয়োজন নেই। (ফিকহী মাকালাত ১-১৩৫)

অমুসলিম দেশে বসবাস করা | ইসলামী যিন্দেগী