মীলাদ পড়া-কিয়াম করা

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫কুফর শিরক বিদ‘আত কুসংস্কার অপসংস্কৃতি

প্রশ্ন

মীলাদ পড়া ও কিয়াম করা সম্পর্কে শরী‘আতের হুকুম কি? এর উৎপত্তি কোথা থেকে কিভাবে হল?

উত্তর

একথার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই যে, আখিরী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রতি ভালবাসা মুহাব্বাত মৌলিক ঈমান এবং প্রিয় নবী ﷺ এর জন্মলগ্ন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার জীবনাদর্শের ও কর্মকান্ডের পরিপূর্ণ অনুসরণ মহান আল্লাহ পাকের রহমাত প্রাপ্তির মাধ্যম। এ কারণেই মহান আল্লাহ পাকের রহমত পাওয়ার জন্য রাসূলে পাক ﷺ এর জীবনাদর্শ ও দ্বীনী আহকামের সম্যক ধারণা রাখা অপরিহার্য। মীলাদের শাব্দিক অর্থ জন্ম। মীলাদুন্নবী অর্থ নবী করীম ﷺ এর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনা করা। এটা নিশ্চয় সাওয়াব ও বরকতের বিষয় এবং মহান দ্বীনী কাজ। কিন্তু আমাদের দেশে শরীয়া নীতি সম্পর্কে অজ্ঞ কতিপয় লোকেরা মীলাদ শরীফ নামে গদবাঁধা যে অনুষ্ঠান ও কিয়ামের রীতি চালু করেছে স্বর্ণ যুগের সাহাবায়ে কেরাম বা তাবিয়ীন, তাবে তারিয়ীন রহ. গণের কোন এক যুগেও এর প্রমাণ নেই। অথচ সর্বজন স্বীকৃত যে, তারাই ছিলেন প্রিয় নবীর ﷺ আদর্শের প্রকৃত ধারক ও বাহক।

মীলাদের অর্থ যদি এই হয় যে, প্রিয় নবী ﷺ এর জীবনী আলোচনা করা শেষে প্রত্যেকে দুরুদ পড়ে দু‘আ করে নেবে, তাহলে এ ধরনের মীলাদ পড়তে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু আমাদের দেশে সাধারণতঃ যে নিয়মে মীলাদ ও কিয়াম করা হয়ে থাকে অর্থাৎ তাওয়াল্লুদ, কিয়াম, কতগুলি আজগুবি বাংলা-উর্দু-ফারসি কবিতা গাওয়া, ইয়ানবী সালামু আলাইকা ধরনের শাব্দিক ও অর্থগত ভুল দরুদ সালাম পাঠ করা ইত্যাদি এসব বিভিন্ন দিক দিয়ে আপত্তিকর এবং কুরআন-হাদীস-ইজমা-কিয়াসের নীতি বহির্ভূত, এর অস্তিত্ব ইসলামী শরী‘আতে নেই। দরুদ শরীফ দাঁড়ানো, বসা, শোয়া সর্বাবস্থায় পড়া জায়েয। দরুদ শরীফ পড়ার সময় যারা কিয়াম বা দাঁড়ানো জরুরী বলেন, তারা মনে করেন যেহেতু এ অনুষ্ঠানে হুযুর ﷺ স্বয়ং তাশরীফ আনেন তাই তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক দাঁড়ানো অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও মনগড়া, বরং শিরকের পর্যায় ভুক্ত। তাদের স্বপক্ষে কুরআন হাদীসের কোন প্রমাণ নেই। তদুপরি বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, হুযুর ﷺ স্বীয় জীবদ্দশায় তাঁকে দাঁড়িয়ে সম্মান দেখানোকে খুবই অপছন্দ করতেন এবং এ কাজ করতে কঠোর ভাবে নিষেধ করতেন। উপরন্তু যারা রাসূলে কারীম ﷺ -এর মীলাদ মাহফিলে আগমনের কথা বলেন, তারা তাঁকে সর্বত্র হাযির নাজির ও বিরাজমান মনে করেন, অথচ সর্বত্র হাজির নাযির থাকা একমাত্র মহান আল্লাহ পাকের বিশেষ খাস গুণ। এই আকীদা দ্বারা আল্লাহ পাকের সত্তাগুণে রাসুল ﷺ কে শরীক করা হয় যা মারাত্মক গুনাহ। তবে এ ধরনের কোন ধারণা পোষণ না করে কেউ যদি নিজে নিজে দাঁড়িয়ে দরুদ শরীফ পড়ে এবং যারা না দাঁড়ায় তাদের প্রতি কোন কটাক্ষ বা আপত্তি না করে তাহলে এরূপ দাঁড়ানোতে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম যেহেতু গর্হিত আকীদা ও পন্থায় আদায় করা হচ্ছে যা শরী‘আতের নিয়ম বহির্ভুত এবং কোন সাহাবী, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন ও আয়িম্মায়ে মুজাতাহিদীন থেকে এর প্রমাণ এবং প্রচলন পাওয়া যায় না। অতএব প্রচলিত মীলাদ ও কিয়াম বিদ‘আত ও নাজায়েয। তবে হ্যাঁ কেউ যদি জায়েয পদ্ধতিতে মীলাদ পড়তে চান তাহলে তার পদ্ধতি হল, কোন একজন হক্কানী আলেম রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনাদর্শ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ দিক সমূহ আলোচনা করবেন, বিভিন্ন কাজের সুন্নত তরীকা সমূহ বয়ান করবেন এবং রাসূলে পাক ﷺ এর উপর দরুদ শরীফ পাঠ করার ফযীলত বর্ণনা করবেন। অতঃপর উপস্থিত সকলে পৃথক পৃথক ভাবে অন্তরে মুহাব্বতের সাথে ঐসব দুরুদ পাঠ করবেন যা সহীহ হাদীসে বর্ণিত আছে। পরিশেষে আলেম সাহেব দু‘আ করবেন। (আহসানুল ফাতওয়া-১/৩৪৭ মাহমুদিয়া-১/২৮৮)।

উল্লেখ্য যে মীলাদ পরবর্তী যুগের নব আবিষ্কৃত অনুষ্ঠান। হুযুর ﷺ এর ইন্তিকালের প্রায় ছয়শত বৎসর পরে ৬০৪ হিজরীতে ইরাকের মুসিল শহরের বাদশাহ আবু সাঈদ মুযাফফর কাওকারী, আবুল খাত্তাব উমর ইবনে দিহইয়া নামক জনৈক দরবারী আলেম দ্বারা সর্বপ্রথম এর গোড়া পত্তন করান।

মীলাদ পড়া-কিয়াম করা | ইসলামী যিন্দেগী