ছবির প্রচলন কিভাবে শুরু হল
প্রশ্ন
ছবির প্রচলন সর্বপ্রথম কিভাবে শুরু হল?
উত্তর
ছবির প্রচলন সর্ব প্রথম এভাবে শুরু হয়েছিল যে, মানুষের চিরশত্রু ইবলীস, যে কিনা বনী আদমকে জাহান্নামী বানানোর কসম খেয়ে বসেছিল সে মানুষকে তাওহীদ থেকে বিচ্যুত করার জন্য শুরু থেকেই অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিল। কেননা শয়তান খুব ভালভাবেই জানে যে, মানুষ যদি তাউহীদের উপর কায়েম থাকে, সীরাতে মুস্তাকীমের উপর চলমান থাকে, আল্লাহ তা‘আলাকেই সবকিছুর মালিক মুখতার মনে করে, আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্যই পরস্পরে ভালবাসে ও শত্রুতা পোষণ করে, তাহলে তাদের থেকে প্রতিশোধ নেয়া মোটেও সম্ভব নয়। তাই মানুষকে ঈমানের নূর থেকে বের করে গোমরাহীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করার জন্য, একই জাতি-ধর্মের বন্ধন থেকে বের করে সাম্প্রদায়িকতার চোরাবালিতে ধসিয়ে দেয়ার জন্য, শান্তি-নিরাপত্তার বেষ্টনী থেকে বের করে ফেতনা-ফাসাদের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার জন্য, এক আল্লাহর ইবাদত থেকে বের কর বিভিন্ন দেব-দেবী আর মনগড়া কাল্পনিক মূর্তির সামনে মাথা নত করানোর ঘৃণ্য পথকে বেছে নিল। সুতরাং সে মানুষকে মূর্তিপুজায় লিপ্ত করার জন্য ছবিকে তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করলো। কেননা ছবি আর মুর্তি তো হচ্ছে প্রাথমিক স্তর। এর সূত্র ধরেই তো মানুষ তাওহীদকে বিসর্জন দিয়ে বসে।
এই পথে সফলতা লাভ করার জন্য শয়তান এই পদ্ধতি অবলম্বন করলো যে, হযরত আদম আ. এর বংশধরের কয়েকটি স্তর পার হয়ে যাওয়ার পরে সে তাদের নিকট হাজির হল এবং জিজ্ঞাসা করলো, অমুক অমুক বুযুর্গ যারা তোমাদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন তারা কেমন ছিলেন? লোকেরা স্ব স্ব ধারণা-বিশ্বাস অনুযায়ী উত্তর দিল যে, তারা খুবই নেক ও সৎ ছিলেন। শয়তান জিজ্ঞাসা করলো, তাদের বিচ্ছেদ আর তাদের শুন্যতা তোমরা কেমন অনুভব কর? লোকেরা বললো, অনেক বেশি। শয়তান বললো, তোমরা কি এটা পছন্দ কর যে, প্রতিদিন তোমরা তাদের দর্শন লাভ করবে, তাদের যিয়ারত প্রতিদিন তোমাদের নসীব হবে? লোকেরা বললো, তাতো অবশ্যই চাই। কিন্তু সেটা কিভাবে সম্ভব? শয়তান বললো, এটা একেবারেই সহজ। তোমরা তাদের ছবি মুর্তি বানিয়ে নিজেদের ঘরে এবং পবিত্র জায়গাগুলিতে রেখে দাও। অতপর সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে প্রতিদিন সেগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত কর। শয়তানের এই প্ররোচনায় মানুষ প্রলুব্ধ হল। তারা খুশিমনে এই প্রস্তাব গ্রহণ করে পিতৃপুরুষদের মুর্তি বানিয়ে ঘরে রেখে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে লাগল। এই প্রজন্ম শেষ হয়ে নতুন প্রজন্মের আবির্ভাব হলে শয়তান তাদেরকে বুঝাল যে, তোমাদের বাপ-দাদারা এই মুর্তিগুলির খুব সম্মান করত। সুতরাং তোমরাও তার সামনে মাথা নত কর। এভাবে এক পর্যায়ে তাদেরকে মুর্তি পুজায় লিপ্ত করলো।
হযরত আয়েশা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মৃত্যুর পূর্বে যখন অসুস্থ ছিলেন তখন একদিন তার স্ত্রীদের মধ্যে কয়েকজন, হাবশার একটি গির্জার কথা তার নিকট উল্লেখ করলেন, যার নাম ছিল মারিয়া। হযরত উম্মে সালামা রা. এবং হযরত উম্মে হাবীবা রা. হাবশায় হিজরত করেছিলেন, তারা উক্ত গির্জার সৌন্দর্য্য এবং তাতে স্থাপিত কিছু ছবির কথা নবীজীর নিকট বর্ণনা করলেন। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ﷺ স্বীয় মাথা মুবারক উপরের দিকে উঠালেন এবং বললেন, আহলে কিতাবদের নিয়ম এই ছিল যে, তাদের মধ্যে কোন নেক লোক মৃত্যুবরণ করলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করত অতঃপর তার মধ্যে ছবি রাখত। পরিশেষে সেই ছবি থেকেই মুর্তিপুজার প্রচলন হয় এবং শিরকের দরজা উম্মুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলার নিকট তারা অত্যন্ত নিকৃষ্ট মাখলুক হিসেবে পরিগণিত। (বুখারী শরীফ-১/১৭৯)
এই মুর্তিপুজাকে নিশ্চিহ্ন করে পৃথিবীর বুকে খালেস তাওহীদকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আল্লাহ তা‘আলা আম্বিয়ায়ে কেরামকে পৃথিবীতে পাঠালেন। তারা স্ব স্ব যুগে মুর্তি পুজার বিলুপ্তি ঘটিয়ে স্বীয় কউমকে তাউহীদের শিক্ষা দিলেন। সর্বশেষ আখেরী নবী হিসাবে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রেরিত হলেন এবং তিনিও লোকদেরকে নির্ভেজাল তাউহীদের দাওয়াত দিলেন, মুর্তি পুজা থেকে বিরত থাকতে বললেন এবং সকলকে দ্বীনে ফিতরাতের উপর কায়েম থাকার নির্দেশ দিলেন। শিরকের সূত্রপাত যেহেতু ছবির দ্বারাই হয়েছিল তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এ ব্যপারে খুব কঠোরতা করলেন এবং এর কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ করলেন। যেমন ইরশাদ হয়েছে,
اَشَدُّ النَّاسِ عَذَابًا يَّوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُوْنَ
কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাকের নিকট সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে ফটোগ্রাফারদের। (বুখারী শরীফ ২/৮৮০)
ছবি তোলা, অংকন করা, ভাস্কর্য তৈরী করা যেহেতু বড় গুনাহ তাই তার শাস্তিও হবে মারাত্মক।
সবচেয়ে বড় জালেম
হাদীসে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তার চেয়ে বড় জালেম আর কেউ নাই যে সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমার সাদৃশ্যতা অবলম্বন করতে চায়। তারা একটা পিপড়া কিংবা একটা দানা অথবা একটা জব সৃষ্টি করে দেখাক তো? (বুখারী-মুসলিম)
অর্থাৎ ছবি তোলাকে আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় সৃষ্টিতে নাক গলানো হিসেবে অভিহিত করেছেন। ছবি তোলা ঠিক এমন, কেমন যেন আল্লাহ তা‘আলার সাথে তার স্রষ্টা হওয়ার গুণে সমকক্ষতার দাবী করা। সুতরাং এটা যে কত বড় মারাত্মক গুনাহ তা সহজেই অনুমেয়।
হযরত আয়েশা রা. নবী কারীম ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি এরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষের মধ্যে ঐ লোকের শাস্তি সবচেয়ে কঠোর হবে, যে আল্লাহ তা‘আলার সাথে তার স্রষ্টা হওয়ার গুণে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে। (বুখারী-মুসলিম)
-জায়েয-নাজায়েয:৭ম খণ্ড