জুমু‘আর দ্বিতীয় আযান কোথায় দিতে হবে?

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)১০ মার্চ, ২০২৫নামায, আযান ইক্বামাত ও ইমাম মু‘আযযিন

প্রশ্ন

জুমু‘আর দ্বিতীয় আযান মসজিদের ভেতরে হবে না বাইরে হবে তা নিয়ে আমাদের এলাকায় ফেৎনা দেখা দিয়েছে। সারা জীবন আমরা এই আযান মসজিদের ভেতরে ইমামের সামনে হতে দেখে আসছি। কিন্তু ইদানীং বেরেলবী পন্থী কিছু আলেম বলছেন মসজিদের ভেতরে আযান দেয়া জায়েয হবে না বরং বাইরে দিতে হবে। তাদের কথা কতটুকু শরী‘আত সম্মত?

উত্তর

ইসলামী শরী‘আতের চারটি দলীল তথা কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের প্রত্যেকটির উপর প্রতিটি মুসলমানের বিশ্বাস স্থাপন করা এবং এগুলি শিখে সে অনুযায়ী আমল করা ফরয। এর মধ্যে থেকে কোন একটিকে কেউ অস্বীকার করলে তার ঈমান আশংকার মধ্যে পড়ে যাবে। কেউ যদি বলে আমি শুধু কুরআন-হাদীস মানি, ইজমা-কিয়াস মানিনা, তাহলে সে গোমরাহ এবং পথভ্রষ্ট। বরং তার এই আকীদা তাকে কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারে। অতএব এ ধরনের ভ্রান্ত আকীদা প্রত্যেকের বর্জন করা একান্ত জরুরী। কেননা ইজমা ও কিয়াস মূলত কুরআন-হাদীস থেকেই নেয়া। এদুটিকে অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে কুরআন সুন্নাহকে অস্বীকার করা।

এই ভূমিকা আলোচনার পরে এবার আমরা মূল আলোচ্য বিষয়ে ফিরে আসছি। জুমু‘আর খুতবার আযান অর্থাৎ সানী আযান মসজিদের ভেতরে হবে, না বাইরে হবে সে সম্পর্কে শরী‘আতের ফায়সালা হল, এই আযান মসজিদের ভেতরে তথা ইমাম সাহেবের সম্মুখে দিতে হবে। অর্থাৎ মসজিদের ভেতরে দেয়া সুন্নাত। বাইরে দেয়া সুন্নতের পরিপন্থী। তবে অন্যান্য আযান মসজিদের ভেতরে না দিয়ে বাইরে দেয়াই উত্তম। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে আবার ভেতরেও দেয়া যেতে পারে। জুমু‘আর খুতবার আযান রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে ইমামের সম্মুখে দাঁড়ীয়ে দেয়া হত। এ ব্যাপারে আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন জুমু‘আর খুতবা দেয়ার জন্য মিম্বরে বসতেন, তখন তার সম্মুখে মসজিদের দরজার নিকট দাঁড়িয়ে আযান দেয়া হত। (১-১৫৫)

হাদীস ও ফিকহের কিতাবে "ইনদাল মিম্বার" মিম্বারের নিকটে এবং "বায়না-ইয়াদাইল ইমাম" অর্থাৎ ইমামের সরাসরি সামনে আযান দেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। যদ্বারা একজন সাধারণ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তিও অবলীলাক্রমে বুঝতে পারবে যে, খুৎবার আযান মসজিদের ভেতরে ইমামের সামনে হওয়াই সুন্নত। তাছাড়া খুতবার আযান মসজিদের বাইরে দেয়ার কোন প্রমাণ শরীয়াতে নেই।

তবে এখানে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে, রাসূলে আকরাম ﷺ এর যুগে আযান মসজিদের দরজার নিকট দাঁড়িয়ে দেয়া হত, এর অর্থতো এটাও হতে পারে যে, এই আযান মসজিদের বাইরে দেয়া হত।

এই সন্দেহের উত্তর হল যে, এ ব্যাপারে হাদীস বিশারদগণ এবং ফুকাহায়ে কেরাম বুখারী শরীফের একটি হাদীস অবলম্বন করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে মসজিদে নববী খুবই ছোট এবং সংকীর্ণ ছিল। মসজিদের মধ্যবর্তী দরজা মিম্বারের সামনে ছিল, যার কারণে মসজিদের ভিতরে হুযুর ﷺ এর সম্মুখে আযান দিলেও অটোমেটিক তা মসজিদের দরজার নিকটই দাঁড়ানো হত।

কারণ মসজিদটির সংকীর্ণতার দরুন মিম্বার এবং দরজা খুবই কাছাকাছি ছিল। আর এ মধ্যবর্তী দরজাটি মূল মসজিদেরই ছিল, বারান্দার নয়। অতএব এর দ্বারা সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে জুমু‘আর খুৎবার আযান মসজিদের ভেতরেই দেয়া হত, বাইরে নয়।

দ্বিতীয় জবাব হল, যদি অল্প সময়ের জন্য মেনেও নেয়া হয় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যুগে খুৎবার আযান মসজিদের বাইরে দেয়া হত তথাপি ফুকাহায়ে কেরাম এর জবাবে বলেন-রাসূলে আকরাম ﷺ এর যুগে শুধুমাত্র জুমু‘আর সানী আযান অর্থাৎ খুতবার আযান দেয়ারই প্রচলন ছিল। প্রথম আযান তখন চালু ছিল না। ফলে জনগণকে নামাযের জন্য আহ্বানের উদ্দেশ্যে মসজিদের বাইরে আযান দেয়া হত, যাতে করে সকলে শুনে মসজিদে সমবেত হতে পারে। এর পরে তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা. এর খেলাফতের যুগে মদীনার বসতি যখন দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ল এবং আযান শ্রবণ করার সাথে সাথেই সকলের জন্য মসজিদে হাজির হওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ল, তখন তিনি সাহাবায়ে কেরামের ইজমার ভিত্তিতে জুমু‘আর প্রথম আযান চালু করলেন। যার ফলে তখন আর জুমু‘আর সানী আযান দ্বারা মানুষদেরকে আহবান করার প্রয়োজন থাকল না। বরং জুমু‘আর প্রথম আযানের দ্বারা মানুষদেরকে নামাযের জন্য আহ্বান করা হতে লাগল আর সানী আযান দ্বারা শুধুমাত্র মসজিদে উপস্থিত মুসল্লীদেরকে নফল নামায পড়া, কুরআন তেলাওয়াৎ, তাসবীহ, তাহলীল ইত্যাদি ইবাদত বন্ধ করে মনোযোগ সহকারে শুধুমাত্র খুৎবা শ্রবণের জন্য আহবান জানানো উদ্দেশ্য হল, সুতরাং তা আর মসজিদের বাইরে দেয়ার প্রয়োজন থাকল না। আর এর উপরই সমস্ত উম্মাতের ইজমা তথা ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হল।

এখন এই ইজমা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে কেউ যদি জুমু‘আর সানী আযান কে মসজিদের ভেতরে না দিয়ে বাইরে দেয়ার জন্য বাড়াবাড়ী করে তাহলে সে ইজমা অস্বীকারকারী রূপে গণ্য হবে এবং তার ঈমান চলে যাওয়ার আশংকা আছে। (ইলাউস সুনান-৮-৬৯, শামী- ২-২৬১, মাহমুদিয়া-২-৫৮)

জুমু‘আর দ্বিতীয় আযান কোথায় দিতে হবে? | ইসলামী যিন্দেগী