মসজিদ বিক্রি করার হুকুম

মুফতী মীযানুর রহমান কাসেমী সাহেব (রাহমানিয়া)২৩ এপ্রিল, ২০২৫মসজিদ মাদরাসা

প্রশ্ন

ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানরা যদি এক এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যায় এবং ছেড়ে যাওয়া এলাকায় যে মসজিদ আছে সেটা অনাবাদ হয়ে যাওয়া কিংবা তার উপর অমুসলিমদের কজ্বা হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকে তাহলে এমতাবস্থায় উক্ত মসজিদ বিক্রি করে দেয়া কি জায়েয হবে? কেননা সেখানে সাধারণতঃ মুসলমানরা কোন বাড়ি ক্রয় করে সেটাকে মসজিদ বানিয়ে ফেলে অতঃপর কোন কারণ বশতঃ উক্ত এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হলে মসজিদ অমনিই পড়ে থাকে, এমতাবস্থায় অমুসলিমরা সেটাকে দখল করে নিজেদের কাজে লাগায়। এখন যদি এমন হয় যে, মুসলমানরা চলে যাওয়ার সময় ঐ মসজিদ বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে অন্য জায়গায় নতুন বাড়ি ক্রয় করে মসজিদ বানিয়ে নিল তাহলে এই এক মসজিদকে অন্য মসজিদ দ্বারা পরিবর্তন করা কি জায়েয হবে?

উত্তর

পশ্চিমা দেশগুলিতে মুসলমানরা যে জায়গায় নামায আদায় করে সেটা দু’ধরনের হয়ে থাকে।

(১) কিছু জায়গা তো এমন হয় যেটাকে মুসলমানরা নামায আদায়ের এবং দ্বীনী কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নির্ধারিত করে নেয়। কিন্তু সে জায়গাটিকে শরঈ মসজিদের মত ওয়াকফ করে মসজিদ বানায় না, এই জন্যই ঐগুলিকে মসজিদ না বলে ইসলামী মারকায, জামা‘আত ঘর বা এই ধরনের কিছু নাম রাখা হয়। এ ধরনের বাড়ির ব্যাপারটি তো বড় সহজ। কেননা এখানে নামায আদায় করা হলে ও মালিকরা সেটাকে যেহেতু মসজিদ হিসাবে ঘোষণা করে নাই বা ওয়াকফ করে নাই সেহেতু সেটা মসজিদই না। সুতরাং মুসলমানদের স্বার্থের খাতিরে ওগুলিকে বিক্রি করা জায়েয হবে। এ ব্যাপারে সকল ফুকাহায়ে কেরাম একমত।

(২) দ্বিতীয় প্রকার হল যেগুলিকে মুসলমানরা ওয়াকফ করে শরঈ মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে। অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরামের নিকট এই ধরনের জায়গার হুকুম হল, ঐ জায়গা কিয়ামত পর্যন্ত মসজিদ হিসাবেই গণ্য হবে। কোন অবস্থাতেই সেটাকে বিক্রি করা জায়েয হবে না। যারা ওয়াকফ করেছিল তাদের মালিকানায়ও ঐ জায়গা আর ফিরে আসবে না। ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এরও এই মত।

তবে ইমাম আহমাদ রহ. এর মত হল, মসজিদের আশে পাশে যদি কোন আবাদী না থাকে এবং মসজিদের কোন দরকারই আর অবশিষ্ট না থাকে তাহলে এমতাবস্থায় মসজিদ বিক্রি করে দেয়া যাবে। (মুগনী লিইবনে কুদামাহ-৬-২২৫)

ইমাম মুহাম্মদ রহ. ও ইমাম আহমাদের সাথে একমত পোষণ করে ওটাকে বিক্রি করা জায়েয বলেছেন। (ফাতহুল কাদীর ৫-৪৪৬)

তবে দলীল-প্রমাণ পর্যালোচনা করলে জমহুর ফুকাহায়ে কেরামের মতকেই রাজেহ তথা অগ্রগণ্য বলে মনে হয়। সুতরাং কোন মসজিদ শরঈ মসজিদ হয়ে যাওয়ার পর সেটাকে আর বিক্রি করা জায়েয হবে না। কেননা যদি মসজিদ বিক্রি করার অনুমতি দেয়া হয় তাহলে লোকেরা মসজিদকেও গীর্জার মত বেচাকেনা শুরু করে দেবে এবং তখন মসজিদ একটা ব্যবসার মালে পরিণত হবে।

কিন্তু ফুকাহায়ে কেরামের মত বিরোধের কারণে এই মাসআলাটি যেহেতু একটি ইজতিহাদী মাসআলায় রূপান্তরিত হল এবং উভয় পক্ষেই কুরআন হাদীসের দলীল বিদ্যমান রয়েছে, সেহেতু যদি কোন অমুসলিম দেশে মসজিদের চারপাশের সকল মুসলমান হিজরত করে চলে যায় আর সেই মসজিদ দখল করে কাফেররা তার বেহুরমতি করবে বলে অনুমিত হয় এবং মুসলমানদের পুনরায় সেখানে ফিরে এসে বসবাস করার কোন সম্ভাবনা না থাকে তাহলে ভীষণ প্রয়োজনের সময় ইমাম আহমদ এবং মুহাম্মদ রহ. এর মাসলাক গ্রহণ করে ঐ মসজিদকে বিক্রি করা এবং বিক্রিলব্ধ টাকা দিয়ে অন্যত্র মসজিদ ক্রয় করার অবকাশ আছে বলে বুঝা যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যেন ঐ টাকা খরচ না হয়। (মুগনী লিইবনে কুদামাহ- ৬-২৬৮)

শেষ কথা হল, ইমাম আহমাদ রহ.এর মাসলাক গ্রহণ করে মসজিদ বিক্রি করা ঐ সময় জায়েয হবে যখন ঐ মসজিদের আশপাশের সমস্ত মুসলমান উক্ত এলাকা ত্যাগ করে চলে যায় এবং পুনরায় তাদের ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকে। কিন্তু যদি এমন হয় যে, সমস্ত মুসলমান ঐ এলাকা ত্যাগ করে নাই এবং বেশির ভাগ চলে গেছে আর কিছু এখনও রয়ে গেছে তাহলে এমতাবস্থায় উক্ত মসজিদ বিক্রি করা মোটেও জায়েয হবে না। হাম্বলী মাযহাবের ফুকাহারাও এটাকে নাজায়েয বলেছেন। (আল মুগনী-৬-২২৭)

মসজিদ বিক্রি করার হুকুম | ইসলামী যিন্দেগী