রাসূলে আকরাম ﷺ কে হাজির নাযির মনে করা
প্রশ্ন
রাসূলে আকরাম ﷺ কে হাজির নাযির মনে করা কেমন?
উত্তর
হাজির অর্থ বিদ্যমান আর নাযির অর্থ দর্শক, অবলোকন কারী। হাজির নাযির গুণটি একমাত্র আল্লাহ পাকের বৈশিষ্ট্য। অন্য কাউকে উক্ত গুণের অধিকারী মনে করলে সেটা শিরক হবে। চাই সে সত্তা নবী, অলী, ফেরেশতা যেই হোক না কেন।
আমাদের সমাজে কিছু লোক আছে যারা নামায-রোযা সহ শরী‘আতের মৌলিক বিষয়গুলির তেমন পাবন্দি না করলেও এই একটি বিষয় নিয়ে সমাজে ফেৎনা ছড়াচ্ছে। তাদের ধারণা ও দাবী হল নবী কারীম ﷺ হাজির নাযির তথা সদা সর্বত্র বিদ্যমান। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তারা মীলাদের মধ্যে কিয়াম করে থাকেন যে, মীলাদের মজলিসে স্বয়ং রাসূলে আকরাম ﷺ আগমন করে থাকেন।
অথচ কুরআন শরীফের অগণিত আয়াত এবং রাসূলে আকরাম ﷺ এর বেশ কিছু হাদীস দ্বারা এ কথা সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয় যে, সদা-সর্বত্র হাজির নাযির তথা বিদ্যমান থাকা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ছিফাত। কোন নবী বা অলীর মধ্যে এই সিফাত নেই। যদি কেউ এরকম আকীদা পোষণ করে তাহলে তার শিরক করার গুনাহ হবে। আমরা এ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত ও হাদীস এখানে উল্লেখ করছি,
আল্লাহ পাক তার প্রিয় হাবীবকে সম্বোধন করে বলছেন, হে নবী! আপনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, যে অবস্থাতেই কুরআন তিলাওয়াত করুন না কেন, আর তোমরা যে কোন আমল কর আমি অবশ্যই তোমাদের সম্পর্কে অবগত যখন তোমরা তা কর। সুরায়ে ইউনুস-৬১
অন্যত্র ইরশাদ করছেন, তোমরা যে কোন স্থানেই থাক না কেন তিনি তোমাদের সাথে আছেন। আর আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী দেখেন। সুরায়ে হাদীদ-৪
এ ধরনের আরো অনেক আয়াত আছে যার দ্বারা প্রমাণিত হয় আল্লাহ তা‘আলাই হাজির নাযির।
এবার আমরা কিছু হাদীস এবং নবী কারীম ﷺ এর কিছু ঘটনা উল্লেখ করব যার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তিনি গায়েব ও জানতেন না এবং হাজির-নাযির ও নন।
(১) রাসূলে কারীম ﷺ এর জীবনের দুটি অধ্যায় হচ্ছে মক্কী এবং মদনী জিন্দেগী। প্রথম জীবন মাতৃভূমি মক্কায় কাটান অতঃপর হিজরত করে মদীনায় যান। তিনি যদি হাজির-নাযিরই হবেন তাহলে হিজরত করার কি প্রয়োজন ছিল?
(২) মিরাজের ঘটনা সত্য। এটা সকল মুসলমান বিশ্বাস করে। এই মিরাজে আল্লাহ তা‘আলা তাকে বিশেষ যানের মাধ্যমে প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাস ভ্রমণ করিয়েছেন তার পর সেখান থেকে আকাশ মন্ডলীর ভ্রমণ করিয়ে জান্নাত-জাহান্নাম ইত্যাদি দেখিয়েছেন। যদি তিনি হাজির-নাযির হবেন তাহলে স্বতন্ত্র অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এসব স্থানে ভ্রমণ করানোর কী প্রয়োজন ছিল?
(৩) জনৈকা বৃদ্ধা মহিলা মসজিদে নববী ঝাড়ু দিত। একদিন নবী কারীম ﷺ বৃদ্ধাকে দেখতে না পেয়ে সাহাবাদের কাছে তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সাহাবারা বললেন, সে তো মারা গেছে। রাত ছিল তাই হুযুর কে সংবাদ দেয়াটা আমরা সমীচীন মনে করি নাই। আমরাই তার দাফন কাফন সম্পন্ন করে ফেলেছি। তখন নবী কারীম ﷺ ইরশাদ করলেন, তার কবরটি কোথায় আমাকে দেখিয়ে দাও আমি তার জানাযা পড়ব।
যিনি হাজির-নাযির হন তিনি তো সর্বত্র বিদ্যমান। তিনি সব কিছু দেখেন, শোনেন। নবী কারীম ﷺ যদি হাজির নাযির হবেন তাহলে বৃদ্ধার মৃত্যুর খবর তিনি জানতে পারলেন না কেন? তার কবরটা চিনতে পারলেন না কেন?
এধরনের আরো বহু ঘটনা আছে যার দ্বারা এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, নবী কারীম ﷺ হাজির-নাযির ছিলেন না। নবীয়ে কারীম ﷺ ইরশাদ করেছেন, তোমরা আমার উপর দরূদ শরীফ পড়লে ফেরেশতাদের মাধ্যমে তোমাদের নাম ও গোত্র সহ তা আমার নিকট পৌঁছানো হয়। (মিশকাত) তিনি যদি হাযির নাজিরই হবেন তাহলে ফেরেশতারা পৌছাতে যাবে কেন?
এতক্ষণের আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হল যে, রাসূলে আকরাম ﷺ এর হাজির-নাযির হওয়ার কোন প্রমাণ কুরআন ও হাদীসে নেই। যারা এরকম বিশ্বাস রাখে তারা গোমরাহ, বিদ‘আতী। এ ধরনের লোকের পিছনে নামায পড়া মাকরুহ তাহরীমী। (প্রমাণের জন্য দেখুন-শরী‘আত ইয়া জাহালত-৩৮০, আহসানুল ফাতাওয়া-১-৩৪৭-ইমদাদুল আহকাম ১-৯৫, ফাতাওয়া দারুল উলুম ১-৯৮ কিফায়াতুল মুফতী-১-১৫০)