নামায না পড়ার ব্যাপারে কিছু ত্রুটি

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)১৮ মে, ২০২৫নামায

প্রশ্ন

নামায না পড়ার ব্যাপারে যে ত্রুটি রয়েছে তা বিস্তারিত উল্লেখ করলে ভালো হয়।

উত্তর

শতকরা ১০০ ভাগ মুসলমানের মধ্যে আজ প্রায় ৮০/৮৫ ভাগই বেনামাযী। নামায না পড়ার যে কত গোনাহ তা কারো অজানা নয়। কিন্তু আফসোসের বিষয় হল, নামায না পড়ে মানুষ সেটাকে জায়েয করার জন্য বিভিন্ন রকম বাহানা দেখাতে থাকে। কেউ বলে আমি গরীব মানুষ, পেটের ধান্দায় দিন চলে যায়, নামায পড়ার সময় কোথায়? কিন্তু চিন্তা করলে দেখা যাবে তাদের এই কথা চাপাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। এখানে আসল কথা হচ্ছে তার উদাসীনতা ও অনীহা। সময় না পাওয়া কোন ওষর নয়। কেননা আমরা দেখি যখন তার সময় বা সুযোগ থাকে তখনো কিন্তু সে নামায পড়ে না, সময় সুযোগ না পাওয়াই যদি তার নামায না পড়ার মূল কারণ হত তাহলে যখন সময় হত তখন সে অবশ্যই পড়ত। এর দ্বারা বুঝা গেল সবই তার অলসতা ও অনীহার কারণে হয়।

দ্বিতীয় কথা হল, এটা যদি তার জন্য সত্যিই কোন ওজর থাকে যার দরুন সে ওয়াক্ত মত পড়তে পারে নাই তাহলে পরে কাযা পড়ে নিত। কেননা কাযার জন্য তো আর কোন সময় নির্ধারণ করে দেয়া হয় নাই, যখনই সুযোগ হবে তখনই পড়ে নেবে। তৃতীয় কথা হল, তার বেপরোয়া ভাবের কারণে যদি নামায না ছুটত তাহলে তার মন ব্যথিত হত। যেমন দুনিয়ার কাংখিত কোন বস্তু ছুটে গেলে কষ্ট হয়, সেটা পাওয়ার জন্য চেষ্টা-তদবীর করে, তার ফিকিরে লেগে যায়। এই বেনামাযীর কি সেরকম কোন কষ্ট হয়? আর যেন নামায না ছোটে সেজন্য কি কোন চেষ্টা তদবীর করে? মোটেই না। বুঝা গেল মুখে তারা যে কথা বলে সেটা মূল কারণ নয়।

এখন এর থেকে বাঁচার উপায় হল, নামায তরককারীদের ব্যাপারে হাদীস শরীফে যে সাবধান বাণী উচ্চারিত হয়েছে তা স্মরণ করা, রাসুলুল্লাহ ﷺ বে-নামাযীকে কাফের আখ্যা দিয়েছেন, বলেছেন তার হাশর হবে কারুন, হামান, ফেরাউনের মত খোদাদ্রোহীদের সাথে।

এসব কথাকে দিলে বসাবার জন্য কবরের হালত, জাহান্নামের বিভীষিকাময় অবস্থা সম্মন্ধে চিন্তা করা। দ্বিতীয় হল, স্বীয় নফসের উপর চাপ প্রয়োগ করবে এবং কাউকে বলে রাখবে যে, নামাযের সময় যেন তাকে জোর করে হলেও নামায পড়াতে নিয়ে যায়। এছাড়াও যখন নামায ছুটে যাবে তখন নিজের শান্তির জন্য কিছু আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা করবে। যখনই নামায ছুটে যাবে তখনই এই পরিমাণ টাকা-পয়সা ফকির- মিসকিনকে দিয়ে দেবে যাতে নফসের উপর চাপ পড়ে। অথবা এমনও করতে পারে যে, নিজের উপর কষ্ট চাপিয়ে নিবে, যেমন এক ওয়াক্ত নামায ছুটে গেলে ২০ রাক‘আত নামায পড়তে নিজেকে বাধ্য করবে। দুই-চার বার এমন করলে নফস ঠিক হয়ে যাবে। আরো একটা পন্থা অবলম্বন করা যায়, যেমন এক ওয়াক্ত নামায ছুটে গেলে এক বেলা খানা খাওয়া বন্ধ করে দেবে, দুই ওয়াক্ত নামায ছুটলে দুবেলা খানা খাবে না। এতে যেহেতু নফসের উপর খুবই চাপ পড়বে তাই তাড়াতাড়িই নফস সোজা হয়ে যাবে। অনেক বুযুর্গদের জীবনেও এই দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়। তাহাজ্জুদ কাযা হয়ে গেলে তারা নিজের পিঠে বেত লাগাতেন এবং বলতেন তুমি যদি আবার এরকম কর তাহলে আমিও এরকমই করব। অনেককে দেখা যায়, সুস্থাবস্থায়, বাড়িতে থাকাবস্থায় তো নামায তেলাওয়াতের খুব পাবন্দ কিন্তু সফরে গেলে কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়লে আর পাবন্দী থাকে না। এটার কারণও ঐ অলসতা এবং বেফিকরী। মানুষ যদি কোন কাজের এরাদা করেই ফেলে তাহলে কোন না কোন ব্যবস্থা হয়েই যায়। একটু চিন্তা করে দেখুন, ঐ অবস্থায় যদি পেশাব-পায়খানার বেগ হয় তাহলে সফর বন্ধ করে বাস থামিয়ে সেকি এটা সেরে নেবে না? অসুস্থ অবস্থায় উঠতে একটু কষ্ট হয় তাই বলে কি সে বিছানায় পেশাব-পায়খানা করবে? মোটেও না। তাহলে নামাযটা হয় না কেন? কারণ একটাই, এটাকে জরুরী মনে করছে ওটাকে জরুরী মনে করছে না। বড়ই পরিতাপের বিষয়। পেশাব-পায়খানার জন্য সময় বের করা যায় কিন্তু নামাযের জন্য সময় বের করা যায় না। অথচ সফর ও অসুস্থ অবস্থায় নামায কত সহজ করে দেয়া হয়েছে। পানি ব্যবহার করতে না পারলে তায়াম্মুম করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে পড়তে বলা হয়েছে। রুকু-সিজদা করতে না পারলে ইশারায় পড়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কিবলার দিক জানা না থাকলে চিন্তা করে একদিকে ফিরে পড়তে বলা হয়েছে। এর দ্বারা বুঝা গেল যারা ট্রেনে সফরের সময় নামায ছেড়ে দেন আর বিভিন্ন ওযর দেখাতে থাকেন তার কোন বাস্তবতা নেই। অনুরূপভাবে অসুখের সময় নামায ছেড়ে দেয়াটাও আফসোস জনক। কেননা অসুখ হচ্ছে মৃত্যুর পয়গাম, এই অসুখেই তার পরপারের ডাক চলে আসতে পারে। এমতাবস্থায় তো কমপক্ষে আল্লাহ তাআলার স্মরণ করা জরুরী। যেন এই অবস্থায় মৃত্যু হলে ঈমানী মৃত্যু হয়। তাই এই সময়েও গাফেল হয়ে থাকা আশ্চর্য্যের ব্যাপার বটে।

অনেক অসুস্থ মানুষ এই বলে নামায ছেড়ে দেয় যে, কাপড় পাক নেই, শরীর পাক নেই। কিন্তু তাদের এই ওযর ভিত্তিহীন। কেননা আপনি এগুলি পাক করতে সক্ষম কি সক্ষম নন। যদি সক্ষম না হল তাহলে আপনি মাযুর। এই অবস্থায় আপনার জন্য নামায পড়া জায়েয। নামায আপনাকে পড়তেই হবে। মাফ হওয়ার কোন সুরত নেই। আর যদি পাক করতে সক্ষম হন তাহলে তো কোন ওযরই আর রইল না। তাহলে নামায পড়ছেন না কেন?

নামায না পড়ার ব্যাপারে কিছু ত্রুটি | ইসলামী যিন্দেগী