আলেম সমাজ টি.ভি প্রোগ্রামের বিরোধিতা করেন কেন?

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)১০ মার্চ, ২০২৫কুফর শিরক বিদ‘আত কুসংস্কার অপসংস্কৃতি, সামাজিকতা আচার ব্যবহার ও রাজনীতি

প্রশ্ন

আমাদের সমাজে কিছু লোক আছেন যারা পাশ্চাত্যের অন্ধ ভক্ত। অবশ্য নিজেদেরকে তারা মুক্ত বুদ্ধি ও মুক্ত চেতনার লোক বলে দাবী করে থাকেন। তারা আলেম সমাজের কঠোর সমালোচনা করে বলেন যে, এরা বড়ই গোঁড়া ও ধর্মান্ধ। মধ্য যুগীয় চিন্তা-চেতনা এদের কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তারা জানেনা যে, টেলিভিশন বর্তমান যুগের একটা অপরিহার্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞান-দর্শন, সাহিত্য শিক্ষা- সংস্কৃতি এমনকি দ্বীনের তাবলীগের জন্যও এটা একটা শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু আলেম সমাজ টি.ভি দেখা হারাম ফাতাওয়া দিয়ে সমাজকে আবার মূর্খতার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন এবং দ্বীন প্রচারের যে সুযোগ এসেছে তাও হাতছাড়া করে দিচ্ছেন।

আমার প্রশ্ন হল এদের এই সমালোচনা এবং আপত্তির যৌক্তিকতা কতটুকু?

উত্তর

আজ যারা টিভি, ভি.সি, আর দেখার পক্ষে সাফাই গাইছেন এবং আলেম উলামাদের বিরোধিতা করছেন তারা যে নিজেদেরকে ধোকার মধ্যে ফেলে রেখেছেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। টি, ভি, ভি. সি. আরের কারণে আজ সমাজে যে উচ্ছৃংখলতা দেখা দিয়েছে এবং নৈতিক চরিত্রের যে অবক্ষয় ঘটে চলেছে তাতে কোন বিবেকবান মানুষ এটাকে সমর্থন করতে পারে না। সন্তান-সন্ততির অধঃপতন দেখে অনেক অভিভাবক আজ শিউরে উঠছেন এবং নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করছেন। কিন্তু এতে কোন লাভ নেই, কেননা পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে "লজ্জা ঈমানের অঙ্গ"। যখন তোমার লজ্জা নেই, তখন তুমি যা মন চায় কর। একথা আজ সর্বজন বিদিত যে, এই টি.ভি. ভি. সি. আরের আধিক্যের কারণে সমাজ আজ নির্লজ্জ হয়ে গেছে, চতুর্দিকে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা আর উলংগপনার ছড়াছড়ি। যখন টি. ভি. ছিলনা তখন অশ্লীলতা তার উৎপত্তি স্থলেই সীমাবদ্ধ থাকত। সকলে তাতে জড়িত হতে পারত না। কিন্তু টি.ভি. আবিষ্কারের পর থেকে অশ্লীলতা মুহূর্তের মধ্যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। আজকের এসব আধুনিক প্রচার মাধ্যম আমাদের সমাজে যে অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে তা কারো নিকট অবিদিত নয়। যেনা, ব্যভিচার, ধর্ষণ, সমকামিতা, স্ত্রী বদল, ভাই বোনের সাথে অবৈধ সম্পর্ক, পিতা-কন্যার অবৈধ সম্পর্ক, লিভ টুগেদার ইত্যাদি এরই কুফল।

হাদীসে বর্ণিত আছে, গোনাহের কারণে অন্তরে আবরণ পড়ে যায়। তখন গুনাহ তার কাছে আর গুনাহ মনে হয় না। টি.ভি'র কারণে আজ আমাদের অন্তরে কিন্তু এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আপনি কোন নিয়মিত টি.ভি দর্শকের সামনে এর কুফল বর্ণনা করে দেখুন সে এটাকে মেনে নেবে না, বরং ঘুরিয়ে ফিরিয়ে টি.ভির উপকারিতা বয়ান করবে। নিজের ছাফাই গাইবে। একটা স্পষ্ট হারাম জিনিষকে জায়েয আখ্যা দেয়ার এই মানসিকতা যে কতটুকু ক্ষতিকর তা বলার প্রয়োজন নেই। যারা টি.ভি'র এই লা'নত কে জায়েয মনে করে না আবার তা দেখা থেকেও বিরত থাকে ন। তারা এই ধোকার মধ্যে পড়ে আছে যে, মুক্তির জন্য খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকা জরুরী নয় বরং ছদকা-খয়রাত করলেই চলবে। চাই তা হারাম মাল দ্বারাই হোক না কেন। এছাড়া যিকির আযকার করা আর বেশী বেশী নফল পড়া মুক্তি পাওয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ এই ধারণা তাদের জন্য বিষতুল্য। গুনাহ তরক না করে যে ব্যক্তি নফল ইত্যাদির মধ্যে মশগুল তার দৃষ্টান্ত ঐ আহম্মকের মত যে পতনোন্মুখ বিল্ডিংয়ের ফাউণ্ডেশন মজবুত না করে তার রং পালিশে ব্যস্ত।

টি.ভি. দেখার শারীরিক ক্ষতি এবং দৃষ্টি শক্তি লোপ পাওয়ার কথা তো বড় বড় অভিজ্ঞ ডাক্তাররা আজ স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করছেন। তাহলে একমাত্র আহম্মক ছাড়া কে নিজেকে ক্ষতির মধ্যে নিক্ষেপ করতে পারে? কোমলমতি ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার যে ক্ষতি এর দ্বারা হচ্ছে তাও আজ সর্বজন বিদিত। টি.ভি. পর্দার এই উলংগ নাচ আর অশ্লীল দৃশ্য ও প্রেম লীলা এসব ছেলে মেয়েদের অন্তরে যে উত্তেজনা আর খাহেশাতের জন্ম দিচ্ছে এবং তার যে প্রভাব সমাজের উপরে পড়ছে তাতে আমাদের এই সমাজ জাহেলিয়াতের যুগকেও হার মানাচ্ছে।

টি.ভি. শুধু বিনোদনের উপকরণই নয় বরং দুনিয়াতে যত বড় বড় অপরাধ সন্ত্রাস সংঘটিত হয় তার ট্রেনিং সেন্টারও বটে। আজ কালকার যুবকেরা টিভি ড্রামা, সিরিয়াল ইত্যাদি দেখে অপরাধের ধরণ শেখে, পরে সেটাকে বাস্তবে পরিণত করে। টিভিতে মাঝে মধ্যে যদিও সামান্য কিছু ধর্মীয় প্রোগ্রাম যথা আযান, নামায, হজ্ব, তিলাওয়াত ইত্যাদি দেখানো হয়ে থাকে কিন্তু এর দ্বারা দ্বীনের কোন খেদমত হয় না, বরং এটা দ্বীনের সাথে উপহাসের নামান্তর। টি.ভির এসব ধংসাত্মক পরিণাম, ক্ষতি ইত্যাদি অবগত হওয়ার পরে কোন সুস্থ বিবেকবান মানুষ টি.ভি কে সমাজ, পরিবার এবং নিজের সন্তানদের জন্য উপকারী বলতে পারে না। তবে এই মোটা কথাটা বুঝার জন্যও কিছু অনুভূতি থাকার দরকার। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল টি.ভি. স্বীয় ভক্তবৃন্দের মধ্যে থেকে এই অনুভূতিটাকেও নিঃশেষ করে দিয়েছে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহীহ বুঝ দান করুন। এখানে খুব ভালভাবে স্বরণ রাখা দরকার যে, দ্বীন ইত্যাদী প্রচার করতে কোন মুসলমান কখনো বাধা প্রদান করে না। বিশেষ করে উলামায়ে কেরাম যাদের সারাটা জীবনই ইলম-আদব, দীনী শিক্ষা প্রচারের জন্য উৎসর্গকৃত তাদের পক্ষ থেকে এই বাধার কথা কল্পনাও করা যায় না। তবে দ্বীনী শিক্ষা হাসিল করার জন্য কিছু শর্ত, কিছু আদব-কায়দা আছে। টি.ভি. কখনো ইলম হাসিল করার মাধ্যম হতে পারে না। সেটা গান-বাজনা নাচ ইত্যাদির কেন্দ্র, নায়ক-নায়িকার বিচরণ ক্ষেত্র। এমন জায়গায় বসে দ্বীনের তাবলীগ করা দ্বীনের খেদমত তো নয় বরং দ্বীনের সাথে উপহাস করা। যেখানে সারাদিন রাত অশ্লীল দৃশ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে সেখানে সামান্য সময়ের জন্য কোন সরকারী আলেম যদি অল্প কিছু ওয়াজ নসীহত করে তাহলে সেটা বাথরুমকে ইবাদতখানা বানানোর মতই হবে। টি.ভির কোন ভক্ত বলবেন কি বৎসরের পর বৎসর টি.ভি প্রোগ্রাম দেখে কজন কাফের মুসলমান হয়েছে কিংবা কজন বেনামাযী নামাযী হয়েছে?

উলামায়ে কেরাম কোন নব আবিষ্কারের বিরোধী নন। কিন্তু তারা যে কোন মূল্যে দ্বীনের মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুন্ন রাখতে বদ্ধ পরিকর। তাই তাদের এই বিরোধিতা। সুতরাং যুক্তিহীন সমালোচনা না করে বিষয়টিকে সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে সচেষ্ট হউন।

আলেম সমাজ টি.ভি প্রোগ্রামের বিরোধিতা করেন কেন? | ইসলামী যিন্দেগী