ছবি, মূর্তি এবং খেলনা পুতুল

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫বিবিধ, কুফর শিরক বিদ‘আত কুসংস্কার অপসংস্কৃতি, সামাজিকতা আচার ব্যবহার ও রাজনীতি

প্রশ্ন

শরী‘আতের দৃষ্টিতে ছবি, মূর্তি এবং খেলনার পুতুলের বিস্তারিত আহকাম জানতে ইচ্ছুক।

উত্তর

হাদীস শরীফে ছবি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সুতরাং যেমন নাকি ছবি তোলা এবং তোলানো হারাম ও গুনাহে কবীরা তদ্রুপভাবে ছবি ঘরে রাখা লটকানো ও নাজায়েয এবং গুনাহ। হাদীস শরীফে যে ছবি তোলে এবং যে তোলার কাজ করে তাদের উভয়ের সম্পর্কে কঠোর হুশিয়ারী এসেছে। হযরত আবদুল্লা ইবনে উমর রা. রাসূলে আকরাম ﷺ থেকে বর্ণনা করেন যে, যারা ছবি বানায়, তাদের কে কিয়ামতের দিন শাস্তি দেয়া হবে এবং তাদের কে বলা হবে যে তোমরা যেসব ছবি বানিয়েছ তাতে প্রাণের সঞ্চার কর এবং সেগুলিকে জীবিত কর। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. রাসূলে কারীম ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, নিশ্চয় কিয়ামতের দিন যেসব লোকের ভীষণ শাস্তি হবে তাদের মধ্যে ঐসব লোক ও থাকবে যারা ছবি বানাতো। এসব হাদীস দ্বারা জানা গেল যে, প্রাণীর ছবি যারা বানায় তাদের উপর কিয়ামতের দিন কঠোর শাস্তি হবে। এর মধ্যে যে ছবি তোলে এবং যাকে দিয়ে তোলে উভয়েই শামিল। অনুরূপভাবে হাদীস দ্বারা এটাও বুঝে আসে যে, ঘরে ছবি রাখাও সম্পূর্ণ নিষেধ। হযরত আবু হুরায়রা রা. রাসূলে কারীম ﷺ এর ইরশাদ নকল করেন যে, ফেরেশতা ঐ ঘরে প্রবেশ করে না যে ঘরে ছবি এবং মূর্তি থাকে। সুতরাং রহমতের ফেরেশতা যখন আসবে না তখন সে ঘরে গুনাহ, নাফরমানী এবং লানত বর্ষিত হবে। এই জন্যই তো আজ আমাদের বাড়ী ঘর নাফরমানী আর পেরেশানীর আখড়া হয়ে আছে। বুখারী এবং মুসলিম শরীফের হাদীসের মধ্যে মূর্তি বানানো এবং তা ক্রয় বিক্রয় করার উপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। সুতরাং বিভিন্ন ডিজাইনের জায়েয নাজায়েয প্রথম খণ্ড মূর্তি, ভাস্কর্য বানানো-চাই তা পুরুষের হোক বা নারীর হোক বা ছোট ছেলেমেয়েদেরই হোক না কেন সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। অনুরূপভাবে মূর্তি ও ভাস্কর্য বানানোর কারখানা বা ফ্যাক্টরী স্থাপন করা কোন মুসলমানের জন্য জায়েয নেই। এবং তার ক্রয় বিক্রয় ও জায়েয নেই। সে মূর্তি সোনার হোক বা রুপার হোক, তামার হোক বা পিতলের হোক, পাথরের হোক বা প্লাষ্টিকের হোক অথবা অন্য কোন ধাতুর হোক- সে সব কেনা, ঘরে রাখা, অফিসে রাখা বা তা দিয়ে সৌন্দর্য্য বর্দ্ধন করা নাজায়েয, গুনাহে কবীরা এবং হারাম। যারা এসবের ব্যবসা করে তাদের কামাই হারাম, তাদের নামায রোযা, হজ্ব যাকাত, মোট কথা কোন ইবাদতই কবুল হবে না। (মাহমুদিয়াহ ১৮৮-৫ জাওয়াহিরুল ফিকহ- ২২৬-৩)

ফটোগ্রাফীর ব্যবসা হারাম হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে সাইদ ইবনে আবুল হাসান বর্ণনা করেন, আমি একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর খেদমতে বসা ছিলাম, এমন সময় একজন লোক এসে বলতে লাগল হে ইবনে আব্বাস, আমি এমন এক ব্যক্তি যে, আমার আয়ের উৎস হচ্ছে আমার শিল্পকর্ম। আমি ছবি আঁকি, আমার এই পেশা কি জায়েয আছে? হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন আমি এ ব্যাপারে তোমাকে সেই কথাই বলব যে কথা আমি রাসূলে আকরাম ﷺ এর নিকট শুনেছি, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি ছবি বানাবে আল্লাহ পাক তাকে কিয়ামতের দিন শাস্তি দিবেন যতক্ষণ না সে ঐ ছবির মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করে। কিন্তু সে তো তা পারবে না। একথা শুনে আগন্তক ব্যক্তি কেঁপে উঠল, তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, হযরত ইবনে আব্বাস রা. বললেন তোমার মঙ্গল হোক, তোমাকে যদি অংকন করতেই হয় তাহলে ঐসব জিনিষের ছবি অংকন কর যার মধ্যে জান নেই অর্থাৎ প্রাকৃতিক জিনিষের ছবি অংকন করায় কোন দোষ নেই। এই হাদীসের ভিত্তিতে ইমাম নববী রহ. অনেকগুলি মাসআলা বয়ান করেছেন যা নিম্নরূপ:

১. হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী কোন প্রাণীর ছবি বানানো বা তোলা না জায়েয ও হারাম।

২. ফটোগ্রাফীর পেশা অবলম্বন করা তথা স্টুডিওর ব্যবসা করা না জায়েয ও হারাম।

৩. প্রাণীর ছবি বড় বা ছোট যাই হোক না কেন তার ব্যবসা করা না জায়েয ও হারাম।

৪. সব রকমের পশু পাখি ছোট হোক বা বড় হোক যে কোন উদ্দেশ্যেই হোক না কেন তার ছবি তোলা, আঁকা, বানানো সব হারাম।

৫. প্রাণীর ছবি ছাপানো চাই তা টাকায় হোক বা পয়সায় হোক, বই পুস্তক, খাতা এবং পোস্টারেই হোক সব হারাম।

৬. যে কোন ধরনের প্লেট, বরতন বা সামগ্রীতে প্রাণীর ছবি তৈরি করা হারাম।

৭. কোন প্রকারের প্রাণীর ছবি ঘরে, দফতরে, অফিসে, আদালতে দোকানে বা বাড়ীতে লটকানো বা ঝুলানো নাজায়েয ও হারাম।

৮. শুধুমাত্র প্রাণহীন জিনিসের ছবি যথা বিল্ডিং, গাছ পালা, পাহাড় পর্বত ইত্যাদির ছবি জায়েয, এসব কেনা-বেচা করা বা এর পেশা অবলম্বন জায়িয়। সুতরাং বর্তমান যুগে যে ভাবে ছবি তোলা, তোলানো, ছাপা ব্যাপক হয়ে গেছে এবং লোকেরা এটাকে কোন গুনাহই মনে করছে না এটা বিবেক লোপ পাওয়ার আলামত, এসব জিনিষের সাথে সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণ হারাম, নাজায়েয এবং কবীরা গুনাহ। অনেক জায়গায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উষর দেখিয়ে বলা হয় যে ছবি না হলে চলে না, এজন্য তারা ছবিকে জরুরী মনে করে। অথচ এটা তাদের ভুল ধারণা। কেননা অনেক ক্ষেত্র এমন আছে যেখানে ছবির মোটেও প্রয়োজন নেই অথচ সেখানে ছবি ছাপা হচ্ছে। যেমন টাকার মধ্যে ছবির ব্যাপারটা, এর কোন প্রয়োজন নেই অথচ ছাপা হচ্ছে। অনুরূপভাবে সব ধরনের ব্যবসায়িক জিনিষ চাই তা পানাহারের হোক বা পরিধানের হোক অথবা অন্য কোন ব্যবহারের হোক সেখানে প্রাণীর ছবির কোন প্রয়োজন নেই। অথচ সেখানে রং বেরংয়ের ছবি ছাপা হচ্ছে। এমনকি মহিলাদের নগ্ন ছবি পর্যন্ত ব্যবসায়ী পণ্যের মধ্যে ছাপা হচ্ছে। সুতরাং এটা শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। আল্লাহ তা‘আলা তার রাসুল এবং তার ফিরিশতা বর্গের এবং সমস্ত মাখলুকের লানত আর অভিসমপাত হোক ঐ ব্যক্তির উপর যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে এই হারাম কাজকে চালু করেছে এবং এর শিক্ষা দিয়েছে ও এটাকে ব্যাপক করেছে। মানুষের পরিচিতির জন্য কুরআন যে উসুল দিয়েছে সেটাই যথেষ্ট, অর্থাৎ পিতার নাম, দাদার নাম বংশের নাম গ্রামের নাম এবং এলাকার নামই তার পরিচিতির জন্য যথেষ্ট, ছবি ছাড়াই হাজার হাজার ছাহাবায়ে কেরামের নাম, ইতিহাস, জন্ম বৃত্তান্ত আজো সংরক্ষিত আছে। সংরক্ষিত আছে হাদীস বর্ণনাকারী লাখ লাখ মুহাদ্দিসীনদের নাম। তাদের কারনামা শুনে হাজার হাজার মানুষ মুসলমান হয়েছে, পশুর জীবন তরক করে মনুষ্য জীবন যাপন করতে শুরু করেছে, আর আজ ছবির পরে ছবি প্রকাশিত হওয়ার পরেও চুরি-ডাকাতি, ধোকাবাজি একের পর এক ঘটে চলেছে। ছবির কারণে কোন অপরাধ হ্রাস পায় নেই এবং এতে বিশেষ কোন লাভ ও হয় নেই, বরং এর কারণে আরো শত শত খারাবী জন্ম নিয়েছে, উলঙ্গ পনা, বেহায়াপনা, ধর্ষণ অপহরণ ইত্যাদি বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা আবার ফিরে গেছি জাহেলিয়াতের অন্ধকার যুগে। চিন্তা করলে দেখা যাবে এসব হারাম অবলম্বন করার কারণেই আমরা অনগ্রসর হয়ে যাচ্ছি, আমাদের উন্নতির পথে এসব জিনিসই প্রতি বন্ধক। অথচ আমাদের নেতারা বলছেন যে, দ্বীন ধর্ম আর মৌলবী মোল্লারাই নাকি উন্নতির পথে অন্তরায় হয়ে আছে। (নাউযুবিল্লাহ) পূর্ববর্তী হাদীসের পর্যালোচনা দ্বারা আরো কয়েকটি জিনিস স্পষ্ট হয়ে যায়। তা হচ্ছেঃ

১. ছবি আঁকা, ছবি তোলা এবং ফটোগ্রাফীর মধ্যে যেহেতু আল্লাহতালার স্রষ্টা হওয়ার গুণের সাথে সাদৃশ্যতা এসে যায় এই জন্য তা নিষিদ্ধ।

২. কোন মুসলমানের জন্য ফটোগ্রাফীর পেশা অবলম্বন করা হারাম।

৩. যে সব মিল-কারখানায় প্রাণীর ছবি যুক্ত কাপড় তৈরি হয় অথবা অন্য কোন জিনিস তৈরি হয় সেসব কাপড় বা জিনিস তৈরি করা হারাম।

৪. যে কারখানায় বা প্রেসে ছবি যুক্ত বই-পুস্তক পত্র-পত্রিকা বিজ্ঞাপন, পোষ্টার, হ্যান্ডবিল ইত্যাদি ছাপা হয় সেই প্রেসের মালিক এর যিম্মাদার হবে। ছাপানোর কারণে সেও গুনাহগার হবে।

৫. ব্যবসায়ী পণ্য যে ধরনেই হোক না কেন তার বাইরে ছবি ছাপা না জায়েয ও হারাম।

৬. যে সব ব্যবসায়ীরা হালাল রোযগারের পাক্কা এরাদা করেছেন এবং হারাম ব্যবসা থেকে বাঁচতে চাচ্ছেন তারা একটু হিম্মত করলেই এসব গুনাহ থেকে বাঁচতে পারে, হয়তবা লাভ একটু কম হবে, কিন্তু তাতেই বরকত হবে। ঈমান নসীব হবে। অন্তরে ঈমানী শক্তি পয়দা হবে। আমল জানদার হবে। শয়তান হাল ছেড়ে দেবে। জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত হবে। নতুবা সামান্য লাভের জন্য এই হারাম পন্থা অবলম্বন করলে সাময়িক লাভ হতে পারে কিন্তু তা চিরস্থায়ী বরবাদী আর ধ্বংস ডেকে আনবে। (জাওয়াহিরুল ফিকহ-২৩৮-৩)

ছবি, মূর্তি এবং খেলনা পুতুল | ইসলামী যিন্দেগী